Trial Run

সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা: এখনো হয়নি কোন মামলা, নেই আটক

ছবি: সংগৃহীত

একটি ফেইসবুকের পোস্টকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জের শাল্লার একটি গ্রামে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে হেফাজতে ইসলামের সমর্থকরা। বুধবার সকালে উপজেলার নোয়াগাও গ্রামে ওই হামলায় ৮০-৯০টি বাড়িঘর ভাঙচুর ও আসবাবপত্র তছনছ করা হয়েছে। সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় আজ বৃহস্পতিবার (১৮মার্চ) পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। এমনকি পুলিশ কাউকে আটকও করেনি।

এলাকাবাসীর বরাত দিয়ে শাল্লা থানার ওসি নাজমুল হক বলেন, গত সোমবার দিরাই উপজেলায় হেফাজতে ইসলাম আয়োজিত সম্মেলনে যান হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী ও যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকসহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। সম্মেলনে মামুনুল হকের দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেন স্থানীয় এক হিন্দু যুবক।

ওই ঘটনাকে ধর্মীয় উসকানি আখ্যায়িত করে ওই এলাকার মামুনুল হকের অনুসারীরা মঙ্গলবার রাতে বিক্ষোভ মিছিল করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ রাতেই ওই যুবককে আটক করে বলে জানান ওসি।

বুধবার সকালে কাশিপুর, নাচনী, চণ্ডিপুরসহ কয়েকটি মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামের হেফাজত নেতা মামুনুল হকের কয়েক হাজার অনুসারী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে নোয়াগাও গ্রামে অতর্কিত হামলা চালায়। হাজারো মানুষের আক্রমণে গ্রাম ছেড়ে আত্মগোপনে যায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। এই সুযোগে হেফাজত নেতার অনুসারীরা গ্রামে প্রবেশ করে তছনছ করে। লুটপাট করে বিভিন্ন বাড়িতে।

হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের স্থানীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী বলেন, ‘রাতেই উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। সকালে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। তারপরও ওই গ্রামবাসীর নিরাপত্তায় পুলিশের আগাম ব্যবস্থা না নেয়া রহস্যজনক। পুলিশ তৎপর থাকলে এমন ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।’

গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, হামলাকারীরা ঘরের টাকাপয়সা নিয়ে গেছে। কয়েকটি ঘরের ভেতরে থাকা প্রতিমা ভাঙচুর করেছে। ঘরে থাকা লোকজনকে গালিগালাজ করলেও কাউকে মারধর করা হয়নি।

গ্রামের কলেজছাত্র লিটন দাস বলেন, মাঝখানে ধারাইন নদ না থাকলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতো। নদের কারণেই সব লোক গ্রামে আসতে পারেননি, কিছুটা রক্ষা পাওয়া গেছে।

নোয়াগাঁওয়ে হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদারের বাড়ি। তার ঘরটিও হামলার শিকার হয়েছে। তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার তারা জানতে পারেন যে তাদের গ্রামের ছেলে ঝুমন দাস ফেসবুকে হেফাজত নেতাকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। এরপর রাতেই গ্রামবাসী ঝুমন দাসকে আটক করে পুলিশে দেন। বিষয়টি নিয়ে এরপর প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে ওই চার গ্রামের লোকজনের সঙ্গে আলোচনাও হয়। কিন্তু পরের দিন বুধবার সকালে কয়েক হাজার লোক সংঘবদ্ধ হয়ে হঠাৎ করে তাদের গ্রামে হামলা চালান। গ্রামের অন্তত ৯০টি ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে লুটপাট চালানো হয়।

গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা অনিল চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমরা চিন্তাও করতে পারিনি এ রকম ঘটনা ঘটতে পারে। হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। পুলিশ এখনো কাউকে আটক করেনি কেন, এটাই বুঝতে পারছি না।’

একই গ্রামের রন্টু দাস বলেন, “আমাদের কী দোষ? আমরা কী করেছি? আমাদের উপর এমন অত্যাচার কেন? ঘরের মন্দির থেকে শুরু করে সব ভেঙেছে তারা। আমরা আতঙ্কে আছি।”

অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন গণমাধ্যমকে বলেন, “ফেইসবুকে একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে যায়। পরে সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে ওই যুবকের বাড়িতে হামলা করে।”

ওই হামলার সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের ‘কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই’ দাবি করে তিনি বলেন, “স্থানীয় হেফাজত ইসলামের নেতারা হামলাকারীদের প্রতিরোধ করেছে, বাধা দিয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দিয়েছে।”

এদিকে শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক আজ বেলা ১১টার দিকে বলেন, পুলিশ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার সঙ্গে জড়িত লোকজনকে আটকে অভিযান চালাচ্ছে। তবে থানায় এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। মামলা প্রক্রিয়াধীন। নোয়াগাঁও ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ মোতায়েন আছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে। আটক ঝুমন দাসের ব্যাপারে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হবে। সেটিও প্রক্রিয়াধীন।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিষয়টি শুধু সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা নয়, এর সাথে রাজনৈতিক বিষয়ও জড়িত। ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব জানান দিতে চায়। এ ধরণের সাম্প্রদায়িক হামলাগুলোকে আশ্রয় দিয়ে, প্রশ্রয় দিয়ে এবং সংগঠিত করে তারা মনে করিয়ে দিতে চায় যে তারা শক্তিশালী। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম এখনো বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

কোন ফেসবুক আইডিতে ইসলামের অবমাননা করা হয়েছে কিংবা সেখানে কী লেখা হয়েছে, সেটি আসল আইডি কিনা এ সম্পর্কে অধিকাংশের কোন ধারণাই থাকেনা। প্রতিবাদকারীরা এগুলো যাচাই করার প্রয়োজন মনে করেন না। এটা হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতার জোর।

এসডব্লিউ/এমএন/ এফএ/১৪৪৫

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 116
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    116
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ