Trial Run

গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, তবু ‘স্পুটনিক-৫’ টিকা এখনও সাধারণ মানুষের জন্য নয়!

Image credit: Yalç?n Sonat / 123rf

শুভ্র সরকার : স্পুটনিক-৫ টিকা নিয়ে জনমনে সংশয় থাকলেও গতবছর রাশিয়া যে ট্রায়াল চালিয়েছিল সেখানে উপসর্গযুক্ত কোভিড-১৯ রোগের বিরুদ্ধ টিকাটি ৯১ দশমিক ছয় শতাংশ কার্যকর বলে জানা যায় বিশ্বের প্রথম সারির চিকিৎসা বিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে।

স্পুটনিক টিকা তৈরি করা হয়েছে মস্কোর এপিডেমিওলজি ও মাইক্রোবায়োলজি বিষয়ক জাতীয় গবেষণা কেন্দ্রে। স্পুটনিকেও করোনা প্রতিরোধের জন্য দুই ডোজ ইঞ্জেকশান প্রয়োজন হবে। তবে স্পুটনিকের ক্ষেত্রে একটা বাড়তি সুবিধা হবে যে সেটি খুবই ঠান্ডায় সংরক্ষণের প্রয়োজন হবে না।

তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় অংশ নেয়া ২০ হাজার অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকে আসা বিশ্লেষণের উপাত্ত বলছে, যাদের টিকার দুটি ডোজ দেয়া হয়েছে, সে সবক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ কার্যকারিতা দেখা গেছে। টিকাটি বয়স্কদের জন্য যথেষ্ট কার্যকর, যাদের মৃত্যুহার সবথেকে বেশি। বিভিন্ন সমীক্ষায় জানা গেছে ৬০ বছরেরও বেশি বয়স্ক প্রায় ২ হাজার মানুষের মধ্যে এই স্পুটনিক ভি টিকা দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। তা থেকেই জানা যায় স্পুটনিক ভি টিকাটি সমানভাবে কার্যকরী। কিন্তু ট্রায়ালটি চালানো হয়েছিল সমস্ত শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের উপর।  

প্রতিবেদনে প্রকাশিত কিছু তথ্য প্রশ্নের জন্ম দেয়। স্পুটনিক টিকা তুলনামূলকভাবে কম মানুষের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে, ফলে এর তথ্যউপাত্তও কম সংখ্যক পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে দেয়া।  

লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিকাল মেডিসিনের ভাইরোলজির অধ্যাপক ইয়ান জোনস, টিকাটির বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি, উপযুক্ত পরীক্ষা ও স্বচ্ছতারর অভাব আছে বলে প্রথমে অভিযোগ করেন। কিন্তু ট্রায়ালের ফলাফলে দেখা যায়, এটি কোভিড রোগীদের ক্ষেত্রে ৯১.৬ শতাংশ কার্যকরী। যার অর্থ বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আরও একটি অস্ত্র মানুষের হাতে এল। 

চূড়ান্ত ট্রায়ালের আগেই টিকাটি অনুমোদন দেয়ায় এটি বেশ বিতর্ক তৈরি করেছিল। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটির উপকারিতা এখন প্রমাণিত। এর ফলে প্রমাণিত টিকার তালিকায় ফাইজার-বায়োএনটেক, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, মডার্না ও জ্যানসেনের সঙ্গে স্পুটনিক ভিও যুক্ত হল।

ছাড়পত্র দেওয়া দেশগুলো

রাশিয়ার তৈরি টিকা ‘স্পুটনিক-৫’ নিয়ে বিশ্বের ২০টি দেশ আগ্রহ দেখিয়েছিল বলে জানা যায়। তার মধ্যে ভারতও ছিল। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিশ্বে প্রথম করোনার টিকা আবিষ্কারের সাফল্য ঘোষণার পরেই দেশটি দাবি করে, ভারত-সহ ২০টি দেশ টিকা চেয়ে রেখেছে। আর তার পরিমাণ ১ বিলিয়ন মানে ১০০ কোটি ডোজ।

সংবাদ সাময়িকী নিউ স্টেটসম্যানের এক খবরে বলা হয়েছে, রুশ সরকারের বিনিয়োগ সংস্থা, রাশান ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড, স্পুটনিক-৫ টিকার শত শত কোটি ডোজ বিক্রির জন্য এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের সাথে ডজন খানেক চুক্তি করেছে।

সূত্র মতে, ভারতের কাছে রাশিয়া স্পুটনিক-৫ টিকাটি প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডোজ বিক্রি করেছে। এর পাশাপাশি এ বছরই ভারত নিজ দেশে ৩০০ মিলিয়ন ডোজ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদিকে, মেক্সিকো এপ্রিলের মধ্যে ৭.৪ মিলিয়ন ডোজ আমদানি করবে বলেও জানা যায়। মে মাসে নেবে আরও এক চালান।

১১ মার্চ অব্দি ৫০টি দেশে স্পুটনিক-৫’ টিকাটি প্রয়োগের ছাড়পত্র পেয়েছে এবং নামিবিয়া ৫০তম দেশ। এছাড়া রয়েছে ইরান, ইটালি, ভারত, হাঙ্গেরি, জার্মানি, নেপাল, বলিভিয়া, ব্রাজিল, মিশর, ফিলিস্তিন, কোরিয়া, তিউনিসিয়া, ভেনিজুয়েলা।

গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই

বাকি সব টিকার মতো কোভিড-১৯ টিকা নেওয়ার পর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে ইউএস সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল (ইউএস-সিডিসি)। যা শরীরে ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির লক্ষণ।

এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে দিনের স্বাভাবিক কাজ করতে কারও কারও সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা কয়েকদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যায়। টিকা ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরের যে অংশে পুশ করা হয় সেখানে এবং এর পরবর্তীতে সারা শরীরেই এর সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

যেখানে টিকা পুশ করা হবে সেখানে ব্যথা হতে পারে বা ফুলে যেতে পারে। ইউএস-সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে জ্বর, সর্দি, অবসাদ ও মাথাব্যথা হতে পারে।

সূত্র মতে, রাশিয়া নয় বরং টিকার কার্যকারিতার উপর সমীক্ষা করেছে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট পত্রিকা। রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে সেই জার্নালে প্রকাশিত একটি উন্নত সমীক্ষার প্রাথমিক ফলাফল অনুসারে, দেশের স্পুটনিক-৫ (Sputnik V) টিকা COVID-19-এর বিরুদ্ধে নিরাপদ এবং কার্যকর বলে মনে হচ্ছে।

স্পুটনিক-৫ টিকার অন্তর্বর্তী পরীক্ষায় অংশ নেন ২০ হাজারের বেশি মানুষ। তাদের এক-তৃতীয়াংশকে এই টিকা দেওয়া হয়। বাকিদের দেওয়া হয় প্লাসেবো (প্রতিক্রিয়াহীন তরল পদার্থ)। আসল টিকা গ্রহণকারীদের কারো বড় ধরনের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। 

যদিও টিকা নেয়ার পর কেউ কেউ হালকা জ্বরের মতো উপসর্গ, ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা বা দুর্বলতা বোধ করেছিলেন। তবে কোনও গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। যেটা বাকি টিকার ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছে।

দ্য মস্কো টাইমস একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, টিকা নিয়ে প্রতি সাতজনের মধ্যে একজনের শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল।

দ্রুত অ্যান্টিবডি তৈরি 

স্পুটনিক ভি টিকাের নির্মান সংস্থা জানিয়েছে, টিকাটি কোন জটিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখায়নি বরং স্বেচ্ছাসেবকের শরীরে টিকাটির একটি ডোজই অ্যান্টিবডি তৈরি করছে।      

গ্যামেলিয়ার কর্ণধার আলেক্সান্ডার গিনটসবার্গ বলেছেন, প্রথম দফায় টিকা দেওয়া হয়েছিল যাদের, তাদের প্রত্যেকের শরীরেই ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে। টিকার একটি ডোজেই বি-কোষ ও টি-কোষ সক্রিয় হয়েছে। ভাইরাস প্রতিরোধী ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে শরীরে। 

দ্য মস্কো টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আলেক্সান্ডার জানিয়েছেন, টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার ২১ দিনের মাথায় রক্তে অ্যান্টিবডি তৈরি শুরু হয়ে যাচ্ছে। আলেক্সান্ডারের দাবি, এই টিকার একটি ডোজেই কাজ শুরু হবে, দ্বিতীয় ডোজ আরও বেশি ইমিউনিটি তৈরি করবে।

গ্যামেলিয়া আরও দাবি করেছে, যাদের এখনও অব্দি টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়েছে তাদের কারও শরীরেই কোনও জটিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। দুটি ডোজ দেওয়ার মাঝের সময়ে যে কয়েকজনের শরীরে সাইড এফেক্টস দেখা গিয়েছিল তাও সামান্য। কিছুদিনের মধ্যে সেরে উঠেছিলেন তারা।

গত বছর সেপ্টেম্বরের প্রথমেই আমজনতার জন্য টিকার ডোজ নিয়ে আসে রাশিয়ার গ্যামেলিয়া ন্যাশনাল রিসার্চ সেন্টার অব এপিডেমোলজি অ্যান্ড মাইক্রোবায়োলজি এবং রাশিয়ান ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড। রাশিয়ার অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের সদস্য ডেনিস লগুনভ বলেছেন, টিকার সেফটি ও কোয়ালিটি চেকের পরে গণ-প্রয়োগের ছাড়পত্র দিয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশে টিকার কার্যকারিতা

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রথম ডোজের টিকা নেয়ার পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন করোনাভাইরাসের দুই ডোজ টিকা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশে এখনও শুধুমাত্র প্রথম ডোজের টিকা দেয়া চলছে। দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেয়া শুরু হয়নি।

“করোনাভাইরাসের এক ডোজ টিকা কাউকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারবে না। ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে দুই ডোজ টিকা দিতে হবে। তার আগ পর্যন্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিয়ম মেনে চলতে হবে। না হলে ঝুঁকি থাকবেই।”

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষণা অনুযায়ী টিকার পূর্ণ ডোজ নেয়ার পরও মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে অন্তত ১৪ দিন সময় লাগে। টিকা দেওয়ার পর এই সময়ের মধ্যে মানুষের শরীরে করোনা ভাইরাসের জেনেটিক উপাদানগুলো চিনে সে অনুযায়ী অ্যান্টিবডি এবং টি-সেল তৈরি করে। ওই অ্যান্টিবডি ভাইরাসটিকে আর দেহকোষে প্রবেশ করতে দেয় না বা আক্রান্ত কোষগুলোকে মেরে ফেলতে শুরু করে।

বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার ১১ মাসের মাথায় দেশব্যাপী টিকা কার্যক্রম শুরু করা হয়। বাংলাদেশে মূলত দেয়া হচ্ছে ব্রিটেনের আবিষ্কৃত এবং ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা।

এই টিকার প্রথম ডোজ নেয়ার ৪ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নিতে হয়। না হলে টিকার অপচয় হয়ে যায়। 

হার্ড ইমিউনিটি 

হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তোলার জন্য অর্থাৎ একটি দেশ বা অঞ্চলে করোনাভাইরাসের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সেখানকার ৭০-৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে এই টিকা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দিতে হবে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমেদ। হার্ড ইমিউনিটি এমন না যে বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষকে করোনাভাইরাসের টিকা দিতে হবে।

বরং এই জনগোষ্ঠীকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে যেমন পাড়া, মহল্লা, উপজেলা, জেলা ধরে ধরে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তুলতে হবে। তারপর পুরো দেশে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।

তিনি বলেন, “আপনি ঢাকার সব মানুষকে টিকা দিলেন কিন্তু রাজশাহীর কোন একটি উপজেলার ৪০% মানুষকে টিকা দিলেন, সেটা হার্ড ইমিউনিটি হবে না। কারণ হার্ড ইমিউনিটি কোন এভারেজ নয় বরং ছোট ছোট ইউনিট ধরে অর্জনের বিষয়।”

বাংলাদেশে ছাড়পত্র পেল ‘স্পুটনিক ভি’

 গত ২৮ জানুয়ারি ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান নিশ্চিত করেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধক টিকা হিসেবে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম অনুমোদন পাওয়ায় রাশিয়ার ‘স্পুটনিক-৫’ দেশে আসার জন্য ছাড়পত্র (নন অবজেকশন সার্টিফিকেট) পেয়েছে।

তবে, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর জানিয়েছে, টিকাটি শুধু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত রাশিয়া, বেলারুশ ও ইউক্রেনের নাগরিকদের ওপর প্রয়োগ করা হবে।

মাহবুবুর রহমান জানান, প্রাথমিকভাবে রাশিয়ায় উৎপাদিত এক হাজার টিকা অর্ডার করা হয়েছে। ‘স্পুটনিক-৫’ এর অনাপত্তিসূচক সনদ (এনওসি) দেওয়া হয়েছে। এই টিকার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের। ইস্যুর তারিখ থেকে পরবর্তী ছয় মাস অনাপত্তিপত্র বলবৎ থাকবে।

টিকা প্রয়োগের পর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর দায়ী থাকবে না। এর সব দায়-দায়িত্ব বহন করবে রাশিয়ান স্টেট অ্যাটমিক অ্যানার্জি করপোরেশন।

এসডব্লিউ/এসএস/১৪৩২ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 29
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    29
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ