Trial Run

মমতার বিরুদ্ধে লড়বেন শুভেন্দু, মমতা কাল মাঠে নামছেন

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন

ছবি: সংবাদ প্রতিদিন

গতকাল আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থীতালিকা ঘোষণা করার পর আজ করলেন বিজেপি। আজ শনিবার(০৬ মার্চ) বিধানসভা ভোটের প্রথম দু’দফার ৫৭টি আসনের প্রার্থীতালিকা ঘোষণা করেছে বিজেপি। সেই তালিকায় নন্দীগ্রাম আসনের পাশে জ্বলজ্বল করছে শিশিরপুত্র খ্যাত শুভেন্দু অধিকারী।  সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এবার মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে নন্দীগ্রাম আসনে বিজেপির হয়ে লড়বেন শুভেন্দু অধিকারী।

এদিকে দলীয় প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেই নির্বাচনী প্রচার শুরুর প্রস্তুতি নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আগামীকাল রোববার(০৭ মার্চ) শিলিগুড়ি শহরেই তার এক রাজনৈতিক কর্মসূচি রয়েছে। অনুষ্ঠানিকভাবে সেখান থেকেই নির্বাচনের প্রচার শুরু করবেন তিনি।

রাজ্য বিধানসভায় রয়েছে ২৯৪টি আসন। আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গতকাল শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে ২৯১ আসনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছেন। তিনটি আসন তিনি ছেড়ে দিয়েছেন দার্জিলিংয়ের গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার প্রার্থীদের জন্য।

এসময় মমতা বলেন, তিনি এবার পূর্ব মেদিনীপুরের  নন্দীগ্রাম আসনেই  লড়বেন। তবে তার কলকাতার ভবানীপুরের বর্তমান আসনে এবার তিনি লড়ছেন না। সেখানে লড়বেন দলের আরেক নেতা শোভন দেব চট্টোপাধ্যায়। এই নন্দীগ্রাম আসনে শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির প্রার্থী হতে পারেন বলে আগে থেকেই আভাস ছিল। আজ শনিবার বিজেপি প্রার্থীতালিকা ঘোষণা করলে সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

গত কিছুদিন আগেও শুভেন্দু অধিকারী মমতার দলের অনুগত এক নেতা ছিলেন। তার প্রতি আস্থা রেখে মমতা তাকে পশ্চিমবঙ্গের পরিবহনমন্ত্রী করেছিলেন। তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতা শুভেন্দু এবার তার নেত্রীর মুখোমুখি হয়েছেন। যা একুশের ভোটে পশ্চিম বাংলায় অন্যতম বড় চমক বলেই মনে করছে পর্যবেক্ষক মহলের একাংশ। হাই ভোল্টেজ এই কেন্দ্রে এবার নজর থাকবে সবার। এই লড়াই দু পক্ষেরই ‘প্রেস্টিজ ফাইট।’

মনোনয়ন পাওয়ার আগেই শুভেন্দু অধিকারী মমতাকে নন্দীগ্রামে প্রার্থী হওয়ার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। শুভেন্দুর চ্যালেঞ্জ ছিল, তিনি অথবা যেই বিজেপির হয়ে দাঁড়াক মমতাকে অর্ধলাখ ভোটের ব্যবধানে হারানো হবে।

এরপর সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে মমতা। তিনি নিজেকে নন্দীগ্রামের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন।

নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তারপর নন্দীগ্রামে তেখালির সভায় মমতা ঘোষণা করেছিলেন, নন্দীগ্রামে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা হচ্ছে তার। দলনেত্রীর ইচ্ছায় মঞ্চেই সম্মতি দেন রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি। তৃণমূল নেত্রীর এহেন ঘোষণার শুভেন্দু হুঁশিয়ারি দেন, পদ্মফুল নিয়ে যে-ই দাঁড়াবে, আধ লাখে ভোটে হারাবেন মমতাকে। কিন্তু, দু’জায়গায় দাঁড়ানো চলবে না। বিজেপি নেতারাও বলতে শুরু করেন, ভবানীপুরে হারার ভয়ে নিরাপদ আসন খুঁজছেন মমতা। শুভেন্দুর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে একটি কেন্দ্র নন্দীগ্রাম থেকে দাঁড়ানোর কথা শুক্রবার ঘোষণা করেন তৃণমূল নেত্রী। বিকালে শুভেন্দু দাবি করেন,’ভবানীপুরে যত ভোটে হারতেন, নন্দীগ্রামে তার থেকে তিনগুণ ভোটে হারাব’।

আনন্দবাজার জানায়, বিজেপির কোর কমিটির বৈঠকে নন্দীগ্রামে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেন শুভেন্দু। তার পাশে দাঁড়ান বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। নন্দীগ্রাম থেকে ইতিবাচক রিপোর্টও এসেছে বিজেপির হাতে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব শুভেন্দুকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিতেই নন্দীগ্রাম হয়ে উঠল রাজ্যের হাইভোল্টেজ কেন্দ্র। লড়াইয়ের ময়দানে মমতার মুখোমুখি শুভেন্দু।

এদিকে, তৃণমূলের অন্যতম বলিষ্ঠ সাংসদ শিশির অধিকারী ১৯৯৮ সালে তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিতি। তার মেজো ছেলে শুভেন্দু তৃণমূল ছাড়ার আগে পর্যন্ত নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের আসনের প্রতিনিধি ছিলেন। ১৯ ডিসেম্বর ৬ জন বিধায়ক ও বর্ধমান পূর্বের সাংসদ সুনীল মণ্ডলসহ শাসকদলের ডজনখানেক নেতাকে নিয়ে বিজেপি–তে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। তারা কেন্দ্রীয় স্বারাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর হাত থেকে তুলে নেন বিজেপির পতাকা।

কদিন আগেই পূর্ব মেদিনীপুরের দিঘা–শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যানের পদ থেকে শিশির অধিকারীকে অপসারণ করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। আর এ ব্যাপারে রীতিমতো হুঙ্কার দিয়েছেন শিশির–পুত্র বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোলে বিজেপির এক মিছিল চলাকালীন এদিন শুভেন্দু বলেন, ‘যারা তাকে সরিয়ে দিয়েছেন মে মাসে তাদেরই পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।’

এদিকে শিশির অধিকারি নন্দীগ্রাম আসনে শুভেন্দু অধিকারীর নাম বিজেপি প্রার্থী হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর শিশির অধিকারী ছেলের পক্ষ নিয়ে বলেছেন, ‘‘উনি (মমতা) এখানে লড়তে এসে মস্ত ভুল করছেন। ভোটের ফল ওর পক্ষে যাবে না। আমি আবার বলছি, শুভেন্দু বিপুল ভোটে জিতবে।’

তিনি বলেন, ‘‘শুভেন্দু নন্দীগ্রামে বিপুল ভোটে জিতবে। আমার প্রচারে নামার কোনও দরকার বলে এখনও পর্যন্ত মনে হচ্ছে না। কিন্তু যদি কোনও দরকার হয়, তা হলে আমি অবশ্যই প্রচারে নামব।’’

তৃণমূলের একসময়কার কাণ্ডারি এই পিতাপুত্রের একজোট হয়ে বিজেপির পাল্লা ভারী করলেও বিশ্লেষকেরা মমতার দিকেই দৃষ্টি রাখছেন। কেননা, শুভেন্দুর দাদা তথা শিশির অধিকারীর বড় ছেলে দিব্যেন্দু অধিকারী তৃণমূলের সাংসদ।

২০১৬ সালে এই নন্দীগ্রাম থেকেই জিতেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ভোট পেয়েছিলেন ৬৬.৭৯ শতাংশ। অপরদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিআই-এর আবদুল কবি পেয়েছিলেন ২৬.৪৯ শতাংশ। জয়ের ব্যবধান ছিল ৪০.৩ শতাংশ। ৮১,২৩০ ভোটে জিতেছিলেন শুভেন্দু। অন্যদিকে বিজেপি পেয়েছিল ৫.৩২ শতাংশ ভোট। যদি এখন সমীকরণ বদলেছে। শুভেন্দু এখন বিজেপিতে। সেক্ষেত্রে নতুন দলে গিয়েও নিজের জয় ধরে রাখতে পারেন কি না শুভেন্দু অধিকারী, সেটাই এখন দেখার।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ফলাফলে তৃণমূল কংগ্রেসের পাল্লা ভারী থাকলেও প্রচণ্ড লড়াইয়ের মুখে পড়তে হবে মমতাকে। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবে বিজেপি। এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বি তারই একসময়কার পরিবহনমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মমতাকে জিততে হলে বেশ লড়াই করেই জিততে হবে।

মমতার নির্বাচনী প্রচার

এদিকে দলীয় প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেই নির্বাচনী প্রচার শুরুর প্রস্তুতি নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রোববার শিলিগুড়ি শহরেই তার এক রাজনৈতিক কর্মসূচি রয়েছে। অনুষ্ঠানিকভাবে সেখান থেকেই নির্বাচনের প্রচার শুরু করবেন তিনি।

আনন্দবাজার জানিয়েছে, নির্বাচন ঘোষণার পর আর কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেননি মমতা। কিন্তু ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দলীয় প্রার্থীদের নামও প্রকাশ্যে এনেছেন তিনি। রোববার শিলিগুড়ির মিছিলে তার সঙ্গে থাকবেন এই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী অধ্যাপক ওমপ্রকাশ মিশ্র। মুখ্যমন্ত্রী শিলিগুড়িতে এই কর্মসূচি করলেও রাজ্যজুড়ে তৃণমূল কর্মীদের সিলিন্ডার মিছিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

এদিকে ওই দিনই বিজেপির ব্রিগেড সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে হাজির থাকবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ব্রিগেড সমাবেশ দিয়েই বিজেপি এ রাজ্যে নিজেদের নির্বাচনী প্রচার শুরু করতে চায়। সূত্র বলছে, সেই সমাবেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী যে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকেই আক্রমণ করবেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। তাই রোববার উত্তরবঙ্গে গিয়ে নির্বাচনী প্রচারের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর আক্রমণের জবাব দেবেন মমতা।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/২৩১০ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ