Trial Run

২০৫০ সাল নাগাদ শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়ার সংখ্যা বাড়বে দেড়গুণেরও বেশি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিবেদন

photo: anadolu agency

পৃথিবীতে প্রতিনিয়তই কোলাহল হট্টগোল শব্দের ঝনঝনানি বাড়ছে। অনেকটা চাকার গতিতেই। চারদিকে শব্দের এতোটাই কোলাহল যে ক্ষাণিক দূর থেকে কাউকে ডাকলে তা আর পৌঁছাচ্ছে না। অন্যান্য শব্দের ভিড়ে কিংবা স্রোতে ভেসে যায়। অথবা কেউ ডাকলেও আসছে না এদিকে। এতো এত শব্দের ভিড় কিংবা বোঝা স্বাভাবিকভাবেই কান চেপে ধরে, চোট পড়ে আমাদের শ্রবণ ক্ষমতাতে।এছাড়াও একটানা লাউড ভলিউমে গান বা সিনেমা, ল্যাপটপ-মোবাইল-ট্যাবে অডিও ভিডিও কনফারেন্স, হেডফোন লাগিয়ে কথাবার্তা ইত্যাদি কারণে আমাদের কানের শ্রবণ ক্ষমতা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। ফলে দূর থেকে নিকটে এসে মুখ নড়লেও আমরা শুনতে পাই অল্পই। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ আমাদের শ্রবণশক্তি দেড়গুণেরও বেশি হ্রাস পাবে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদনে। ৩ মার্চ বিশ্ব শ্রবণ দিবসকে সামনে রেখে ডব্লিউএইচওর ওয়েবসাইটে শ্রবণবিষয়ক প্রথম প্রতিবেদনটি আজ মঙ্গলবার প্রকাশ করা হয়েছে।

২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী, শ্রবণ সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়া মানুষের সংখ্যা আগামী তিন দশকে দেড় গুণেরও বেশি বাড়তে পারে। ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন হতে পারে। অর্থাৎ ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মানুষ কোনও না কোনও ধরনের শ্রবণ সমস্যা নিয়ে বসবাস করবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সাল নাগাদ ২ দশমিক ৫ বিলিয়নের মধ্যে ৭০০ মিলিয়ন মানুষের অবস্থা এমন গুরুতর পর্যায়ে যেত পারে যে তাদের শ্রবণ সহায়ক যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার প্রয়োজন হতে পারে। শ্রবণ সমস্যার ব্যাপারে যথার্থ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে তা ভুক্তভোগীদের জন্য স্বাস্থ্যগত, ভালো থাকা, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ক্ষতির কারণ হবে।

প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী শ্রবণ সংক্রান্ত এ প্রতিবেদনে সমস্যার মূল কারণ হিসেবে সংক্রমণ, রোগ, জন্মগত ত্রুটি, অতিরিক্ত শব্দ ও জীবনধারাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এসব সমস্যার অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্টে পদক্ষেপ গ্রহণ বাবদ একটি প্যাকেজ প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রতি বছর মাথাপিছু ১.৩৩ মার্কিন ডলার ব্যয় ধরা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, বিশ্বব্যাপী বর্তমানে প্রতি পাঁচজনে একজনের শ্রবণ সমস্যা রয়েছে। কিন্তু এ সংখ্যা আগামী তিন দশকে ১.৫ গুণ বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্বে ২০১৯ সালে ১৬০ কোটি লোকের শ্রবণ সমস্যা ছিল। এ সংখ্যা বেড়ে ২৫০ কোটি হতে পারে।

রিপোর্টে শ্রবণ সমস্যার বড় ধরনের কারণ হিসেবে চিকিৎসার অভাবকে দায়ী করা হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ঘাটতি রয়েছে। শ্রবণ সমস্যায় ভোগা প্রায় ৮০ শতাংশ লোক এসব দেশে বাস করে। তারা তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা পায় না। এমনকি উন্নত দেশে তুলনামূলক ভালো সুযোগ-সুবিধা থাকলেও চিকিৎসায় সুষম বিন্যাস নেই।

ডব্লিউএইচওর মহাসচিব তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুস বলেছেন, ‘আমাদের শ্রবণক্ষমতা মূল্যবান একটি বিষয়। শ্রবণশক্তি হ্রাসের চিকিৎসা না হলে তা মানুষের যোগাযোগ, শিক্ষা ও জীবিকার সক্ষমতার ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এটা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও সম্পর্ক বজায় রাখার সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।’

তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুস বলেছেন, ডব্লিউএইচওর নতুন প্রতিবেদনটিতে শ্রবণ সমস্যার মাত্রা যেমন তুলে ধরা হয়েছে, তেমনি সমাধানও দেওয়া হয়েছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে বিশ্বের সব দেশকে তাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই বিষয়কে একীভূত করতে উৎসাহিত করেন ডব্লিউএইচওর প্রধান।

কানের সমস্যা কেবল প্রাপ্ত বয়স্কদের নয়, শিশুদের মধ্যেও বেড়েছে। জন্মগত ত্রুটি, জটিল রোগ, সংক্রমণজনিত রোগ, শব্দ দূষণ থেকে লাইফস্টাইল ডিজিজ— এর ভয়ংকর পরিণতি দেখে রীতিমতো উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৯০ কোটির বেশি মানুষ কানের সমস্যায় ভুগবেন আর ৬০ শতাংশ শিশু শ্রবণ প্রতিবন্ধকতার শিকার হবে।

এর কারণ হিসাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কানের সমস্যা আমলে নিতে চান না অনেকেই। প্রথমত, যদি শিশুদের কথা ধরা হয়, তাহলে দেখা যাবে বিশ্বে ৩ কোটির বেশি শিশুর শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সেটা হতে পারে জন্মগত ত্রুটির কারণে বা কোনো জেনেটিক রোগ বা পরে হওয়া জটিল রোগের কারণে। বাচ্চারা কানে শুনেই কথা বলতে শেখে। যদি শব্দ কানে না পৌঁছায় তাহলে কথা বলতেও শিখবে না শিশুরা। এখনকার সময় এমন জটিলতা দেখা যাচ্ছে অনেক শিশুরেই। অথচ বাবা মায়েরা এ ব্যাপারে সচেতন না।

শ্রবণ শক্তি কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ হলো শব্দ দূষণ। শুধু বাইরের শব্দই নয়, ঘরের ভেতরেও শরীরের ওপর আমরা নানাভাবে অত্যাচার করে থাকি। বিশেষ করে, কানে হেডফোন গুঁজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো। রাতে শোওয়ার সময় একটানা লাউড ভলিউমে গান বা সিনেমা , ল্যাপটপ-মোবাইল-ট্যাবে অডিও ভিডিও কনফারেন্স, হেডফোন লাগিয়ে কথাবার্তা ইত্যাদি কারণে আমাদের কানের ভেতরের সিস্টেমটাই বদলে যায়। মোবাইলের রেডিয়েশন কানে গিয়ে শোনার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যে কারণে শরীরের ভারসাম্য বিগড়ে যায়, মাথা ধরা, মাইগ্রেন, স্ট্রেস, মেজাজ খিটখিটেও হয়ে যেতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মোবাইল বা ল্যাপটপ থেকে ছোট ছোট রেডিয়েশন বের হয় যাকে বলে মাইক্রোওয়েব। যেহেতু হেডফোন কানে টাইট করে লাগানো থাকে তাই সরাসরি সেই মাইক্রোওয়েব মাথার কোষে গিয়ে আঘাত করে। শুধু যে শ্রবণ শক্তিই কমে তা নয়, আগামী দিনে স্মৃতিশক্তির ওপরেও জোরালো আঘাত হানতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাইফস্টাইল ম্যানেজমেন্ট সবচেয়ে আগে দরকার। যেকোনো অসুখের ক্ষেত্রে ঠিক সময়ে যেমন চিকিৎসার দরকার, কানের ক্ষেত্রেও তাই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কান দিয়ে আমরা শুনি অথচ গুরুত্ব দিই কম। এর ফলে বধিরতা পর্যন্ত হতে পারে। কানের যত্ন সব সময়েই নেওয়া উচিত। বিশেষ করে স্নানের সময়ে, বিছানায় ঘুমোতে যাওয়ায় সময়ে, বাজি ফাটানোর সময়ে কিংবা উচ্চ স্বরের যে কোনও শব্দ থেকে দূরে থাকা উচিত। শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী মহিলাদেরও বিশেষ সতর্কতা নেওয়া দরকার। কানের যে কোনও সমস্যা দেখা দিলে দেরি না করে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে বলেও জানান তারা।

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ