
দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তাল জলরাশি পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানবাহী রণতরী যখন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাত্রা শুরু করে, তখন সেটি কেবল একটি নৌ-চলাচলের ঘটনা ছিল না—বরং বিশ্ব রাজনীতির জটিল দাবার বোর্ডে আরেকটি শক্তিশালী চাল। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং সেই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুমকি—সব মিলিয়ে এই যাত্রা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনার বার্তা বহন করছে। মার্কিন গণমাধ্যমের ভাষায়, এটি একটি ‘কৌশলগত পুনঃমোতায়েন’, কিন্তু এর রাজনৈতিক, সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য অনেক গভীর।
পেন্টাগনের নির্দেশে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও এর সঙ্গে থাকা ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ দক্ষিণ চীন সাগর ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে—এই খবর প্রকাশের পর থেকেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি সেদিকেই নিবদ্ধ। বহরের সঙ্গে রয়েছে আরলি বার্ক শ্রেণির গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, যা আধুনিক নৌযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রবাহী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত। এই পুরো বহরটি কেবল প্রতিরক্ষামূলক শক্তির প্রতীক নয়, বরং প্রয়োজনে আক্রমণাত্মক সক্ষমতারও স্পষ্ট বার্তা দেয়।
মার্কিন নৌবাহিনীর ইনস্টিটিউটের ক্যারিয়ার ট্র্যাকারের তথ্যমতে, সোমবার পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন ছিল না। এমন এক সময়ে এই শূন্যতা পূরণ করতে আব্রাহাম লিংকনের যাত্রা শুরু হওয়া নিছক কাকতালীয় বলে মনে করার সুযোগ কম। সক্রিয় ডিউটিতে থাকা ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপগুলোর মধ্যে এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে থাকা বহর, যা স্কারবরো শোলের কাছাকাছি জলসীমায় অবস্থান করছিল। সেখান থেকেই দিক পরিবর্তন করে পশ্চিম এশিয়ার দিকে যাত্রা—এই সিদ্ধান্ত নিজেই অনেক প্রশ্ন ও সম্ভাবনার জন্ম দেয়।
এই রণতরীটির ইতিহাসও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গত নভেম্বরে সান দিয়েগোর নিজস্ব ঘাঁটি ত্যাগ করার পর এটি দীর্ঘ সময় ধরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থান করেছে। গত মাস থেকে দক্ষিণ চীন সাগরে এর উপস্থিতি ছিল নিয়মিত, যেখানে এটি অন্তত দুই সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন দেশের দাবি করা সম্পদসমৃদ্ধ জলপথে কার্যক্রম চালিয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগর নিজেই একটি স্পর্শকাতর অঞ্চল—চীন, ফিলিপাইন, ভিয়েতনামসহ একাধিক দেশের সার্বভৌমত্ব দাবি সেখানে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। সেই অঞ্চলে আব্রাহাম লিংকনের উপস্থিতি যেমন বেইজিংয়ের জন্য একটি কৌশলগত বার্তা ছিল, তেমনি এখন এর মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রা তেহরানের জন্য ভিন্ন মাত্রার সতর্ক সংকেত।
পেন্টাগনের ডিফেন্স ভিজ্যুয়াল ইনফরমেশন ডিস্ট্রিবিউশন সার্ভিস প্রকাশিত ফুটেজে দেখা গেছে, গত সপ্তাহে রণতরীটি একাধিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। ৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত লাইভ-ফায়ার ড্রিলে ব্যবহৃত হয়েছে ফ্যালানক্স ক্লোজ-ইন ওয়েপন সিস্টেম—যা ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন কিংবা শত্রু বিমানের মতো হুমকি প্রতিহত করতে সক্ষম। পাশাপাশি বিমান পরিচালনা, সমুদ্রে জ্বালানি ও রসদ সরবরাহ, ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ প্রশিক্ষণ এবং বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ মহড়াও চালানো হয়েছে। এসব মহড়া কেবল রুটিন প্রস্তুতির অংশ নয়; বরং সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির ইঙ্গিতও দেয়।
এই সামরিক প্রস্তুতির পটভূমিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটি বহু রাজনৈতিক সংকট দেখেছে, কিন্তু বর্তমান সরকারবিরোধী আন্দোলনকে অনেক বিশ্লেষক সবচেয়ে বড় ও গভীর বলে মনে করছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, তেহরানের দমন-পীড়নে এ পর্যন্ত দুই হাজার থেকে বারো হাজার মানুষ নিহত হয়েছে—সংখ্যাটি নিয়ে মতভেদ থাকলেও সহিংসতার মাত্রা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কম। রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ—সব মিলিয়ে ইরান এক গভীর অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বরাবরই কঠোর। ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে কূটনৈতিক চাপ—সবকিছুই এর অংশ। তবে বিমানবাহী রণতরীর মতো শক্তিশালী সামরিক সম্পদের সরাসরি উপস্থিতি কেবল কাগুজে হুঁশিয়ারির চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব ও দৃশ্যমান বার্তা দেয়। এটি ইরানকে যেমন সতর্ক করে, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকেও আশ্বস্ত করে যে যুক্তরাষ্ট্র এখনও অঞ্চলটিতে সক্রিয় ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মধ্যপ্রাচ্য এমনিতেই একটি বারুদভরা অঞ্চল। ইরান ছাড়াও এখানে রয়েছে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত, ইয়েমেন যুদ্ধ, সিরিয়া সংকট এবং উপসাগরীয় রাজনীতির জটিল সমীকরণ। এই প্রেক্ষাপটে একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের আগমন শক্তির ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। বিমানবাহী রণতরী মানে কেবল একটি জাহাজ নয়; এর সঙ্গে থাকে ডজনখানেক যুদ্ধবিমান, নজরদারি ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্রবাহী জাহাজ ও সাবমেরিন—যা মিলিয়ে একটি ভাসমান সামরিক ঘাঁটির মতো কাজ করে।
তবে এই পদক্ষেপের আরেকটি দিকও রয়েছে—মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ। সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন ইরানকে বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের মতো বৈশ্বিক শক্তিগুলোকেও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে ওয়াশিংটন এখনও বৈশ্বিক নিরাপত্তা খেলায় সক্রিয় খেলোয়াড়। দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত দিক পরিবর্তন দেখায় যে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক সম্পদকে কত দ্রুত ও নমনীয়ভাবে পুনর্বিন্যাস করতে পারে।
অবশ্য এই পদক্ষেপ ঝুঁকিমুক্ত নয়। ইতিহাস বলে, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতি অনেক সময় অনিচ্ছাকৃত সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়। একটি ভুল হিসাব, একটি ভুল বোঝাবুঝি—আর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। ইরানও বসে থাকার দেশ নয়; তাদের রয়েছে নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি বাহিনী। ফলে শক্তি প্রদর্শনের এই খেলায় প্রতিটি চাল অত্যন্ত হিসাব করে দিতে হয়।
তবু বর্তমান বাস্তবতায় আব্রাহাম লিংকনের যাত্রা একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে—যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও আঞ্চলিক আচরণকে হালকাভাবে নিচ্ছে না। এটি একই সঙ্গে একটি সতর্কবার্তা, একটি কূটনৈতিক চাপ এবং প্রয়োজনে সামরিক বিকল্প খোলা রাখার ঘোষণা। বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এমন মুহূর্তগুলোই অনেক সময় ভবিষ্যৎ সংঘাত বা সমঝোতার দিক নির্ধারণ করে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়—এই শক্তি প্রদর্শন কি পরিস্থিতি শান্ত করবে, নাকি উত্তেজনা আরও বাড়াবে? ইতিহাস আমাদের শেখায়, সামরিক শক্তি একা কখনো স্থায়ী সমাধান এনে দিতে পারে না। তবে এটি আলোচনার টেবিলে বসার আগে শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। আব্রাহাম লিংকনের মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রা ঠিক সেই ভারসাম্যেরই অংশ—যেখানে রাজনীতি, কূটনীতি ও সামরিক শক্তি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, আর প্রতিটি ঢেউ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করে।
আপনার মতামত জানানঃ