ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে চলমান এই বিক্ষোভ ও দমন–পীড়নের অধ্যায় কেবল রাজনৈতিক সহিংসতার গল্প নয়, এটি ধীরে ধীরে মানবিক বিপর্যয়ের এক নির্মম দলিলে পরিণত হচ্ছে। সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহও এখন পরিবারগুলোর জন্য হয়ে উঠেছে ভয়, আতঙ্ক ও অপমানের আরেকটি নাম। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহতদের লাশ ফেরত পেতে স্বজনদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবি করার অভিযোগ সামনে আসার পর ইরানের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে নাড়া দিয়েছে। বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসা এসব তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, মৃত্যুর পরও যেন শেষ হয়নি নিপীড়ন; বরং মরদেহ হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় চাপ ও দমননীতির আরেকটি হাতিয়ার।
উত্তর ইরানের রাশত শহরের একটি পরিবার জানায়, তাঁদের প্রিয়জনকে গুলিতে হত্যা করার পর মরদেহটি পুর্সিনা হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়। কিন্তু সেই মরদেহ ফেরত পেতে নিরাপত্তা বাহিনী দাবি করে ৭০০ মিলিয়ন তোমান, যা প্রায় ৫ হাজার মার্কিন ডলারের সমান। সাধারণ মধ্যবিত্ত বা শ্রমজীবী পরিবারের পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। ওই পরিবার জানায়, তাঁদের স্বজনের মরদেহের পাশাপাশি মর্গে আরও অন্তত ৭০ জন বিক্ষোভকারীর লাশ পড়ে ছিল, যেগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের দাবি করা হচ্ছে। হাসপাতালের ভেতরে পড়ে থাকা এসব মরদেহ যেন একেকটি নীরব সাক্ষ্য—রাষ্ট্র কীভাবে তার নাগরিকদের জীবনের শেষ সম্মানটুকুও কেড়ে নিচ্ছে।
রাজধানী তেহরানেও চিত্র ভিন্ন নয়। এক কুর্দি নির্মাণশ্রমিকের পরিবার জানায়, তাঁদের ছেলের মরদেহ নিতে এক বিলিয়ন তোমান দাবি করা হয়েছে। মাসে যেখানে তাঁর আয় ছিল ১০০ ডলারেরও কম, সেখানে এক বিলিয়ন তোমান জোগাড় করা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত তাঁরা সন্তানের মরদেহ ছাড়াই হাসপাতাল থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হন। সন্তানকে শেষবারের মতো দেখার, ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিতে দাফন করার অধিকার থেকেও এভাবে বঞ্চিত হচ্ছে পরিবারগুলো। অনেকের কাছে এটি শোকের চেয়েও বড় এক অপমান।
এই চাঁদাবাজি ও অমানবিক আচরণ থেকে মানুষকে বাঁচাতে কোথাও কোথাও হাসপাতালের কর্মীরাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে আসছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে তাঁরা নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের ফোন করে সতর্ক করছেন, যেন দ্রুত এসে মরদেহ নিয়ে যান। এমনই এক ঘটনায় ৯ জানুয়ারি এক নারী তাঁর স্বামীর ফোনে হাসপাতাল থেকে কল পান। কর্মীরা তাঁকে জানান, নিরাপত্তা বাহিনী আসার আগেই যেন তিনি এসে লাশটি নিয়ে যান। দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ছুটে যান হাসপাতালে। ভয়, আতঙ্ক আর অশ্রুর মধ্যেই তিনি স্বামীর মরদেহ উদ্ধার করেন। এরপর একটি পিকআপ ভ্যানের পেছনে লাশ রেখে সাত ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে নিজের শহরে ফিরে যান এবং গোপনে দাফন সম্পন্ন করেন। রাষ্ট্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে শেষ বিদায়—এই দৃশ্য যেন আধুনিক ইরানের এক করুণ প্রতীক।
তেহরানের বেহেশত-ই জোহরা মর্গে আরও ভয়াবহ প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে পরিবারগুলোর কাছে। কর্মকর্তারা বলছেন, যদি পরিবারগুলো স্বীকার করে যে নিহত ব্যক্তি বিক্ষোভকারী নয়, বরং সরকারি আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের সদস্য ছিল এবং বিক্ষোভকারীদের হাতে নিহত হয়েছে, তাহলে বিনা মূল্যে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। একটি পরিবার বিবিসিকে জানায়, তাঁদের সন্তানকে সরকারি মিছিলে ‘শহীদ’ হিসেবে প্রচার করার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সন্তানকে মিথ্যা পরিচয়ে ব্যবহার করার এই অনৈতিক প্রস্তাব তাঁরা প্রত্যাখ্যান করেন। এই প্রত্যাখ্যানের মূল্য দিতে হয়েছে সন্তানের মরদেহ হারিয়ে।
নিরাপত্তা বাহিনী গোপনে লাশ দাফন করে ফেলবে—এই আতঙ্কে অনেক জায়গায় স্বজনেরা মরগে হামলা চালিয়ে লাশ ছিনিয়ে নিচ্ছেন। তেহরানের এক সূত্র জানায়, কয়েকটি পরিবার মর্গের দরজা ভেঙে অ্যাম্বুলেন্স থেকে মরদেহ বের করে এনেছে। কেউ কেউ হাসপাতালের আঙিনায় দীর্ঘ সময় ধরে লাশ পাহারা দিয়েছে, যাতে কর্তৃপক্ষ তা কেড়ে নিতে না পারে। এসব দৃশ্য দেখলে মনে হয়, যেন একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে মানুষ নিজেদের মৃতদের রক্ষা করার লড়াইয়ে নেমেছে।
এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় গত ২৯ ডিসেম্বর, যখন ইরানি মুদ্রার দরপতনের প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নামে। শুরুতে এটি ছিল অর্থনৈতিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ, কিন্তু দ্রুতই তা রূপ নেয় সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে। দেশের প্রায় সব বড় শহর ও প্রান্তিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমননীতি পরিস্থিতিকে আরও সহিংস করে তোলে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৪৩৫ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৩ জন শিশু। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৮ হাজার ৪৭০ জন মানুষকে। সহিংসতায় নিরাপত্তা বাহিনীরও অন্তত ১৫৩ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
পুরো দেশে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট থাকায় প্রকৃত চিত্র পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদ ও ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলো বন্ধ থাকায় ভেতরের খবর বাইরে পৌঁছাচ্ছে মূলত প্রত্যক্ষদর্শীদের গোপন বার্তা বা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সীমিত অনুসন্ধানের মাধ্যমে। ইরানের সরকার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোকেও সরাসরি সংবাদ সংগ্রহে বাধা দিচ্ছে। ফলে নিহতের সংখ্যা, গ্রেপ্তার, নিখোঁজ বা গোপনে দাফনের প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
এই পরিস্থিতিতে মরদেহ আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করার অভিযোগ ইরানের দমননীতির এক নতুন, ভয়ংকর দিক উন্মোচন করেছে। এটি শুধু অর্থ আদায়ের বিষয় নয়; এটি পরিবারগুলোকে ভয় দেখানো, আন্দোলনের স্মৃতি মুছে ফেলা এবং নিহতদের পরিচয় ও গল্প নিয়ন্ত্রণ করার একটি কৌশল। যারা লাশ ফেরত পেতে টাকা দিতে অক্ষম, তারা যেন ইতিহাস থেকেই মুছে যাচ্ছে—কোনো কবর নেই, কোনো জানাজা নেই, কোনো শেষ বিদায় নেই।
মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন। মৃত্যুর পর মরদেহের মর্যাদা রক্ষা করা, পরিবারের কাছে তা হস্তান্তর করা—এগুলো মৌলিক মানবিক অধিকার। কিন্তু ইরানে সেই অধিকারও এখন রাষ্ট্রের হাতে জিম্মি। ভয়ের সংস্কৃতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, মানুষ বেঁচে থাকার পাশাপাশি মৃত্যুর পর কী হবে, তা নিয়েও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
এই অন্ধকার বাস্তবতার মাঝেও কিছু মানুষ সাহস দেখাচ্ছেন—হাসপাতালের কর্মীরা, যারা গোপনে ফোন করে সতর্ক করছেন; পরিবারগুলো, যারা ঝুঁকি নিয়ে লাশ উদ্ধার করছেন; আর সেই সব মানুষ, যারা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যেও কোনোভাবে সত্যের টুকরো টুকরো খবর বাইরে পৌঁছে দিচ্ছেন। তাঁদের এই ছোট ছোট প্রতিরোধই হয়তো ভবিষ্যতে বড় কোনো ন্যায়বিচারের ভিত্তি হয়ে থাকবে।
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; এটি বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার চর্চার জন্যও এক কঠিন পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতটা দৃঢ়ভাবে এই অভিযোগগুলোর তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জানাবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। আর ইরানের সাধারণ মানুষের জন্য, এই বিক্ষোভের প্রতিটি দিন মানে নতুন করে শোক, ভয় আর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়া—যেখানে জীবনের পাশাপাশি মৃত্যুর পরের সম্মানটুকুও নিশ্চিত নয়।
আপনার মতামত জানানঃ