ইরানজুড়ে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা বিক্ষোভ, প্রাণহানি ও রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়নের প্রেক্ষাপটে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যে বক্তব্য দিলেন, তা শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভাষ্য নয়—বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তপ্ত বাস্তবতারও প্রতিফলন। টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েল-কে ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন। খামেনির ভাষায়, এবারের বিক্ষোভ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা, কারণ এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ রয়েছে—এমনকি তিনি দাবি করেন, ট্রাম্প নিজেই এই অস্থিরতার ‘কেন্দ্রীয় চরিত্র’ ছিলেন।
খামেনির এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরানের ভেতরে ও বাইরে বিক্ষোভের প্রকৃতি, দায়-দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মাত্রা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। রাষ্ট্রীয় ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত বিদেশি ষড়যন্ত্র, যার লক্ষ্য ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভেঙে দেওয়া, সরকার উৎখাত করা এবং দেশটির ওপর পুনরায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য কায়েম করা। খামেনি ট্রাম্পকে ‘অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরেই ইরানকে গ্রাস করার চেষ্টা করছে এবং এবারের বিক্ষোভ সেই ধারাবাহিক চেষ্টারই অংশ।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিবরণ এই চিত্রের আরেকটি দিক তুলে ধরে। আল-জাজিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল মূলত অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ থেকে—অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ থেকেই রাস্তায় নেমেছিলেন মানুষ। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস রূপ নেয়, যার বড় অংশের দায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপরও বর্তায়।
খামেনি তাঁর বক্তব্যে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পৃক্ত গোষ্ঠীগুলো ইরানের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। তাঁর ভাষায়, উগ্র বিক্ষোভকারীরা ২৫০টির বেশি মসজিদ ও বেশ কয়েকটি চিকিৎসা কেন্দ্র পুড়িয়ে দিয়েছে, যা প্রমাণ করে এটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ছিল না, বরং পরিকল্পিত নাশকতা। রাষ্ট্রীয় প্রচারে বারবার বলা হচ্ছে, এসব হামলার মাধ্যমে ইরানের ধর্মীয় ও সামাজিক ভিত্তিকে আঘাত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
কিন্তু এই দাবির বিপরীতে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত অন্তত ৩ হাজার ৯০ জন নিহতের তথ্য যাচাই করেছে, যাদের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৮৮৫ জনই সাধারণ বিক্ষোভকারী। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, সহিংসতার প্রধান ভুক্তভোগী ছিলেন সাধারণ মানুষ, যারা হয়তো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িত ছিলেন না।
ইরানের ইতিহাসে বিক্ষোভ নতুন কিছু নয়। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকেই দেশটিতে বিভিন্ন সময় সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবিতে আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভের ব্যাপ্তি ও সহিংসতা একে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। একদিকে রয়েছে রাষ্ট্রীয় বয়ান—বিদেশি ষড়যন্ত্র ও নিরাপত্তার হুমকি; অন্যদিকে রয়েছে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা—দমন, গ্রেপ্তার, গুম এবং প্রাণহানি।
এই দুই বয়ানের মাঝখানে সত্যের অবস্থান নির্ধারণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
খামেনির বক্তব্যে ট্রাম্পের নাম বিশেষভাবে উঠে আসা আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির সময় থেকেই ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা, কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার ঘটনা—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। খামেনির বক্তব্য সেই পুরোনো বৈরিতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে এবং বর্তমান সংকটকে আন্তর্জাতিক শক্তির লড়াইয়ের অংশ হিসেবে চিত্রিত করছে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—বিদেশি হস্তক্ষেপ থাকলেও কি তা হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করতে যথেষ্ট? মানবাধিকার কর্মীদের মতে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে সংযত থাকা, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, নির্বিচার গুলি ও গণগ্রেপ্তার। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে সব দায় বাইরের শক্তির ওপর চাপালে অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো আড়ালেই থেকে যাবে।
ইরানের সমাজও এই ঘটনায় গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একাংশ রাষ্ট্রীয় ভাষ্যের সঙ্গে একমত—তাদের মতে, বিদেশি শক্তি ইরানের অস্থিতিশীলতা চায় এবং বিক্ষোভ সেই ষড়যন্ত্রেরই অংশ। অন্য অংশ মনে করে, এই বিক্ষোভ ছিল বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ, যার দায় শাসনব্যবস্থার ওপরই বর্তায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এই বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রতিক্রিয়া তীব্র। পশ্চিমা দেশগুলো ইরানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে, আবার ইরান বলছে, এসব সমালোচনা দ্বিচারিতার উদাহরণ। খামেনির বক্তব্য এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনকে আরও ঘনীভূত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সরাসরি অভিযুক্ত করার মধ্য দিয়ে তিনি একদিকে দেশের ভেতরে সমর্থন সংহত করার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার কৌশল নিচ্ছেন বলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সবশেষে বলা যায়, ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক শক্তির দ্বন্দ্ব এবং মানবাধিকারের প্রশ্নকে একসূত্রে বেঁধে দিয়েছে। খামেনির বক্তব্য হয়তো রাষ্ট্রীয় অবস্থানকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা, কিন্তু নিহত হাজার হাজার মানুষের গল্প, তাদের পরিবারের শোক আর সমাজে তৈরি হওয়া গভীর ক্ষত সহজে মুছে যাবে না। এই সংকটের প্রকৃত সমাধান আসবে তখনই, যখন দায় শুধু বাইরের শক্তির ঘাড়ে চাপানো নয়, বরং ভেতরের সমস্যাগুলোর সৎ স্বীকৃতি ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পথ খোঁজা হবে। না হলে ইরানের রাজপথে যে রক্ত ঝরেছে, তা ভবিষ্যতের আরও অস্থিরতার ইঙ্গিতই দিয়ে যাবে।
আপনার মতামত জানানঃ