Trial Run

বাংলাদেশেও যে কোনো সময় আসতে পারে লকডাউন!

দেশে করোনার নতুন প্রজাতি নিয়ে ‘লুকোচুরি’র অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ দ্রুতই খারাপ দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে করোনার নতুন ধরন মেলার পরও বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে বিমান চলাচল অব্যাহত আছে। অথচ ইউরোপের প্রতিবেশী দেশগুলোই ইংল্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এদিকে দেশে করোনার নতুন ধরন শনাক্তের বিষয়েও আলাপ হচ্ছে। এ অবস্থায় যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে লকডাউনের কোনো সম্ভাবনা নেই, তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরি, বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতি থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যে কোনো সময় আবারো সাধারণ ছুটি বা অন্য কোনো আকারে ‘লকডাউন’ দিতে বাধ্য হতে পারে সরকার।

চলতি বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে চীন ছিল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ব্যস্ত। ঠিক তখন বাংলাদেশ সরকার প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময় পেয়েও ছিল উদাসীন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক একাধিকবার গণমাধ্যমে বলেন, ভাইরাস ঠেকাতে সরকারের প্রস্তুতি আছে এবং লকডাউন হবে না। একই সময় ইউরোপ করোনার থাবায় হিমশিম খেলেও দেশে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু ছিল। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল থেকে কোথাও করোনা নিয়ন্ত্রণের কোনো পরিকল্পনা তো ছিলই না, এমনকি ২১ মার্চ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক বক্তব্যে বলেন, ‘আমরা করোনার চেয়েও শক্তিশালী।’

পরে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে হঠাৎ সুর পাল্টে গত ২৬ মার্চ থেকে হঠাৎ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এরপর একে একে বিভিন্ন এলাকা লকডাউনের আওতায় আসতে থাকে। করোনার সেই তীব্রতা কমে আসে জুলাই মাস থেকে। এরপর লকডাউন উঠে গেলেও জারি রয়েছে স্বাস্থ্য সুরক্ষার নির্দেশনা। এরপর শুরু হয়েছে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় প্রণোদনা প্যাকেজ পরিকল্পনা তৈরি করতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী আগেও করোনার দ্বিতীয় ধাক্কার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন।

সাধারণ ছুটির ৯ মাস পর ডিসেম্বরে এখন আবারও বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। এখন রয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সংকট। এদিকে ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে শনাক্ত হয়েছে করোনার নতুন প্রজাতি (স্ট্রেইন), যার উপস্থিতি দেশেও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে বিশ্বে করোনা সংক্রমণ সাড়ে ৭ কোটি ছাড়িয়েছে। গত মাসেই বিশ্বজুড়ে এক কোটি ৮৬ লাখ ৫০ হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকে ৩০ দিন সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্তের রেকর্ড এটি।

ভারতে শনাক্ত এক কোটি ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে মৃত্যু এক লাখ ৪৫ হাজারেরও বেশি। দেশে করোনা শনাক্ত পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে, মৃত্যু প্রায় সাড়ে ৭ হাজারের কাছাকাছি। তবে এবারও স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, দেশে লকডাউনের কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা প্যাকেজ, বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতি এবং দেশের করোনার নতুন ধরনের আবির্ভাব থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে কোনো সময় আবারও সাধারণ ছুটি বা অন্য কোনো আকারে ‘লকডাউন’ দিতে বাধ্য হতে পারে সরকার।

নতুন ধাক্কা সামলাতে প্রণোদনার নির্দেশনা
করোনা পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে এর আগে সরকার সোয়া লাখ কোটি টাকার ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এই অঙ্ক জাতীয় বাজেটের এক-পঞ্চমাংশের বেশি, মোট জিডিপির ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। মাঝে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও শীতে আবার সংক্রমণ বেড়েছে। তাই নতুন করে অর্থ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।

২৩ ডিসেম্বর অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২১-২০২৫) চূড়ান্তকরণ সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউকে সামনে রেখে আর্থিক প্রণোদনার একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান জাহিদ তুষার সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতি
করোনার বিস্তার ঠেকাতে বড়দিন উৎসবের আগে কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দেয় জার্মান সরকার। ২৩ ডিসেম্বর থেকে বন্ধ থাকে দোকানপাট, স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার। শীতের শুরু থেকে জার্মানিতে করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকে। এই কারণে অক্টোবর মাসের শেষে দেশটিতে আংশিক লকডাউন ঘোষণা করা হয়।

যুক্তরাজ্যের ক‌রোনা প‌রি‌স্থি‌তি ভয়াবহ রূপ নি‌য়ে‌ছে। বড়দিন ঘিরে শপিং সেন্টারে মানু‌ষের ঢল, টানা কয়েক দিনের বৃষ্টির কারণে বাড়া জ্বরের প্রকোপ প‌রি‌স্থি‌তি‌কে জ‌টিল ক‌রে তু‌লে‌ছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশই এখন কঠোর বিধিনিষেধে আছে। লন্ডনসহ দক্ষিণ ইংল্যান্ডে আবারও লকডাউন জারির ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।

এদিকে ব্রিটেনসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে নতুন প্রজাতির করোনাভাইরাস দ্রুত সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। ব্রিটিশ নাগরিকদের পাশাপাশি এই বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-কে সতর্ক করেছে ব্রিটেন। যুক্তরাজ্য ছাড়াও নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক ও অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে এই নতুন প্রজাতির ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে এই প্রজাতি করোনা ভ্যাকসিনের বিরুদ্ধে ভিন্ন প্রতিক্রিয়ায় দেখায় বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

করোনার নতুন প্রজাতি নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ও সতর্কতা শুরু হয়েছে ভারতে। দেশটির মহারাষ্ট্র রাজ্যে এই নতুন প্রজাতির সংক্রমণ ঠেকাতে জারি করা হয়েছে রাতের কারফিউ। ২১ ডিসেম্বর থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত রাজ্য সরকার মুম্বাই ও রাজ্যের অন্যান্য বড় শহরে রাত ১১টা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করে।

ঝুঁকিতে শিশুরাও
নতুন বৈশিষ্ট্যের করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের তথ্য বিশ্লেষণের পর বিজ্ঞানীরা বলছেন, রূপান্তরিত এই ভাইরাস শিশুদের অনেক সহজে আক্রান্ত করতে পারে। পূর্বে বয়স্কদের তুলনায় শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার ছিল কম। তবে নতুন বৈশিষ্ট্যের ভাইরাসটি নিয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি উচ্চহারে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ঘটাচ্ছে।

দেশে করোনার নতুন প্রজাতি নিয়ে ‘লুকোচুরি’
যুক্তরাজ্যে শনাক্ত নতুন বৈশিষ্ট্যের করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের অন্তত ৪০টি দেশ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জরুরি বৈঠক করেছে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান যাতায়াত ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ধ হয়নি।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের মতো করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেইনের (প্রজাতি) মিউটেশন বাংলাদেশে ঘটে গত নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। পাঁচটি স্যাম্পলে এই নতুন স্ট্রেইনের অনেকটাই মিল পাওয়া যায় বলে গণমাধ্যমকে জানান বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা, পরিষদ (বিসিএসআইআর) এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সেলিম খান। ১৭টি জিনোম সিকোয়েন্স পর্যালোচনা করে পাঁচটি নমুনায় এই নতুন স্ট্রেইনের লক্ষণ পাওয়া যায়। এর সবই ছিল ঢাকার নমুনা।

তবে বিষয়টি অনেকটা অস্বীকার করেছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান। এ বিষয়ে বিসিএসআইআর এর চেয়ারম্যান ড. আফতাব আলী শেখ প্রতিষ্ঠানটির আরেক কর্মকর্তার বক্তব্য ঠিক নয় জানিয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা কাজটা মাত্র শুরু করেছি, তাই এখনই এ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার কিছু নেই। প্যানিক তৈরি হবে এমন কোনো কথা বলার দরকার নেই।’

ওই কর্মকর্তার বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘উনি কী বলেছেন আমি জানি না। তিনি সিলেট আছেন, সেখান থেকে ফিরছেন। ফিরলেই তার সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলব। প্যানিক সৃষ্টি করা যাবে না। রিসার্চের ফাইন্ডিংস ঠিক আছে কিনা, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে আমি নিজেই জানি না। অথচ চারদিকে প্রকাশ হলো, আমি তো অবাক হলাম এটা দেখে।’

এসডাব্লিউ/এসএন/নাসি/আরা/১৫২০

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 94
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    94
    Shares