
একটি বইয়ের কথা ভাবুন, যার পাতা খুলতে গেলেই তা গুঁড়ো হয়ে যায়। বাইরে থেকে সেটি কালো কাঠকয়লার মতো; ভেতরে লেখা থাকলেও খালি চোখে দেখা যায় না। ইতালির হারকিউলেনিয়ামের প্যাপিরাস স্ক্রলগুলো গবেষকদের সামনে প্রায় এমন সমস্যাই হাজির করেছে। খ্রিষ্টাব্দ ৭৯ সালে ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে শহরটি চাপা পড়ে। তাপে প্যাপিরাস পুড়ে কার্বনে পরিণত হলেও কিছু স্ক্রলের পাকানো গঠন টিকে যায়। যে ঘটনা বইগুলোকে পড়ার অযোগ্য করে তুলেছিল, সেটিই অদ্ভুতভাবে তাদের চিহ্ন দুই হাজার বছর ধরে সংরক্ষণ করেছে। PLOS One
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ PLOS ONE-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা সেই বন্ধ পথ খোলার নতুন কৌশল দেখিয়েছে। গবেষকেরা কোনো অক্ষত প্রাচীন স্ক্রল খুলে পড়েননি। তাঁরা আধুনিক মিশরীয় প্যাপিরাসে সিসা মেশানো কালি দিয়ে লিখে স্ক্রল বানিয়েছেন, সেটি পুড়িয়ে কার্বনে পরিণত করেছেন, তারপর এক্স-রে প্রযুক্তিতে লেখা শনাক্ত করেছেন। পরীক্ষাটি আশাব্যঞ্জক; এই নতুন পদ্ধতিতে হারকিউলেনিয়ামের অজানা কোনো গ্রন্থ ইতোমধ্যে উদ্ধার হয়েছে—এমন দাবি গবেষণাপত্রে নেই। PLOS One
হারকিউলেনিয়ামের ‘ভিলা অব দ্য প্যাপিরি’ থেকে পাওয়া সংগ্রহ ইতিহাসবিদদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিক দর্শন, বিশেষ করে এপিকুরীয় চিন্তার সঙ্গে যুক্ত লেখার সাক্ষ্য সেখানে পাওয়া গেছে। অতীতে কিছু স্ক্রল শারীরিকভাবে খোলার চেষ্টায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তাই এখন লক্ষ্য, যতটা সম্ভব মূল বস্তু অক্ষত রেখে তার ভেতরের লেখা পড়া। এক্স-রে টমোগ্রাফি স্ক্রলের অভ্যন্তরের ছবি নেয়; সফটওয়্যার সেই পাকানো স্তর অনুসরণ করে সমতল ছবি তৈরির চেষ্টা করে। এটি হাতে স্ক্রল খোলা নয়—কম্পিউটারে তার ভার্চুয়াল উন্মোচন। PLOS One
কিন্তু স্তর দেখা আর অক্ষর দেখা এক বিষয় নয়। অনেক প্রাচীন কালি ছিল কার্বনভিত্তিক; পোড়া প্যাপিরাসও কার্বনে পরিণত হয়েছে। ফলে এক্স-রে ছবিতে কালি ও পৃষ্ঠের পার্থক্য ক্ষীণ হতে পারে। গবেষকদের আগ্রহের জায়গা হলো সিসা। হারকিউলেনিয়ামের দুটি প্রাচীন প্যাপিরাস খণ্ডের অক্ষরে এর উপস্থিতি আগে শনাক্ত হয়েছিল। সিসা এক্স-রেতে আলাদা সংকেত দিতে পারে; কালিতে পর্যাপ্ত সিসা থাকলে লেখার অবস্থান ছবিতে বেশি স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে সব প্রাচীন স্ক্রলের কালিতে সিসা ছিল—এমন প্রমাণ নেই। সেটি ইচ্ছা করে মেশানো হয়েছিল, নাকি অন্য উপাদানের সঙ্গে এসেছিল, তাও নিশ্চিত নয়। PLOS One
নতুন পরীক্ষায় গবেষকেরা সিসার বিভিন্ন ঘনত্বের কালি ব্যবহার করেছেন। হাতে ধরা এক্স-রে ফ্লুরোসেন্স যন্ত্রে সিসাযুক্ত লেখার সংকেত পাওয়া যায়। পোড়া প্যাপিরাসের ছোট নমুনায় প্রতি বর্গসেন্টিমিটারে ২৫ মাইক্রোগ্রাম সিসাযুক্ত রেখাও এক্স-রে ছবিতে শনাক্ত হয়েছে; একই পরীক্ষায় সিসাবিহীন কার্বন কালির রেখা দৃশ্যমান হয়নি। এরপর পরীক্ষামূলক পাকানো স্ক্রলের ছবি সফটওয়্যারে সমতল করে ইংরেজি শব্দের অংশ পড়া সম্ভব হয়। এটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার ফল, মূল প্রত্নবস্তুর ওপর সফল প্রয়োগের ফল নয়। PLOS One
পদ্ধতিটির সম্ভাব্য ব্যবহার দুই ধাপে। প্রথমে অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য এক্স-রে ফ্লুরোসেন্স যন্ত্রে দেখা যাবে কোনো স্ক্রলে সিসার সংকেত আছে কি না। তারপর সম্ভাবনাময় স্ক্রলকে বিস্তারিত টমোগ্রাফির জন্য বেছে নেওয়া যেতে পারে। গবেষকদের তৈরি নমুনার আরেকটি সুবিধা হলো, সেখানে আগে কী লেখা হয়েছিল তাঁরা জানেন। ফলে লেখা শনাক্তকারী সফটওয়্যারের ফল মূল লেখার সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করা সম্ভব। PLOS One
বাস্তব স্ক্রলের বাধা অবশ্য অনেক। দুই হাজার বছর পুরোনো প্রতিটি স্ক্রলের ভাঁজ, চাপ, ক্ষয় ও কালির অবস্থা আলাদা হতে পারে। স্তর একে অন্যের সঙ্গে লেগে গেলে কম্পিউটারে সেগুলো ঠিকভাবে আলাদা করা কঠিন। সিসা পাওয়া গেলেও প্রতিটি অক্ষর পড়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার সিসা না পাওয়া মানেই স্ক্রলে লেখা নেই, তাও নয়। এই প্রযুক্তিকে তাই হারানো সব বই পড়ার নিশ্চিত চাবি বলা যাচ্ছে না; আপাতত এটি কোন স্ক্রল আগে পরীক্ষা করা উচিত, তা বেছে নিতে সাহায্য করতে পারে। PLOS One
এখানে ইতিহাসের প্রশ্নও বিজ্ঞান থেকে আলাদা নয়। প্রাচীন জগতকে আমরা যে লেখাগুলোর মাধ্যমে চিনি, সেগুলো টিকে থাকার ইতিহাস অসম্পূর্ণ। কোনো গ্রন্থ শতাব্দীর পর শতাব্দী হাতে নকল হয়েছে; অনেক গ্রন্থ হারিয়েছে। হারকিউলেনিয়ামের স্ক্রলে নতুন পাঠ মিললে পরিচিত লেখকের অজানা অংশ, বিতর্কের ভিন্ন ভাষ্য কিংবা অপরিচিত রচনার সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সম্ভাবনা আর আবিষ্কারকে এক করে ফেললে পাঠক ভুল ধারণা পাবেন। কোন অক্ষর ছবিতে দেখা গেছে, কোন পাঠ সফটওয়্যারের সাহায্যে তৈরি, আর কোনটি গবেষকেরা যাচাই করেছেন—প্রতিটি ধাপ আলাদা করে জানানো জরুরি।
পোড়া স্ক্রল তাই কেবল প্রযুক্তির গল্প নয়; জ্ঞান সংরক্ষণের এক গভীর বিদ্রূপ। যে আগুন বইয়ের পাঠ অদৃশ্য করেছিল, সেই আগুনই হয়তো তার বস্তুগত চিহ্ন টিকিয়ে রেখেছে। দুই হাজার বছর পর বিজ্ঞানীরা বইটি হাতে খুলতে না পেরে ছবির ভেতর দিয়ে এগোচ্ছেন। নতুন গবেষণা দেখাল, কালির রাসায়নিক সামান্য পার্থক্যও সেই যাত্রায় বড় সূত্র হতে পারে। হারানো ইতিহাস কতটা ফিরে আসবে, তা এখনো অজানা—কিন্তু সেটি খোঁজার পদ্ধতি আরও নির্দিষ্ট হলো।
আপনার মতামত জানানঃ