১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। রাত তখন প্রায় মধ্যরাত। ঢাকা সেনানিবাসের আকাশে হঠাৎ ভেসে আসতে থাকে গোলাগুলির শব্দ। সঙ্গে উচ্চকণ্ঠে স্লোগান—‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই’, ‘জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’। ঘুম ভেঙে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সেনানিবাসে বসবাসকারী কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। কেউ জানতেন না কী ঘটছে, কারা এই গোলাগুলি চালাচ্ছে, কিংবা পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় দেশের ক্ষমতার সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেবে। কিন্তু রাত পেরিয়ে ভোর হওয়ার আগেই স্পষ্ট হতে শুরু করে, এটি সাধারণ কোনো সামরিক তৎপরতা নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি বড় রাজনৈতিক ও সামরিক পরিবর্তনের সূচনা ঘটেছে।
মাত্র কয়েক মাস আগে, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছিল। এরপর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সেনাবাহিনীর ভেতরে নতুন করে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থানে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান গৃহবন্দী হন। রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের অবস্থানও পরিবর্তিত হয়। ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে সেনানিবাস ও বঙ্গভবন। এমন পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বরের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতি ও সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন তাঁর ‘রক্তাক্ত দিনগুলো: ১৯৭৫-১৯৮১’ গ্রন্থে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের একটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাভিত্তিক বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই রাতের আতঙ্ক, সেনানিবাসের বিশৃঙ্খলা, সৈনিকদের বিদ্রোহ, জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং কর্নেল আবু তাহেরের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনার নানা দিক। একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে তিনি যে পরিস্থিতি কাছ থেকে দেখেছিলেন, তা ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যক্তিগত দলিল।
সাখাওয়াত হোসেনের বর্ণনা অনুযায়ী, ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে গোলাগুলির শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। বাসার পেছনের বারান্দা থেকে তিনি দেখতে পান, সৈনিকভর্তি সামরিক যান সেনানিবাসের প্রধান সড়ক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটি ট্যাংকও দ্রুতগতিতে দক্ষিণ দিকে চলে যায়। অন্যদিকে তেজগাঁও বিমানবন্দরের দিক থেকে বিমানবিধ্বংসী কামানের গোলার আলো আকাশকে রক্তিম করে তুলছিল। পরিস্থিতি দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ইউনিট এবং খালেদ মোশাররফের সমর্থক ইউনিটগুলোর মধ্যে হয়তো সংঘর্ষ শুরু হয়েছে।
এর আগের দিন সেনানিবাসে বিভিন্ন ধরনের লিফলেট বিতরণ এবং নানা গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে সামরিক বাহিনীর ভেতরে বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সাখাওয়াত হোসেনের নিচের তলায় বসবাস করতেন বিমানবিধ্বংসী ইউনিটের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাশাহেদ চৌধুরী। তাঁর ইউনিটের একটি ব্যাটারি তেজগাঁও বিমানবন্দরে মোতায়েন করা হয়েছিল। তিনি সাখাওয়াতকে জানান, তাঁর নির্দেশ ছাড়াই ইউনিটের একটি ব্যাটারিকে বিমানবন্দরে নিয়ে মোতায়েন করা হয়েছে। রাতভর চলতে থাকা গোলাগুলির মধ্যে তাঁদের আলোচনা চলতে থাকে। কিন্তু তখনো কেউ নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারছিলেন না, সেনানিবাসের ভেতরে আসলে কী ঘটছে।
ভোরের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা পরিষ্কার হলে সাখাওয়াত হোসেন প্রতিবেশী মেজর হারুনের সঙ্গে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের উদ্দেশে বের হন। পথে তাঁদের সঙ্গে দেখা হয় কয়েকজন পরিচিত সামরিক কর্মকর্তার। তাঁরা জানান, বন্দিদশা থেকে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে নিয়ে আসা হয়েছে। তাঁকে সেখানে গিয়ে দেখা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কিন্তু সেনানিবাসের রাস্তায় যে দৃশ্য তাঁদের চোখে পড়ে, তা ছিল আরও উদ্বেগজনক। সৈনিকদের পাশাপাশি অস্ত্রধারী কিছু বেসামরিক তরুণ সামরিক ট্রাকে করে স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাদের মুখে শোনা যাচ্ছিল, ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই’ এবং ‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’ স্লোগান। সাখাওয়াতের বর্ণনায়, এসব তরুণের মধ্যে জাসদের গণবাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে কিছু তরুণ সামরিক কর্মকর্তাও ছিলেন, যাঁদের কাঁধে কোনো পদমর্যাদার ব্যাজ ছিল না।
একজন তরুণকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, সেদিন থেকে সৈনিক ও অফিসারদের মধ্যে পদমর্যাদার পার্থক্য থাকবে না। সশস্ত্র বাহিনীতে কোনো শ্রেণিবিন্যাস থাকবে না—এটাই তাঁদের বিপ্লবের মূল বক্তব্য। এমন বক্তব্য শুনে সাখাওয়াত হোসেনের মনে প্রশ্ন জাগে, এটি কি কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার পরিকল্পিত অভ্যুত্থান?
দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে পৌঁছে তিনি দেখতে পান, সেখানে কার্যত সেনাবাহিনীর প্রচলিত শৃঙ্খলা ও কর্তৃত্ব ভেঙে পড়েছে। ইউনিটের সুবেদার মেজর আনিস তাঁকে জড়িয়ে ধরে জানান, ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না এবং জিয়াউর রহমান তাঁদের খুঁজছেন। রাতের বিদ্রোহের পর প্রথম বেঙ্গলের গার্ডদের সরিয়ে সৈনিকেরা জিয়াকে মুক্ত করে দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে নিয়ে এসেছে।
সেদিন দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্ট হয়ে ওঠে দেশের সামরিক ক্ষমতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জিয়াউর রহমান, ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলীসহ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা। সাখাওয়াত হোসেন আরও দেখতে পান, বেশ কয়েকজন পরিচিত কর্মকর্তা কোয়ার্টার গার্ডের সেলে আটক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল বাহার। সাখাওয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী, সৈনিকদের ক্ষোভ ও হামলার আশঙ্কা থেকে কিছু কর্মকর্তাকে নিরাপত্তামূলক হেফাজতে রাখা হয়েছিল। তবে কার নির্দেশে তাঁদের সেখানে রাখা হয়েছিল, সে বিষয়ে তখন পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায়নি।
জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেখা হলে তিনি সাখাওয়াতকে ব্রিগেডে ফিরে গিয়ে সৈনিকদের নিয়ন্ত্রণে আনার দায়িত্ব দেন। একই সঙ্গে জানান, ব্রিগেডের কমান্ডার শাফায়াত জামিলের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং তিনি নিরাপদে আছেন। কিন্তু সেনানিবাসের পরিস্থিতি তখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত।
এই সময় ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন কর্নেল আবু তাহের। তিনি ছিলেন জাসদের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠনের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সেনাবাহিনীর প্রচলিত পদমর্যাদা ও কাঠামোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। সৈনিকদের মধ্যে বিভিন্ন অসন্তোষ, সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য এবং কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ে ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন।
সাখাওয়াত হোসেনের বিবরণ অনুযায়ী, তাহের দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে এসে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রথমে দুজনের মধ্যে কোলাকুলি হয়। এরপর তাহের জিয়াকে রেডিও স্টেশনে গিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার আহ্বান জানান। তবে তাহের সেখানে পৌঁছানোর আগেই জিয়াউর রহমান অন্য কর্মকর্তাদের পরামর্শে তাঁর ভাষণ রেকর্ড করে রেডিওতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তাহের সৈনিকদের পক্ষ থেকে কিছু দাবিদাওয়ার তালিকাও জিয়ার কাছে তুলে দেন। জিয়া বিষয়গুলো বিবেচনার আশ্বাস দিলেও তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেননি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। সাখাওয়াতের বর্ণনায়, তাহের জিয়াকে তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে জিয়া বুঝতে শুরু করেন, সৈনিকদের বিদ্রোহের পেছনে কেবল সামরিক অসন্তোষ নয়, আরও বড় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে। ফলে তিনি তাহেরের প্রভাব থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিতে শুরু করেন।
জিয়াউর রহমান ও শাফায়াত জামিলের কথোপকথনও সেদিনের ঘটনাপ্রবাহে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। খালেদ মোশাররফের সঙ্গে বঙ্গভবনে অবস্থান করছিলেন শাফায়াত জামিল। জিয়াউর রহমান তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে পুরোনো বিরোধ ভুলে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। কিন্তু শাফায়াত জামিল সেই প্রস্তাবে সাড়া দেননি। নিজের স্মৃতিচারণে তিনি জানিয়েছিলেন, সৈনিকদের ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর ভেতরে বিদ্রোহ ঘটিয়ে স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, সেনাবাহিনীর মধ্যে হিংসা ও বিভেদের রাজনীতি প্রবেশ করানো হয়েছিল।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা ও কর্নেল হায়দার বঙ্গভবন ত্যাগ করেন। শাফায়াত জামিল সেখানে একা হয়ে পড়েন। বিদ্রোহী সৈনিকেরা তাঁকে খুঁজছে জানতে পেরে তিনি বঙ্গভবনের পেছনের দেয়াল টপকে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় তাঁর একটি পা ভেঙে যায়। পরে মেজর দীদার আতাউরকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক ধরে মেঘনা ফেরিঘাটে পৌঁছান। সেখানে নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা হলে তিনি তাঁদের লঞ্চে আশ্রয় দেন। পরে তাঁদের বন্দর থানায় নেওয়া হয় এবং সেখান থেকেই শাফায়াত জামিল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন।
এদিকে কর্নেল তাহেরের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যেতে থাকে। সাখাওয়াত হোসেন তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, তাহেরের পরিকল্পনা ছিল জিয়াকে ব্যবহার করে সৈনিকদের দাবিদাওয়া এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে একটি রাজনৈতিক ঘোষণা দেওয়ানো। বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে তিনি আরও কিছু গুরুতর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ ও নির্ভরযোগ্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তাঁর বিবরণে স্পষ্ট, তাহের ও জিয়ার মধ্যে অভ্যুত্থানের পরবর্তী লক্ষ্য নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল।
৭ নভেম্বরের ঘটনা শেষ হওয়ার পরও সেনানিবাসে সহিংসতা থামেনি। ৮ নভেম্বর কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা হত্যার শিকার হন। সাখাওয়াত হোসেনের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে লেডি ডাক্তার হামিদা, ডেন্টাল সার্জন করিম, ক্যাপ্টেন আনোয়ার ও লেফটেন্যান্ট মোস্তাফিজ ছিলেন। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ড সেনাবাহিনীর ভেতরে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তোলে।
সাধারণ সৈনিকদের মধ্যেও ধীরে ধীরে বিভক্তি তৈরি হতে থাকে। প্রথমদিকে যারা বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্লোগান দিয়েছিল, তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে সংগঠনটির নেতৃত্ব ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। অন্যদিকে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে গিয়ে সৈনিকদের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল সেনাবাহিনীর প্রচলিত শৃঙ্খলা ও কমান্ড কাঠামো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
৮ নভেম্বর বিকেলে ঢাকা সেনানিবাসে সৈনিকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন জিয়াউর রহমান। তিনি অস্ত্র জমা দিয়ে নিজ নিজ ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সৈনিকদের ন্যায্য দাবিদাওয়া বিবেচনার আশ্বাস দেন। তাঁর বক্তব্যের পর সৈনিকদের একটি বড় অংশ অস্ত্র জমা দিতে সম্মত হয়। এতে সেনানিবাসে জিয়ার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়।
সাখাওয়াত হোসেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাহেরের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। জিয়াউর রহমান দ্রুত পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন এবং সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সমর্থন অর্জন করেন। তবে ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে শুধু জিয়ার ক্ষমতায় ফিরে আসার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর সম্পূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝা সম্ভব নয়। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সৈনিকদের অধিকার ও অসন্তোষ, জাসদের রাজনৈতিক পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের প্রচেষ্টা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বরকে ঘিরে আজও ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ দিনটিকে সিপাহি-জনতার বিপ্লব হিসেবে দেখেন, কেউ জাতীয় সংহতি ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। আবার কারও কাছে এটি ছিল সামরিক বাহিনীর ভেতরে ক্ষমতার লড়াই এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নতুন বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এসব ব্যাখ্যার পেছনে রয়েছে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সামরিক কাঠামোয় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এই দিনের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের পথ আরও সুগম হয়। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর ভেতরে প্রচলিত শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব এবং ক্ষমতার সম্পর্ক নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত না হলেও তাঁর ভূমিকা এবং সৈনিকদের বিদ্রোহের রাজনৈতিক তাৎপর্য ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে।
প্রায় পাঁচ দশক পরও ৭ নভেম্বরের ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। কারণ এই একটি রাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন, সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থান এবং জাতীয় ইতিহাসের এক জটিল অধ্যায়। কে কী উদ্দেশ্যে বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন, কার পরিকল্পনা কতটা সফল হয়েছিল এবং কোন শক্তি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিচারণের পাশাপাশি সমসাময়িক দলিল, সামরিক নথি এবং বিভিন্ন পক্ষের বিবরণও বিবেচনায় নিতে হবে।
৭ নভেম্বর তাই শুধু অতীতের একটি তারিখ নয়; বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এমন এক সন্ধিক্ষণ, যার প্রভাব পরবর্তী বহু বছর ধরে দেশের রাজনীতি ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়েছে। সেই রাতের গোলাগুলির শব্দ থেমে গেলেও তার রাজনৈতিক প্রতিধ্বনি আজও বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চা ও জাতীয় বিতর্কে ফিরে ফিরে আসে।
আপনার মতামত জানানঃ