
সকালের উপাসনা চলছিল। দিনটি ছিল অল সেন্টস ডে—ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় উৎসব। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের গির্জাগুলোতে জড়ো হয়েছিলেন বহু মানুষ। সেই সকালেই মাটি কেঁপে উঠল। যে স্থাপত্য আশ্রয় ও আস্থার প্রতীক, তার পাথরই মানুষের ওপর ভেঙে পড়তে লাগল।
১৭৫৫ সালের ১ নভেম্বরের এই ভূমিকম্পের পর নদীতীরও নিরাপদ থাকেনি। আটলান্টিকে সৃষ্ট সুনামি তেজো নদীর মোহনায় ঢুকে বন্দরের দিকে ছুটে আসে। অন্যদিকে শহরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে বেঁচে যাওয়া মানুষকে পরপর মোকাবিলা করতে হয় পানি ও শিখার বিপদ। NOAA-র ঐতিহাসিক বিবরণে এই বহুমাত্রিক বিপর্যয়ের চিত্র পাওয়া যায়।
আজ, ঘটনার ২৭১ বছর পর, লিসবনের ইতিহাস শুধু একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিবরণ নয়। এটি এমন এক মুহূর্তের গল্প, যখন মানুষ প্রশ্ন করেছিল: নিরপরাধের মৃত্যু আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করি? রাষ্ট্রের প্রথম কাজ কী? আর প্রকৃতির বিপদের সামনে মানুষের নিজের সিদ্ধান্তের দায় কতখানি?
ধ্বংসের হিসাব, নিশ্চয়তার সংকট
ভূমিকম্পটির আধুনিক যন্ত্রে মাপা রেকর্ড নেই। এর মাত্রা পরবর্তী গবেষণায় পুনর্নির্ণীত হয়েছে; বিভিন্ন অনুমানকে একটিমাত্র নিশ্চিত অঙ্ক হিসেবে দেখানো ঠিক নয়। মৃত্যুসংখ্যাতেও বড় পার্থক্য রয়েছে। লিসবন শহর, পুরো পর্তুগাল কিংবা পার্শ্ববর্তী অঞ্চল পর্যন্ত হিসাবের সীমানা বদলালে সংখ্যাও বদলায়। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বিপর্যয়ে বহু হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধ্বংস হয়।
আঘাতটি এত গভীর হয়েছিল শুধু ধ্বংসের পরিমাণে নয়, তার প্রেক্ষাপটেও। ধর্মীয় উৎসবের দিনে উপাসনালয়ে মৃত্যু মানুষের নৈতিক কল্পনাকে নাড়িয়ে দেয়। কেউ একে পাপের শাস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অন্যরা প্রশ্ন তোলেন, শিশু বা সাধারণ উপাসনাকারীর মৃত্যু কোন ন্যায়বিচারের পরিচয়?
তবে সেদিন থেকেই ইউরোপ ধর্মবিশ্বাস ছেড়ে বিজ্ঞানের পথে হাঁটতে শুরু করেছিল—এমন সরল গল্প ইতিহাসকে বিকৃত করে। ধর্মীয় সান্ত্বনা, দার্শনিক সংশয়, প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা ও প্রশাসনিক উদ্যোগ পাশাপাশি চলেছিল। লিসবন এই বিতর্কগুলোর জন্ম দেয়নি; তাদের তীব্র ও দৃশ্যমান করে তুলেছিল।
ভলতেয়ারের প্রশ্ন, রুশোর পাল্টা দৃষ্টি
ঈশ্বর সর্বশক্তিমান ও কল্যাণময় হলে জগতে এত যন্ত্রণা কেন—দর্শনের এই পুরোনো সমস্যাকে লিসবন নতুন তীক্ষ্ণতা দেয়। ভলতেয়ার তাঁর লিসবন-বিষয়ক কবিতায় মানুষের কষ্টকে সহজ আশাবাদের মধ্যে মিলিয়ে দেওয়ার প্রবণতার বিরোধিতা করেন। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া মানুষের সামনে সবই শেষ পর্যন্ত মঙ্গলের জন্য ঘটে বলা কতটা গ্রহণযোগ্য—এটাই তাঁর আপত্তির কেন্দ্রে।
১৭৫৯ সালে প্রকাশিত কাঁদিদ উপন্যাসেও ভূমিকম্পটি ফিরে আসে। সেখানে আশাবাদী দর্শনের ব্যঙ্গচিত্র দেখায়, বাস্তব যন্ত্রণা কীভাবে একটি সর্বব্যাখ্যাকারী তত্ত্বকে অস্বস্তিতে ফেলে। ভলতেয়ারের সাহিত্যিক লিসবনকে প্রত্যক্ষদর্শীর প্রতিবেদন হিসেবে পড়া উচিত নয়; ঘটনাটি তাঁর কাছে নৈতিক ও দার্শনিক প্রশ্নের ক্ষেত্র।
জঁ-জাক রুশো অন্য দিক সামনে আনেন। ১৭৫৬ সালের ১৮ আগস্ট ভলতেয়ারকে লেখা চিঠিতে তিনি আপত্তি জানান। তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মানুষের বসতি ও জীবনযাপন: প্রকৃতিতে কম্পন ঘটতে পারে, কিন্তু মানুষ কোথায় এবং কীভাবে শহর গড়ে, তা ক্ষয়ক্ষতির চরিত্র বদলায়।
এই যুক্তিকে ভুক্তভোগীদের দোষ দেওয়া হিসেবে ব্যবহার করা বিপজ্জনক। দরিদ্র মানুষ প্রায়ই নিরাপদ বাসস্থান বেছে নেওয়ার ক্ষমতা পান না। তবে রুশোর প্রশ্ন থেকে আজকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান তৈরি হয়: প্রাকৃতিক ঘটনার সঙ্গে সামাজিকভাবে তৈরি ঝুঁকির সম্পর্ক কী?
ভলতেয়ার ও রুশোর মতভেদকে তাই শুধু ঈশ্বরে বিশ্বাস বনাম অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বে নামিয়ে আনা যায় না। একজন অসহায় মানুষের যন্ত্রণাকে তত্ত্ব দিয়ে ন্যায্যতা দেওয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়ান; অন্যজন প্রাকৃতিক নিয়মের মধ্যে মানুষের তৈরি বিপদের জায়গাটি দেখতে বলেন। এখানে তাঁদের বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত ভাবার্থ দেওয়া হলো, সরাসরি উদ্ধৃতি নয়।
রাষ্ট্রের হাতে উদ্ধার, রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা
রাজা প্রথম জোসের শাসনামলে মন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁও জোসে দে কারভালিউ ই মেলু উদ্ধার, সরবরাহ ও পুনর্গঠনে প্রধান ভূমিকা নেন। তিনি পরে মার্কেস দে পোম্বাল নামে পরিচিত হন; ভূমিকম্পের সময় ওই উপাধি তাঁর ছিল না।
রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ায় খাদ্য সরবরাহ, শৃঙ্খলা রক্ষা, আহতদের সহায়তা ও পুনর্গঠনের প্রশ্ন সামনে আসে। এই ইতিহাসের তাৎপর্য হলো, বিপর্যয়ের অর্থ নিয়ে বিতর্ক চললেও জীবিত মানুষের প্রয়োজন মেটানোর কাজ অপেক্ষা করতে পারে না।
কিন্তু পোম্বালকে নিখুঁত আধুনিক উদ্ধারকর্তা বানালে ইতিহাসের আরেক দিক হারিয়ে যায়। পুনর্গঠন ওপর থেকে পরিচালিত হয়েছিল, রাজকীয় কর্তৃত্বের ভিত্তিতে। নগর পরিকল্পনাবিষয়ক গবেষণায় এ উদ্যোগকে স্বৈরতান্ত্রিক পরিকল্পনার দিক থেকেও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কার্যকর সিদ্ধান্ত এবং অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত একই বিষয় নয়।
শহরের বাইশা এলাকায় নতুন পরিকল্পনায় প্রশস্ত রাস্তা, নিয়মিত বিন্যাস ও বড় উন্মুক্ত পরিসর গুরুত্ব পায়। সামরিক প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাকারীদের কাজ পুরোনো শহরকে হুবহু ফিরিয়ে আনার বদলে নতুন বিন্যাসে গড়ার পথ তৈরি করে। পুনর্গঠন এখানে স্থাপত্যের পাশাপাশি ক্ষমতা ও সামাজিক অগ্রাধিকারেরও প্রশ্ন।
এই অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের পাঠ হলো, দুর্যোগে রাষ্ট্রের সক্ষমতা অপরিহার্য; তার সঙ্গে জবাবদিহিও প্রয়োজন। জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কাদের সুরক্ষা দেয়, কার কথা শোনে এবং কার জীবনকে নতুন পরিকল্পনায় জায়গা দেয়—সেই প্রশ্নগুলোও উদ্ধারকাজের ইতিহাসের অংশ হওয়া উচিত।
পাপের হিসাব থেকে পর্যবেক্ষণের খাতায়
লিসবনের পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল তথ্য সংগ্রহ। ১৭৫৬ সালে বিভিন্ন প্যারিশে প্রশ্নমালা পাঠানো হয়। কম্পন কখন শুরু হয়েছিল, কতক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল, বাড়িঘরের ক্ষতি কত, পানি অস্বাভাবিক আচরণ করেছিল কি না, আগুন লেগেছিল কি না—এসব জানতে চাওয়া হয়। প্রশাসন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন ছিল।
এটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত পরিবর্তনের উদাহরণ। ভয়াবহ ঘটনার ব্যাখ্যা শুধু অনুমান বা উপদেশে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন জায়গার পর্যবেক্ষণ একত্র করা হচ্ছিল। আবার তথ্য সংগ্রহে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কই ব্যবহৃত হয়েছিল। ফলে ধর্ম ও অনুসন্ধানকে দুটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন শিবির হিসেবে দেখলে ঘটনাটির বাস্তবতা ধরা পড়ে না।
ইমানুয়েল কান্টও ১৭৫৬ সালে ভূমিকম্প নিয়ে তিনটি লেখা প্রকাশ করেন। তিনি প্রাকৃতিক কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। ভূগর্ভস্থ পদার্থের দহনসংক্রান্ত তাঁর ব্যাখ্যা আধুনিক ভূবিজ্ঞানে গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর গুরুত্ব সঠিক আধুনিক তত্ত্ব আবিষ্কারে নয়; প্রাকৃতিক কারণ অনুসন্ধান এবং ক্ষয়ক্ষতি কমানোর চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়ায়।
একটি বিপর্যয়েই আধুনিক ভূকম্পবিদ্যার জন্ম হয়ে গিয়েছিল বলা অতিরঞ্জিত। তবে পর্যবেক্ষণ, তুলনা ও পদ্ধতিগত তথ্য সংগ্রহের ইতিহাসে লিসবনের পরবর্তী উদ্যোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থান রাখে।
লিসবন আমাদের সহজ সমাপ্তি দেয় না। এটি প্রমাণ করে না যে বিশ্বাস অপ্রয়োজনীয় কিংবা যুক্তিবাদী রাষ্ট্র সব সমস্যার সমাধান করে। বরং একই ধ্বংসস্তূপে দেখা যায় বিশ্বাসের আশ্রয়, তত্ত্বের সীমা, অনুসন্ধানের প্রয়োজন এবং ক্ষমতার দ্বৈত চরিত্র।
কেউ প্রার্থনায় অর্থ খুঁজতে পারেন, কেউ প্রকৃতির নিয়ম অনুসন্ধান করতে পারেন। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়, খাবার ও চিকিৎসা দেওয়ার দায়িত্ব স্থগিত রাখা যায় না। লিসবনের দীর্ঘস্থায়ী প্রশ্ন সেখানেই: বিপর্যয়ের অর্থ আমরা যা-ই করি, মানুষের কষ্ট কমাতে আমরা কী করছি?
আপনার মতামত জানানঃ