Trial Run

করোনায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশ: পরিস্থিতি সামলাতে কতটা ফলপ্রসূ প্লাজমা থেরাপি?

ছবি: সংগৃহীত

শুভ্র সরকার :: ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যব্যবস্থা। ঠাঁই নেই আইসিইউয়ে, হাসপাতালগুলো ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগীর চাপে দিশেহারা। এরই মধ্যে টিকা নিয়ে নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। এমন পরিস্থিতিতে প্লাজমা থেরাপি কোভিড-১৯ এর এই ভয়াবহতার মুখে লাগাম টেনে ধরতে পারে।  গণস্বাস্থ্য প্লাজমা সেন্টারের সূত্র মতে, প্লাজমা থেরাপি দিতে পারলে সেটি মৃত্যুহার কমিয়ে রোগীদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। পাশাপাশি এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। রক্ত দেয়ার মতো স্বাভাবিক। প্লাজমা দান করার পর ২৪ ঘণ্টায় তিন লিটার পানি পান করলেই এর অভাব পূরণ হয়ে যায়। তবে চাহিদার তুলনায় তাদের সরবরাহের হার বেশ কম। প্লাজমা ডোনেট নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব এর জন্য দায়ী বলে মনে করেন গণস্বাস্থ্য প্লাজমা সেন্টারের মাইক্রোবায়োলজিষ্ট আনোয়ারা খাতুন।     

এদিকে দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি মারাত্মক বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এখনই নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে সংক্রমণের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। শুক্রবার (২ এপ্রিল) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া গত ২৪ ঘণ্টার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৬ হাজার ৮৩০ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আর ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৫০ জনের। এর আগের দিন আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছিল ৬ হাজার ৪৬৯ জন এবং মারা গেছেন ৫৯ জন। গত ৩১ মার্চ আক্রান্ত ৫ হাজার ৩৫৮ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫২ জনের।

প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। জনস্বাস্থ্য বিশেজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়বে এবং দেশে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। 

এমন পরিস্থিতিতে কতোটা কার্যকর হতে পারে প্লাজমা থেরাপি, আসুন জেনে নিই। 

প্লাজমা থেরাপি কী?

মানুষের রক্তের জলীয় অংশকে বলা হয় প্লাজমা বা রক্তরস। রক্তের মধ্যে প্রায় ৫৫ ভাগই থাকে হলুদাভ রঙের এই প্লাজমা। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পরে যারা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছেন, তাদের শরীরে এক ধরনের অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।

তাদের শরীর থেকে প্লাজমার মাধ্যমে সংগ্রহ করা এই অ্যান্টিবডি যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোন ব্যক্তির শরীরে প্রয়োগ করা হয়, তখন তার শরীরের সেই অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। তখন তিনিও সুস্থ হয়ে ওঠেন।

প্লাজমায় অনেক ধরনের অ্যান্টিবডি থাকে। যখন কেউ কোন রোগে আক্রান্ত হন, তখন সেই ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া বিরুদ্ধে এ ধরণের অ্যান্টিবডি প্রোটিন তৈরি হয়। ওই প্রোটিন জীবাণুর চারপাশে এক ধরনের আবরণ তৈরি করে সেটাকে অকেজো করে ফেলে। এভাবেই অ্যান্টিবডি কাজ করে।

প্লাজমা থেরাপির মাধ্যমে একজনের শরীরের কার্যকর অ্যান্টিবডি অন্যদের শরীরের স্থানান্তর করা হয়।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রক্তের জলীয় অংশকে প্লাজমা বলে। কোনো ব্যক্তি ভাইরাস–ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হলে ৫ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে তার শরীরে জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি হয়। ফলে তার রক্তে একধরনের অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াকে নিষ্ক্রিয় করে দেয় ও এর বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। 

প্লাজমা থেরাপির কার্যকারিতা

‘কনভালসেন্ট প্লাজমা থেরাপি’ নিয়ে প্রাথমিক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা আশার আলো দেখছেন, তবে এখনও তারা শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলতে পারছেন না এটি পুরোপুরি কাজ করবে কিনা। চীনে করোনাভাইরাসের মহামারি শুরু হওয়ার পর সেখানে প্রথম এটি নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়।

তবে গণস্বাস্থ্য প্লাজমা সেন্টারের মাইক্রোবায়োলজিষ্ট আনোয়ারা খাতুন স্টেট ওয়াচকে জানান, প্লাজমা থেরাপির কার্যকারিতা বেশ আশাব্যঞ্জক। রোগীর অবস্থা খুব বেশি ক্রিটিকাল না হলে দুই বা তিনটি প্লাজমা দেয়ার পর রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন বলে জানান তিনি। 

তিনি বলেন, করোনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে প্লাজমা থেরাপি হতে পারে বিপর্যয় কাটানোর উপায়। যদিও গণস্বাস্থ্য প্লাজমা সেন্টারে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ টা কল আসছে প্লাজমার জন্য। সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ৪ থেকে ৫ টা। এর জন্য মানুষের অসচেতনতাই দায়ী। সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকেও মানুষকে যথাযথভাবে প্লাজমা ডোনেটে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি সামলাতে তিনি সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। 

তবে কোভিড-১৯ পজেটিভ হবার পর সুস্থ হলেই যে সবাই প্লাজমা ডোনেট করতে পারবে এমন নয়। সেজন্য অবশ্যই ডোনারকে অ্যান্টিবডি টেস্টের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এই টেস্ট পজিটিভ হলে তবেই সে প্লাজমা ডোনেট করতে পারবে। করোনায় আক্রান্ত হলেও সবার রক্তে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি পাওয়া যায় না বলে জানান আনোয়ারা খাতুন।

যুক্তরাষ্ট্রে কনভালেসেন্ট প্লাজমা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণায় যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের একজন ড‍ঃ লুইস কাটয। তিনি বলছেন, কোভিড-১৯ এর চিকিৎসায় সেরকম কিছু যেহেতু এখনও পর্যন্ত নেই, তাই তারা কনভালসেন্ট প্লাজমা থেরাপিকে একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে দেখছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলেস টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‍“এটি যে বেশ উপকারি হতে পারে সেরকম ঐতিহাসিক নজির আমাদের কাছে আছে। আর এরকম তথ্য-উপাত্তও আমাদের কাছে আছে যা দেখে আমরা মনে করছি এই পদ্ধতি নিরাপদ।”

“আপনাকে গুনতে হবে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। যেখানে গণস্বাস্থ্য ও ঢাকা মেডিকেলে লাগবে মাত্র ৫ হাজার টাকা।”

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন গত সপ্তাহেই কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। কেবল গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জরুরী চিকিৎসায় ডাক্তাররা এই থেরাপি ব্যবহার করতে পারবেন বলে জানাচ্ছে লস এঞ্জেলস টাইমস। হিউস্টন মেথডিস্ট হাসপাতাল যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম এই থেরাপি ব্যবহার করেছে।

কোভিড-১৯ আক্রান্ত থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাওয়া ব্যক্তির রক্তের প্লাজমাতে এই অ্যান্টিবডি রয়েছে, যা সংগ্রহ করে কোভিড আক্রান্ত রোগীর শরীরে দিলে সাময়িক প্যাসিভ ইমিউনিটি তৈরি হয়। এই অ্যান্টিবডি সার্চ করোনা-২ ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে এবং রোগী সুস্থ হতে থাকে হয়।

সর্বপ্রথম ফেব্রুয়ারি মাসে চীনের হুনান শহরে ৫ জন রোগীর ওপর এবং পরবর্তী সময়ে ১০ জন এবং এরও পরে ২৪৫ জন কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর ওপর ব্যবহার করে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গিয়েছিল। আমেরিকায় এ পর্যন্ত ১৫ হাজারের অধিক রোগীকে কনভেলিসেন্ট প্লাজমা দেওয়া হয়েছে এবং এর চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

চিকিৎসকদের দাবি চীনসহ বিশ্বের আরো অনেক দেশে এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা করে ৮০ ভাগ সফলতা পাওয়া গেছে৷ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের প্রধান ও কোভিড-১৯ ন্যাশনাল টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. মহিউদ্দিন আহমেদ খান এর কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান, চীনে এর কিছু ছোট ছোট পরীক্ষা হয়েছে৷ এরমধ্যে বিভিন্ন গ্রুপ থেকে ১০ জন রোগীকে প্লাজমা থেরাপি দেয়ার পর ১০ জনই ভালো হয়ে যায়৷ আর একটি কন্ট্রোলড গ্রুপে ১০ জনের মধ্যে ৭ জন ভালো হয়ে যায়৷ 

একজন সুস্থ রোগীর শরীর থেকে সংগ্রহ করা প্লাজমা দুই থেকে তিনজন অসুস্থ রোগীকে দেয়া সম্ভব হবে।

কোভিড-১৯ ধরা পরার পর যত দ্রুত সম্ভব প্লাজমা থেরাপি দেয়ার কথা বলছেন প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মহিউদ্দিন আহমেদ খান

তিনি বলছেন, শেষের দিকে আসলে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা তীব্র হয়ে যায়। ফুসফুসের অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। শরীরে নানা ধরনের প্রদাহ দেখা দেয়। তখন এর কার্যকারিতা কম হয়। আক্রান্ত হওয়ার প্রথম দিকে যদি দেয়া যায় তাহলে ফলটা ভাল পাওয়া যায়।

“আমাদের দেশে বেশিরভাগ রোগীকে প্লাজমা দিচ্ছে ভেন্টিলেশনে যাওয়ার পর, আইসিইউতে যাওয়ার পর। তখন আসলে প্লাজমার কোনো গুরুত্ব বা সুবিধা নাই। প্লাজমা দিতে হয় রোগটি ধরা পড়ার শুরুতে, যেটাকে ভাইরাল ফেইজ বলি। প্লাজমা যেহেতু ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে। ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে যদি সময়মত দেওয়া যায়।”

তিনি বলেন, ‘‘করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হলে রক্তে প্রাকৃতিক নিয়মেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়৷ প্লাজমার মাধ্যমে অ্যান্টিবডি যখন আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে দেয়া হবে তখন ওই ব্যক্তির শরীরের করোনা ভাইরাস ছাড়ানোর প্রক্রিয়া বন্ধ করে নিস্ক্রিয় করে ফেলবে৷’’ 

বিশ্বের ৬০টিরও বেশি দেশে প্লাজমা থেরাপি ব্যবহার করা হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এই প্লাজমা থেরাপির বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, আমাদের আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের সংখ্যা সীমিত। উপরন্তু কোনো ওষুধ ও ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি। এই প্লাজমা থেরাপি ব্যবহার করে আমরা আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের ওপর চাপ কমাতে পারব বলে মনে করি।

প্লাজমা ব্যাংক

করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপির কার্যকারিতার পরিপ্রেক্ষিতে ‘প্লাজমা ব্যাংক’ গড়ে তোলে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে প্লাজমা সেন্টার, ব্লাড ব্যাংক অ্যান্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টারের উদ্বোধন করবেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের প্রধান ও প্লাজমা থেরাপির জন্য গঠিত কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. এম এ খান।

সারাদেশের মানুষ এখান থেকে প্লাজমা নিতে পারবে। প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিদিন ২৫ জনকে প্লাজমা দেয়ার সক্ষমতা নিয়ে চালু করা হয় এ সেন্টার।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কোরেশী বলেন, করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের জন্য গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে কোভিড প্লাজমা তৈরি করা হবে। ডোনারদের কাছ থেকে আমরা যে ব্লাড নেবো, সেই ব্লাড থেকে এ প্লাজমা তৈরি করা হবে। প্লাজমা তৈরিতে শুধু আমাদের যে খরচ হবে সেই মূল্যে কোভিড রোগীদের আমরা এ প্লাজমা দেবো।

এদিকে দেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়ায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য করোনা থেকে সুস্থ হওয়া ব্যক্তিদের প্লাজমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল। গত মঙ্গলবার দুপুরে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মিডিয়া উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম মিন্টুর পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়।

এতে বলা হয়েছে, করোনা ভয়ানকরূপ ধারণ করছে। এই অবস্থায় করোনা রোগীদের চিকিৎসায় অনেক প্লাজমা প্রয়োজন। করোনা থেকে সুস্থ ব্যক্তির রক্ত থেকে প্লাজমা তৈরি করা হয়। করোনা থেকে সুস্থ ব্যক্তিরা রক্তদান করুন। একে অপরকে রক্তদানের বিষয়ে আগ্রহ সৃষ্টি করে অন্যের জীবন রক্ষায় অংশ নিন। একইসঙ্গে যাদের প্লাজমা প্রয়োজন তাদেরকেও রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের গণস্বাস্থ্য প্লাজমা সেন্টারে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।

গণস্বাস্থ্য জানায়, ৫ হাজার টাকায় যে কোনো গ্রুপের ৪৫০ মিলিগ্রামের এক ব্যাগ প্লাজমা বিক্রি করা হয়। তাদের হাসপাতালে অত্যাধুনিক প্লাজমা সেন্টার রয়েছে। প্লাজমা সেন্টারটি দিনরাত খোলা থাকে। ফলে যাদের প্লাজমা প্রয়োজন তাদেরকে ধানমণ্ডি গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, করোনা থেকে কোনো ব্যক্তি সুস্থ হওয়ার ১৫-২১ দিন পর যদি তিনি রক্তদান করেন এবং যদি তার শরীরে নিউট্রালাইজড অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সেই প্লাজমা সবচেয়ে বেশি কার্যকরী। 

এ প্রসঙ্গে গণস্বাস্থ্য প্লাজমা সেন্টারের মাইক্রোবায়োলজিষ্ট আনোয়ারা খাতুন স্টেট ওয়াচকে বলেন, ঢাকা মেডিকেল, পুলিশ হাসপাতাল সহ কিছু বেসরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীরা প্লাজমা সংগ্রহ করতে পারবেন। তবে বেসরকারি হাসপাতালগুলো থেকে প্লাজমা সংগ্রহে আপনাকে গুনতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। যেখানে গণস্বাস্থ্য ও ঢাকা মেডিকেলে লাগবে মাত্র ৫ হাজার টাকা।   

কতবার প্লাজমা দেয়া যাবে?

প্লাজমা প্রদানের ক্ষেত্রে রক্তের কণিকাগুলো বাদ দিয়ে বাকি প্রোটিনগুলো নেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে শরীর স্বাভাবিক ভাবে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম হয়।

যে কারণে আমেরিকার ফেডারেল ড্রাগ অ্যাডমিন্সট্রেইশন (এফডিএ) সাত দিনে দুইবার প্লাজমা দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। তবে দ্বিতীয়বার দেওয়ার মধ্যে অন্তত এক দিন সময়ের ব্যাবধান থাকার কথা বলেছে।

অবশ্য রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি সপ্তাহে একবার প্লাজমা ডোনেশন নিচ্ছে। এক্ষেত্রে আমরা বুঝতে পারি আমরা একাধিকবারও প্লাজমা দিতে পারি। একবারে কী পরিমাণ প্লাজমা দিতে পারবে সেটা ডোনারের বয়স, ওজন ও অন্যান্য অবস্থার ওপর চিকিৎসক নির্ধারণ করবে।

প্লাজমা কীভাবে সংগ্রহ করা হয়

কোভিড-১৯ রোগ থেকে সেরে ওঠার ১৪ দিন পর এফেরেসিস মেশিনের সাহায্যে ওই ব্যক্তির শরীর থেকে ৪০০ থেকে ৬০০ মিলিলিটার প্লাজমা সংগ্রহ করা হয়। 

এই পদ্ধতিতে রক্তকণিকা (আরবিসি, ডব্লিউবিসি ও প্লেটলেট) প্লাজমাদাতার শরীরে ফিরে যায়। অর্থাৎ, তা সংগৃহীত হয় না, শুধুই প্লাজমাই নেওয়া হয়। 

তবে যেসব জায়গায় এই এফেরেসিস মেশিন নেই, সেখানে এক ব্যাগ ব্লাড (হোল ব্লাড) সংগ্রহ করে সেন্ট্রিফিউজ করে প্লাজমা আলাদা করা যেতে পারে এবং তা প্রয়োজনমতো কোভিড রোগীকে প্রয়োগ করা যেতে পারে।

অ্যান্টিবডি টেস্ট

রক্তে কী পরিমাণ অ্যান্টিবডি হয় তা পরীক্ষার জন্য কিট রয়েছে। রয়েছে প্লাজমা নেয়ার আলাদা যন্ত্র৷ এই যন্ত্র রক্ত থেকে প্লাজমা আলাদা করে বাকিটা আবার দেহে ফিরিয়ে দেয়৷ 

একটি কিট দিয়ে ৯০ জনের প্লাজমার অ্যান্টিবডি টেস্ট করা যায়৷ তবে এই কিট বেশ দামী হওয়ায় ৩০-৪০ জনের প্লাজমা জমা হলে অ্যান্টিবডি টেস্ট করা হয়।

গণস্বাস্থ্য প্লাজমা সেন্টারের মাইক্রোবায়োলজিষ্ট আনোয়ারা খাতুন জানান, যথেষ্ট পরিমাণে অ্যান্টিবডি টেস্ট কীট তাদের কাছে আছে। কোভিড পজিটিভ হলেই প্লাজমা দেয়া সম্ভব এটা ভুল ধারণা। সেক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি টেস্টে ডোনারকে পজিটিভ হতে হবে। 

কোভিড থেকে সেরে ওঠা সকল রোগীর শরীরে অ্যান্টিবডি একরকম থাকে না। রক্তের প্লাজমায় যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় তার একটা নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত হলেই তবে কেবল সেটা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে। 

ডা. খান বলেন, থেরাপির আগে প্লাজমায় অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পরিমাপ করা জরুরি হলেও বাংলাদেশে তা করা হয় না। প্লাজমায় সঠিক ঘনত্বের অ্যান্টিবডি না থাকলে তেমন কাজ হবে না।

রক্তের তরল, হালকা হলুদাভ অংশকে প্লাজমা বা রক্তরস বলে। তিন ধরনের কণিকা ছাড়া রক্তের বাকি অংশই রক্তরস। মেরুদণ্ডী প্রাণীর শরীরের রক্তের প্রায় ৫৫ শতাংশই রক্তরস।

অ্যান্টিবডি, যা ইমিউনোগ্লোবলিন নামে পরিচিত, এমন এক ধরনের সুরক্ষা প্রোটিন, যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা থেকে তৈরি হয়। প্লাজমায় এই অ্যান্টিবডির ঘনত্ব কী মাত্রায় আছে তা আইজিজি (Immunoglobulin G-IgG) পরীক্ষায় পরিমাপ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) বলছে, করোনাভাইরাস থেকে সেরে ওঠা রোগীর প্লাজমা (কনভালেসেন্ট প্লাজমা) আক্রান্তের শরীরের প্রয়োগের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডির ঘনত্ব বা আইজিজির মাত্রা ১:৩২০ এর বেশি হতে হবে।

“বাংলাদেশে মানুষের শরীরে আইজিজি ১:৩২০ পর্যন্ত পাওয়া খুবই কঠিন। এ কারণে আইজিজি ১:১৬০ মাত্রায় পেলেই আমরা রোগীদের প্রয়োগ করছি।”

কোন রোগীদের জন্য প্লাজমা থেরাপি

ডা. মহিউদ্দিন আহমেদ খান বলছেন, আমরা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বৈজ্ঞানিক গবেষণা করছি। সরাসরি রোগীরা অনুরোধ করতে পারে না। তার যে চিকিৎসক তার মাধ্যমে আসতে হয় এবং কারা প্লাজমা থেরাপি পাবেন তারও একটি ক্রাইটেরিয়া আছে।

তিনি বলছেন, রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। যাদের শ্বাসকষ্ট আছে, অক্সিজেনের মাত্রা ৯৩ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যাদের নিউমোনিয়া আছে এরকম মারাত্মক অসুস্থদের ব্যাপারে একটা গাইডলাইন দেয়া আছে। ‘সিভিয়ারলি ইল’ আর ‘ক্রিটিকালি ইল’ এই দুই ধরনের আক্রান্ত ব্যক্তিদের এই থেরাপি দেয়া হচ্ছে।

একজনকে ২০০ মিলিমিটার পরিমাণ প্লাজমা দেয়া গেলে সেটি ভাল ফল হতে পারে। প্লাজমা থেরাপির কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কিছু নেই। তবে দেখতে হবে সেরে ওঠা ব্যক্তির মধ্যে কোভিড-১৯ এর লক্ষণ দেখা দেয়ার পর ২৮দিন পার হয়েছে কিনা।

প্লাজমা দেয়ায় নেই শারিরীক ঝুঁকি

গণস্বাস্থ্য প্লাজমা সেন্টারের সাথে যোগাযোগ করলে এ প্রসঙ্গে তারা জানান, এখন অব্দি প্লাজমা ডোনেট করার পর ডোনারদের শারীরিক কোন অসুস্থতার রিপোর্ট তারা পাননি। প্লাজমা দেয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ। কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।       

বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক বলেন, প্লাজমা সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোন আইনি বাধা নেই। এটা অনেক বেশি নিরাপদ একটি পদ্ধতি, যেমন- মানুষ যেভাবে রক্তদান করে এটিও সেই একই ধরনের। ১৮-৬০ বছর বয়সী যে কোন ব্যক্তি যার ওজন সর্বনিম্ন ৫০ কেজি এবং যিনি হেপাটাইটিস (এইচবিভি), এইচসিবি, এইচআইভি, ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত নন এমন যেকোন ব্যক্তিই প্লাজমা দান করতে পারেন। 

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. দিলদার হোসেন করোনা পজিটিভ হয়েছিলেন৷ এখন পুরোপুরি সুস্থ৷ তিন বলেন, ‘‘আমি নিজে একজন চিকিৎসক এবং প্লাজমা থেরাপির ব্যাপারে আমার ধারণা আছে৷ তাই আমি মনে করেছি আমরা রক্তের প্লাজমা নিয়ে যদি অন্য রোগীর জীবন বাঁচে তাহলে কিছু হলেও তো মানুষের কাজে লাগতে পারব৷’’

তিনি বলেন, ‘‘আমি একজন নিয়মিত রক্তদাতা৷ এ পর্যন্ত ২৫ বারের মত রক্ত দিয়েছি৷ এটা রক্তদানের চেয়েও সহজ৷ ৩০-৩৫ মিনিট লেগেছে আমার৷ যারা করোনা পজিটিভ হওয়ার পর সুস্থ হয়েছেন তারা যদি প্লাজমা দেয়ার ব্যাপারে এগিয়ে আসেন তাহলে অনেকের জীবন বাঁচবে৷’’

মানুষের রক্তের ৫৫ ভাগই প্লাজমা৷ এটি দেয়ার ক্ষেত্রে কোনা শারীরিক ঝুঁকি নেই বলেও জানান চিকিৎকরা৷

হেমাটোলজির অধ্যাপক এম এ খান বলছেন, প্লাজমা দানের ব্যাপারে এখনো সচেতনতার অভাব রয়েছে। যারা প্লাজমা দেবেন, তাদের ভয়ের কোন কারণ নেই। এখানে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কিছু নেই। বরং তার প্লাজমা হয়তো অন্যদের সুস্থ হয়ে উঠতে সহায়তা করবে। এটা একেবারে রক্ত দেয়ার মতো একটা ব্যাপার।

অ্যাফরেসিস মেশিন

দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ১৫-১৮টি অ্যাফরেসিস মেশিন (মানবদেহ থেকে সরাসরি প্লাজমা নেয়ার যন্ত্র) রয়েছে। এর মধ্যে রংপুর, রাজশাহী ও সিলেট মেডিকেল কলেজে এই মেশিন রয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল এবং নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে এই মেশিন কার্যকর। 

এই মেশিনের সাহায্যে একজন মানুষের শরীর থেকে রক্ত নিয়ে ২০০ এমএল প্লাজমা তৈরি করতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। সে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে একটি মেশিন দিয়ে দৈনিক ১০-১২ জনের প্লাজমা সংগ্রহ সম্ভব।

মৃত্যুঝুঁকি কমাতে পারে না প্লাজমা থেরাপি

করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) গুরুতর অসুস্থ হওয়ার বা মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে পারে না প্লাজমা থেরাপি। নতুন এক গবেষণায় এই তথ্য মিলেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির এক খবরে এ কথা জানানো হয়।

ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে এই কনভালসেন্ট প্লাজমা ব্যবহারের জরুরি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটা আসলেই কাজ করে কি না, তা খতিয়ে দেখতে কয়েকটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল (পরীক্ষামূলক প্রয়োগ) চলছে। তার একটি ভারতজুড়ে পরিচালিত নতুন এই গবেষণা। ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক ‘ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল’ (বিএমজে) সাময়িকীতে।

গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে এই কনভালসেন্ট প্লাজমা ‘সামান্যই কার্যকর’ বলে দেখা গেছে। অবশ্য গবেষকেরা বলেছেন, ভবিষ্যৎ গবেষণায় শুধু সেই প্লাজমা ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে, যাতে উচ্চমাত্রার নিষ্ক্রিয় অ্যান্টিবডি রয়েছে। করোনা রুখতে এমন প্লাজমা অধিকতর কার্যকর কি না, খতিয়ে দেখতে হবে।

এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় কার্যকর ওষুধ নেই বললেই চলে। ফলে দেহে এই ভাইরাসের আক্রমণের তীব্রতা কমিয়ে দেওয়ার উপায় খুঁজছে বিভিন্ন দেশ। এরই অংশ প্লাজমা থেরাপির ব্যবহার।

গণস্বাস্থ্য প্লাজমা সেন্টারে যোগাযোগের ঠিকানা

গণস্বাস্থ্য ব্লাড, ট্রান্সফিউশন ও প্লাজমা সেন্টার, বাড়ি নম্বর ১৪/ই, সড়ক ৬, ধানমণ্ডি, ঢাকা-১২০৫। ফোন: ৯৬৭০০৭১-৫, Ext:-২২৫, ২০৯, ০১৭০৯৬৬৩৯৯৪। ডা. কোরাইশী  ০১৫৫২৪৬০৭৮০। ই-মেইল: gdc@gonoshasthayakendra.org।

এসডব্লিউ/এসএন/১৮২৪ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগীতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগীতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগীতার অনুরোধ জানাচ্ছি।

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 123
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    123
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ