Trial Run

কর্মক্ষেত্রে যৌন নিপীড়নের শিকার ৬৭ শতাংশ নারী কোনো সাহায্য পায় না

অ্যাকশন এইডের গবেষণা

যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার নারীর জন্য প্রতিটা কারখানায় সহিংসতা দমন কমিটি থাকে। কর্মক্ষেত্রে যৌন নিপীড়নের শিকার ৬৭ শতাংশ নারী এই কমিটি থেকে কোনো সাহায্য পায় না বলে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের এক গবেষণা বলেছে। আবার অধিকাংশ কারখানাতেই এই কমিটিই নেই। ফলে পোশাক খাতে নিয়োজিত নারীদের ৬৪ শতাংশ এই কমিটি সম্পর্কে জানে না বলে ওই গবেষণা জানায়।

গতকাল মঙ্গলবার(২৩ মার্চ)  বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি আয়োজিত এক সংলাপে এসব কথা বলা হয়। এতে সহযোগিতা দেয় অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের পরিচালক আসগর আলী সাবির। সঞ্চালনা করেন সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সেকান্দার আলী মিনা। এতে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শ্রম আদালত বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সেলিম আহসান খান, শ্রমিক নেতা চৌধুরী আশিকুল আলম, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ মহাপরিদর্শক ইউসুফ আলী ও বিভিন্ন খাতের শ্রমিক প্রতিনিধি।

অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদনটি পাঠ করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ব্যারিস্টার আরাফাত হোসেন খান।

ওই গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে নারীরা ব্যাপক হারে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। যার ৮৬ শতাংশ হয় পুরুষ সুপারভাইজারের মাধ্যমে। যৌন নিপীড়ন ও সহিংসার শিকার ৬৭ শতাংশ নারী কারখানার সহিংসতা দমন কমিটির কোনো সাহায্য পায় না। অথবা বেশির ভাগ কারখানায় এই কমিটিও নেই। ফলে পোশাক খাতে নিয়োজিত নারীদের ৬৪ শতাংশ এই কমিটি সম্পর্কে জানে না। ফলে নির্যাতনের শিকার বেশির ভাগই ভয়ে কারও কাছে মুখ খোলে না।

এ তথ্য জানিয়ে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের ওই গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে ৩৬ শতাংশ নারী কর্মী যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়। যার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ২২ শতাংশ হয় তৈরি পোশাক খাতে।

আরাফাত হোসেন খান বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান, সাধারণ আইন ও শ্রম আইনে নারীর ওপর সহিংসতা প্রতিরোধে অনেক ধারা রয়েছে। তবে কার্যকারিতার অভাবে কর্মক্ষেত্রে নারীর ওপর সহিংসতা এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এ জন্য আইএলও কনভেনশন-১৯০ অনুসমর্থনে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য শামসুন্নাহার ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশের শ্রম খাতে ১ কোটি ২০ লাখ নারী নিয়োজিত। এর বাইরেও নারীরা কৃষিসহ নানা পেশায় নিয়োজিত থেকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে নারীরা আজও কর্মক্ষেত্রে সম মর্যাদা পাচ্ছে না।

তিনি বলেন, দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ শ্রমজীবী হলেও জাতীয় সংসদে এই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব খুবই কম।

কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে৷ ২০০৯ সালে হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি রোধে নির্দেশনা দেয়৷ তাতে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে৷ অভিযোগ দেয়ার ব্যবস্থা এবং তার নিস্পত্তির ব্যবস্থার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়৷ কিন্তু তা অনুসরণ করছেনা প্রতিষ্ঠানগুলো৷ অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ওই কমিটির ব্যাপারেই জানেনা৷

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা নিরোধ করতে নানা ধরনের আইন আছে৷ হাইকোর্টের রায়ও আছে৷ কিন্তু রাষ্ট্র বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যেসব ব্যবস্থা নেওয়ার কথা সেটা নেওয়া হচ্ছে না৷ এই ধরনের হয়রানির শিকার হলে অনেকেই বলতে পারে না৷ তার চাকরির ভয় থাকে বা তাকে নিয়ে কথা বলাবলির একটা ভয় কাজ করে৷

তারা বলেন, আইন যা আছে তার যদি সঠিক প্রয়োগ হতো তাহলেও অনেক সমস্যা কমে যেত৷ আইনকানুনের পাশাপাশি আমাদের সামাজিক রীতিনীতি নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন৷ যেটা বলছিলাম, যৌন নিপীড়ন৷ সেখানে আদালতের একটা রায় আছে৷ সেখানে বলা আছে, একটা ঘটনা ঘটলে সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া  যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে৷ কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না৷ আইনে কিন্তু বলা আছে, আপনি একজন পুরুষ হলে কর্মক্ষেত্রে আপনি একজন নারীর সঙ্গে কী ধরনের ব্যবহার করবেন, কী করলে অশ্রদ্ধা হিসেবে গণ্য হবে তাও বলা আছে৷ এগুলো কিন্তু মানা হচ্ছে না৷

তারা বলেন, সুপ্রিমকোর্টের একটা রায় আছে, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে একটা সেল থাকতে হবে৷ এই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে৷ এসব কমিটিতে অবশ্যই নারীদের সংখ্যা বেশি থাকতে হবে৷ সেখানে যে কেউ অভিযোগ করতে পারবে৷ কেউ অভিযোগ করলে অবশ্যই সেটার বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে৷ কিন্তু তেমনটি হচ্ছে কোথায়!

তারা বলেন, একটা ভালো দিক, কারখানা পরিদর্শন অধিদফতর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে৷ তারা এ ব্যাপারে খোঁজ খবর নিচ্ছেন৷ এই উদ্যোগগুলো আরো বেশি জোরালো করা দরকার৷ তারা মনে করেন, কেন্দ্রীয়ভাবে এটা পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন৷ আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, যে প্রতিষ্ঠান থেকে এই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হোক, বা ব্যবস্থা নেওয়া হোক প্রতিবেদনগুলো সংসদে যেতে হবে৷ কিন্তু সংসদে কোনো প্রতিবেদন যাচ্ছে বলে আমরা জানি না৷ এটা নিয়ে কোনো পর্যালোচনাও আমরা শুনিনি৷

এসডব্লিউ/ডিআর/কেএইচ/১৩০১ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগীতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগীতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগীতার অনুরোধ জানাচ্ছি।

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ