Trial Run

বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার সুনিশ্চিতে কাজ করছেন বাইডেন, বাংলাদেশ এর বাইরে নয়

মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির যে দীর্ঘদিনের অবস্থান ভারতের চোখে বাংলাদেশকে দেখা, তার পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে

বিশেষ প্রতিনিধি :  প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈশ্বিক দায়বদ্ধতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন অনেকটাই। বেশ কিছু ইস্যুতেই তখন চুপ ছিল হোয়াইট হাউস। তবে বাইডেন তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও বৈশ্বিক অঙ্গনে দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ববোধ পালনে নেতৃত্ব দেওয়ার অবস্থানে ফিরিয়ে আনছেন। গত ২০ জানুয়ারি ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রায় দেড় মাসে যুক্তরাষ্ট্রকে বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার, গণতন্ত্রসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সরব দেখা যাচ্ছে। 

রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অংশ হিসেবে হোয়াইট হাউসসহ সর্বত্র নিয়মিত সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা আবারও চালু করবেন বলে নির্বাচনী প্রচারে কথা দিয়েছিলেন জো বাইডেন। মিয়ানমারে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন বা চীন, রাশিয়ায় বিরোধী ও ভিন্নমতাবলম্বী, সংখ্যালঘু দমন-পীড়নের অভিযোগ নিয়ে প্রতিক্রিয়াই শুধু নয়, বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কারাবন্দি লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু নিয়ে রাষ্ট্রদূতদের বিবৃতিও এখন প্রচার করেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তন

চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার সাড়ে তিন মাস পর ফের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে যুক্ত হল যুক্তরাষ্ট্র। জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রথম দিনই এ সংক্রান্ত একটি আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন। তার ওই পদক্ষেপের ঠিক ৩০ দিন পর শুক্রবার দেশটির আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে ফেরা কার্যকর হল।

ক্ষমতায় এসে ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন। অবশ্য তার ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় গত বছরের নভেম্বর থেকে। ট্রাম্প প্যারিস চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘অন্যায্য’ চুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তার ভাষ্য ছিল, চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, লাভবান হবে চীন-ভারত।

২০৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে কার্বন নিরপেক্ষ দেশে পরিণত করার পথ প্রস্তুতে প্রতিশ্রুতি আছে বাইডেনের। 

খাশোগি ইস্যুতে বাইডেনের অবস্থান

জামাল খাশোগিকে গ্রেপ্তার বা হত্যার অভিযানে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের অনুমোদন ছিল বলে দাবি করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা।

ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে এই ষড়যন্ত্রের দায় অন্যদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধে যেয়ে মানবাধিকার গোষ্ঠীসহ অনেকগুলো সংস্থা বাইডেনকে সৌদি যুবরাজের বিরুদ্ধে অন্তত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য চাপ দিচ্ছিল।

বাইডেন প্রশাসন জানিয়েছেন, ব্যবহারিক বিষয় হিসাবে যুবরাজ মোহাম্মদকে শীঘ্রই যুক্তরাষ্ট্রে আমন্ত্রণ জানানো হবে না। তবে তারা অস্বীকার করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে কোন ছাড় দিচ্ছে না।

ইতিমধ্যে সাংবাদিক জামাল খাশোগজি হত্যাকাণ্ডে জড়িতসহ বিদেশে নির্বাসিতদের হুমকিদাতা হিসাবে চিহ্নিত সৌদি আরবের ৭৬ জনের ওপর ইতোমধ্যে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সেক্রেটারি অফ স্টেট অফ অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন সৌদি আরবের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান, যিনি খাশোগি অভিযানে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন এবং যুবরাজকে সুরক্ষা দানকারী সৌদি রয়্যাল গার্ডের একটি ইউনিট।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আরব মিত্রের সাথে সম্পর্ক লঙ্ঘন না করে তার ক্ষমতার উত্তরাধিকারীকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা বা তার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক অভিযোগ তোলা থেকে বাইডেনকে বিরত থাকতে হবে।

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান  

বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বহির্বিশ্বে দৃশ্যত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান। গত ১০ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউস থেকে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকারীদের এভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ‘বার্মা’ বদলে সামরিক জান্তার দেওয়া নাম ‘মিয়ানমার’ উচ্চারণ করছে না বাইডেনের যুক্তরাষ্ট্র। 

গত ১ ফেব্রুয়ারি ভোরে মিয়ানমারে যখন নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছিল তখন তার নিন্দা জানাতে হোয়াইট হাউস এক ঘণ্টা সময়ও নেয়নি। 

জো বাইডেন নিজেও আলাদাভাবে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছিলেন, নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও নিষেধাজ্ঞা জারি করবে। বাইডেনের সেই হুঁশিয়ারির কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

শিথিল হতে পারে ফিলিস্তিনের উপর ইসরায়েলের দখলদারিত্ব

জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় ফিলিস্তিনের নেতারা আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ফেরার বিষয়ে আগ্রহী হয়েছেন। সম্ভাব্য সেই আলোচনার প্রধান বিষয় হবে ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি নির্মাণ বন্ধ করা।

ইসরায়েলের প্রতি নির্লজ্জ পক্ষপাতের কারণে বছর তিনেক আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সব ধরনের সমঝোতা আলোচনা বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। 

উল্লেখ্য, ট্রাম্পের ইহুদি বংশোদ্ভূত জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রিডম্যান ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অবৈধ বসতি নির্মাণকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে আসছেন।

ট্রাম্পের শান্তিপ্রক্রিয়া ইসরায়েলকে যা ইচ্ছা তাই করার ছাড়পত্র দিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ফিলিস্তিনকে একচুলও ছাড় দেওয়া হয়নি। যদিও ট্রাম্পের কাছে নতিস্বীকার না করে আব্বাস যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত করে দেন। 

ইসরায়েল ফিলিস্তিনের মধ্যে ঢুকে নজিরবিহীনভাবে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ভেঙে সাফ করে ফেলছে। সেসব জায়গায় ইহুদি বসতি স্থাপন করা হবে। অথচ চার বছর আগে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ২৩৩৪ নম্বরের যে প্রস্তাব পাস হয়, সে প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েলের দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের কোনো ধরনের ভবন ভাঙা কিংবা নির্মাণ সম্পূর্ণ অবৈধ। অথচ ইসরায়েল সেই অবৈধ কাজ করেই যাচ্ছে। আর ট্রাম্প প্রশাসন তাতে সায় দিয়েই যাচ্ছে।

বাইডেন নির্বাচিত হওয়ায় ফিলিস্তিনিরা একটু আশার আলো দেখছে। ইসরায়েলের অবৈধ বসতি গড়ার বিরুদ্ধে পাস হওয়া ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাব বারাক ওবামার সময় পাস হয়েছিল, কারণ তার প্রশাসন সে সময় এই প্রস্তাবে ভেটো দেয়নি। এ প্রস্তাব যখন পাস হয়, তখন ওবামার জাতীয় প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ছিলেন সুসান রাইস। বাইডেনের নতুন সরকারের সম্ভাব্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সংক্ষিপ্ত তালিকায় রাইসের নাম আছে।

বাইডেন নিজে ওবামার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং ২০১৪ সালে তিনি নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন, ‘আপনি যেসব বাজে কথা বলেন, তার সঙ্গে আমি একমত নই।’

এ ছাড়া বাইডেনের চিফ অব স্টাফ হিসেবে যিনি আসছেন, সেই রন কেলিনও ইসরায়েলের বসতি নির্মাণের বিরোধিতা করে আসছেন।

বাইডেন বিজয়ী হওয়ার পর আব্বাস তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, তার জয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিস্তিনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে।

ইয়েমেনে যুদ্ধের অবসান চান বাইডেন

প্রেসিডেন্ট হিসাবে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে বাইডেনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে বাইডেন বলেন, ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের মিত্রদের কাছে অস্ত্র বিক্রিসহ সকল সমর্থন প্রত্যাহার করেছেন তিনি

তিনি ইয়েমেনে ভয়ঙ্কর যুদ্ধে সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার এবং নাটকীয়ভাবে শরণার্থীদের প্রতি সমর্থন জোরদার করেছেন। বাইডেন ইয়েমেনে বিশেষ দূত হিসেবে টিমুথি লেনডারকিংকে নিয়োগ দিয়েছেন। 

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, এই দূত জাতিসংঘের যুদ্ধ বিরতি প্রচেষ্টা এবং সরকার ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে শান্তি আলোচনায় সহায়তা করবে। হুতিরা রাজধানী সানাসহ দেশটির বেশীরভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।

যুদ্ধের অবর্ণনীয় দুর্দশায় থাকা ইয়েমেনের জনগণের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করবে। 

ইয়েমেনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, “এই যুদ্ধের অবসান করতে হবে।”

জো বাইডেনের নীতিতে বাংলাদেশ

শপথ নেয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনেক নীতিই উল্টে দিচ্ছেন তিনি৷ প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফিরে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র৷ আর এতে লাভবান হবে বাংলাদেশ৷ কারণ বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি৷ 

এদিকে, রোহিঙ্গারা গণহত্যার শিকার হয়েছেন কিনা তা আবারও খতিয়ে দেখতে চান তারা৷ আর এটা  মিয়ানমারকে চাপে ফেলবে৷ যা বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সুবিধাজনক অবস্থায় নিয়ে যাবে৷

রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানে বাংলাদেশের সামনে বড় একটি সুযোগ আসতে পারে৷ কারণ নতুন মার্কিন প্রশাসন মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা গণহত্যার শিকার হয়েছেন কিনা তা নতুন করে দেখবে৷ আগে তারা এটা দেখতে চায়নি৷ 

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন মনে করেন, ‘‘এটাকে বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারবে৷ আর সার্বিকভাবে মানবাধিকারকে নতুন প্রশাসন গুরুত্ব দিচ্ছে৷ এটাও মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াবে৷”

এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল(অব.) শহীদুল হক বলেছেন, মিয়ানমারের ব্যাপারে নতুন মার্কিন প্রশাসন ঠিক কতদূর যাবে তা এখনো নিশ্চিত না হলেও এই জায়গায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা দরকার৷ যদি আমেরিকার ট্রেজারি মিয়ানমারের ওপর অবরোধ আরোপ করে সেটা হবে তাদের জন্য ভয়াবহ৷ যা বাংলাদেশের সঙ্গে বসে তাদের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাধ্য করতে পারে৷

অভিবাসন নীতির কারণে এবার অনেক বাংলাদেশি যারা সেখানে রয়েছেন তাদের সুবিধা হবে৷ শিক্ষা ভিসা বাড়বে৷ আর বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্যেও সুবিধা হবে৷ আগামী এক দেড়-বছর চীনের সাথে আমেরিকার ব্যবসা বাণিজ্যে দূরত্ব থাকছে৷ তা থাকলে বাংলাদেশ ঠিকমত এগোতে পারলে এর সুবিধা পাবে৷

তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘‘মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির যে দীর্ঘদিনের অবস্থান ভারতের চোখে বাংলাদেশকে দেখা, তার পরিবর্তন এরইমধ্যে হয়েছে৷ এটা অব্যাহত থাকবে বলেই মনে হচ্ছে৷ বাংলাদেশের বাজার এবং ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরো বাড়বে৷ তবে সেটা কতটা বাড়বে তা নির্ভর করবে চীন নীতির ওপর৷” 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ নানা দিক দিয়ে সুবিধা পেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার এই পালাবদলের কারণ। যদিও এটি বহুলাংশে নির্ভর করছে সুবিধা আদায় করতে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে কতটা তৎপরতা তার উপর৷

এ প্রসঙ্গে, সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) শহীদুল হক বলেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ আলাদা গুরুত্ব পাবে৷ আমরা এবার আশা করতে পারি বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে না৷ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য যে পরিমান বিনিয়োগ করেছেন আর বাইডেনকে যতটা উপেক্ষা করেছেন তার একটা ফল হয়তো আমরা দেখতে পাব৷ ভারতে এখন এমন অনেক ইস্যু এখন আছে যা ডেমোক্র্যাটদের পছন্দ না৷ আর এর সুবিধা পাবে বাংলাদেশ৷

এদিকে, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি জো বাইডেনের বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কতটা উপযুক্ত ক্ষেত্র, তা নিয়ে অস্বস্তির ভাঁজ সরকারের কপালে দেখতে পাওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। নির্বাচনে প্রকাশ্য কারচুপি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় মানুষের মত প্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়া, ক্ষমতাসীনদের দেশব্যাপী দৌরাত্ম্য, বিরোধী দলের কোণঠাসা অবস্থা জানান দেয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে সুবিধা নেয়ার জন্য খুব একটা প্রস্তুত নয় বাংলাদেশ।

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রহমান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা নিয়ে অতীতের মতো কাজ করবে বলে মনে হয়৷ হয়তো একটু বেশিই করবে৷ তবে সেটা কখনো হস্তক্ষেপের পর্যায়ে যাবে না৷ বাংলাদেশের গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা নিয়ে অতীতেও কথা হয়েছে৷ ভবিষ্যতেও হবে৷ তবে সেটা মন্তব্য বা প্রতিবেদনের পর্যায়েই থাকবে৷ অর্থাৎ অনেকটা কেতাবি৷ তাদের বিভিন্ন কমিটি রয়েছে৷ তারা প্রতিবেদন দেয়৷ আমার মনে হয় সেভাবেই চলবে৷

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। গত মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহীর নাইস কনভেনশন সেন্টারের সামনে এক সমাবেশে চলতি বছরেই বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়ার দাবি জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা। এ সময় তারা সরকার পতনে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানান।

পাশাপাশি বিএনপি দাবি করছে, তারা তাদের প্রাপ্য রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা অভিযোগ জানিয়েছে, যেখানেই তাদের সমাবেশ, সেখানেই পরিবহন বন্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে। সূত্র মতে, রাজশাহীতে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের আগে জেলা থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বাস মালিক বিবিসির সংবাদদাতাকে জানিয়েছেন, সোমবার রাতে রাজশাহীর পুলিশ বাস মালিকদের ডেকে বাস পরিবহন বন্ধ রাখার নির্দেশ নিয়েছে।

বিএনপির নেতারা অভিযোগ করছেন, তাদের সমাবেশ বানচাল করার উদ্দেশ্যেই যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

দেশের রাজনৈতিক এই অস্থিতিশীলতার সাথে গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো সরকারের কাঁধে চেপে বসেছে লেখক মুসতাক আহমেদের কারাগারে মৃত্যু। রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ডিজিটাল আইনে গ্রেফতার লেখক মুসতাক আহমেদ কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মারা যান। গত বছরের মে মাস থেকে কারাবন্দী ছিলেন মুসতাক। র‌্যাবের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেফতার হন তিনি। মুসতাকের মৃত্যুকে ঘিরে দেশ জুড়ে বিক্ষোভে সমাবেশ করে শিক্ষার্থীরা। তাদের সমর্থন জানায় সাধারণ মানুষ।

এমন পরিস্থিতিতে বাইডেনের কার্যক্রম সরকারের জন্য একপ্রকার সতর্কতাই। গণতন্ত্রের নামে স্বেচ্ছাচারিতা এবং ক্ষমতাসীনদের একক রাজত্বের গলায় খড়গ হয়ে নেমে আসতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। যা মোটেও কাম্য হবে না সরকারের। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর জন্য এটা অনেকটা মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো। বাইডেনের এই গণতন্ত্রের পিঠ চাপড়ে দেয়াটা একপ্রকার তাদেরকে সাহস জোগানোই। আর এজন্যই সম্ভবত দীর্ঘদিন পর বিএনপিকে রাজনৈতিক অঙ্গণে সরব দেখা যাচ্ছে। তাই বাইডেনের ভবিষ্যৎ কর্মযজ্ঞ পাল্টে দিতে পারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতামত

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রকাশনা ফরেন পলিসির এডিটর অ্যাট লার্জ জনাথন টেপারম্যান বলেছেন, প্রেসিডেন্ট বাইডেনের প্রথম পাঁচ সপ্তাহ আর ট্রাম্পের প্রথম পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ফিরেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের কাজ শুরু করেন। মিয়ানমারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তিনি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্বে কভিড মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র কোভ্যাক্সকে ৪০০ কোটি ডলার তহবিল দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন  পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেন বাইডেন প্রশাসনের নীতি অনুসরণ করে মিয়ানমারে গণতন্ত্র ফেরাতে এবং চাপ সৃষ্টির জন্য অন্য দেশগুলোকে উৎসাহিত করছেন। এর ফলে আরো অনেক দেশ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং আরো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে। মিয়ানমার ইস্যুতে বাইডেন প্রশাসনের জোরালো প্রচেষ্টায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একটি যৌথ বিবৃতি দিতে সক্ষম হয়েছে।

তুরস্কের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক বুরহানেটিন ডুরান তার ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্য জো বাইডেন অ্যাফেক্ট’ নিবন্ধে লিখেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশে পটপরিবর্তনের সুস্পষ্ট প্রভাব বিশ্বে পড়তে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকাই প্রথম’ নীতি বিশ্বে বিশৃঙ্খলা এবং ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল। কোনো সন্দেহ নেই যে বাইডেনের ‘আমেরিকা ফিরে এসেছে’ নীতি এবং বিশ্বের গণতন্ত্রগুলোর সঙ্গে তার জোট করার পরিকল্পনার প্রভাব কী হতে পারে তা বিশ্বের সরকারগুলো সঠিকভাবে ধারণা করতে চাইবে। তার মন্ত্রিসভায় যারা স্থান পেয়েছেন তারা দেশে ও বিদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও স্বাধীনতা ইস্যুতে অনেক সরব থাকবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট ও উপপরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বে গণতন্ত্র ও যথার্থতার বিষয়ে যথেষ্ট দৃষ্টি দেননি। অনেক ক্ষেত্রে তিনি নির্দ্বিধায় একনায়কদের সঙ্গে সখ্য গড়েছিলেন। বাইডেন আগেই বলেছেন, এ ক্ষেত্রে তার অবস্থান ট্রাম্পের চেয়ে অনেক আলাদা হবে। গণতন্ত্রকে উৎসাহিত করাই হবে তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন বিশ্বে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ইস্যুতে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখাচ্ছেন। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নের অভিযোগে বাইডেন প্রশাসন রাশিয়ার বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। মানবাধিকার ইস্যুতে চীন, সৌদি আরবকে সতর্ক করেছে। সৌদি আরবের উদ্বেগ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র তার ঘোষিত সন্ত্রাসী তালিকা থেকে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বাদ দিয়েছে। বাইডেন দুই রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ফিলিস্তিনিদের জন্য ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে। 

এসডব্লিউ/১৭৫৫ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 265
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    265
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ