Trial Run

ছাত্রদল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, সারা দেশে প্রতিবাদ সমাবেশ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় কারাবন্দী অবস্থায় লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর প্রতিবাদ ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গতকাল রোববার(২৮ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের বিক্ষোভ-সমাবেশের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, সংঘর্ষের ঘটনায় সমাবেশ শেষে পণ্ড হয়ে যায়। আর এ ঘটনায় গতকাল রোববার গভীর রাতে পুলিশ বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় এজাহার নামীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের ৪৭ নেতাকর্মী ও অজ্ঞাতনামা ২০০-২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এদিকে  ছাত্রদলের সমাবেশে ‘পুলিশি হামলা’র প্রতিবাদে একদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি। আজ সোমবার(০১ মার্চ) সারা দেশের জেলা, মহানগর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিটে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় কারাবন্দী অবস্থায় লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ছাত্রদল গতকাল রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ-সমাবেশ ডেকেছিল। তবে পুলিশের লাঠিপেটা, টিয়ার শেল, গুলি, সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় সেই কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত পণ্ড হয়ে যায়।

পূর্বঘোষণা অনুযায়ী রোববার সকাল ১০টার দিকে ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জাতীয় প্রেসক্লাব ও তার আশপাশের এলাকায় জড়ো হতে থাকেন। সকাল ১১টার পর নেতাকর্মীদের একটি অংশ প্রেসক্লাবের ভেতর থেকে বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করে। তাদের বাধা দেয় পুলিশ। একপর্যায়ে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী বেরিয়ে সড়কে বসে পড়েন। এ সময় পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করে তুলে দেয়। তারপরই এলাকায় উপস্থিত ছাত্রদল ও বিএনপির নেতাকর্মীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।

শুরু হয় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ করে ইটপাটকেল ছোড়েন। আশপাশে ভাঙচুরও করেন। তাদের ধাওয়া করে পুলিশ। যাকে সামনে পায়, তাকে লাঠিপেটা করে। বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ফাঁকা গুলি ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশের ধাওয়ার মুখে বিএনপি-ছাত্রদলের কিছু নেতা-কর্মী জাতীয় প্রেসক্লাবের ভেতরে ঢুকে পড়েন। সেখানে ঢুকে নেতা-কর্মীদের লাঠিপেটা করে পুলিশ। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে কিছু কর্মী বিএমএ ভবনের কোনায় অবস্থান নেন। তারা সেখান থেকে স্লোগান দিতে থাকেন।

পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছাত্রদল-বিএনপির নেতাকর্মী, পুলিশ ও সাংবাদিক রয়েছেন।

আহত নেতা-কর্মীদের মধ্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মামুন খান, ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক করিম প্রধান ও ইডেন কলেজের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক জান্নাত জাহান রয়েছেন।

পুলিশের ভাষ্য, সমাবেশ করার জন্য ছাত্রদল কোনো অনুমতি নেয়নি। উল্টো ছাত্রদলের কয়েক নেতা-কর্মী সড়কে নেমে পুলিশের ওপর হামলা করেছে। এ ঘটনায় পুলিশের সাত থেকে আটজন সদস্য আহত হয়েছেন। ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

গত রাতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ফজলুর রহমান বলেন, এই ঘটনায় সংগঠনের শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। সংগঠনের বেশ কিছু নেতা-কর্মীকে পুলিশ আটক করছে বলে তারা খবর পেয়েছেন।

ছাত্রদল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা

ছাত্রদলের সমাবেশ ঘিরে পুলিশ ও নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। রোববার গভীর রাতে পুলিশ বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় এ মামলাটি করেন। মামলায় এজাহার নামীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের ৪৭ নেতাকর্মী ও অজ্ঞাতনামা ২০০-২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।  এখন পর্যন্ত সংঘর্ষের ঘটনায় ১২ জনকে গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে (পুলিশ অ্যাসল্ট) হত্যাচেষ্টা ও হামলা-ভাঙচুর চালানো। আজ সোমবার সকালে শাহবাগ থানার ওসি মোহাম্মদ মামুন অর রশীদ গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, গ্রেফতার আসামিদের আদালতে উপস্থাপন করা হবে। গতকালের সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছে। সংঘর্ষের সময় প্রেসক্লাবসংলগ্ন অস্থায়ী পুলিশ বক্সের জানালা ভাঙচুরসহ পুলিশের ওপর হামলা চালায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

মামলায় বাকি আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে বলেও জানান তিনি।

ছাত্রদল নেতাকর্মীদের রিমান্ড

এদিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় করা মামলায় ছাত্রদলের ১৩ নেতাকর্মীকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। আজ সোমবার ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর হাকিম মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান নূরের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

সোমবার বিকালে আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হেমায়েত উদ্দিন খান হিরন গণমাধ্যমকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছিল। আদালত ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ডে যাওয়া নেতাকর্মীরা হলেন মঞ্জুরুল আলম, আতাউর রহমান, মাসুদ রানা, শফিকুল ইসলাম, শাহিরাজ, আহসান হাবিব ভূইয়া রাজু, কবির হোসেন, মনোয়ার ইসলাম, আরিফুল হক, আনিছুর রহমান খন্দকার অনিক, আবু হায়াত মো. জুলফিকার, আতিফ মোর্শেদ ও রমজান।

এর আগে গ্রেফতারকৃত আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই মো. আব্দুল্লাহ প্রত্যেক আসামির ১০ দিন করে রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। অন্যদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল ও জামিন চেয়ে আবেদন করেন। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষ রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত প্রত্যেকের পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

 সারা দেশে ছাত্রদলের প্রতিবাদ সমাবেশ

কারাবন্দি অবস্থায় লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আয়োজিত ছাত্রদলের সমাবেশে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে একদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি। আজ সোমবার (১ মার্চ) সারা দেশের জেলা, মহানগর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিটে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করবেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

এতে বলা হয়, বিদ্যমান অবৈধ অগণতান্ত্রিক সরকারের গাত্রদাহ প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত করার আরও একটি কলঙ্কজনক উদাহরণ কারাবন্দি লেখক মুশতাককে হত্যা। এই বর্বর হত্যার প্রতিবাদে ছাত্রদল আহূত বিক্ষোভ সমাবেশে পুলিশ বাহিনীর নগ্ন হামলার প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

ঢাবি শাখা ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল

এরই প্রেক্ষিতে কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু ও ছাত্রদলের বিক্ষোভ সমাবেশে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল।

টিএসসির সামনে থেকে আজ দুপুর বেলা আড়াইটায় শুরু হওয়া বিক্ষোভ মিছিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের ১৫ থেকে ২০ জন নেতা-কর্মী অংশ নেন। কর্মসূচির ব্যানারে লেখা ছিল, ‘কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের হত্যার প্রতিবাদে ছাত্রদলের ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশে বাকশালি পুলিশের নগ্ন হামলার প্রতিবাদে ও টিএসসি থেকে নজিরবিহীন সীমালঙ্ঘন করে তিন নেতা-কর্মীকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল’।

মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল ও রাজু ভাস্কর্যের সামনে দিয়ে জনতা ব্যাংকের এটিএম বুথের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে তারা সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন।

ছাত্রদলের এই কর্মসূচিতে অন্যদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতা সোহেল রানা, মানসুরা আলম, মিনহাজ আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন৷

সমাবেশে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্যসচিব আমানউল্লাহ আমান বলেন, শিক্ষার্থীদের টিএসসি থেকে তুলে নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হাতে চুড়ি পরেছে। এই ধরনের দালালি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলবে না।

জাবি শাখা ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল

এছাড়াও ছাত্রদলের বিক্ষোভে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। সোমবার সকাল ১০টার দিকে শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম সৈকতের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক সংলগ্ন ঢাকা আরিচা মহাসড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা।

মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম সৈকত বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে কালো আইনের মাধ্যমে সরকার তাদের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়। কেউ যেন এই মাফিয়া সরকারের নানা দুর্নীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে না পারে, সেই জন্যই এই অবৈধ সরকার ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট তৈরি করে মানুষের মুখ বন্ধ রাখতে চায়। মানুষের মুখ আর বেশিদিন বন্ধ রাখা যাবে না। মানুষ শীঘ্রই এসব অন্যায়-অত্যাচারের সমুচিত জবাব দেবে।’

জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ছাত্রদলের মিছিলে পুলিশি হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে এই ছাত্রদল নেতা বলেন, ‘হামলা-মামলা দিয়ে আন্দোলন দমন করা যাবে না। ছাত্রদল রাজপথে আছে, রাজপথে থাকবে। ছাত্রদল বাংলাদেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এই সরকারের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে ছাড়বে।’ এ সময় তিনি আটক ছাত্রদল নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি করেন।

শাখা ছাত্রদলের এই বিক্ষোভ মিছিলে আরও উপস্থিত ছিলেন জাবি শাখা ছাত্রদলের নেতা সাইফুল ইসলাম সাগর, সেলিম রেজা,  আব্দুল কাদের মার্জুক, রাকিবুল হাসান শুভ, ইকবাল হোসাইন, জুয়েল আহম্মেদ তালুকদার, ইব্রাহিম খলীল আপনসহ আরও অনেকে।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/২১২৬ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 14
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    14
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ