বাংলাদেশের বর্ষাকাল নতুন কিছু নয়, কিন্তু এ বছরের জুলাই যেন প্রকৃতির এক ভিন্ন রূপ দেখাচ্ছে। টানা ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, পাহাড়ধস, নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি এবং একের পর এক বাঁধ ভেঙে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ থেকে শুরু করে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা পর্যন্ত একই চিত্র—পানিবন্দী মানুষ, ভেঙে পড়া যোগাযোগব্যবস্থা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি, ডুবে যাওয়া ঘরবাড়ি এবং অনিশ্চয়তায় ঘেরা লাখো মানুষের জীবন। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মৌসুমি বায়ু অত্যন্ত সক্রিয় থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমন চরম আবহাওয়ার ঘটনা এখন আরও ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা।
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রামে কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বর্ষণে শহরের বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়েছে, অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া ও বোয়ালখালীর মতো উপজেলাগুলোতে বন্যার পানি ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়েছে। কোথাও কোথাও সরকারি অফিস, হাসপাতাল, আদালত এবং থানা পর্যন্ত পানির নিচে চলে গেছে। এসব এলাকার মানুষ শুধু নিজেদের ঘরবাড়ি নয়, গবাদিপশু, খাদ্যশস্য এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
কক্সবাজারের পরিস্থিতিও কম ভয়াবহ নয়। চকরিয়া, পেকুয়া এবং মাতামুহুরী উপজেলায় পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণের ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কয়েক দিন ধরে পানিবন্দী লাখো মানুষের জীবনযাত্রা কার্যত থমকে গেছে। বহু পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে উঠলেও এখনও অসংখ্য মানুষ নিজেদের বাড়িতেই আটকা পড়ে আছেন। শিশুদের মৃত্যু এই দুর্যোগকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে। বন্যার পানিতে ডুবে ছোট ছোট শিশুদের প্রাণহানির ঘটনা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রতিটি পরিবার ও সমাজের জন্য গভীর বেদনার প্রতীক। একই সঙ্গে নৌকাডুবির মতো দুর্ঘটনায় আরও প্রাণহানির ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিস্থিতি আরও জটিল। পাহাড়ধস, সড়ক বিচ্ছিন্নতা এবং প্রবল স্রোতের কারণে বহু এলাকা বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়েছে। দুর্গম অঞ্চলে আটকে পড়া মানুষ এবং পর্যটকদের উদ্ধার করতে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনী কাজ করছে। ভূমিধসের ঝুঁকিতে থাকা শত শত পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধসে যাওয়া সড়ক পরিষ্কার করা হচ্ছে, যাতে জরুরি ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। এসব কার্যক্রম প্রমাণ করে যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ কতটা জরুরি।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও উদ্বেগ বাড়ছে। ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কুশিয়ারা, মনু, খোয়াইসহ একাধিক নদী বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আরও কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফলে নতুন করে বন্যা বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মৌলভীবাজারের রাজনগরে বাঁধ ভেঙে বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানির স্রোতে প্রাণ হারিয়েছেন এক বৃদ্ধ। হবিগঞ্জে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় হাজার হাজার পরিবার রাতারাতি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে বাধ্য হয়েছে। অনেকেই নিজেদের ঘরে তালা লাগানোরও সুযোগ পাননি।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলেও উদ্বেগ বাড়ছে। কয়েক দিনের টানা বর্ষণ এবং উজানের ঢলে হাওর ও নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পরিস্থিতির ওপর নজর রাখলেও মানুষ আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। কারণ, হাওর অঞ্চলে একবার পানি ঢুকে গেলে তা দ্রুত নেমে যেতে সময় লাগে, ফলে কৃষি, মৎস্য এবং স্থানীয় অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়ে।
এবারের বন্যা শুধু মানুষের ঘরবাড়িই নয়, শিক্ষা কার্যক্রমেও বড় প্রভাব ফেলেছে। বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন কয়েকটি জেলার এইচএসসি, কারিগরি ও মাদরাসা বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। হাজার হাজার পরীক্ষার্থী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। দুর্যোগের সময় শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়া শুধু সাময়িক সমস্যা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাগত ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কৃষিখাতও বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। নিম্নাঞ্চলের ধানক্ষেত, সবজিখেত, মাছের ঘের এবং গবাদিপশুর খামার পানির নিচে চলে গেছে। কৃষকরা বছরের পর বছর যে শ্রম দিয়ে ফসল উৎপাদন করেন, কয়েক দিনের বন্যায় তা মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে শুধু কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, ভবিষ্যতে খাদ্য সরবরাহ এবং বাজারমূল্যের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যা-পরবর্তী সময়ে কৃষকদের দ্রুত সহায়তা না দিলে গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়বে।
দুর্যোগের সময় সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে ওঠে বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ খাদ্য এবং স্বাস্থ্যসেবা। দীর্ঘ সময় পানিবন্দী থাকলে ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগ এবং সাপের কামড়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়। শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই শুধু ত্রাণ বিতরণ নয়, জরুরি চিকিৎসাসেবা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রমও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং স্থানীয় জনগণ একযোগে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষকে নিরাপদে স্থানান্তর, শুকনো খাবার বিতরণ, চিকিৎসাসেবা এবং দুর্গম এলাকায় নৌকার মাধ্যমে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এত বেশি যে অনেক জায়গায় এখনও পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। দুর্গম এলাকা, ভাঙা সড়ক এবং প্রবল স্রোত ত্রাণ কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযান দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। নদী ব্যবস্থাপনা, কার্যকর বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, জলাধার সংরক্ষণ, পাহাড়ে অবৈধভাবে গাছ কাটা ও বসতি স্থাপন বন্ধ, উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনায় পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে প্রতি বর্ষাতেই শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
প্রকৃতির এই কঠিন পরীক্ষায় সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা। কোথাও স্থানীয় যুবকেরা নৌকা নিয়ে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করছেন, কোথাও স্বেচ্ছাসেবীরা নিজেদের উদ্যোগে খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ত্রাণ সংগ্রহ ও সমন্বয়ের নানা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। এই মানবিক সংহতি প্রমাণ করে, দুর্যোগ যত বড়ই হোক, সম্মিলিত প্রচেষ্টা মানুষের আশা বাঁচিয়ে রাখে।
বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বন্যাপ্রবণ দেশ। তাই বন্যা পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, সময়োপযোগী অবকাঠামো, কার্যকর পূর্বাভাস এবং সচেতন জনগণের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে। এবারের বন্যা শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগ নয়; এটি আমাদের জলবায়ু বাস্তবতা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাকে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগও তৈরি করেছে। সামনে আরও বৃষ্টি ও উজানের ঢলের আশঙ্কা থাকায় এখন প্রয়োজন সর্বোচ্চ সতর্কতা, দ্রুত ত্রাণ সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি। কারণ বন্যার পানি একসময় নেমে যাবে, কিন্তু এর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে অনেক বেশি।
আপনার মতামত জানানঃ