বাংলাদেশের যমুনা নদীর বুকে জেগে ওঠা অস্থির বালুচরগুলোতে জীবন চলে প্রান্তে দাঁড়িয়ে—ভৌগোলিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে এবং সামাজিকভাবে। বর্ষার ছন্দে জেগে ওঠে আবার হারিয়েও যায় এই নদীদ্বীপগুলো। একই জীবনে বহুবার গড়ে ওঠে, ভেঙে পড়ে, আবার গড়ে ওঠে জনপদ। যারা এখানে বাস করেন, তাদের কাছে অস্থিরতা কোনো ব্যতিক্রম নয়; বরং জীবনের এক স্বাভাবিক শর্ত। কিন্তু বন্যা, নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতির দৃশ্যমান সংকটের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও গভীর এক বাস্তবতা—নারীর প্রতি সহিংসতা, যা প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
২০১৯ সালের মে মাসে পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ বিকাশ ফাউন্ডেশন বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের বাস্তুচ্যুতি-প্রভাবিত চরাঞ্চলে একটি মিশ্র পদ্ধতির গবেষণা পরিচালনা করে। ২০১৯ সালের বন্যার পর স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা, বাস্তুচ্যুতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণই ছিল এই গবেষণার লক্ষ্য। মোট ১৩টি গ্রামের ৪৩৩টি পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, যার মধ্যে ৩৫৬ জন নারী ও ৭৭ জন পুরুষ। পাশাপাশি নেওয়া হয় ২৬টি গভীর সাক্ষাৎকার। গবেষণার মূল ফোকাস ছিল নারীদের জীবন, যদিও পুরুষদের অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় আনা হয়। পরবর্তীতে কয়েকজন চরবাসী নারীকে ‘বাস্তুচ্যুতি বর্ণনাকারী’ হিসেবে যুক্ত করে টানা দুই বছর ধরে তাদের জীবনের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে—পরিবেশগত সংকটের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। বন্যা, নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতি পুরো পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও নারীরা পড়েন দ্বিমুখী চাপে। একদিকে সংসার টিকিয়ে রাখার অতিরিক্ত দায়িত্ব, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে বাড়তে থাকে সহিংসতার ঝুঁকি। বাস্তুচ্যুতির সময় নতুন পরিবেশ, অস্থায়ী আশ্রয় কিংবা যাতায়াতের পথেও নারী ও কিশোরীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অনেক পরিবার তাই মেয়েদের নিরাপত্তার কথা ভেবে দূরের আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—চরের নারীদের জীবনে সহিংসতা শুধু বিস্তৃত নয়, বরং তা অনেকাংশেই স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সহিংসতাকে ব্যতিক্রম হিসেবে নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা। বাংলাদেশে নারী অধিকার ও সমতার প্রশ্নে নতুন আলোচনা চললেও চরাঞ্চলের এই নীরব সংকট এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
চরের ভূগোলই এই বাস্তবতা বোঝার প্রথম সূত্র। ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও মেঘনা নদীব্যবস্থার পলি জমে সৃষ্টি হওয়া চরগুলো যেমন উর্বর, তেমনি অত্যন্ত অস্থির। প্রতি বর্ষায় বন্যা নতুন পলি এনে কৃষিকে সমৃদ্ধ করে, আবার একই সঙ্গে মুহূর্তেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু ও জীবিকা। দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন অবস্থানের কারণে গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য পালিয়ে যাওয়া বা সহায়তা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। বাস্তুচ্যুতির পুনরাবৃত্তি এই অনিশ্চয়তাকে আরও তীব্র করে তোলে। অনেক পরিবার জীবনে দশবারেরও বেশি স্থান পরিবর্তন করেছে। ফলে নিরাপত্তাহীনতা তাদের জীবনের স্থায়ী সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থনৈতিক দুর্বলতা এই সংকটকে আরও গভীর করে। অধিকাংশ পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে ক্ষুদ্র কৃষিকাজ কিংবা অনিয়মিত দিনমজুরির ওপর নির্ভর করে। মঙ্গা মৌসুমে মাসের পর মাস আয়ের উৎস বন্ধ থাকে। এমন বাস্তবতায় সামান্য একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগও পুরো পরিবারকে চরম সংকটে ঠেলে দেয়। এই দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটেই নারীর প্রতি সহিংসতার প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব।
গবেষণায় নারী ও পুরুষের সহিংসতা সম্পর্কে ধারণার মধ্যে বিস্ময়কর পার্থক্য দেখা যায়। নারীরা শারীরিক, মানসিক ও যৌন—সব ধরনের নির্যাতনকে সহিংসতা হিসেবে চিহ্নিত করলেও অধিকাংশ পুরুষের ধারণা ছিল অনেক সীমিত। প্রায় সব নারী দাম্পত্য ধর্ষণ ও যৌন হয়রানিকে সহিংসতা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও ৯০ শতাংশেরও বেশি পুরুষ এগুলোকে সহিংসতা বলে মনে করেননি। এই মানসিকতার পেছনে রয়েছে গভীরভাবে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো, যেখানে পুরুষের কর্তৃত্বকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
২০১৯ সালের বন্যার অভিজ্ঞতা এই সংকটকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। নয়াপাড়া, কড়মজাপাড়া, ধানেরপাড়া, শিমুলবাড়ি ও চক রথীনাথ গ্রামের শত শত পরিবারকে অন্য এলাকায় আশ্রয় নিতে হয়। বন্যায় ফসল ও জমি হারিয়ে দেখা দেয় তীব্র খাদ্যসংকট। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়, গবাদিপশু বিক্রি করতে বাধ্য হয় অনেক পরিবার। কিন্তু ক্রেতার অভাবে ন্যায্য মূল্যও পাওয়া যায়নি। একই সময়ে ডায়রিয়া ও আমাশয়ের মতো রোগ ছড়িয়ে পড়লেও চিকিৎসা পাওয়া ছিল কঠিন। এই সংকটের পুরো সময়জুড়ে বহু নারী স্বামী, শ্বশুরবাড়ির সদস্য কিংবা পরিবারের অন্যদের হাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।
গবেষণায় উঠে এসেছে, বন্যা ও বাস্তুচ্যুতি সহিংসতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান অনুঘটক। তিন-চতুর্থাংশের বেশি নারী জানিয়েছেন, বন্যার পর পরিবারের মধ্যে মানসিক চাপ ও সংঘাত বেড়ে যায়। ফসল নষ্ট হওয়া, আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সংসার চালানোর অক্ষমতা অনেক পুরুষকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করে তোলে। সেই হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটে পরিবারের নারী সদস্যদের ওপর। নারীরা দারিদ্র্যকেই সহিংসতার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
পরিসংখ্যানগুলো পরিস্থিতির গভীরতা আরও স্পষ্ট করে। প্রায় ৮০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় থাপ্পড় বা বস্তু নিক্ষেপের শিকার হয়েছেন। প্রায় ৭৫ শতাংশ দাম্পত্য ধর্ষণের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। আবার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী লাথি, মারধর বা টেনেহিঁচড়ে নেওয়ার মতো গুরুতর শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রতিদিনের নীরব যন্ত্রণার দলিল।
গবেষণায় অংশ নেওয়া অনেক নারী জানিয়েছেন, স্বামীর হাতে টাকা না থাকলে কিংবা কাজ না পেলে তার আচরণ আরও সহিংস হয়ে ওঠে। তাই নিজের নিরাপত্তার জন্য তারা কম কথা বলেন, প্রতিবাদ এড়িয়ে চলেন এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ বলেছেন, বাবার বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় এই নির্যাতনই তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই সঙ্গে গবেষণায় দেখা যায়, বাস্তুচ্যুতির সময় প্রতিবেশীরা পরস্পরকে ঘর সরানো, নৌকায় মালপত্র তোলা বা আশ্রয় খুঁজে পেতে সহায়তা করলেও গার্হস্থ্য সহিংসতার বিরুদ্ধে সমষ্টিগত উদ্যোগ খুব কম দেখা যায়। অর্থাৎ দুর্যোগে সামাজিক সংহতি থাকলেও নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নে সেই সংহতি কার্যকর হয় না।
গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ নারী স্বামীকেই প্রধান নির্যাতনকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ঘর, যা নিরাপত্তার প্রতীক হওয়ার কথা, অনেক নারীর জন্য সেটিই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান। অল্প বয়সে বিয়ে, আর্থিক নির্ভরতা, চলাফেরার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক চাপ এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়, যা যৌন সহিংসতা থেকে রক্ষার পরিবর্তে নতুন ধরনের নির্যাতনের সূচনা করে।
এত ব্যাপক সহিংসতার পরও বাইরের সহায়তা চাওয়ার প্রবণতা খুবই কম। গবেষণার সময় চরাঞ্চলে নির্যাতিত নারীদের জন্য কার্যকর কোনো সহায়তা ব্যবস্থা ছিল না। শহরে গিয়ে সেবা নেওয়া ছিল ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। তাছাড়া সামাজিক রীতিনীতি নারীদের নীরব থাকতে শেখায়। অনেকেই মনে করেন, সংসার টিকিয়ে রাখতে নির্যাতন সহ্য করাই উত্তম। সাহায্য চাইলে তা সাধারণত পরিবারের সদস্য বা ধর্মীয় নেতাদের কাছেই সীমাবদ্ধ থাকে, যারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পারিবারিক ঐক্যকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক কিছু সামাজিক ধারণা। প্রায় ৮০ শতাংশ নারী এবং ৪২ শতাংশ পুরুষ মনে করেন, স্বামী বা পরিবারের চাহিদা মেনে চলাই সহিংসতা কমানোর উপায়। আবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ও পুরুষ বিশ্বাস করেন, কাউকে কিছু না বলে চুপ থাকা কিংবা নারীদের ঘরের বাইরে চলাফেরা সীমিত করাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিক্রিয়া। এসব ধারণা প্রমাণ করে, চরাঞ্চলের বাস্তবতা শহর কিংবা অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল গ্রামীণ সমাজের তুলনায় ভিন্ন এবং আরও জটিল।
চরের জীবনকে প্রায়ই মানুষের অসাধারণ সহনশীলতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু এই সহনশীলতার পেছনে লুকিয়ে থাকা নারীদের অদেখা সংগ্রাম খুব কমই আলোচনায় আসে। প্রতিদিনের নির্যাতন, নীরবতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েও তারা সংসার টিকিয়ে রাখেন, সন্তান লালন-পালন করেন এবং প্রতিটি নতুন বাস্তুচ্যুতির পর আবার নতুন করে জীবন শুরু করেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতি ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই চরাঞ্চলের এই অভিজ্ঞতা শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। পরিবেশগত সংকট কখনোই শুধু পরিবেশের সংকট নয়—এটি একই সঙ্গে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবাধিকার সংকট।
গবেষকদের মতে, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধকে আলাদা কোনো নারী-কেন্দ্রিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন, পুনর্বাসন এবং গ্রামীণ উন্নয়নের প্রতিটি পরিকল্পনার মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে চরাঞ্চলের নারী ও কিশোরীদের কণ্ঠস্বরকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আনতে হবে। কারণ তাদের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম এবং বাস্তবতাকে গুরুত্ব না দিলে টেকসই উন্নয়নের কোনো পরিকল্পনাই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। চরের নীরব এই সংগ্রাম তাই শুধু মানবিক সহমর্মিতার বিষয় নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন ও লিঙ্গসমতার অপরিহার্য দাবি।
আপনার মতামত জানানঃ