ভারতের রাজনীতিতে চলমান অস্থিরতা আবারও সামনে এনেছে ভোটের বৈধতা, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং গণতন্ত্রের কাঠামোগত সংকটের মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো। নরেন্দ্র মোদী টানা তৃতীয়বার ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন গত বছরের জুন মাসে, যদিও বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তেলুগু দেশম ও জনতা দল ইউনাইটেডের মতো আঞ্চলিক শরিকদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন সহজ হয়েছিল। কিন্তু তার নেতৃত্বে তৃতীয় মেয়াদ শুরুর এক বছরেরও কম সময়ে বিরোধী শিবিরে দাবি উঠেছে—এই সরকার আসলে ত্রুটিপূর্ণ ও জাল ভোটার তালিকার ভিত্তিতে গঠিত, তাই এর বৈধতা নেই।
বিরোধী কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এই দাবির মুখ্য কণ্ঠস্বর। তিনি স্পষ্ট অভিযোগ করছেন যে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন হয়েছে এক “ভুলে ভরা” ভোটার তালিকার ভিত্তিতে, আর সেটি নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করেছে নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন দলের ইশারায়। রাহুলের অভিযোগ, বৈধ ভোটারদের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে আর জাল ভোটারদের নাম যুক্ত করা হয়েছে। তার দাবি, এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি ভূমিকা ছিল প্রধানমন্ত্রী মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং নির্বাচন কমিশনের। বিহারের মুজফফরপুরে এক নির্বাচনি সমাবেশে তিনি বলেন, মোদীর জয় আসলে জালিয়াতির ফল।
কংগ্রেসের বাইরে বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেসও এই অভিযোগে রাহুলের পাশে দাঁড়িয়েছে। ডিএমকে, আরজেডি ও সমাজবাদী পার্টির মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক দলগুলোও এতে সমর্থন জানিয়েছে। তৃণমূল নেতা অভিষেক ব্যানার্জী সাফ বলেছেন—যদি নির্বাচন কমিশন নিজেই স্বীকার করে ভোটার তালিকায় অসঙ্গতি আছে, তবে সেই তালিকার ভিত্তিতে গঠিত সরকারের কোনো বৈধতা নেই। তার মতে, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভাকে পদত্যাগ করতে হবে এবং অবিলম্বে লোকসভা ভেঙে দিতে হবে।
এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ‘এসআইআর’ বা বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা। নির্বাচন কমিশন স্বীকার করেছে, বিহারসহ কয়েকটি রাজ্যে ভোটার তালিকায় ভুয়া নাম ছিল এবং সেগুলো বাদ দেওয়ার কাজ চলছে। বিহারে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যেই ৬৫ লক্ষের বেশি নাম বাদ পড়েছে। বিরোধীদের প্রশ্ন—যদি বিহার বা পশ্চিমবঙ্গের তালিকা ভুল হতে পারে, তবে মহারাষ্ট্র বা গুজরাটে তা কীভাবে নিখুঁত হলো? বিরোধীদের দাবি, মূলত গোটা দেশের তালিকাই ত্রুটিপূর্ণ, এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন হয়েছে একটি অবৈধ ভিত্তির ওপর। এই অভিযোগ যতই জোরালো হচ্ছে, ততই প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তীব্র হচ্ছে।
রাহুল গান্ধীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই ভোট চুরির মডেল শুরু হয়েছিল গুজরাটে যখন মোদী মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। পরে ২০১৪ সালে সেটি জাতীয় স্তরে কার্যকর হয়। তিনি একে “গুজরাট মডেল অব ইলেকশন রিগিং” বলেছেন, যা তার মতে কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেল নয় বরং সরাসরি ভোট চুরির প্রক্রিয়া। রাহুল অভিযোগ করেন, ২০১৪, ২০১৯ ও ২০২৪—এই তিনটি লোকসভা নির্বাচনে একই কৌশল ব্যবহার করে বিজেপি জয়ী হয়েছে। শুধু তাই নয়, মহারাষ্ট্র ও অন্যান্য রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনও একই প্রক্রিয়ায় চুরি করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
অভিযোগ উত্থাপনে রাহুল কিছুটা দেরি করেছেন, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এতদিন প্রমাণ হাতে ছিল না। মহারাষ্ট্রে নির্বাচনের পর তারা প্রমাণ পেয়েছেন, যেখানে ভোটার তালিকায় অন্তত এক কোটি ভুয়া নাম যোগ করা হয়েছিল, আর সেই নামগুলির ভোট সরাসরি বিজেপির ঝুলিতে গেছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, শিগগিরই এ নিয়ে প্রমাণ উপস্থাপন করবেন।
ডিএমকে নেতা ও তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিনও রাহুলের অভিযোগে সায় দিয়েছেন। আরজেডির তেজস্বী যাদবও কংগ্রেসের পাশে রয়েছেন। তৃণমূল আবারও বলেছে, যদি তালিকা সংশোধন করতেই হয়, তবে তা পুরো দেশে করতে হবে, কেবল নির্বাচনীভাবে সুবিধাজনক রাজ্যগুলোতে নয়। অভিষেক ব্যানার্জী মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই তালিকার ভিত্তিতেই ২৪০ জন বিজেপি সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন, যারা আবার রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতিও নির্বাচন করছেন। সুতরাং এটি শুধু একটি দলীয় নয়, বরং একটি সাংবিধানিক প্রশ্ন।
অন্যদিকে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। বিজেপি বলছে, রাহুল গান্ধীর অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তাদের মুখপাত্র শেহনাজ পুনেওয়ালা পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন—যদি মোদীর মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় থেকেই ‘গুজরাট মডেল’ চালু হয়ে থাকে, তবে তো সেই সময়ে কংগ্রেসই কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় ছিল এবং নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ করেছিল। তাহলে কি কংগ্রেস-নিযুক্ত কমিশনাররা নিজেই মোদীকে জেতানোর কাজে যুক্ত ছিলেন? এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে বিজেপি বিরোধীদের অভিযোগকে অস্বীকার করছে।
নির্বাচন কমিশনও স্পষ্ট করে দিয়েছে, রাহুল গান্ধী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হলফনামা বা প্রমাণ জমা না দেওয়ায় তার অভিযোগের তদন্ত হবে না। ফলে আইনগতভাবে মোদী সরকারের বৈধতা আপাতত অটুট থাকলেও রাজনৈতিক অস্বস্তি ক্রমশ বাড়ছে। বিরোধীরা যখনই জনসভায় এই অভিযোগ তোলে, তখনই সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগে—তাদের ভোট কি আদৌ মূল্যবান?
এই পরিস্থিতি ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গভীর সংকেত বহন করছে। একদিকে বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর শাসকদলের উপর চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে শাসকদল তা নস্যাৎ করছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যখন নাগরিকরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তাদের ভোট গণনায় সঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না, তখনই গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।
নরেন্দ্র মোদী একটানা এগারো বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আসনে আছেন। এই দীর্ঘ সময়ে নানা বিতর্ক হলেও এত বড় আকারে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। বর্তমান অভিযোগ তাই শুধু বিরোধীদের রাজনৈতিক অস্ত্র নয়, বরং গণতন্ত্রের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো বিষয়। বিহারের ভোটের আগে এসআইআর প্রক্রিয়া এবং ভোটার তালিকার ছাঁটাই ইতিমধ্যেই লাখো মানুষকে প্রভাবিত করেছে।
সামনের দিনগুলোতে এই বিতর্ক আরও তীব্র হবে। বিরোধীরা রাস্তায় আন্দোলন ও সংসদে চাপ বজায় রাখবে, বিজেপি চেষ্টা করবে তা উপেক্ষা করতে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে—তারা কি নিরপেক্ষ রেফারি, নাকি একপক্ষের খেলোয়াড়?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—এই বিতর্ক ভারতের সাধারণ মানুষকে কোথায় নিয়ে যাবে? তারা কি আরও বেশি করে রাজনীতির প্রতি বিমুখ হবে, নাকি আরও সক্রিয়ভাবে অধিকার দাবি করবে? বিরোধীদের এই দাবির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সত্য: একটি দেশের গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী থাকে যখন জনগণ বিশ্বাস করে তাদের ভোটই ক্ষমতা নির্ধারণ করে। আর সেই বিশ্বাস নষ্ট হলে শুধু একটি সরকার নয়, গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থা সংকটে পড়ে।
আপনার মতামত জানানঃ