Trial Run

ভারতের জবরদস্তিতে তিস্তা এখন ধু-ধু বালুচর

বাংলাদেশের হিস্যা পুনঃনির্ধারণের দাবি বিশেষজ্ঞদের

মৃতপ্রায় তিস্তা নদী। ছবি: করতোয়া।

ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সময় অতিক্রম করছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, দুই দেশের সরকারেরই এমন দাবি। অথচ বাংলাদেশ বারবার বলা সত্ত্বেও তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা বুঝে পাচ্ছে না। দুই দেশের মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা সত্ত্বেও ভারত এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে সাড়া দেয়নি। উজানের দেশ হয়ে ভারতের এমন জবরদস্তিমূলক আচরণের কারণে বাংলাদেশ অংশে থাকা তিস্তা নদী এখন মৃত প্রায়।

বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, সরকার তৎপর হলেই এই সংকটের সমাধান সম্ভব। তবে বাংলাদেশকে এখন নতুন কৌশল ঠিক করতে হবে বলে জোর দিচ্ছেন তারা। উজানে অনেক ছোট ছোট বাঁধ দেয়ায় নদীতে এমনিতেই পানি থাকে না। ফলে বাংলাদেশকে তার দাবি সংশোধন করতে হবে এবং পানির হিস্যা পুনঃনির্ধারণ কররতে হবে। নইলে এখনও তিস্তার কোথাও কোথাও কিছু পানি থাকলেও অচিরেই সেটুকুও চলে যাবে দৃষ্টিসীমার বাইরে।

অনুসন্ধানে গিয়ে দেখা যায়, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে তিস্তায় যথেষ্ট পানি থাকার কথা থাকলেও তিস্তা নদী পরিণত হয়েছে ধু-ধু বালুচরে। ১৬ নভেম্বর ২০২০, সোমবার তিস্তা অববাহিকা থেকে আমাদের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দিন-দুপুরে দেখা গেছে, তিস্তার বুকজুড়ে শুধু বালু আর বালু। বন্যার ক্ষত মুছে না যেতেই তিস্তার এই পরিণতি দেখে হতাশ নদীপাড়ের লাখো মানুষ।

জানা যায়, ভারত তিস্তা থেকে ইচ্ছেখুশিমতো পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশ অংশে থাকা তিস্তা বাঁধ প্রকল্প প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। নদীতে পানি না থাকায় জেলায় মৎস্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। হুমকির মধ্যে পড়েছে জীব বৈচিত্র্য। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মৎস্যজীবীদের কর্মহীনতা, কৃষিতে সেচ, আরসেনিক সমস্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই আছে। নদীর বুকজুড়ে এখন ধু-ধু বালুচর। এতে চলছে ধান, গম, আলু, পিঁয়াজ, মরিচ, কুমড়া, বাদামসহ নানা ধরনের রবিশষ্যের চাষাবাদ।

স্থানীয়রা বলছেন, এক মাস আগেই তিস্তা যেমন বন্যায় ভাসিয়েছে দু কূলের মানুষের জীবন, গ্রাস করেছে গ্রামের পর গ্রাম, ভেঙেছে কৃষকের কষ্টে বোনা ফসলের মাঠ, সেই সর্বনাশা তিস্তা এখন শুকিয়ে খাঁ খাঁ। মাস শেষ হতে না হতেই তিস্তা যেন শুকিয়ে কঙ্কাল রূপ ধারণ করেছে। নেই তার বুকে ছুটে চলা নৌকা, নেই জেলেদের আগের মতো আনাগোনা, নদী যেন মরেই গেছে। ভারত অংশ থেকে পানি না আসাতেই এই দুরবস্থা।

পানিবিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিস্তা নদীর উজানে ভারত সরকার পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে একটি খালের মাধ্যমে শুকনো মৌসুমে নদী থেকে ১৫০০ থেকে ২০০০ কিউসেক পানি মহানন্দা নদীতে নিয়ে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশে তিস্তার মৃত্যুদশা। দুই দেশের সরকার এ সংকট সমাধানে বারবার বৈঠক করছে নদী কমিশনের ব্যানারে। কিন্তু ভারতপক্ষের আন্তরিকতা নেই। উজানের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে জোরপূর্বক অন্যায় আচরণ করছে তারা।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ব্যর্থতাই এজন্য দায়ী। সরকার সুসম্পর্কের কথা বলছে বটে, তবে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়ায় এবং স্বাধীনতার ৫০ বছরে কখনও নদী ড্রেজিং না করায় নদীর তলদেশ বালু ভরাট হয়ে বর্তমানে মরা খালে পরিণত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানজিমউদ্দীন খান স্টেটওয়াচকে বলেন, ‘তিস্তার উৎসমুখে অনেক ছোট ছোট বাঁধ দেয়া হয়েছে। এভাবে নিয়ন্ত্রণের ফলে নদীটির নাব্যতা সংকটে পড়ছে। পুরনো যেসব সমীক্ষা এবং সমঝোতার ভিত্তিতে দুই দেশ আলোচনা চালাচ্ছে, আমার মনে হয় সেগুলো এখন অনেক কিছুই অচল হয়ে গেছে। এখানে নতুন করে হাত দিতে হবে। যেসব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বাংলাদেশের বা ভারতের হিস্যা নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেগুলো যথার্থ কিনা তা যাচাই করা দরকার। ছোট ছোট বাঁধ ও ভারতের নতুন অনেক প্রকল্পের কারণে পরিস্থিতি পুরোই বদলে গেছে।’

গণপক্ষের লড়াই সংগ্রামে সক্রিয় এই শিক্ষক মনে করেন, ‘বাংলাদেশ সরকার জোর দিলে, বৈধ অবস্থান থেকে কথা বললে এ বিষয়ে একটা চাপ তৈরি হবে। এরপরও যদি তারা উপেক্ষা করে, তাহলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে সমাধান করতে হবে। এর আগে ভূমি ও সমুদ্রের সীমানা বিরোধে আমরা আন্তর্জাতিক আদালত থেকে ভালো ফল পেয়েছি। তিস্তা লাখ লাখ মানুষের জীবন-মরণের বিষয়। এটাকে দিনের পর দিন এভাবে ফেলে রাখাটা গণবিরোধী কার্যকলাপের মধ্যে পড়ে।’

তিস্তা নদীর অববাহিকায় বসবাসরত মানুষেরা জানান, বিরূপ প্রভাব পড়েছে নৌ-চলাচলে। নদীতে পানি না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে চিলমারী ও বুড়িমারী বন্দরের সঙ্গে নৌযানযোগে মালামাল পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে। নদীর পানি হ্রাস ও উজানের পাহাড়ি ঢলে বালু পড়ে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছ না থাকায় নদীকে ঘিরে জেলে পরিবারগুলোর আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে গেছে। নদী ড্রেজিং না করায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে অসংখ্য বাঁক ও চরের সৃষ্টি হয়েছে।

এভাবে বর্ষাকালে নদীতে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় কাউনিয়া এলাকার উভয় তীরের প্রায় ৩০ কিমি. এলাকার গ্রামগুলো নদীভাঙন ও বন্যাকবলিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমান সরকার চীনের সঙ্গে তিস্তা নদী নিয়ে যে মহাপরিকল্পনার চুক্তি করেছে তার দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চান নদীপাড়ের মানুষ। দিনের পর দিন নদীর কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। সরকারের অব্যাহত ব্যর্থতার অবসান চান তারা।

মিই/আরা/১৪২০

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 175
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    175
    Shares