Trial Run

পাহাড় কেটে নির্মিত সড়ক পাহাড় ধ্বসের শঙ্কায় বন্ধ

ছবি: কালেরকণ্ঠ

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড নির্মাণে ছোট-বড় ১৬টি পাহাড় কেটেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে চলমান টানা বৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে ফৌজদারহাট-বায়েজিদ লিংক রোডের একাধিক পাহাড়। ফলে আজ মঙ্গলবার(৮ জুন) থেকে সড়কটিতে যান চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।

পাহাড় কেটে নির্মাণ করা নগরের বায়েজিদ বোস্তামী-ফৌজদারহাট সড়ক বন্ধ করে দিতে ট্রাফিক পুলিশকে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। গতকাল সোমবার এ চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে আজ মঙ্গলবার থেকে পাহাড়ধসের শঙ্কায় বর্ষা মৌসুমে সড়কে চলাচল বন্ধ করে দিতে অনুরোধ করা হয়।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী হাসান বিন শামস জানান, সড়কটির নির্মাণকাজ এখনও শেষ হয়নি। যানবাহন চলাচল করলে নির্মাণকাজ করা যায় না। ফলে এটি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। তা ছাড়া এই সড়কে কিছু পাহাড় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভারি বর্ষণে ধসের আশঙ্কা রয়েছে। এখন পাহাড়গুলো ঝুঁকিমুক্ত করার কাজ চলবে। ঝুঁকিমুক্ত করতে পাহাড়ের কিছু অংশ কাটতে হবে। কী পরিমাণ পাহাড় কাটতে হবে, তা পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন সাপেক্ষে জানা যাবে।

হাসান বিন শামস বলেন, চলতি বর্ষা মৌসুমে সড়কটি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হবে। বর্ষা মৌসুম শেষ হলে আগামী আগস্ট মাসের দিকে যান চলাচলের জন্য সড়কটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। সড়কটি বন্ধ রাখতে সিডিএ ইতোমধ্যে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়েছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট টোল রোডের মুখ থেকে বায়েজিদ বোস্তামি পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সিডিএ। প্রকল্পের আওতায় একটি রেলওয়ে ওভারব্রিজসহ ছয়টি ব্রিজ ও কয়েকটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়।

প্রকল্পের ৬ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে সিডিএ ছোট-বড় ১৬টি পাহাড় কেটেছে। ২৬ ডিগ্রি করে এসব পাহাড় কাটার অনুমতি থাকলেও কাটা হয়েছে ৯০ ডিগ্রি কোণে। এতে পুরোপুরি কাটিং ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান লঙ্ঘন করা হয়। এজন্য সিডিএকে ১০ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৩ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর।

পরবর্তী সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাড়া পাহাড়গুলো নতুন করে কাটার জন্য গত বছরের ২৩ মার্চ পরিবেশ অধিদপ্তরে নতুন করে আবেদন করে সিডিএ। ওই আবেদনে নতুন করে ৩ লাখ ৩২ হাজার ঘনমিটার পাহাড় কাটার অনুমতি চায় সিডিএ। এরপর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো কাটা ও সংরক্ষণ কীভাবে করা হবে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামতসহ প্রতিবেদন চায় পরিবেশ অধিদপ্তর।

এরপর সিডিএর প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে প্রকল্পটির পরিচালক ও চুয়েটের দুই শিক্ষকের সমন্বয়ে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্য বুয়েটের দুই শিক্ষক ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করেছেন। এরপর কয়েক মাস অতিবাহিত হলেও করোনা প্রাদুর্ভাবসহ নানা জটিলতায় প্রতিবেদন তৈরি করতে পারেনি বিশেষজ্ঞ কমিটি।

এদিকে সিডিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের চিঠি চালাচালির মধ্যে বর্ষা মৌসুম শুরু হয়। রোববার ভারী বর্ষণ শুরু হয়। এতে ভিজে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোডের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে নতুন করে ধসের আশঙ্কা দেখা দেয়।

চট্টগ্রাম মহানগরী ও আশপাশের বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন হাজারো মানুষ। প্রতিবছর পাহাড় ধ্বসে প্রাণহানি ঘটলেও পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপন থেমে নেই। সেখানে চরম ঝুঁকি নিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষ সংসার পাতেন।

‘মৃত্যুকূপ’ পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপন রোধ ও উচ্ছেদে প্রশাসন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। কারণ উচ্ছেদ-উদ্যোগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইনি জটিলতা। উচ্ছেদ করতে গেলেই স্বার্থান্বেষী মহল উচ্চ আদালতে রিট ঠুকে দেয়। তবে পাহাড় ধ্বস ও প্রাণহানি রোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকে।

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দেয়। সোমবারসহ দুই দিনের বৃষ্টিতে এরই মধ্যে আবার পাহাড় ধসের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসন তৎপর হয়ে উঠেছে। মাইকিং করাসহ বিভিন্ন পাহাড় থেকে দুই শতাধিক পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আরও লোকজনকে সরানো হচ্ছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘রিট’।

যখনই কোনো পাহাড়ে উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয় তখনই স্বার্থান্বেষী মহল উচ্চ আদালতে রিট ঠুকে দেয়। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি পাহাড়ের পাদদেশে ঘর তৈরি করে নিম্ন আয়ের মানুষদের কাছে ভাড়া দেয়। বিপদ হতে পারে জেনেও তুলনামূলক কম টাকায় থাকা যায় বলে নিম্ন আয়ের লোকজন সেসব ঘর ভাড়া নেয়। এ প্রভাবশালীরাই মূলত রিট করে। এ কারণে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।

চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের প্রকৃত সংখ্যা প্রশাসন বা অন্য কোনো সংস্থার কাছে নেই। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তালিকা অনুযায়ী ৩০টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি পাহাড় অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। কমিটির গত বছরের হিসাব অনুযায়ী- ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সংখ্যা ৮৩৫টি।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা কয়েক হাজার। বায়েজিদ ও আকবারশাহ থানা এলাকার অনেক পাহাড়ে টিনের ঘেরাও দিয়ে গোপনে পাহাড় কেটে বসতঘর তৈরি করা হচ্ছে। দখলদাররা একাধিক স্তরের পাহারা বসিয়ে বাইরের কাউকে সেখানে প্রবেশ করতে দেয় না। এখানকার বসবাসকারীরা প্রশাসনের অগোচরেই থেকে যায়।

টানা বৃষ্টি বা বর্ষা মানেই পাহাড় ধস। এতে প্রাণ যাচ্ছে বহু মানুষের। কিন্তু পাহাড় কাটা যেমন বন্ধ হয়নি, তেমনি বন্ধ হয়নি পাহাড় দখল বা এর পাদদেশে বসবাস। একদিকে উজাড় হচ্ছে পাহাড়, ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ, অন্যদিকে জীবনের ক্ষয়-অথচ ধস রোধ ও দখলদার উচ্ছেদে স্থায়ী ও টেকসই ব্যবস্থা বা পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি কখনো। উদ্যোগ নেওয়া হয় না বাধাগুলো দূর করার। সাময়িক উদ্যোগে এর সমাধান দেখেন না পরিবেশবিদরা।

তারা জানান, পাহাড় কাটা রোধে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ না থাকায় পাহাড় কাটার প্রবণতা বাড়ছে। আবার সরকারিভাবেও পাহাড় কাটা হচ্ছে। প্রতিবছর প্রাণহানি ঘটলেও পাহাড় ধ্বস রোধে সরকারের কোনো টেকসই ব্যবস্থা নেই।

বলেন, যারা পাহাড় কাটছেন, তাদের মধ্যে বিভিন্ন পেশার প্রভাবশালী লোক রয়েছেন। চট্টগ্রাম নগর ও আশপাশে বসতি গড়ে তোলার জন্য পাহাড় কাটা হয়। সীতাকুণ্ড ও অন্যান্য উপজেলায় পাহাড় কাটা হচ্ছে শিল্পকারখানা গড়ে তোলার জন্য। কক্সবাজারে পাহাড় কেটে চলছে মাটি বিক্রির ব্যবসা।

তারা বলেন, চট্টগ্রাম শহরে প্রতিনিয়ত পাহাড় কাটা হচ্ছে। পাহাড় কাটা, পাহাড়ে বসতি এবং পাহাড় ধ্বসের জন্য সংশ্লিষ্ট পাহাড়ের মালিককে দায়ী করা দরকার। যদি তা করা হয়, তাহলে পাহাড় রক্ষা হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর কেবল তদারকির দায়িত্বে থাকবে।

তারা বলেন, পাহাড় রক্ষা করা খুবই দরকার। পাহাড় কাটার কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর একটু তৎপর হলে পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষা করা সম্ভব।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৭০১ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগিতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ