Trial Run

বসুন্ধরার এমডি এবং সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম— দুই ক্ষেত্রে পুলিশের ভিন্ন দুই রূপ

প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের ক্ষেত্রে পুলিশ যেন পুলিশ নয়, কমিক বুকের সুপারম্যান। প্রথমে আটকে রাখা, হেনস্থা করা, নির্যাতন করা, তল্লাশি, এরপর গ্রেফতার, তারপর মামলা, রিমান্ডের আবেদন। সব মিলিয়ে এ যেন এক অচেনা প্রেক্ষাপট। এদিকে, দেশে থাকলেও গ্রেফতার হচ্ছে না বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীর। উন্নত তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসামি গ্রেফতার না করা পুলিশের দায়িত্ব পালনে নিষ্ক্রিয়তা হিসেবে গণ্য করা যায়। এমনকি জিজ্ঞাসাবাদও করেনি পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, শক্ত প্রমাণ হাতে নিয়েই কলেজছাত্রী মুনিয়ার প্রেমিকা বসুন্ধরা এমডি সায়েম সোবহান আনভীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। প্রধান অভিযুক্ত দেশেই আছেন এবং তাকে নজরদারিতে রাখার চেষ্টা চলছে। অপর একটি সূত্র মতে, আনভীরকে গ্রেফতারের বিষয়টি মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। ‘ওপর মহলের’ সিগন্যালের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।

কেন এই বৈষম্য? কেন এই ভিন্নভাবে ট্রিট করা? কেন কখনও তদন্তে দায়সারা, তো কখনও প্রয়োজনের থেকে বেশি তৎপর? অপরাধীর পরিচয় অনুসারে কেন বদলে যায় পুলিশি তদন্তের ধরনধারণ?

সাংবাদিক গ্রেফতারের ক্ষেত্রে পুলিশ যেন সুপারম্যান

গত সোমবার পাঁচ ঘন্টা আটকে রাখার পর রাত পৌনে ১২ টার দিকে রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। মামলার নম্বর ১৬। দণ্ডবিধি ৩৯৭ এবং ৪১১ অফিসিয়াল সিক্রেসি এক্ট ১৯২৩ এর ৩/ ৫ এর ধারায় মামলা করেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপ-সচিব শিব্বির আহমেদ ওসমানী। এই মামলার একমাত্র আসামি করা হয়েছে তাকে। তার বিরুদ্ধে সরকারি নথি সরানো ও ছবি তোলার অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

দণ্ডবিধির ওই ধারায় প্রকাশ্য কোনও জায়গা থেকে কিছু চুরির কথা বলা হয়েছে। আর অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ধারায় গোপন কোনও জায়গা থেকে রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপুর্ণ নথি নেয়ার কথা বলা হয়েছ। এই দুইটি ধারা একসঙ্গে প্রয়োগ সাংঘর্ষিক। 

রোজিনার আইনজীবী অ্যাডভোকেট প্রশান্ত কুমার কর্মকার বলেন, এইভাবে মামলা করাই মামলাই প্রমাণ করে যে মামলাটি মিথ্যা এবং বেআইনি। আর মামলার অভিযোগের সাথে কোনও জব্দ তালিকা এবং জব্দ করা কোনও কিছু আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি।

থানায় মামলা করার আগে রোজিনাকে সচিবালয় থেকে একটি ফরোয়ার্ডিং দিয়ে পাঠানো হয়। তাতে শুধু মোবাইলে ছবি তোলার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এজাহারে তার সাথে সরাসরি নথি চুরির বিষয়টি নতুন করে যুক্ত করা হয়।

রোজিনাকে হয়রানির উদ্দেশ্যের বড় প্রমাণ মেলে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদনে। চুরির ঘটনায় ‘হাতে নাতে’ যদি আটক করা হয় তাহলে তো চুরির মালও উদ্ধার হয়ে গেল। তারপরও রিমান্ডে চাওয়ার উদ্দেশ্য কী? প্রশ্ন আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকারের।

এদিকে, রোজিনা ইসলামকে সোমবার ‘বেআইনিভাবে’ সচিবালয়ে পাঁচ ঘন্টা আটক রাখার পর থানায় হস্তান্তর করা হয়। এরপর মামলা। কিন্তু এই পাঁচঘন্টা কীভাবে আটক রাখা হলো? প্রশান্ত কুমার কর্মকার বলেন, এই বেআইনি আটকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ আছে। রোজিনা চাইলে এর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন।

গত সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রোজিনা ইসলাম পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যান। এ সময় স্বাস্থ্য সচিবের পিএস সাইফুল ইসলামের রুমে ফাইল থেকে নথি সরানোর অভিযোগে তাকে পুলিশ দিয়ে ওই রুমে আটকে রাখা হয় এবং তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। 

খবর পেয়ে সাংবাদিকেরা সেখানে ছুটে যান। যে কক্ষে রোজিনাকে আটকে রাখা হয়েছিল, সেখানে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়। কক্ষের বাইরে ছিলেন আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য। কয়েকজন সাংবাদিক কক্ষের ভেতরে গেলে রোজিনা ইসলাম জানান তাকে মিজান নামে এক পুলিশ সদস্য নাজেহাল করেছেন।

একপর্যায়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেসা বেগম রোজিনা ইসলামের গলা চেপে ধরে তাকে শাসান। পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় আটকে রাখা হয় রোজিনাকে। সেখানে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তিনি মেঝেতে পড়ে যান। রাত সাড়ে আটটায় তাকে ধরাধরি করে নারী পুলিশ সদস্যরা ওই কক্ষ থেকে বের করে নিচে নামিয়ে আনেন এবং গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। 

এ সময় সাংবাদিকেরা পুলিশের কাছে জানতে চান, রোজিনাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? তখন পুলিশ জানায়, চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর জানা যায়, তাকে হাসপাতালে নয়, শাহবাগ থানায় নেওয়া হয়েছে।

রাত পৌনে ১২টার দিকে পুলিশ জানায়, রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা হয়। তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

মুনিয়ার মৃত্যুর ২৫ দিনেও গ্রেফতার হননি বসুন্ধরার এমডি

এদিকে, কলেজ ছাত্রী মুনিয়ার আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলায় প্রধান আসামী সায়েম সোবহান আনভীর এখনও গ্রেফতার হয়নি। এ প্রসঙ্গে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আইনজীবিসহ সংশ্লিষ্টরা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অপরাধী যেই হোক আইনের আওতায় আনা হবে, এমন মন্তব্যও কাজে আসেনি। ক্ষমতার একটা পর্যায়ের পরে, আইনের হাত যে খাটো হয়ে যায় তাও আবারও প্রমাণিত হলো।

এছাড়া মুনিয়ার মামলার বাদি তার বড় বোন নুসরাত বলেছেন নিরাপত্তাহীনতায় ভুছেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে তাকে নামে বেনামে হুমকি দেয়া হচ্ছে। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে মামলার প্রধান আসামীর গ্রেফতার দাবি করেন। 

বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি মস্ত বড় মানুষ। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক রেজওয়ানুল হক বলেন, বাস্তবতা হলো সত্যিই তারা বড়। বাস্তবতা মেনে নিয়েই বলতে হবে, মামলা হয়েছে বেশি সময় হয়নি ধৈর্য হারানোর মতো সময় এখনো হয়নি। 

এদিকে, পঁচিশ দিন হয়ে গেলেও মুনিয়ার আত্মহত্যার ঘটনায় মামালার প্রধান আসামী সাযেম সোবাহান আনভীরের খোঁজ মিলছে না। ইতিমধ্যে তার পুরো পরিবার দেশ ত্যাগ করেছে।

তবে জানা যায়, আদালতের নিষেজ্ঞার কারণে বিদেশী ভাড়া করা বিমানে, মুনিয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামী সাযেম সোবহান আনভীর ইমিগ্রেশন ক্রস করে বিমানে উঠতে পারেননি। তিনি দেশেই আছেন অথচ সাংবাদিক পুলিশ গোয়েন্দারা তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। এত মস্তবড় শক্তিশালী ক্ষমতাশীল মানুষ সবার নজর এড়িয়ে চলছেন। এটা কীভাবে সম্ভব?

এদিকে, কলেজ শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার পর বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীর কোথায় অবস্থান করছেন তা মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসীকে জানাতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার বরাবর একটি আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এস এম জুলফিকার আলী জুনু। 

আবেদনে বলা হয়, ‘সম্প্রতি দেশের আলোচিত বিষয় হচ্ছে গুলশানের একটি ফ্ল্যাটে মুনিয়া নামের একটি মেয়ের আত্মহত্যার মামলা। যে মামলায় আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী হিসেবে দেশের স্বনামধন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরকে আসামি করা হয়েছে।’

‘কিন্তু জনমনে প্রশ্ন, মামলা দায়েরের তিন দিন অতিবাহিত হলেও কেন এই মামলার অন্যতম আসামি সায়েম সোবাহান আনভীরকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না? নাকি সায়েম সোবহান আনভীর দেশত্যাগ করেছে? দেশের অভ্যন্তরে থাকলে কেন পুলিশ কর্তৃক উন্নত তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসামি গ্রেফতার করা হচ্ছে না?’

‘জনমনে এ-ও প্রশ্ন রয়েছে, দেশের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী বলে পুলিশ গ্রেফতারে অনীহা প্রকাশ করছে। যা দেশের সাধারণ মানুষের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অশনি সঙ্কেত।’

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ পুলিশ একটি পেশাদার সুশৃঙ্খল বাহিনী। এই বাহিনীর প্রতি দেশের সাধারণ মানুষ ও আমাদের আস্থা রয়েছে। পুলিশ কমিশনার আপনার কাছে আকুল আবেদন, আত্মহত্যায় প্ররোচনার আসামি বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীর দেশে আছে নাকি বিদেশে পালিয়ে গেছে এর একটি সুস্পষ্ট বক্তব্য দেশ ও জাতির কাছে জানান।’

এসডব্লিউ/এমএন/এসএস/২০৪৮ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগীতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ