Trial Run

ব্রহ্মপুত্র নিয়ে চীন-ভারতের কলোনিয়াল পলিটিক্সে নদীহীন হচ্ছে বাংলাদেশ

ছবি: সংগৃহীত

ব্রহ্মপুত্রে চীন ও ভারতের বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্তে জল ঘোলা হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কে। ধারণা করা হচ্ছে, জলবিদ্যুতের নামে পানি সরিয়ে নিতে বা কৌশলগত কারণেও বাঁধ নির্মাণ করতে পারে দেশ দু’টি। যাতে সংঘাতের সময় পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া বেশ কিছু ক্ষেত্রেই বাঁধ নির্মাণ সিদ্ধান্ত ভাটির দেশগুলোর জন্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠবে। পাশাপাশি চীনের সিদ্ধান্তে ভারতেরও পাল্টা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা উপমহাদেশে পানি রাজনীতির আগুনকে আরও উস্কে দিচ্ছে। 

চীন-নিয়ন্ত্রিত তিব্বত থেকে ভারতে প্রবেশ করেছে ব্রহ্মপুত্র। অরুণাচল-আসাম হয়ে বাংলাদেশের দিকে এসেছে নদীটি। তিব্বত থেকে ২ হাজার ৮৮০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ হয়ে যার প্রবাহ মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। দীর্ঘ এই নদী তার সেবা দিয়ে যাচ্ছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ বর্গকিলোমিটার পরিসরজুড়ে। ব্রহ্মপুত্র বাংলাদেশের প্রাণ। শুষ্ক মৌসুমের ৭০ ভাগ পানির জোগান দেয় ব্রহ্মপুত্র। যার একটা অংশের যোগান দেয় তিস্তা। যদিও ফারাক্কা বাঁধের কারণে তিস্তা ইতিমধ্যেই ধুকছে।

বাংলাদেশে বহমান ৯২ ভাগ পানির উৎস দেশটির বাইরে। তাই পানি নিয়ে চীন ও ভারতের অপরাজনীতি কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে বাংলাদেশে। ভারত ও চীনে সুপেয় পানির প্রাচুর্য নেই। পৃথিবীর মোট ৩৭ শতাংশ মানুষ এই দুই দেশে বাস করলেও সুপেয় পানি আছে মাত্র ১১ শতাংশ। দুই দেশেরই কৃষি ও অর্থনীতির কারণে পানির উপর নির্ভরতা বাড়ছে। বাড়ছে রাজনীতি। বাড়ছে ক্ষতি।

ব্রহ্মপুত্রে চীন ও ভারতের পাল্টাপাল্টি বাঁধ 

সম্প্রতি তিব্বতের ইয়ারলুং জ্যাংবো নদীর ওপর বিশাল বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা কথা জানিয়েছে চীনা সরকার। ইয়ারলুং জাংবোর ভাটিতে (ব্রহ্মপুত্রের তিব্বত অঞ্চলের নাম) এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান চীনের পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের চেয়ারম্যান ইয়ান ঝিয়ং।

জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তিব্বতের জাঙ্গমু, দাগু, জিয়েক্সু ও জাছা এলাকায় ব্রহ্মপুত্রের ওপর আগেও চারটি বাঁধ নির্মাণ করেছে চীন, সেগুলোর সবই ইয়ারলুং জ্যাংবোর (ব্রহ্মপুত্র) উজানে উচ্চ ও মাঝের গতিপথে। যদিও বাঁধ নির্মানে ভাটির দেশগুলোর সাথে কখনও আলোচনায় যায় না চীন। 

নতুন প্রকল্পে উৎপাদিত জলবিদ্যুতের পরিমাণ বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী এই প্রকল্পটি মধ্য চিনের থ্রি গর্জেস ড্যামের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি হতে পারে। 

সূত্র মতে, ইয়ারলুং জ্যাংবো নদীর ওপরে প্রস্তাবিত বাঁধ প্রকল্প বছরে ৬০০ কোটি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হবে, যা বছরে ৩০০ কোটি কিলোওয়াট কার্বনমুক্ত ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।

এদিকে, চীনের এই ঘোষণার পর দুদিন গড়াতেই ভারতও এ নদে জলাধারের পরিকল্পনার কথা জানায়। ভারতের পক্ষ থেকে ঘোষণা দে’য়া হয়, অরুণাচল প্রদেশে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর ১০ গিগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির কথা ভাবছে তারা।

ভারতের কেন্দ্রীয় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে টিএস মেহরা জানান, চীনের জলাধার নির্মাণের ফলে যে প্রভাব পড়বে তার সঙ্গে লড়াই করার জন্যই অরুণাচল প্রদেশে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর জলাধার বানানো প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপর্যায়ে এই নিয়ে এখন আলোচনা চলছে।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আড়ালের কথা

চীনের উত্তরাঞ্চল কৃষি ও অর্থনীতির কেন্দ্র। কিন্তু পানি নেই সেখানে। তাই তারা দক্ষিণ থেকে উত্তরে পানি সরিয়ে নিচ্ছে। এ উদ্দেশ্যেই এই বিশাল জলবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।  

ইয়ারলুং জ্যাংবোতে আড়াআড়ি বাঁধ দেবার প্রসঙ্গে পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, শুধু যদি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন উদ্দেশ্য হলে সেটা ভারত বা বাংলাদেশের চিন্তার কিছু ছিল না। কিন্তু চীন ওই জায়গায় জলাধার নির্মাণের মাধ্যমে বাঁধ দিয়ে পানি নিয়ে যাবে ইনার মঙ্গোলিয়ায় যেখানে পানির সংকট রয়েছে।

ফলে এখনকার পরিস্থিতিতে ভারতে পানির প্রবাহ কমবে, আর তাতে বাংলাদেশের ওপরেও তার কিছুটা প্রভাব এসে পড়বে।

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আড়ালে চীন বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পানি অন্যদিকে সরিয়ে নেয় কিনা, সেদিকে নজর রাখতে বলছেন অধ্যাপক রেজাউর রহমানও। 

তিনি বলেন, “জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হলে, প্রভাবটা একটু কম পড়বে। কারণ পানিটা তাদের ছেড়ে দিতে হবে, পানি ধরে রাখতে পারবে না।”

“চীন কিন্তু আগে বলেছিল, তারা বাঁধ দেবে না। জলবিদ্যুৎ প্রকল্প করবে না। এখন দেখা যাচ্ছে, তারা একটা একটা করে করছে। ২০১৫ সালে তারা বাঁধ দিয়ে মঙ্গোলিয়ায় পানিও সরিয়ে নিয়েছিল।”

অর্থ নিয়েও তথ্য গোপণ করছে চীন

ভারত বলছে, ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ বিষয়ে চীন সময়মতো তথ্য না দেওয়ায় তাদের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের চারটি প্রদেশে কয়েক কোটি মানুষ নিয়মিত ক্ষতির শিকার হয়েছে। 

এই অভিযোগের সঙ্গে দিল্লি এই উদ্বেগও যুক্ত করেছে, চীন ব্রহ্মপুত্রের পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে বলে তাদের অনুমান। বিশেষ করে এ বছর আসামে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে নদীটির প্রবাহের অবিশ্বাস্য হ্রাস-বৃদ্ধি প্রমাণ করে, যান্ত্রিক উপায়ে প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। 

ভারতের দাবি, ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য আদান-প্রদান করতে চীনের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে তার। চীন কর্তৃক প্রয়োজনীয় তথ্য না দে’য়া তাই বড় অন্যায়।

সূত্র মতে, ভারতীয় দাবিতে সত্যতা আছে। ২০০৬ সালে ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ সম্পর্কিত তথ্যবিনিময়ের একটি চুক্তি হয় দুই দেশের মধ্যে। ২০১৩ ও ২০১৬ সালে প্রবাহ তথ্য বিষয়ে উপরিউক্ত ধাঁচের আরও ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ স্বাক্ষর হয় শতদ্রু নদীকে অন্তর্ভুক্ত করে। 

এসব চুক্তি ও সমঝোতার মূল বিষয় হলো প্রতিবছর ১৫ মে থেকে ১৫ অক্টোবর সময়ে ভারতকে ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রবাহের উত্থান-পতন সম্পর্কিত তথ্য দেবে চীন, বিনিময়ে অর্থও নেবে। কিন্তু ভারত অর্থ দিয়েও তথ্য পায়নি।

সে কারণে পদ্মা ও তিস্তা অববাহিকায় কী ধরনের এবং কতটি অবকাঠামো আছে, তা মোটামুটি জানা গেলেও ব্রহ্মপুত্র এবং বরাক নদের ওপর নির্মাণ করা অবকাঠামোর তথ্য সেভাবে পাওয়া যায় না। তাই ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বন্যা ব্যবস্থাপনার জন্য চীন, তিব্বত, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তথ্যবিনিময় জরুরি। একই সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি করা দরকার।

ভারতের তৈরি বাঁধে ক্ষতি বেশি বাংলাদেশের

ভারত ইতিমধ্যে চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করায় নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাস্তব প্রয়োজন নেই।  তবে অরুণাচল প্রদেশ ঘিরে ভারত ও চীন যে ধরনের বিবাদে লিপ্ত, তাতে জ্বালানির জন্য অদরকারি হলেও ভূরাজনৈতিক প্রয়োজনে তারা বাঁধের জবাবে বাঁধ বানাতেও পারে। 

আর বাংলাদেশের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিতে পারে চীনের জবাবে ভারতের অরুণাচলে এই ১০ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জলবিদ্যুতের বাঁধ ও জলাধার তৈরি। 

এই প্রকল্পে পানি সরিয়ে নে’য়ার ব্যবস্থা রাখার কথা বলেছেন এক ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তা। 

সেই ভারতীয় বাঁধ যত নিচের দিকে হবে, বাংলাদেশের দিকে পানিপ্রবাহ তত কমবে। এর মানে হলো, তিব্বতে চীনের পানি আটকে রাখায় যত সমস্যা হবে, অরুণাচলে বাঁধ হলে তা আরও বাড়বে। যেহেতু অরুণাচল থেকেই ব্রহ্মপুত্র বেশি জল পায়।

বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বাড়ছে বন্যা প্রবণতা

দেশে ২০২০ সালের জুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া বন্যায় দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল বিশেষজ্ঞদের কপালে। 

বাংলাদেশের পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারত, নেপাল থেকে শুরু করে পাকিস্তানের কিছু এলাকাও তখন বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এমনকি পূর্ব এশিয়ার দেশ চীন থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং জাপানেরও কিছু এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে।

তবে অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এর কারণ, অন্য দেশগুলোর বন্যা ১০ দিনের বেশি স্থায়ী হচ্ছে না। কিন্তু দেশে বন্যা পরিস্থিতি প্রায় মাস ব্যাপী থাকছে। যা কিছুটা অস্বাভাবিক।

বাংলাদেশে বন্যার ধরন ও পরিবর্তন নিয়ে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নন্দন মুখার্জি ২০ বছর ধরে গবেষণা করছেন। তার গবেষণায় দেখা গেছে, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা অববাহিকায় গড়ে তোলা প্রায় ৫০০টি বাঁধ, ব্যারাজ (সেচের জন্য অবকাঠামো তৈরি করে পানি নিয়ন্ত্রণ) ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র বিভিন্ন নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। 

বাঁধ, ব্যারাজ ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় অবকাঠামোর বেশির ভাগই চীন, ভারত ও নেপালে। ফলে উজানে প্রচুর বৃষ্টি হলে এবং ওই তিন দেশ হঠাৎ করে পানি ছেড়ে দিলে বাংলাদেশের নদ-নদীতে প্রচুর পানি চলে আসছে।

গঙ্গা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা অববাহিকার মৌসুমি বায়ু, বৃষ্টি, পানির প্রবাহের ধরন বিশ্লেষণ করে নন্দন মুখার্জি দেখিয়েছেন, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা অববাহিকায় ঘন ঘন বন্যা হচ্ছে এবং আগের চেয়ে বেশি এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। যে কারণে কুড়িগ্রাম, জামালপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধায় দু-তিন বছর পরপর বড় বন্যা হচ্ছে।

বাড়ছে লবণাক্ততা, কমছে পানি 

সময়ের বিবর্তনে গঙ্গা চুক্তিটি এখন বাংলাদেশের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বিপজ্জনক। চুক্তিটির ৮ নম্বর ধারায় বর্ণিত শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি বণ্টনের সুস্পষ্ট বিধানটি না মেনে ভারত একচেটিয়া পানি সরিয়ে নিচ্ছে। পানি প্রবাহের কোনো ‘গ্যারান্টি বা আরবিট্রেশন’ ধারা সংযোজন না করা চুক্তিটির একটি দুর্বলতা। 

গঙ্গার পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দ্রুত লবণাক্ততা বাড়ছে, অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্রে শুষ্ক মৌসুমে পানিই পাওয়া যাচ্ছে না। শুষ্ক মৌসুমে গোটা বাংলাদেশ ব্রহ্মপুত্রের মাধ্যমে শতকরা ৬৫ ভাগ পানি প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই ৬৫ ভাগ পানির পুরোটাই শুষ্ক মৌসুমে দেশের সামগ্রিক কৃষিকাজ ও লবণাক্ততা রোধের জন্য একান্ত প্রয়োজন। 

ব্রহ্মপুত্র বাংলাদেশের বাহাদুরাবাদে ঢোকার সময় বর্ষায় ১৩ লাখ কিউসেক পানির প্রবাহ নিয়ে ঢুকে; কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে ইদানীং এটির প্রবাহ নিন্মতম পর্যায়ে নেমে এসেছে, যেখানে ন্যূনতম প্রবাহ প্রয়োজন ২,১০,০০০ কিউসেক। ফলে বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ততা এদিকেও ধেয়ে আসছে, যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে আসছে। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর গড়াই নদীর লবণাক্ততা ৮ গুণ বেড়ে যায়। 

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে অঞ্চলটির জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য সম্পদ এবং ওই অঞ্চলের মানুষের জীবন ব্যবস্থার দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির অপার রহস্যে ঘেরা সুন্দরবন।

পলি জমে গভীরতা হারাচ্ছে নদী

বাংলাদেশের মোট প্লাবনভূমির প্রায় ৮০ শতাংশ এই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার মধ্যে অবস্থিত। দেশের একশ পঁচাত্তরটি নদীর অবস্থা শোচনীয়, পঁচাত্তরটি মৃতপ্রায় এবং আশি শতাংশ নদী নাব্য সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশের একসময়ের স্রোতোস্বিনী ব্রহ্মপুত্রের অনেকাংশ হয় মরে গেছে, না হয় নাব্যতা হারিয়েছে।

ধারণা করা হয়, ইতোমধ্যে দেশের পঁচাত্তর শতাংশ নদীর তলদেশে দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে তার গভীরতা এতটাই কমে গেছে যে, এর ফলে এগুলোকে আর নদী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। 

দেশের নদীগুলোর ৯৯.৫ শতাংশ পানির উৎস দেশের উজানে অবস্থিত ওপরের পশ্চিমের রাজ্যগুলো থেকে। প্রবাহিত এই নদীগুলো শুধু পানিই নিয়ে আসে না, সঙ্গে নিয়ে আসে বিপুল পরিমাণে পলি ও অন্যান্য বস্তু।

গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র একসঙ্গে হিমালয় থেকে প্রায় দুই বিলিয়ন টন পলি বহন করে এবং বর্ষার সময় এর পরিমাণ হয় প্রতিদিন দুই মিলিয়ন টন। এই বিপুল পরিমাণের পলল চলার পথে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে কিছু অংশ নদীর তলদেশে জমা হয়, যা দিন দিন নদীর গভীরতা কমাচ্ছে এবং নদীর পানিপ্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে।

তলদেশে পলি জমে ভরাট হতে যাওয়া নদীগুলোর নাব্য রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ড্রেজিং প্রয়োজন। দেশের অনেক অঞ্চলে ড্রেজিংয়ের অপ্রতুলতার জন্য নদী এখন খালে পরিণত হয়েছে। সেক্ষেত্রে নিয়মিত ড্রেজিং করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, পানির কারণেই আরেকটা যুদ্ধের সম্মুখীন হতে পারি আমরা। জলবায়ু বিপর্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফলের পথে রাষ্ট্রগুলোর অনীহা, এই সমস্যাকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। তিস্তার পর ব্রহ্মপুত্রে উজানের দেশ চীন ও ভারতের মহাজনি মেজাজের খবরদারি বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার কপালেই ভয়াবহ দুর্যোগ ডেকে আনবে।  বিশ্বের যে ৪০০ কোটি মানুষ সামনের দিনগুলোতে পানির সম্ভাব্য সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে, তার অর্ধেকই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার।

মুম্বাইভিত্তিক ‘স্ট্র্যাটেজিক ফোরসাইট গ্রুপ’ বলছে, ২০৫০ সাল নাগাদ ভারতে অন্তত ৩০ শতাংশ এবং চীনে অন্তত ৫০ শতাংশ ধান উৎপাদন কমবে পানির অভাবে। উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অস্থিতিশীলতাও বাড়ছে। ফলে আসন্ন দিনগুলোতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণেই চীন ও ভারত আঞ্চলিক নদীগুলোর পানিপ্রবাহ বিষয়ে আপসহীন অবস্থান নিতে বাধ্য হবে, যা কার্যত কোনোরূপ গোলাবারুদ বিনিময় ছাড়াই যুদ্ধরূপী অবস্থা তৈরি করবে।

এসডব্লিউ/এমএন/এসএস/১৬৫৮ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগিতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 72
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    72
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ