Trial Run

বৈষম্য ঘুচাতে পারলে কয়েক মাসেই করোনার লাগাম টানা সম্ভব বলে দাবি ডব্লিএইচওর

পৃথিবীটা ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয় যাচ্ছে। মানুষের পদচারণায় সবসময় মুখর থাকে যে জায়গাগুলো সেখানে এখন ভুতুড়ে নীরবতা। অস্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনযাপন চলছে। একটি ভাইরাস পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কিছু কিছু দেশ নিজেদের সামলে নিলেও এখনো তাণ্ডব চললে বহু দেশে। মৃত্যুর মিছিলে প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছেন শত শত মানুষ। দেশগুলো করোনার সঙ্গে লড়তে লড়তে আস্তে আস্তে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। এই লড়াই শেষ হবে কবে? মানুষ কবে নাগাদ তাদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনে ফিরতে পারবে?

বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারি নিয়ে যখন এমনই হাজারো প্রশ্ন তখন নতুন খবর জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। করোনা মহামারির লাগাম টেনে ধরা যাবে কয়েক মাসেই যদি বিশ্ব চায়। অর্থাৎ, করোনার সরঞ্জামাদি নিয়ে বিশ্বে যে বৈষম্য চলছে তা ঘুচাতে পারলে অল্প কয়েক মাসেই করোনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে জানিয়েছে। সোমবার এক সাংবাদিক বৈঠকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আডানম গেব্রিয়াসিস এমন মন্তব্য করেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এখবর জানিয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর প্রধান টেড্রোস আডানম গেব্রিয়াসিস বলেছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে করোনা মহামারিকে নিয়ন্ত্রণে আনার সামর্থ্য রয়েছে। বিশ্ব চাইলে কয়েক মাসের মধ্যে মহামারি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। সঠিকভাবে করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য এর সরঞ্জাম সঠিকভাবে বণ্টন সবচেয়ে জরুরি বলে জানান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রধান।

গেব্রিয়াসিস বলেন, ধারাবাহিক ও ন্যায্যতার সঙ্গে প্রয়োগ করলে কয়েক মাসের মধ্যেই মহামারিকে নিয়ন্ত্রণে আনার মতো হাতিয়ার আমাদের রয়েছে।

এরই মধ্যে বিশ্বে করোনা ভাইরাসের টিকার ৭৮০ মিলিয়নেরও বেশি ডোজ ছাড়া হয়েছে। তারপরও এর প্রবণতা কমেনি। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রধান টেড্রোস আডানম গেব্রিয়াসিস বলেন, মহামারি এখনই নিয়ন্ত্রণে আসবে না, করোনাকে ঠেকাতে আরও কয়েক মাস সময় লেগে যাবে।

সঠিকভাবে করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য এর সরঞ্জাম সঠিকভাবে বণ্টন সবচেয়ে জরুরি বলে জানান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রধান।

তবে বিশ্বজুড়ে ২৫-৫৯ বছরের মানুষের মধ্যে করোনার সংক্রমণের উদ্বেগজনক হার নিয়ে ডব্লিউএইচও প্রধান উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

টেড্রোস আডানম গেব্রিয়াসিস বলেছেন, করোনার কারণে গত নয় মাসে এক মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছেন। চার মাসে ২ মিলিয়ন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। গত তিন মাসে সেই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৩ মিলিয়নে। এছাড়াও করোনার টিকা গ্রহণের ক্ষেত্রে ধনী দেশগুলোর তুলনায় অপেক্ষাকৃতভাবে পিছিয়ে আছে দরিদ্র দেশগুলো।

আন্তর্জাতিক জলবায়ু অ্যাক্টিভিস্ট গ্রেটা থুনবার্গ সুইডেন থেকে ডব্লিউএইচও-এর সংবাদ সম্মেলনে অতিথি হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন। ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করে গ্রেটা বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণির মানুষ পাওয়ার আগেই ধনী দেশগুলো তাদের তরুণ নাগরিকদের ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু করেছে, যা অনৈতিক।

থুনবার্গ বলেছেন, ধনী দেশে প্রতি চার জনে একজন মানুষ ভ্যাকসিন নিয়েছেন। কিন্তু দরিদ্র দেশে পাঁচ শতাধিক মানুষের মধ্যে একজন ভ্যাকসিন পেয়েছেন।

তিনি বলেন, ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ দ্বারাই ভ্যাকসিন সরবরাহ পরিচালিত হচ্ছে।

এর আগেও ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন বিতরণে হতবাক করা বৈষম্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান ড. টেড্রোস আডানম গেব্রিয়াসিস। প্রতিটি দেশে যে পরিমাণ টিকা প্রয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিলো তা অর্জিত হবে না বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন বিতরণে সমতা আনার জন্য দীর্ঘদিন থেকেই বলে আসছে ডব্লিউএইচও। দরিদ্র দেশগুলোর জন্য ভ্যাকসিন নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা করা কোভ্যাক্স কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছে ডব্লিউএইচও। এই কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত প্রায় একশ’টি দেশে তিন কোটি ৮০ লাখ ডোজ টিকা সরবরাহ করা হয়েছে।

এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ১৯০টি দেশে দুইশ’ কোটি ডোজ টিকা সরবরাহের আশা করছে কোভ্যাক্স। বিশেষ করে ৯২টি দরিদ্র দেশে ধনী দেশগুলোর মতো একই সময়ে একই পরিমাণ টিকা নিশ্চিত করতে চায় কর্মসূচিটি।

ডব্লিউএইচও প্রধান টেড্রোস আডানোম গেব্রিয়াসিস বলেছেন, ‘বিশ্বজুড়ে টিকা সরবরাহে হতবাক করার মতো বৈষম্য রয়েছে। উচ্চ-আয়ের দেশগুলোতে প্রতি চার জনের মধ্যে এক জন করোনাভাইরাসের টিকা পেয়েছেন। নিম্ন-আয়ের দেশগুলোতে এর পরিমাণ প্রতি পাঁচশ’ জনে এক জন।’

কোভ্যাক্স কর্মসূচির বাইরে টিকা পেতে যেসব দেশ নিজেরা চুক্তি করছে তাদেরও সমালোচনা করেন ডব্লিউএইচও প্রধান। তিনি বলেন, ‘কিছু দেশ ও কোম্পানি নিজেদের রাজনৈতিক কিংবা বাণিজ্যিক কারণে কোভ্যাক্স এড়িয়ে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করছে।’ এইসব চুক্তি ভ্যাকসিন বৈষম্য বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে বলে জানান তিনি। ড. টেড্রোস বলেন, ‘ভ্যাকসিন সরবরাহের এই ঘাটতি ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের দিকে ধাবিত করছে।’

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া ও চীনে উৎপাদিত টিকা ইতোমধ্যেই ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়েছে। তবে সব দেশের মধ্যে এই টিকা সমভাবে বন্টন করা হয়নি। উচ্চ-আয়ের দেশগুলোর কাছে বর্তমানে ৪৬০ কোটি ডোজ টিকা রয়েছে, নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশগুলোর কাছে আছে মাত্র ৬৭ কোটি ডোজ টিকা।

এদিকে ব্লুমবার্গে ভ্যাকসিন ট্র্যাকারের তথ্য অনুযায়ী, ধনী দেশগুলোয় টিকাদান কার্যক্রম চলছে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর তুলনায় ২৫ গুণ দ্রুত।

ধনী দেশের সরকারগুলো টিকা উৎপাদক প্রতিষ্ঠান থেকে শত শত কোটি ডোজ আগাম চুক্তির ভিত্তিতে কিনে রেখেছে। ফলে এমন বৈষ্যমের চিত্র বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা যাচ্ছে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে টিকার সুষম বণ্টন নিশ্চিতে এখনও কোনো উপায় বা পদ্ধতির প্রয়োগ দেখা যায়নি।

এদিকে ভ্যাকসিন থেকে দরিদ্র দেশ বঞ্চিত হলে ক্ষতির মুখে পড়বে বিশ্ব অর্থনীতি। এতে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ধাক্কা উন্নয়শীল দেশগুলোর মতো উন্নত দেশগুলোতেও লাগবে বলে অতীতের কয়েকটি গবেষণা জানিয়েছিল। সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও চলতি বছরের মাঝামাঝিতে ধনী দেশগুলো তাদের শতভাগ নাগরিককে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনতে পারবে।  অথচ তখনো ভ্যাকসিনেশন থেকে অনেক দূরে থাকবে দরিদ্র দেশগুলো।  এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হবে। এ অংকটি জাপান ও জার্মানির সম্মিলিত বার্ষিক জিডিপির চেয়েও বড়। তবে এ ক্ষতিতে এখানে অর্ধেকের বেশি মূল্য চুকাতে হবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ব্রিটেনের মতো ধনী দেশগুলোকে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুনাফার আগে মানুষের জীবন নিয়ে ভাবতে হবে। কার পকেটে কত টাকা রয়েছে, তাই যদি জীবনরক্ষাকারী ভ্যাকসিন ব্যবহারের মানদণ্ড হয়, তবে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ এই মহামারি প্রতিরোধে টিকা নিতে অসমর্থ হবে। তারা বলেন, বিজ্ঞানের অর্জন যেন মানুষের জীবনরক্ষাকারী না হয়ে শুধু ওষুধ কোম্পানিগুলোর মুনাফা অর্জনের পথ না হয়। তারা বলেন, এই মহামারিটি একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা, যার একটি বৈশ্বিক সমাধান প্রয়োজন। আর যতক্ষণ না পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষের এই ভ্যাকসিন নেওয়ার সামর্থ্য রইবে না, ততক্ষণ বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে।

এসডব্লিউ/এমএন/কেএইচ/১৩৩২ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগিতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগিতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগিতার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

ছড়িয়ে দিনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মতামত জানানঃ