বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি। নীল জলরাশি, প্রবাল, সারি সারি নারকেলগাছ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য আর নির্জন সৈকতের আকর্ষণে প্রতিবছর এখানে ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক। পর্যটন মৌসুম শুরু হলে দ্বীপের অর্থনীতি প্রাণ ফিরে পায়। হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, নৌযান ও স্থানীয় ব্যবসাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় কর্মসংস্থানের সুযোগ। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে যদি পর্যটকের জীবনের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে সেই পর্যটন কতটা দায়িত্বশীল? সেন্টমার্টিনের বর্তমান পরিস্থিতি এই প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে।
সমকালের ২৭ অক্টোবর ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দ্বীপটিতে থাকা আড়াইশর বেশি হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর একটিরও ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নেই। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদনও নেই। অনেক স্থাপনায় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, পয়োশোধনাগার ও জরুরি নির্গমনপথের মতো মৌলিক ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত একটি দ্বীপের জন্য এই চিত্র শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত নয়, বরং মানুষের জীবন, পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
পর্যটন ব্যবসার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত নিরাপত্তা ও আস্থা। একজন পর্যটক যখন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোনো রিসোর্টে ওঠেন, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেন, সেখানে অন্তত আগুন লাগলে বের হওয়ার পথ আছে, প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রয়েছে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সাহায্য পাওয়ার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানে এসবের নিশ্চয়তা না থাকলে অতিথির নিরাপত্তা কার্যত ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। বাহ্যিক সৌন্দর্য, আধুনিক সাজসজ্জা কিংবা আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন তখন নিরাপত্তার প্রকৃত ঘাটতি আড়াল করার উপায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সেন্টমার্টিনের অনেক রিসোর্ট ইট, কাঠ ও বাঁশের মতো উপকরণ দিয়ে তৈরি। এসব উপকরণ দিয়ে নান্দনিক স্থাপনা নির্মাণ করা সম্ভব হলেও অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। কাঠ ও বাঁশের তৈরি ঘরে আগুন লাগলে, বিশেষ করে বাতাস প্রবল থাকলে, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, আগুন শনাক্ত করার অ্যালার্ম, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, পানি সরবরাহ এবং বিকল্প বের হওয়ার পথ না থাকলে ছোট একটি দুর্ঘটনাও বড় বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে। রাতে পর্যটকেরা ঘুমিয়ে থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে গেলে প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়।
কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় গত ১৭ অক্টোবর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা এই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনার পরও যদি পর্যটন স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান না হয়, তাহলে তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রশ্ন উঠবেই। দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ কিংবা তদন্তের আশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়ে জরুরি হলো একই ধরনের দুর্ঘটনা যাতে অন্য কোথাও না ঘটে, সে জন্য আগাম প্রস্তুতি নিশ্চিত করা।
সেন্টমার্টিনের ক্ষেত্রে ঝুঁকির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভৌগোলিক অবস্থান। দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। সেখানে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে টেকনাফ থেকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের স্পিডবোট ভাড়া করে যেতে হয়। আবহাওয়া খারাপ থাকলে বা সমুদ্র উত্তাল হলে দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ স্থলভাগের কোনো পর্যটনকেন্দ্রে আগুন লাগলে যে ধরনের তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া সম্ভব, সেন্টমার্টিনে তা নিশ্চিত করা অনেক বেশি জটিল। এই বাস্তবতায় দ্বীপটির নিজস্ব অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা নিছক প্রশাসনিক সুবিধা নয়, বরং অপরিহার্য প্রয়োজন।
টেকনাফ ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কমান্ডারের বক্তব্য অনুযায়ী, দ্বীপে আগুন লাগার খবর পেলে মূল ভূখণ্ড থেকে গিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে হয়। অন্যদিকে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারাও দ্বীপের হোটেল-রিসোর্টগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসের একটি দল দ্বীপ পরিদর্শনে যাওয়ার পরিকল্পনার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয় হলেও প্রশ্ন হলো, এত দিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা গড়ে ওঠার সময় নিয়মিত পরিদর্শন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কোথায় ছিল?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দ্বীপটিতে অন্তত ১৫০টি হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ তৈরি হয়েছে। এই পরিসংখ্যান পর্যটন ব্যবসার সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু ব্যবসা বেড়েছে বলেই কি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে? নতুন স্থাপনা নির্মাণের আগে অনুমোদন, নির্মাণকাজ চলাকালে তদারকি এবং ব্যবসা পরিচালনার আগে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র যাচাই করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কোনো প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর পরিচালিত হওয়ার পরও যদি মৌলিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণ না করে, তাহলে তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এখানে শুধু হোটেলমালিকদের দায় দেখলেই পুরো সমস্যার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না। ব্যবসায়ীরা মুনাফার জন্য নিরাপত্তা খাতে ব্যয় কমিয়ে থাকলে তা অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আসা উচিত। কিন্তু অবৈধ বা অননুমোদিত স্থাপনা কীভাবে গড়ে উঠছে, কীভাবে সেগুলো পর্যটক গ্রহণ করছে এবং কেন নিয়মিত পরিদর্শনে ঘাটতি থাকছে, সেসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে অনিয়মের তদন্ত করতে হবে, তবে প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা সমীচীন নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, নিয়মিত পরিদর্শন এবং আইনের সমান প্রয়োগ।
অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি পর্যটন স্থাপনায় অন্তত উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, আগুন শনাক্ত করার অ্যালার্ম, নিরাপদ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, জরুরি আলোকসজ্জা, স্পষ্ট নির্দেশনাসহ নির্গমনপথ এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ থাকা দরকার। বহুতল বা বড় স্থাপনার ক্ষেত্রে ভবনের নকশা ও ঝুঁকি অনুযায়ী অতিরিক্ত ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। শুধু একটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কিনে রাখলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেটি কার্যকর আছে কি না, কর্মীরা ব্যবহার করতে জানেন কি না এবং জরুরি অবস্থায় অতিথিদের কীভাবে নিরাপদে বের করা হবে, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।
দ্বীপের জন্য একটি স্থায়ী বা পর্যটন মৌসুমে কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তা ইউনিট গড়ে তোলার দাবিও দীর্ঘদিনের। স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা পর্যটক এবং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য এমন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। সেন্টমার্টিনের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় ফায়ার সার্ভিসের একটি উপযুক্ত ইউনিট, প্রশিক্ষিত কর্মী, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে, যাতে মূল দল পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত তাঁরা নিরাপদভাবে প্রাথমিক সহায়তা দিতে পারেন। তবে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছাড়া সাধারণ মানুষকে আগুন নেভানোর ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়।
নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দ্বীপটির পরিবেশগত সংকট। সেন্টমার্টিন দেশের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার একটি। এর প্রবাল, সামুদ্রিক কাছিমের প্রজননক্ষেত্র, উপকূলীয় উদ্ভিদ ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবর্জনা, প্লাস্টিক, অপরিশোধিত বর্জ্য, শব্দদূষণ এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামোর চাপও বাড়তে পারে। হোটেল-রিসোর্টে পয়োশোধনাগার না থাকলে বর্জ্য মাটি ও সমুদ্রের পানিতে মিশে দূষণ ঘটাতে পারে। এতে শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, দ্বীপের সৌন্দর্য ও পর্যটনের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
দক্ষিণপাড়া সৈকত সামুদ্রিক কাছিমের প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন সংবেদনশীল এলাকায় অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ এবং পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। উন্নয়নের নামে প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হলে তার ক্ষতি সহজে পূরণ করা যায় না। প্রবাল ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হলে স্থানীয় মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলের পরিবেশও প্রভাবিত হতে পারে। ফলে সেন্টমার্টিনে পর্যটন ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য শুধু বেশি পর্যটক আনা হওয়া উচিত নয়; বরং পরিবেশের ধারণক্ষমতার মধ্যে পর্যটন পরিচালনা করাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে অননুমোদিত স্থাপনার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে। গত এক বছরে ৩১টি হোটেলের বিরুদ্ধে মামলা এবং ১৫টি হোটেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তিন লাখ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করার কথা বলা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশ্ন থেকে যায়, জরিমানা ও মামলা কি অনিয়ম বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট? যদি কোনো প্রতিষ্ঠান জরিমানা দিয়েও একইভাবে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে, তাহলে শাস্তির কার্যকারিতা কমে যায়। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্থাপনাগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাধ্য করতে হবে। গুরুতর ঝুঁকি থাকলে আইন অনুযায়ী পর্যটক গ্রহণ বন্ধ রাখার মতো ব্যবস্থাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পর্যটন মৌসুমকে ঘিরে সরকারের নির্দেশনায় এবারও রাতযাপনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ বহাল থাকার কথা জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নভেম্বরে রাতযাপন করা যাবে না, তবে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সুযোগ থাকবে। পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু শুধু পর্যটকের সংখ্যা সীমিত করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। নির্ধারিত সীমার মধ্যে পর্যটক এলেও তাঁদের থাকার জায়গা নিরাপদ হতে হবে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর থাকতে হবে এবং পরিবেশগত বিধিনিষেধ মানতে হবে। অন্যথায় নিয়ন্ত্রিত পর্যটনও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সেন্টমার্টিনের পর্যটন খাত স্থানীয় মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। তাই নিরাপত্তার নামে সব ব্যবসাকে একসঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া যেমন বাস্তবসম্মত সমাধান নয়, তেমনি পর্যটন ব্যবসা সচল রাখার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন ধাপে ধাপে বাস্তবসম্মত সংস্কার। প্রথমে দ্বীপের সব হোটেল-রিসোর্টের তালিকা তৈরি করে অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকি যাচাই করতে হবে। এরপর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি নির্ধারণ করে সময়সীমা দিতে হবে। ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে এবং নিয়মিত পরিদর্শনের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। এতে পর্যটকেরা কোথায় নিরাপদে থাকতে পারবেন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটনসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব স্পষ্ট করতে হবে। কে অনুমোদন যাচাই করবে, কে নিরাপত্তা পরিদর্শন করবে, কে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে এবং অনিয়ম ধরা পড়লে কে ব্যবস্থা নেবে—এসব বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকলে দায় এড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। একটি সমন্বিত তদারকি কাঠামো, নির্ধারিত পরিদর্শনসূচি এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা এই সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিরাপত্তাকে ব্যবসার অতিরিক্ত খরচ হিসেবে নয়, দায়িত্বশীল পর্যটনের মৌলিক শর্ত হিসেবে দেখা। পর্যটকরা শুধু সুন্দর সমুদ্রসৈকত দেখতে যান না; তাঁরা নিরাপদে ঘুরতে, থাকতে এবং সুস্থভাবে ফিরে আসতেও চান। তাঁদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোটেলমালিক, প্রশাসন ও সরকারের সম্মিলিত দায়িত্ব। একই সঙ্গে পর্যটকদেরও নির্ধারিত নিয়ম মানতে হবে, যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং পরিবেশের ক্ষতি করে এমন আচরণ এড়িয়ে চলতে হবে।
সেন্টমার্টিনের সামনে এখন দুটি পথ—একদিকে অপরিকল্পিত স্থাপনা, দুর্বল নজরদারি ও পরিবেশদূষণের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি ব্যবসায়িক লাভ; অন্যদিকে নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি। প্রথম পথটি দ্বীপের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলবে। দ্বিতীয় পথের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীলতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ।
আড়াইশর বেশি পর্যটন স্থাপনার একটিরও ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র না থাকার তথ্য তাই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি পুরো ব্যবস্থার জন্য সতর্কসংকেত। কোনো বড় দুর্ঘটনার পর নতুন করে শোক প্রকাশের অপেক্ষা না করে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ, সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য রক্ষা করা যেমন জাতীয় দায়িত্ব, তেমনি সেখানে বেড়াতে যাওয়া প্রতিটি মানুষের জীবন সুরক্ষিত রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত পর্যটন উন্নয়ন তখনই সফল হবে, যখন প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে কাউকে নিজের জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়তে হবে না।
আপনার মতামত জানানঃ