ভারতের ইতিহাসে মানববলি ও শিশু বলি এমন একটি সংবেদনশীল বিষয়, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার, ঔপনিবেশিক প্রশাসনের বিবরণ এবং অপরাধের ইতিহাস পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে শিশু বা কিশোরকে বলি দেওয়ার কাহিনি রয়েছে। আবার ঔপনিবেশিক আমলের কিছু নথি এবং পরবর্তী সময়ের প্রকাশিত অপরাধসংক্রান্ত বিবরণেও ধর্মীয় উদ্দেশ্যে শিশু হত্যার অভিযোগ পাওয়া যায়। ফলে বিষয়টিকে নিছক পৌরাণিক কাহিনি বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা থেকে গোটা ভারতীয় সমাজ বা একটি ধর্মের সামগ্রিক চরিত্র নির্ধারণ করাও ইতিহাসসম্মত নয়। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কোন তথ্য কেবল ধর্মীয় আখ্যান, কোনটি সমসাময়িক অভিযোগ এবং কোন ঘটনার পক্ষে বাস্তব অপরাধের নথি রয়েছে।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রাচীন সাহিত্য থেকে শুরু করে ঊনবিংশ শতকের প্রশাসনিক দলিল এবং বিংশ শতকের ফৌজদারি মামলার বিবরণ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের উৎস পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এসব সূত্রের গুরুত্ব এক নয়। কোনো ধর্মীয় গ্রন্থে বলির বর্ণনা পাওয়া গেলে সেটি প্রাচীন মানুষের ধর্মীয় কল্পনা, আচার বা বিশ্বাস সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে কোনো শিশুকে হত্যা করে দেবতার উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়েছিল কি না, তা প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, আদালতের নথি, তদন্তের বিবরণ এবং অন্যান্য স্বাধীন প্রমাণের প্রয়োজন হয়।
প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে শিশু বলির প্রসঙ্গ আলোচনায় শুনঃশেফের কাহিনি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে বর্ণিত এই কাহিনিতে একটি বালককে যজ্ঞে উৎসর্গ করার পরিকল্পনার কথা উঠে আসে। রাজা হরিশ্চন্দ্রের পুত্রকে ঘিরে প্রতিজ্ঞা ও যজ্ঞের সংকটের মধ্য দিয়ে শুনঃশেফের কাহিনি বিকশিত হয়েছে। পরবর্তী কিছু বর্ণনায় এই আখ্যানের সঙ্গে রাজা অম্বরীষের নামও যুক্ত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রার্থনা ও দেবতাদের কৃপায় বালকটি রক্ষা পায় বলে কাহিনিতে বর্ণিত হয়েছে।
এই আখ্যান প্রাচীন ভারতীয় ধর্মীয় সাহিত্যে মানববলির ধারণা এবং তা থেকে মুক্তির বিষয়টি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুনঃশেফের কাহিনিকে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক শিশুহত্যার প্রত্যক্ষ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। এটি একটি ধর্মীয় সাহিত্যিক উৎস, যার ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও রচনাপ্রেক্ষাপট আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার। প্রাচীন গ্রন্থে কোনো প্রথার উল্লেখ থাকলেই সেই প্রথা সব সময়ে বা সব অঞ্চলে বাস্তবে প্রচলিত ছিল—এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়।
শিশু বলির ইতিহাস অনুসন্ধানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো ঊনবিংশ শতকের ভারতীয় গবেষণা। রাজেন্দ্রলাল মিত্র ১৮৭৬ সালে ‘On Human Sacrifices in Ancient India’ শিরোনামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। প্রাচীন ভারতীয় ধর্মীয় সাহিত্যে মানববলির উল্লেখ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে তাঁর কাজ উল্লেখযোগ্য। এই ধরনের গবেষণা দেখায়, মানববলি নিয়ে আলোচনা আধুনিক সময়ে শুরু হয়নি; উনিশ শতকেও ভারতীয় ইতিহাস ও ধর্মীয় সাহিত্য বিশ্লেষণের অংশ হিসেবে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
তবে প্রাচীন সাহিত্যের উল্লেখ, ধর্মীয় বিধান এবং বাস্তবে সংঘটিত ঘটনার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা অপরিহার্য। কোনো গ্রন্থে মানববলির ধারণা পাওয়া গেলেই সেই সমাজে নিয়মিত মানববলি হতো, এমন প্রমাণ তৈরি হয় না। একইভাবে কোনো নির্দিষ্ট আচার সম্পর্কে পরবর্তী যুগের ব্যাখ্যাকে প্রাচীন যুগের প্রত্যক্ষ বিবরণ বলে ধরে নেওয়াও ভুল হতে পারে। তাই প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের পাশাপাশি সমসাময়িক সামাজিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের সন্ধান জরুরি।
ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসনিক নথি এই আলোচনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মানববলি, কন্যাশিশু হত্যা এবং ধর্মীয় আচারকে ঘিরে অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন। ব্রিটিশ লাইব্রেরির India Office Records-এ ১৮৫৫ সালের একটি আর্কাইভ রেকর্ড রয়েছে, যেখানে ওড়িশার খোন্দ সম্প্রদায়ের মধ্যে মানববলি ও কন্যাশিশু হত্যার অভিযোগ দমনে প্রশাসনিক তৎপরতার প্রসঙ্গ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এই নথি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে ঊনবিংশ শতকে এসব অভিযোগ প্রশাসনিক আলোচনার বিষয় ছিল এবং সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষিত হয়েছে। কিন্তু একটি প্রশাসনিক রেকর্ডের অস্তিত্ব আর সেখানে উল্লিখিত প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা এক বিষয় নয়। ঔপনিবেশিক কর্মকর্তারা অনেক সময় স্থানীয় দোভাষী, সংবাদদাতা বা অন্য কর্মকর্তার বিবরণের ওপর নির্ভর করতেন। তাঁদের তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় সমাজ সম্পর্কে জ্ঞান এবং ঔপনিবেশিক শাসনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ভারতের বিভিন্ন আদিবাসী ও আঞ্চলিক সম্প্রদায় সম্পর্কে ঔপনিবেশিক যুগে প্রকাশিত বিবরণে কখনো মানববলি, কখনো শিশু হত্যা এবং কখনো ধর্মীয় উদ্দেশ্যে মানুষ উৎসর্গের অভিযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু সব অভিযোগের প্রমাণের মান সমান ছিল না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশাসনিক তদন্ত বা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ছিল, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিবরণটি ছিল শোনা কথা বা যাচাই না করা অভিযোগ। আধুনিক ইতিহাসচর্চায় তাই এসব নথি ব্যবহার করার সময় লেখকের বক্তব্য এবং প্রতিষ্ঠিত ঘটনার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা হয়।
এই পার্থক্যের একটি উদাহরণ পাওয়া যায় মধ্য ভারতের জনগোষ্ঠী নিয়ে প্রকাশিত ঊনবিংশ শতকের একটি নৃতাত্ত্বিক গ্রন্থে। ‘The Tribes and Castes of the Central Provinces of India’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে একটি বালকের অপহরণ এবং ধর্মীয় উদ্দেশ্যে তাকে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে সাক্ষ্যের বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু গ্রন্থটির বর্ণনা অনুযায়ী, দীর্ঘ পুলিশি তদন্তেও সাক্ষ্যের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যদিও তা সম্পূর্ণভাবে খণ্ডনও করা যায়নি।
এই নথির মূল্য এখানেই যে এটি একটি ঐতিহাসিক অভিযোগ ও সাক্ষ্যের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা অনিশ্চিত থাকায় একে আদালতে প্রমাণিত শিশু বলির ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। ঐতিহাসিক গবেষণার সততা বজায় রাখতে হলে প্রমাণের সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করতে হয়। কোনো ঘটনার বিবরণ যত ভয়াবহই হোক, তার সত্যতা যাচাইয়ের বিকল্প হিসেবে আবেগ বা অনুমানকে গ্রহণ করা যায় না।
বিংশ শতকের একটি নির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলার বিবরণ এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির সালেম অঞ্চলে একটি শিশুহত্যার ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত বিবরণে চিন্না চেট্টি নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাঁর দুগ্ধপোষ্য পুত্র হনুমাদুকে হত্যার অভিযোগের কথা উঠে আসে। সাক্ষ্য ও ঘটনার বিবরণে মারিয়াম্মান দেবীর উদ্দেশে শিশুটিকে বলি দেওয়ার পরিকল্পনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়। ঘটনাটি পরবর্তী সময়ে ‘The Indian Medical Gazette’-এর ১৯৩৭ সালের একটি সংখ্যায় আলোচিত হয়।
এই ঘটনার গুরুত্ব হলো, এখানে আলোচনা কেবল প্রাচীন ধর্মীয় কাহিনি বা পৌরাণিক আখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; একটি নির্দিষ্ট সময়, ব্যক্তি, শিশু এবং ফৌজদারি অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। ফলে এটি ঐতিহাসিক অপরাধের নথি হিসেবে গবেষণার উপযোগী। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার: কোনো চিকিৎসা বা সাময়িকী প্রকাশনায় মামলার বিবরণ থাকা মানেই তার প্রতিটি তথ্য আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে, এমন নয়। অভিযোগ, সাক্ষ্য, তদন্তের ফলাফল এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়—এসব আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।
সালেমের ঘটনাটি তাই শিশু বলির ইতিহাস নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলেও সেটিকে ব্যবহার করার সময় সতর্ক ভাষা প্রয়োজন। মামলায় কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, সাক্ষীরা কী বলেছিলেন এবং আদালত শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত দিয়েছিল—এসব তথ্য নির্ভরযোগ্য মূল নথি থেকে যাচাই না করে কোনো চূড়ান্ত দাবি করা উচিত নয়। তবু ঘটনাটির বিবরণ থেকে বোঝা যায় যে বিংশ শতকের প্রথমার্ধেও ভারতে ধর্মীয় বলির উদ্দেশ্যে শিশু হত্যার অভিযোগ একটি নির্দিষ্ট অপরাধসংক্রান্ত আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল।
মানববলি ও শিশু বলির ইতিহাসে ধর্মীয় আচার এবং বাস্তব অপরাধের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে পশুবলি প্রচলিত থাকলেই সেখানে মানববলি বা শিশু বলি প্রচলিত ছিল, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। একইভাবে কোনো তান্ত্রিক গ্রন্থে মানববলির উল্লেখ পাওয়া গেলেও তা থেকে সাধারণ কালীপূজা বা শক্তি উপাসনায় শিশু বলি দেওয়া হতো বলে দাবি করা যায় না। ধর্মীয় ঐতিহ্য অঞ্চল, সময়, সম্প্রদায় এবং ব্যাখ্যাভেদে বহুবিধ রূপ ধারণ করেছে।
এই কারণে ভারতের ইতিহাসে মানববলি নিয়ে গবেষণা করতে গেলে ধর্মীয় গ্রন্থ, লোককাহিনি, প্রশাসনিক বিবরণ, আদালতের নথি এবং আধুনিক গবেষণাকে একত্রে বিবেচনা করা দরকার। ডেভিড ডিন শুলম্যানের ‘The Hungry God: Hindu Tales of Filicide and Devotion’ গ্রন্থে ধর্মীয় আখ্যান, সন্তান হত্যা এবং ভক্তির ধারণার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ ধরনের গবেষণা ধর্মীয় সাহিত্যে সন্তান উৎসর্গের কাহিনির সাংস্কৃতিক ও নৈতিক তাৎপর্য বোঝার ক্ষেত্রে সহায়তা করে। তবে সাহিত্যিক আখ্যানের বিশ্লেষণ এবং কোনো নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের ঐতিহাসিক প্রমাণ প্রতিষ্ঠা—দুটি পৃথক গবেষণার কাজ।
ঔপনিবেশিক নথির ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রযোজ্য। ব্রিটিশ শাসনামলে কিছু সামাজিক প্রথা বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেই উদ্যোগের সঙ্গে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শ্রেণিবদ্ধ করা এবং ভারতীয় সমাজ সম্পর্কে ঔপনিবেশিক ধারণা প্রচারের সম্পর্কও ছিল। ফলে এসব নথি একদিকে অতীতের অভিযোগ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের তথ্য দেয়, অন্যদিকে সেই সময়ের শাসনব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গিও প্রকাশ করে। ইতিহাসবিদদের কাজ হলো দুই দিকই পরীক্ষা করা।
শিশু বলি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আরও একটি নৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে: কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের দায় কি একটি সম্পূর্ণ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো যায়? ইতিহাসের উত্তর হলো, না। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ধর্মীয় উদ্দেশ্যের কথা বলে অপরাধ করলে সেই অপরাধের দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা থেকে কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস ও আচরণ সম্পর্কে সাধারণ সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রমাণনির্ভর গবেষণার পরিপন্থী। একইভাবে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো অপরাধের অভিযোগকে যাচাই ছাড়া সত্য ধরে নেওয়াও অন্যায়।
ভারতে শিশু বলির ইতিহাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে তাই তিন ধরনের সিদ্ধান্ত আলাদা রাখা উচিত। প্রথমত, প্রাচীন ধর্মীয় সাহিত্য ও লোককাহিনিতে শিশু বা কিশোরকে উৎসর্গ করার ধারণার উল্লেখ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক নথি ও নৃতাত্ত্বিক গ্রন্থে কিছু অঞ্চলে মানববলি বা শিশু হত্যার অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে, যদিও সব অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত নয়। তৃতীয়ত, বিংশ শতকের নির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলার বিবরণে ধর্মীয় বলির উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে শিশুহত্যার অভিযোগের উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব তথ্য একত্রে বিষয়টির ঐতিহাসিক অনুসন্ধানকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে, কিন্তু সব সময়ে বা সব অঞ্চলে শিশু বলি প্রচলিত ছিল—এমন সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করে না।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ভারতে শিশু বলির ইতিহাসকে শুধু পৌরাণিক কাহিনি কিংবা কেবল আধুনিক অপরাধের ঘটনা হিসেবে দেখলে বিষয়টির পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। প্রাচীন সাহিত্য ধর্মীয় ধারণার ইতিহাস জানায়; ঔপনিবেশিক নথি নির্দিষ্ট সময়ে প্রচলিত অভিযোগ ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়ার তথ্য দেয়; আর ফৌজদারি মামলার বিবরণ বাস্তব ঘটনার অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সরবরাহ করে। কিন্তু প্রতিটি উৎসের প্রমাণমূল্য আলাদা। কোনো ঘটনার সত্যতা নির্ধারণ করতে হলে মূল নথি, সাক্ষ্য, তদন্তের ফলাফল এবং আদালতের সিদ্ধান্ত যাচাই করা অপরিহার্য।
ইতিহাসের দায়িত্ব কোনো ধর্মকে অভিযুক্ত করা বা কোনো সম্প্রদায়ের অতীতকে একমাত্রিকভাবে উপস্থাপন করা নয়। বরং নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে কোন ঘটনা ঘটেছিল, কোনটি অভিযোগ হিসেবে রয়ে গেছে এবং কোনটি সাহিত্যিক বা ধর্মীয় আখ্যান—তা স্পষ্ট করা। ভারতের ইতিহাসে শিশু বলি নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও এই নীতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রমাণ যেখানে শক্তিশালী, সেখানে তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে; আর যেখানে প্রমাণ অসম্পূর্ণ, সেখানে অনিশ্চয়তাকে স্বীকার করতে হবে। এভাবেই অতীতের একটি সংবেদনশীল বিষয়কে আবেগের পরিবর্তে ইতিহাস, দলিল এবং যুক্তির আলোকে বিচার করা সম্ভব।
আপনার মতামত জানানঃ