
ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। শ্রমিকেরা কারখানার ফটকের দিকে হাঁটছেন। ভেতরে যন্ত্র প্রস্তুত, দেয়ালে ঘড়ি। কয়েক মিনিট দেরি মানে শুধু কাজের শুরু পিছিয়ে যাওয়া নয়; হাজিরার খাতায় অপরাধী হয়ে ওঠা। শিল্পযুগের এই পরিচিত দৃশ্য একটি বড় পরিবর্তনের কথা বলে: মানুষ কখন কাজ করবে, কতক্ষণ করবে এবং কখন থামবে—সেসব সিদ্ধান্তের ক্ষমতা ক্রমে তার নিজের হাত থেকে সরে যাচ্ছে।
আজ অফিসে ঢোকার সময় আঙুলের ছাপ দেওয়া কিংবা কাজের সময় সফটওয়্যারে নথিভুক্ত করার অভিজ্ঞতা থেকে দৃশ্যটি খুব দূরের মনে হয় না। কিন্তু এর ইতিহাস কেবল একটি যন্ত্রের ইতিহাস নয়। ঘড়ি কীভাবে শ্রমের মূল্য, শৃঙ্খলা এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সীমানা নির্ধারণের উপকরণ হয়ে উঠল, সেটিই এই ইতিহাসের কেন্দ্র।
কাজের ছন্দ থেকে ঘণ্টার হিসাব
কারখানার আগে মানুষ সময় বুঝত না—এমন ধারণা ভুল। কৃষককে ঋতু ও আবহাওয়ার হিসাব রাখতে হতো; জেলেকে জোয়ারভাটার। কাজের তাগিদ কখনো অত্যন্ত কঠোর ছিল। ফসল তোলার মৌসুমে দিনের দৈর্ঘ্য বিশ্রামের নিশ্চয়তা দিত না। আবার গৃহভিত্তিক উৎপাদনেও ব্যবসায়ীর চাহিদা ও দারিদ্র্যের চাপ ছিল।
ইতিহাসবিদ ই. পি. থম্পসন তাঁর ১৯৬৭ সালের বিখ্যাত প্রবন্ধে ‘কাজকেন্দ্রিক’ সময়বোধের সঙ্গে ঘড়িনির্ভর শ্রমের পার্থক্য ব্যাখ্যা করেন। প্রথম ক্ষেত্রে কাজের প্রয়োজন অনুযায়ী দিনের ছন্দ বদলাতে পারে; কাজ ও সামাজিক জীবনের মধ্যে কিছু মিশ্রণ থাকে। শিল্পপুঁজিবাদে নির্দিষ্ট ঘণ্টার ওপর নিয়োগকর্তার দাবি আরও শক্তিশালী হয়। এই রূপান্তর ছিল দীর্ঘ, অসম এবং প্রতিরোধপূর্ণ। ঘড়ি একদিনে এসে পুরোনো জীবনকে সরিয়ে দেয়নি।
এই পার্থক্যকে সহজ করতে একটি উদাহরণ ধরা যায়। নিজের কর্মশালায় কাজ করা একজন কারিগর একটি জিনিস শেষ করে কিছুক্ষণ থামার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বড় কারখানার শ্রমিকের ক্ষেত্রে তাঁর অংশের কাজ শেষ হলেও নির্ধারিত পালা শেষ নাও হতে পারে। তখন পরবর্তী নির্দেশের জন্য প্রস্তুত থাকাও চাকরির অংশ। অবশ্য সব কারিগর স্বাধীন ছিলেন না, আর সব কারখানায় একই ব্যবস্থা ছিল না। উদাহরণটি পরিবর্তনের যুক্তি বোঝায়, গোটা অতীতের একমাত্র ছবি নয়।
কারখানায় একটি সুতো তৈরির কাজ অন্য একটি কাজের সঙ্গে যুক্ত। একই ভবনে বহু শ্রমিক ও যন্ত্রের সমন্বয় প্রয়োজন। ফলে সবার সময় মেলানোর বাস্তব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সমন্বয়ের প্রয়োজন থেকেই কার হাতে কতটা কর্তৃত্ব থাকবে, তার ন্যায্য উত্তর পাওয়া যায় না। কাজের শুরু, বিরতি ও সমাপ্তি একতরফাভাবে ঠিক করার ক্ষমতাই সময়ের ব্যবস্থাপনাকে ক্ষমতার সম্পর্কে পরিণত করে।
ঘড়ি যখন হাজিরার সাক্ষী
সময় মাপার সঙ্গে সময়ের প্রমাণ রাখার পার্থক্য আছে। দেয়ালের ঘড়ি দেখে একজন শ্রমিক জানতে পারেন কখন বাড়ি ফিরবেন। হাজিরা রেকর্ডের যন্ত্র ব্যবস্থাপনাকে জানায় তিনি কখন এসেছেন, কখন গেছেন। একই সময় এবার বেতন ও উপস্থিতির হিসাবের নথি হয়ে যায়।
ব্রিটেনের সায়েন্স মিউজিয়াম গ্রুপের সংগ্রহে থাকা একটি হাজিরা রেকর্ডারের বিবরণে দেখা যায়, কর্মী কার্ড ঢুকিয়ে লিভার টানলে তাতে সময় ছাপা হতো। তাদের আরেকটি বৈদ্যুতিক রেকর্ডারের বিবরণে একটি কারখানার ১৭টি বে বা কর্মস্থলজুড়ে অন্তত ৩০টি এমন ঘড়ি ব্যবহারের কথা আছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আকার বাড়ার সঙ্গে সময় নথিভুক্ত করার অবকাঠামোও কতটা বিস্তৃত হয়েছিল, বস্তুগুলো তার সাক্ষ্য দেয়।
নির্ভরযোগ্য রেকর্ড শ্রমিকের পাওনা প্রমাণেও সাহায্য করতে পারে। তাই সময়ের হিসাব রাখা নিজেই অন্যায় নয়। প্রশ্ন হলো, হিসাবটি কে দেখতে পারবেন, ভুল হলে কে সংশোধন করবেন, এবং কোন সময়কে কাজ বলে গণ্য করা হবে। কাজে উপস্থিত থাকা, যন্ত্রের জন্য অপেক্ষা করা ও কাজের প্রস্তুতির সময় নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে ঘড়ি একা বিচার করতে পারে না। তার সংখ্যার অর্থ নির্ধারিত হয় নিয়ম ও ক্ষমতার মাধ্যমে।
এই জায়গায় ‘সময়ানুবর্তিতা’ শব্দটিরও দুটি দিক দেখা যায়। একদিকে সহকর্মীদের সঙ্গে দায়িত্ব মেলানো; অন্যদিকে দেরির দায় সব সময় দুর্বল পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ। শ্রমিকের কয়েক মিনিটের দেরি এবং নিয়োগকর্তার বেতন দিতে দেরিকে যদি ভিন্ন নৈতিক মানদণ্ডে বিচার করা হয়, তবে শৃঙ্খলার ভাষার ভেতরেই বৈষম্য থাকে।
ঘণ্টা থেকে প্রতিটি নড়াচড়া
শুধু কর্মদিবসের দৈর্ঘ্য মাপলেই ব্যবস্থাপনার অনুসন্ধান শেষ হয়নি। ঘণ্টার ভেতরে শ্রমিক কীভাবে কাজ করছেন, সেটিও পরিমাপের বিষয় হয়ে ওঠে। ফ্রেডেরিক উইন্সলো টেলরের ১৯১১ সালের ‘দ্য প্রিন্সিপলস অব সায়েন্টিফিক ম্যানেজমেন্ট’ এই প্রবণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
টেলর কাজকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে স্টপওয়াচের সাহায্যে সময় মাপা, কর্মী নির্বাচন ও প্রশিক্ষণ এবং কাজের পদ্ধতি নির্ধারণে ব্যবস্থাপনার সক্রিয় ভূমিকার পক্ষে যুক্তি দেন। তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল উৎপাদনশীলতা ও সমৃদ্ধি বাড়ানো; তিনি নিয়োগকর্তা ও শ্রমিকের সহযোগিতার ওপরও জোর দেন।
তবে এই পদ্ধতি থেকে একটি মৌলিক প্রশ্ন ওঠে: কাজের সেরা উপায় কে নির্ধারণ করবেন? অভিজ্ঞ শ্রমিকের বিচারবোধ, নাকি ব্যবস্থাপনার পরিমাপ? পদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষমতা ব্যবস্থাপনার দিকে সরে গেলে শ্রমিক নিজের শরীরের গতি ও কাজের কৌশল নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হারাতে পারেন। দক্ষতার উন্নতি কার উপকারে আসবে, সেটিও আলাদা প্রশ্ন। উৎপাদন বাড়া মানেই শ্রমিকের অবসর বাড়া নয়।
এখানে কর্মঘণ্টা ও শ্রমের তীব্রতা আলাদা করে দেখা জরুরি। একই আট ঘণ্টায় কাজের চাপ বাড়ানো সম্ভব। তাই শ্রমের ইতিহাস বুঝতে শুধু কখন ফটক খুলল আর বন্ধ হলো, তা জানলে চলে না; মাঝের সময়টুকু মানুষের কাছ থেকে কী দাবি করেছে, সেটিও জানতে হয়।
নিজের সন্ধ্যা ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম
সময় নিয়ে শ্রমিকের সংগ্রাম তাই জীবনের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। কাজের বাইরে সন্তান, সম্পর্ক, শিক্ষা, সংগঠন কিংবা বিশ্রামের জন্য সময় চাইতে হলে কর্মদিবসের একটি সীমা প্রয়োজন।
ব্রিটেনের ১৮৩৩ সালের ফ্যাক্টরি অ্যাক্ট শিশু-কিশোরদের শ্রমে বয়স ও কর্মঘণ্টার বিধিনিষেধ আনে এবং চারজন পরিদর্শকের একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু প্রায় চার হাজার মিলের জন্য এই পরিদর্শকসংখ্যা ছিল অপ্রতুল; আইন ব্যাপকভাবে ফাঁকি দেওয়া হতো। নিয়ম তৈরি ও তা কার্যকর করার মধ্যকার ব্যবধান তখনই স্পষ্ট ছিল।
১৮৪৭ সালের আইন বস্ত্রকারখানায় নারী ও ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের জন্য দশ ঘণ্টার কর্মদিবসের বিধান আনে; দশ ঘণ্টার সীমা কার্যকর হওয়ার ধাপ আসে ১৮৪৮ সালে। এটি সব পেশার সব প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের জন্য একযোগে দশ ঘণ্টার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেনি। এই সীমাবদ্ধতা মনে রাখা প্রয়োজন, যাতে শ্রমিক অধিকারের ইতিহাসকে একটি আইনের সহজ বিজয়কাহিনিতে নামিয়ে না আনি।
১৮৫০ সালের ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিতর্কে পালাক্রমে কর্মী বদলে কাজ চালানোর মাধ্যমে আগের আইনের উদ্দেশ্য এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠে আসে। একই বিতর্কে সন্ধ্যাকে পারিবারিক জীবন, শিক্ষা ও বিনোদনের জন্য উন্মুক্ত করার যুক্তি দেওয়া হয়। বিরোধটি তাই উৎপাদনের হিসাবের পাশাপাশি শ্রমিক কেমন জীবন যাপন করতে পারবেন, সেই প্রশ্নেও ছিল।
দীর্ঘ আন্দোলনের ধারায় আট ঘণ্টার কর্মদিবস আন্তর্জাতিক শ্রমরাজনীতির প্রধান দাবিগুলোর একটি হয়ে ওঠে। ১৯১৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রথম কনভেনশন শিল্পক্ষেত্রে দৈনিক আট ও সাপ্তাহিক ৪৮ ঘণ্টার সাধারণ মান নির্ধারণ করে, নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমসহ। কনভেনশন গ্রহণের অর্থ অবশ্য পৃথিবীর সব কর্মক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে সমান অধিকার কার্যকর হওয়া নয়।
কারখানার ফটকের পরেও
এই ইতিহাস থেকে আজকের জীবনের দিকে তাকালে একটি প্রশ্ন করা যায়: কাজ শেষ হওয়ার সিদ্ধান্তটি কে নেন? সন্ধ্যায় আসা একটি নির্দেশ, ছুটির দিনে উত্তর দেওয়ার প্রত্যাশা কিংবা অবসরকেও পরবর্তী কর্মদিবসের প্রস্তুতি হিসেবে দেখার অভ্যাস—এসব পরিস্থিতিতে কর্মস্থলের সীমানা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়। এখানে তুলনাটি ক্ষমতা ও সময়ের সম্পর্ক বোঝার জন্য; উনিশ শতকের কারখানা ও আজকের সব চাকরির অভিজ্ঞতা এক নয়।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পাঠকের কাছেও প্রশ্নটি পরিচিত হতে পারে। কাজের ঘোষিত সময়ের বাইরে যাতায়াত, অপেক্ষা এবং ঘরের পরিচর্যার দায়িত্ব মিলিয়ে নিজের জন্য কতটা সময় থাকে? বিশেষত অবৈতনিক গৃহশ্রমকে বাদ দিলে শুধু চাকরির ঘণ্টা দিয়ে মানুষের মোট পরিশ্রম বোঝা যায় না। কর্মদিবস ছোট হওয়ার সুফলও পরিবারের সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ঘড়ি আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে সাহায্য করে। একই ঘড়ির হিসাব ধরেই অতিরিক্ত কাজের পাওনা দাবি করা কিংবা নির্ধারিত সময়ে কাজ থামানোর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়। অতএব প্রশ্নটি ঘড়ি বর্জনের নয়; সময়ের নিয়ম তৈরিতে কার কণ্ঠ থাকবে এবং উৎপাদনের সুবিধা কীভাবে ভাগ হবে, তার।
কারখানা মানুষের সময়কে নিজের করে নিতে পেরেছিল যন্ত্র, মজুরি, নিয়ম ও নির্ভরতার সম্মিলিত শক্তিতে। আর কর্মঘণ্টার আন্দোলন সেই দাবির একটি সীমানা টানার চেষ্টা করেছে। এই ইতিহাসের গভীরতম শিক্ষা হলো, কাজের জন্য সময় বিক্রি করলেও মানুষ তার সমগ্র জীবনের মালিকানা বিক্রি করে না। দিনের কিছু সময় তার নিজের থাকবে—এ দাবি বিলাসিতা নয়, মর্যাদার দাবি।
আপনার মতামত জানানঃ