
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে, ক্ষমতায় এসেছে নির্বাচিত সরকার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির প্রতিশ্রুতিও বারবার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানুষের মনে নিরাপত্তার প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিত। দলবদ্ধ হামলা, প্রকাশ্যে মারধর, ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, সম্পত্তি দখল কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা যেন থামছেই না। কখনও এসব ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে হামলার ভিডিও, কখনও সামনে আসে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও কেন নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না মব সহিংসতা? রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কি যথেষ্ট সক্রিয়, নাকি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ছে আইনের শাসন?
বিবিসি বাংলা প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের হিসাবে দেশে ৫৩৭টি মবের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৫৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৭৫ জন। সংগঠনটির তথ্যমতে, ২০২৫ সালে মবের ঘটনা ছিল ৪২৮টি, আর ২০২৪ সালে ছিল ১৬৯টি। এই পরিসংখ্যান সত্যিই উদ্বেগজনক। কারণ, সংখ্যাগুলো কেবল অপরাধের হিসাব নয়; প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে প্রাণহানি, আহত মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি, আতঙ্কিত পরিবার এবং বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তা।
তবে মব সহিংসতার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার সংজ্ঞা, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এবং সময়সীমার পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একই প্রতিবেদনে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মব সহিংসতায় ১৭১ জন নিহত হয়েছেন। সংস্থাটির হিসাবে ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১২৮ এবং ২০২৫ সালে ১৯৮। দুটি সংস্থার পরিসংখ্যানে পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—মব সহিংসতা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে।
মব বা গণপিটুনি বলতে সাধারণত এমন পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়, যেখানে একদল মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করে। অভিযোগ সত্য কি না, অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ আছে কি না, কিংবা অভিযোগের পেছনে ব্যক্তিগত শত্রুতা কাজ করছে কি না—এসব যাচাইয়ের আগেই জনতার একটি অংশ নিজেকে বিচারক ও শাস্তিদাতার ভূমিকায় বসিয়ে ফেলে। এতে বিচারব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে এবং নিরপরাধ মানুষের জীবনও বিপন্ন হয়ে ওঠে।
সমস্যাটি আরও ভয়াবহ হয় যখন এমন সহিংসতা ধর্ম, রাজনীতি কিংবা জনরোষের ভাষায় বৈধতা পাওয়ার চেষ্টা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে মানুষ উত্তেজিত হয়ে উঠতে পারে। একটি ভিডিও, একটি পোস্ট কিংবা যাচাই না করা কোনো বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হতে পারে সংঘবদ্ধ হামলার পরিস্থিতি। পরে দেখা যায়, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই কারও ওপর হামলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করা হয়েছে কিংবা একজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তখন তদন্ত শুরু হলেও হারানো জীবন আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না।
বাংলাদেশে মব সহিংসতার সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রশ্নটি এখন বিশেষভাবে আলোচিত। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তাদের পর্যবেক্ষণে সম্পত্তি দখলের ঘটনায় ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ দেখা যায়। অন্যদিকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত মবের ঘটনায় প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তাদের মনিটরিং রিপোর্টে উঠে এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ ধরনের অভিযোগ অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগ আর প্রমাণ এক বিষয় নয়। কোনো দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার দায় নির্ধারণ করতে হবে নির্দিষ্ট ঘটনার প্রমাণের ভিত্তিতে। একইভাবে রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই কাউকে অপরাধী ধরে নেওয়া যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি দলীয় পরিচয়ের আড়ালে সংঘটিত অপরাধকে উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তার বিরুদ্ধে থাকা প্রমাণ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগই হওয়া উচিত বিচার নির্ধারণের ভিত্তি।
প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেছেন, তাদের কাছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশে বা দলীয় সিদ্ধান্তে মব সংঘটিত হওয়ার নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে এসব ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের কমবেশি সংশ্লিষ্টতা দেখা গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য এখানেই—মব সহিংসতাকে একটি নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর সমস্যা হিসেবে দেখলে এর সামগ্রিক চরিত্র বোঝা কঠিন হবে। স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, দলীয় প্রভাব, ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং সামাজিক উত্তেজনা একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ অবশ্য দলটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের, পুলিশের এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর। জামায়াতের বিরুদ্ধে মবের ঘটনায় দায় চাপানোর প্রবণতা রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের নেতাদের বক্তব্যে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে। ফলে মব সহিংসতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্কের ভিড়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে: হামলার শিকার মানুষটি কি ন্যায়বিচার পাচ্ছেন? কোনো ব্যক্তি মবের শিকার হলে তাঁর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা দেওয়া হচ্ছে কি না, হামলাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে কি না, কিংবা তদন্ত শেষ করে বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রধান মাপকাঠি।
মব সহিংসতা প্রতিরোধে সরকারের ভূমিকা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন, সরকারের নথিভুক্ত অপরাধের তুলনামূলক হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এবং ২০২৬ সালের একই সময়ের মধ্যে মবের ঘটনা ৪০ শতাংশ কমেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ধরনের ঘটনা হ্রাস পেয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে সরকারের হিসাবের পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্যের কারণ বুঝতে হলে মবের সংজ্ঞা, নথিভুক্ত ঘটনার ধরন, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এবং তুলনার সময়সীমা প্রকাশ করা জরুরি।
সরকারের পরিসংখ্যান কমার কথা বললেও কোনো একটি সময়ে সহিংসতার ঘটনা ঘটতে থাকলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একইভাবে মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যের ভিত্তিতে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ ব্যর্থ—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো উচিত নয়, যদি না তথ্যগুলো যথাযথভাবে তুলনা করা হয়। বরং সরকারের উচিত নিয়মিত, স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য পরিসংখ্যান প্রকাশ করা, যাতে নাগরিকেরা বুঝতে পারেন কোথায় উন্নতি হচ্ছে, কোথায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে এবং কোন ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা দরকার।
মব সহিংসতা থামাতে না পারার পেছনে মানবাধিকারকর্মীরা কয়েকটি কাঠামোগত দুর্বলতার কথা বলেছেন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমানের মতে, সরকার বিরোধী দলকে অসন্তুষ্ট করতে চায় না—এমন রাজনৈতিক হিসাব, পুলিশের মধ্যে ভয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাধা হতে পারে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলামও বলেছেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রকাশ্যে মবের বিরোধিতা করলেও স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার ঘাটতি দেখা যায়।
এখানে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এলাকায় সংঘবদ্ধ উত্তেজনার খবর পাওয়ার পর পুলিশ যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। আবার হামলার পর তদন্তে গড়িমসি, অভিযুক্তদের প্রতি বিশেষ সুবিধা কিংবা ভুক্তভোগীর ওপরই মামলা চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠলে মানুষের আস্থা দুর্বল হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মামলা নেওয়া নয়; সম্ভাব্য সহিংসতার ঝুঁকি চিহ্নিত করা, জীবন রক্ষা করা, হামলাকারীদের থামানো এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনাও তাদের দায়িত্বের অংশ।
ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত মবের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। ধর্ম মানুষের বিশ্বাস ও পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ধর্মের নামে কোনো অভিযোগ উঠলেই কাউকে আক্রমণ করার অধিকার কারও নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অপরাধের বিচার করার জন্য রাষ্ট্রের নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে। কেউ ধর্ম অবমাননা করেছেন বলে অভিযোগ উঠলে সেই অভিযোগ তদন্ত করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থা। জনতার হামলা কোনোভাবেই ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না।
একইভাবে জমি, দোকান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য কোনো সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ হামলা হলে সেটিকে নিছক জনরোষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এমন ঘটনা সংঘটিত হলে ব্যক্তিগত স্বার্থ, স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবের সম্ভাব্য যোগসূত্র তদন্ত করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক কর্মী অপরাধে জড়িত থাকলে তাঁর পরিচয় তাঁকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না। আবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার জন্য মবের অভিযোগ ব্যবহার করা হলেও সেটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মব সহিংসতার আরেকটি বড় দিক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর বিস্তার। ফেসবুক লাইভ, ভিডিও কিংবা উসকানিমূলক পোস্ট কখনও হামলাকে সরাসরি উৎসাহিত করতে পারে, আবার কখনও অপরাধের প্রমাণ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও যাচাই, গুজব প্রতিরোধ এবং সহিংসতার আহ্বান শনাক্ত করার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ ব্যবহারকারীদেরও যাচাই না করা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কোনো অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করাও নতুন করে সহিংসতা উসকে দিতে পারে।
মব বন্ধ করার জন্য শুধু কঠোর বক্তব্য বা সাময়িক গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ধারাবাহিক তদন্ত, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা এবং সাক্ষীদের সুরক্ষা। রাজনৈতিক দলগুলোকেও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, তাদের নাম ব্যবহার করে কেউ সহিংসতা করলে তাঁকে দলীয় পরিচয়ের কারণে রক্ষা করা হবে না। অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা এবং আইনগত প্রক্রিয়া—দুটিই কার্যকর হওয়া উচিত। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, যাচাই করা তথ্য ও ন্যায্য প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই এসব পদক্ষেপ নিতে হবে।
স্থানীয় প্রশাসনকে সক্রিয় করা এবং নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি। সহিংসতার আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত পুলিশি সাড়া, আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সমন্বয় প্রাণহানি কমাতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে জবাবদিহি বাড়বে। অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার বাস্তব নজির তৈরি না হলে কেবল হুঁশিয়ারি দিয়ে মবের সংস্কৃতি বদলানো কঠিন।
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকা মানেই গণতন্ত্রের সব প্রতিষ্ঠান কার্যকর হয়ে গেছে—এমন নয়। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় রাষ্ট্র কতটা নিরপেক্ষভাবে নাগরিকের অধিকার রক্ষা করছে, বিরোধী মতের মানুষ কতটা নিরাপদ এবং ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও বিচার কতটা সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে, তার মধ্য দিয়ে। জনতার ক্ষোভকে অজুহাত করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা চলতে থাকলে রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশে মব সহিংসতার অবসান তাই শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের কার্যকারিতা এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। সরকার বলছে, ঘটনা কমছে; মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সহিংসতা এখনও ব্যাপক এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। এই দুই বক্তব্যের মধ্যে সত্য নির্ধারণের পথ হলো স্বচ্ছ তথ্য, স্বাধীন তদন্ত এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি। শেষ পর্যন্ত নাগরিকেরা জানতে চান না কোন দল কতটা দায়ী—তাঁরা জানতে চান, তাঁদের জীবন ও সম্পত্তি কতটা নিরাপদ এবং অপরাধী যে-ই হোক, তাঁর বিচার হবে কি না। রাষ্ট্র যদি এই প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে না পারে, তাহলে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও মবের সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে।
আপনার মতামত জানানঃ