‘নারীকে সম্মান করতে হবে’—আধুনিক ইউরোপীয় সভ্যতার অন্যতম পরিচিত নৈতিক ধারণা। নারীকে দুর্বল বলে তার সুরক্ষার কথা বলা, তাকে পরিবারের মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা, তার প্রতি ভদ্রতা ও সৌজন্য প্রদর্শন—এসব ধারণা ইউরোপীয় সমাজের আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই সম্মানের সংজ্ঞা সব নারীর জন্য সমান ছিল না। বিশেষ করে আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি নির্মম। সেখানে নারীর শরীর শুধু শ্রমের মাধ্যমই হয়নি; কখনো সেই শরীরকেই পরিণত করা হয়েছিল বোঝা বহনের বাহনে।
আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের ইতিহাসে নারীকে মাথায় বা শরীরে পণ্য, খাদ্য, কৃষিপণ্য, জ্বালানি, সরঞ্জাম এবং অন্যান্য মালামাল বহন করতে ব্যবহারের সুস্পষ্ট নথি রয়েছে। ঊনবিংশ শতকের পশ্চিম আফ্রিকায় porterage বা বোঝা বহন ছিল শ্রম ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীপথে নৌযান চালানো সম্ভব নয় কিংবা বোঝা বহনের উপযোগী পশু ব্যবহার করা যায় না—এমন অঞ্চলে মানুষের শ্রমই ছিল পরিবহনের বাস্তব সমাধান। এই শ্রমে শিশু, নারী, দাস, নির্ভরশীল মানুষ এবং পরবর্তীতে মজুরিভিত্তিক পেশাদার বাহকরাও যুক্ত ছিলেন। ঔপনিবেশিক শাসন আসার পর অনেক অঞ্চলে এই পুরোনো পরিবহনব্যবস্থা বিলুপ্ত না হয়ে বরং আরও বিস্তৃত হয়।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয় তখন, যখন এই শ্রম আর স্বেচ্ছাশ্রম থাকে না। গোল্ড কোস্ট—বর্তমান ঘানা—নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, ১৯০০ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে নারী ও শিশুদের বাধ্যতামূলক শ্রম ঔপনিবেশিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিশেষ করে অবকাঠামো নির্মাণ, কৃষি ও বাণিজ্যিক পরিবহনে নারীদের ব্যবহার করা হতো। এমন নারীদের কথাও গবেষণায় উঠে এসেছে, যারা involuntary porterage বা বাধ্যতামূলক বোঝা বহনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
এখানেই ‘সভ্যতা’র দাবির সঙ্গে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংঘর্ষটি দেখা যায়। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো আফ্রিকায় তাদের শাসনকে প্রায়ই উন্নয়ন, শৃঙ্খলা, আধুনিকতা ও সভ্যতার মিশন হিসেবে উপস্থাপন করত। রাস্তা তৈরি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, আইন ও শিক্ষা—এসবকে ঔপনিবেশিক শাসনের নৈতিক যুক্তি হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল। কিন্তু সেই রাস্তা নির্মাণের জন্য কার শ্রম নেওয়া হয়েছিল? সেই বাণিজ্যের পণ্য কে বহন করেছিল? সেই প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সচল রাখতে কার শরীর ব্যবহার করা হয়েছিল? বহু ক্ষেত্রে উত্তরটি ছিল—আফ্রিকান জনগোষ্ঠী, যার মধ্যে নারী ও শিশুরাও বাদ যায়নি।
উগান্ডা প্রোটেক্টরেটের ঔপনিবেশিক শ্রমব্যবস্থা নিয়েও গবেষণায় দেখা যায়, ‘traditional labor’ নামে পরিচিত বিভিন্ন ধরনের বিনা পারিশ্রমিক বা বাধ্যতামূলক শ্রমের মধ্যে রাস্তা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি human porterage-ও ছিল। এই শ্রমের বাধ্যবাধকতা থেকে নারী ও পুরুষ উভয়েই মুক্ত ছিলেন না।
কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল ছিল। কারণ তারা একই সঙ্গে বর্ণ ও লিঙ্গ—দুই ধরনের ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করতেন। একজন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষকে ঔপনিবেশিক শ্রমব্যবস্থা একজন শ্রমিক হিসেবে দেখত; একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীকে অনেক সময় একই সঙ্গে শ্রমিক, গৃহকর্মী, পরিচর্যাকারী এবং অধীনস্থ নারী হিসেবে দেখা হতো। তার শ্রমের মূল্য কমিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল, কারণ তার বর্ণ তাকে ‘নিম্নতর’ হিসেবে চিহ্নিত করত; আবার নারী হওয়ার কারণে তার শ্রমকে অনেক সময় স্বাভাবিক বা পারিবারিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখানো যেত।
এই দ্বৈত বৈষম্য ঔপনিবেশিক গৃহস্থালিতেও স্পষ্ট ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে আফ্রিকান নারীদের গৃহস্থালি শ্রমের সঙ্গে বর্ণভিত্তিক ক্ষমতার সম্পর্ক গভীর ছিল। শ্বেতাঙ্গ পরিবারের গৃহস্থালি পরিচালনা, রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, শিশুর যত্ন ও অন্যান্য কাজের বড় অংশ কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। ফলে একদিকে শ্বেতাঙ্গ নারীকে গৃহের মর্যাদার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হতো, অন্যদিকে কৃষ্ণাঙ্গ নারীকে সেই গৃহের শ্রমশক্তিতে পরিণত করা হতো।
এখানে ‘নারীর সম্মান’ কথাটির একটি অস্বস্তিকর সীমা প্রকাশ পায়। সব নারীকে সমানভাবে সম্মান করার ধারণা এবং নির্দিষ্ট শ্রেণি বা বর্ণের নারীকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার ধারণা এক জিনিস নয়। ঔপনিবেশিক সমাজে শ্বেতাঙ্গ নারীর সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করা এবং কৃষ্ণাঙ্গ নারীর শ্রমকে নিয়ন্ত্রণ করা একই সামাজিক ব্যবস্থার পাশাপাশি চলতে পারত। ফলে একজন শ্বেতাঙ্গ নারীকে ‘ভদ্র সমাজের নারী’ হিসেবে সুরক্ষা দেওয়ার সংস্কৃতি থাকলেও একই সমাজে একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীকে কঠোর শ্রমে নিয়োজিত করা, তার শ্রমকে অবমূল্যায়ন করা কিংবা তার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা অস্বাভাবিক বলে বিবেচিত হতো না।
এখানে বোঝা যায়, সমস্যাটি কেবল পুরুষের হাতে নারীর নিপীড়ন ছিল না। সমস্যাটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতার কাঠামো—যেখানে একজন নারী অন্য একজন নারীর ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারতেন, কারণ প্রথমজন ছিলেন শ্বেতাঙ্গ ও সুবিধাভোগী শ্রেণির, আর দ্বিতীয়জন ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ ও অধীনস্থ শ্রমজীবী। অর্থাৎ ‘নারী বনাম পুরুষ’ দিয়ে ঔপনিবেশিক সমাজকে বোঝা যায় না; সেখানে প্রশ্ন করতে হয়—কোন নারী, কোন শ্রেণির নারী, কোন বর্ণের নারী এবং তার শ্রমের ওপর কার অধিকার?
কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের শরীরকে শুধু শ্রমের জন্য ব্যবহার করা হয়নি; তাদের শরীর নিয়ে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক কল্পনাও তৈরি হয়েছিল। আটলান্টিক দাসব্যবস্থার ইতিহাসে আফ্রিকান নারীদের শ্রম এবং তাদের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা—দুটিকেই দাসমালিকেরা অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখত। ইতিহাসবিদ Jennifer L. Morgan দেখিয়েছেন, ইংরেজ উপনিবেশগুলোতে আফ্রিকান নারীদের শ্রম এবং reproductive labor এমনভাবে যুক্ত করা হয়েছিল যে তাদের শরীর ও মাতৃত্বও দাসব্যবস্থার অর্থনীতির অংশ হয়ে যায়।
এখানে ‘সম্মান’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। যদি একজন নারীর শরীরকে তার নিজের বলে না দেখে তার শ্রম, সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে সেখানে সম্মান কতটা বাস্তব? আর যখন সেই নারী কৃষ্ণাঙ্গ, তখন তার ওপর এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের ঐতিহাসিক নজির আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে আফ্রিকান নারীরা কেবল নিপীড়নের শিকার হয়ে বসে ছিলেন না। তারা শ্রম করেছেন, দর-কষাকষি করেছেন, পরিবার ও সমাজ টিকিয়ে রেখেছেন, কখনো পালিয়েছেন, কখনো প্রতিরোধ করেছেন এবং নিজেদের জন্য জায়গা তৈরি করেছেন। পশ্চিম আফ্রিকার porterage ইতিহাসেও দেখা যায়, সব বাহকই সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন ছিলেন না; কিছু অঞ্চলে স্থানীয় caravan সংগঠক ও পেশাদার বাহকদের নিজেদের প্রভাব ও দর-কষাকষির ক্ষমতা ছিল।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের ইতিহাসকে শুধু ‘অসহায় ভুক্তভোগী’র ইতিহাস বানালে তাদের নিজেদের শক্তি, সিদ্ধান্ত ও প্রতিরোধও অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের ওপর চাপানো বাস্তবতাকে ছোট করে দেখারও সুযোগ নেই। একজন নারী যখন মাথায় ভারী বোঝা নিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটেন, সেটি শ্রম; যখন তাকে সেই শ্রম করতে বাধ্য করা হয়, সেটি শোষণ; আর যখন তার গায়ের রং ও সামাজিক অবস্থানকে ব্যবহার করে সেই শোষণকে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন সেটি বর্ণভিত্তিক ক্ষমতার কাঠামো। ঔপনিবেশিক আফ্রিকায় এই তিনটি বাস্তবতা অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে মিশে ছিল।
এ কারণেই কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের ‘বাহন’ বানানোর ইতিহাসকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন নিষ্ঠুরতার ঘটনা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি ছিল বৃহত্তর ঔপনিবেশিক অর্থনীতির অংশ—যেখানে মানুষের শরীর ছিল রাস্তা, বাণিজ্য ও প্রশাসনের অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলো নিজেদের সভ্যতার প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। কিন্তু সভ্যতার আসল পরীক্ষা কোনো জাতি নিজের সম্পর্কে কী বলে, সেখানে নয়; আসল পরীক্ষা হলো—সে ক্ষমতাহীন মানুষের সঙ্গে কী আচরণ করে।
একজন শ্বেতাঙ্গ নারীকে সম্মান করা আর সব নারীকে সম্মান করা এক কথা নয়। নিজের সমাজের নারীর মর্যাদা রক্ষা করা আর অন্য জাতির নারীর মানবিক মর্যাদা স্বীকার করা এক কথা নয়। আর কোনো সমাজ যদি নিজের নারীর জন্য ‘সম্মান’ দাবি করে কিন্তু অন্য নারীর শরীরকে শ্রমের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে সেই সম্মানের সার্বজনীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
ঔপনিবেশিক আফ্রিকার ইতিহাস সেই প্রশ্নের অসংখ্য উদাহরণ রেখে গেছে। কখনো কৃষ্ণাঙ্গ নারী মাথায় পণ্য বহন করেছেন, কখনো রাস্তা নির্মাণের জন্য বাধ্যতামূলক শ্রম দিয়েছেন, কখনো ইউরোপীয় পরিবারের গৃহকর্মী হয়েছেন, কখনো শিশু ও পরিবারের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন, আবার কখনো এমন শ্রম করেছেন যার বিনিময়ে ন্যায্য পারিশ্রমিক বা স্বাধীনতা কোনোটিই নিশ্চিত ছিল না। তাদের শরীরকে ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু তাদের মানবিক মর্যাদা সমানভাবে স্বীকৃত হয়নি।
আজকের পৃথিবীতে নারী অধিকার, মানবাধিকার ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই যতই এগিয়ে যাক, ইতিহাসের এই অধ্যায় মনে রাখা জরুরি। কারণ অতীতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—অধিকার যদি সর্বজনীন না হয়, তাহলে সেটি অধিকার নয়; সেটি বিশেষাধিকার। কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের ইতিহাস তাই কেবল দুঃখের ইতিহাস নয়; এটি শ্রমের ইতিহাস, শোষণের ইতিহাস, বর্ণবাদের ইতিহাস, ঔপনিবেশিক অর্থনীতির ইতিহাস এবং একই সঙ্গে প্রতিরোধের ইতিহাস।
‘নারীর প্রতি সম্মান’ কথাটিকে সত্যিকার অর্থে মূল্যায়ন করতে হলে প্রশ্নটি হতে হবে খুব সহজ: একজন নারী শ্বেতাঙ্গ কি কৃষ্ণাঙ্গ, ধনী কি দরিদ্র, ইউরোপীয় কি আফ্রিকান—এসব পরিচয়ের আগে তাকে কি মানুষ হিসেবে দেখা হয়েছিল? ঔপনিবেশিক আফ্রিকার ইতিহাসের বহু অধ্যায় সেই প্রশ্নের উত্তরকে অস্বস্তিকর করে তোলে। কারণ সেখানে এমন এক পৃথিবী ছিল, যেখানে এক নারীর সম্মান রক্ষার জন্য সমাজ উদ্বিগ্ন হতে পারত, অথচ অন্য এক নারীর কাঁধে চাপিয়ে দিতে পারত সেই সমাজের আরাম, বাণিজ্য ও সাম্রাজ্যের বোঝা।
সেই বৈপরীত্যই হয়তো ‘সভ্যতা’র সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
আপনার মতামত জানানঃ