বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর মানুষের প্রত্যাশা থাকে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেশের অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনবে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পরও সেই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের আচরণ এখন জনআলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শাসনামল তুলনা করতে হলে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি দুই সরকারের বাস্তব রেকর্ডও বিবেচনা করতে হবে।
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। এই সময়ে বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু এসব উন্নয়নের পাশাপাশি নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ পর্যায়ে বিরোধী দলের ব্যাপক গ্রেপ্তার, গুম এবং দমন-পীড়নের অভিযোগ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জাতিসংঘের অনুসন্ধানেও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য উঠে আসে।
অন্যদিকে বিএনপির অতীত শাসনামলও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে দুর্নীতি, রাজনৈতিক সংঘাত, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা ছিল। ২০০৪ সালে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব গঠিত হয় বিএনপি সরকারের সময়। পরবর্তী সময়ে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০১৪ সালের বিশ্লেষণেও বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—উভয় দলের শাসনামলে নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহির ঘাটতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছিল। ফলে আওয়ামী লীগের শাসনামলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আলোচনা করতে গিয়ে বিএনপির অতীত রেকর্ড উপেক্ষা করাও যথাযথ হবে না।
২০২৬ সালে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে উঠেছে। ১৭ আগস্ট প্রকাশিত ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে সরকারের প্রথম ছয় মাসের চ্যালেঞ্জ হিসেবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং জননিরাপত্তার বিষয়গুলো উঠে আসে। একই সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি ও প্রশাসনে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে নীতিগত ঘোষণা নয়, বরং বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কতটা সহনীয় হয়েছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিতে বিঘ্ন এবং দেশের নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদনের সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, গ্যাসের স্বল্পতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চিত্রও তুলে ধরা হয়। অর্থাৎ সমস্যাগুলোর জন্য শুধু বর্তমান সরকারকে দায়ী করলেই পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না; আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানিনির্ভরতা, পূর্ববর্তী সরকারের নীতি এবং বর্তমান সরকারের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা—সবই বিবেচনায় নিতে হবে।
রাজনৈতিক সহিংসতা এবং বিরোধী দলের প্রতি আচরণ তুলনার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: সরকার কি সমালোচনা ও প্রতিবাদকে গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে দেখছে? আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী মত দমন, রাজনৈতিক মামলার অপব্যবহার এবং বিক্ষোভে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের গুরুতর অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও যদি দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে হামলা, ভয়ভীতি, বেআইনি গ্রেপ্তার কিংবা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটে, তাহলে সেসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনো দল অতীতে নিপীড়নের শিকার হয়েছিল বলেই ভবিষ্যতে তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় রাজনৈতিক পরিবেশে মতপ্রকাশ ও জনপরিসরে আলোচনার সুযোগ বেড়েছে। একই সঙ্গে বিএনপি সরকারের আমলেও স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে নির্বাচনের পর সহিংসতা কমার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়নের সময় ইতিবাচক পরিবর্তন ও অব্যাহত সমস্যাগুলোকে পাশাপাশি দেখতে হবে।
তাহলে দেশ পরিচালনায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে তুলনা কীভাবে করা উচিত? প্রথমত, অর্থনীতির ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত মজুরি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য, বৈদেশিক ঋণ ও রিজার্ভের তথ্য দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয়, দুর্নীতির অভিযোগ, ঋণের বোঝা এবং বিনিয়োগের কার্যকারিতা যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে নির্বাচন কতটা প্রতিযোগিতামূলক ছিল, বিরোধী দল স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছে কি না এবং নাগরিকেরা ভয় ছাড়াই সরকারের সমালোচনা করতে পেরেছেন কি না, তা বিবেচনা করতে হবে। চতুর্থত, আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকদের নিরাপত্তা, অপরাধের তদন্ত এবং বিচার পাওয়ার সুযোগ মূল্যায়ন করতে হবে।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের রেকর্ড মূল্যায়নের জন্য প্রায় দেড় দশকের তথ্য রয়েছে। বিপরীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপির শাসনকাল এখনো তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত। তাই দুই দলকে একই সময়সীমার তথ্য দিয়ে তুলনা না করে সরাসরি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তবে নতুন সরকারকে তার প্রতিশ্রুতি, প্রথম দিকের সিদ্ধান্ত এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাবের ভিত্তিতে প্রশ্ন করা সম্পূর্ণ যৌক্তিক।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দলীয় পরিচয় নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো কে মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করতে পারছে, কে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্ভরযোগ্য করতে পারছে, কে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং কে বিরোধী মত ও নাগরিক অধিকারের প্রতি সম্মান দেখাচ্ছে। আওয়ামী লীগের উন্নয়নমূলক কাজকে স্বীকার করার অর্থ তার শাসনামলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করা নয়। একইভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ যাচাই করার অর্থ আওয়ামী লীগের অতীতকে নির্দোষ ঘোষণা করা নয়।
গণতন্ত্রে সরকারকে বিচার করতে হয় তার প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি তার কাজ দিয়ে। বিএনপি যদি অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে এবং বিরোধী দলের অধিকার নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে তার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে প্রতিফলিত হবে। আর যদি পুরোনো সমস্যাগুলো নতুন নামে ফিরে আসে, তাহলে জনগণের প্রশ্ন করার অধিকারও অক্ষুণ্ণ থাকবে। বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শাসনের মান, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকারেরও পরিবর্তন ঘটবে।
আপনার মতামত জানানঃ