একটি শিশু রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চকলেট খাচ্ছে। হয়তো একটু পরেই সে বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে বায়না ধরবে, খেলতে যাবে বন্ধুদের সঙ্গে, কিংবা স্কুলের পড়া শেষ করে আবার ছুটবে খোলা মাঠে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে একটি দ্রুতগতির অটোরিকশা তার জীবনের সব সম্ভাবনা থামিয়ে দিতে পারে। যে শিশুটির সামনে পড়ে ছিল দীর্ঘ একটি জীবন, সে-ই পরিণত হয় সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি পরিসংখ্যানে। পরিবারের কাছে নেমে আসে এমন এক শূন্যতা, যা কোনো ক্ষতিপূরণ কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়া দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের সড়কগুলোতে প্রতিদিন এমন ঘটনা ঘটছে। আর এই মৃত্যুমিছিলের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, নিহতদের একটি বড় অংশ শিশু-কিশোর।
সমকালের ২২ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুদের প্রাণহানির ভয়াবহ চিত্র। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় বছর নয় মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু নিহত হয়েছে। এখানে শিশু বলতে ১৭ বছরের কম বয়সীদের বোঝানো হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট প্রাণহানির সংখ্যা ৩৩ হাজার ৬৮৯। এই দুই পরিসংখ্যানের তুলনায় দেখা যায়, সড়কে নিহতদের প্রায় এক-চতুর্থাংশই শিশু।
সংখ্যাটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন। যে বয়সে একটি শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, খেলার কথা, নতুন কিছু শেখার কথা, সেই বয়সেই তাকে প্রাণ হারাতে হচ্ছে যানবাহনের চাকার নিচে। আরও উদ্বেগের বিষয়, এই হিসাব সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে আসা ঘটনাগুলোর ওপর নির্ভরশীল। অনেক দুর্ঘটনার খবর সংবাদমাধ্যমে আসে না, অনেক ঘটনায় আনুষ্ঠানিক মামলা হয় না। ফলে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।
বরগুনার আমতলীর আট বছর বয়সী এলমা আক্তারের ঘটনাটি এই সংকটের নির্মম উদাহরণ। নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চকলেট খাচ্ছিল দ্বিতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থী। দ্রুতগতির একটি অটোরিকশা তাকে ধাক্কা দিলে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। গত ১৬ অক্টোবরের এই ঘটনা একটি পরিবারের জীবনকে মুহূর্তে বদলে দিয়েছে। এর আগেও কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় বাড়ির সামনের রাস্তায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চাপায় প্রাণ হারায় চার বছর বয়সী ওমর ফারুক। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় রাস্তা পার হওয়ার সময় ইজিবাইকের চাপায় মারা যায় ছয় বছর বয়সী ইভা।
এলমা, ওমর কিংবা ইভার মৃত্যু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এসব মৃত্যুর পেছনে রয়েছে সড়কের নকশা, যানবাহনের গতি, চালকের দক্ষতা, আইন প্রয়োগ এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ চলাচলের পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারার মতো একাধিক সমস্যা। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বসতবাড়ির পাশ দিয়ে চলে যাওয়া সড়কগুলো শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাড়ির উঠানে খেলতে থাকা শিশু হঠাৎ দৌড়ে রাস্তায় উঠে যেতে পারে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুও দ্রুতগতির যানবাহনের ধাক্কায় গুরুতর আহত হতে পারে। অথচ অনেক সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পারাপার কিংবা শিশুদের চলাচল বিবেচনায় নিয়ে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয় না।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিহত শিশুদের মধ্যে ১ হাজার ৫৩২ জনের বয়স ছিল পাঁচ বছর বা তার কম। ছয় থেকে ১২ বছর বয়সী নিহত শিশুর সংখ্যা ২ হাজার ৮৮৪ এবং ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী নিহত হয়েছে ৩ হাজার ৫৪৭ জন। অর্থাৎ নিহত শিশুদের বড় একটি অংশই এমন বয়সী, যখন তাদের চলাফেরা ও নিরাপত্তার জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের তত্ত্বাবধান এবং নিরাপদ পরিবেশ বিশেষভাবে প্রয়োজন।
শুধু বয়সের পরিসংখ্যান নয়, দুর্ঘটনার পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে নিহত হয়েছে ২ হাজার ৫১৩ শিশু। বাড়ির আশপাশের সড়কে খেলাধুলার সময় প্রাণ হারিয়েছে ৯৬২ শিশু। অর্থাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া কিংবা বাড়ির আশপাশে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করার মতো দৈনন্দিন কাজও অনেক শিশুর জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। একটি নিরাপদ রাষ্ট্রে যে পথ দিয়ে শিশু স্কুলে যাবে, সেই পথেই যদি তার জীবন ঝুঁকিতে পড়ে, তবে সড়ক ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করলে মোটরসাইকেল-সংশ্লিষ্ট প্রাণহানির বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ে নিহত শিশুদের মধ্যে ২ হাজার ৯৫৮ জন মোটরসাইকেলের চালক বা যাত্রী ছিল, যা মোট শিশু মৃত্যুর ৩৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। রাস্তা পারাপার ও রাস্তায় হাঁটার সময় যানবাহনের ধাক্কা বা চাপায় নিহত হয়েছে ২ হাজার ৮১২ শিশু। বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে নিহত হয়েছে ২ হাজার ১৯৩ শিশু। এই পরিসংখ্যানের শ্রেণিগুলো দুর্ঘটনার বিভিন্ন পরিস্থিতি তুলে ধরে; তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব চালক, অভিভাবক, সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায়।
গ্রামীণ সড়কের ঝুঁকি আরও জটিল। এসব সড়কের অনেকগুলো বসতবাড়ির একেবারে পাশ দিয়ে চলে গেছে। কোথাও রাস্তা আঁকাবাঁকা, কোথাও বাঁকের কারণে সামনে থেকে আসা যানবাহন দেখা যায় না। কোথাও রাস্তার পাশে ফুটপাত নেই, নেই শিশুদের জন্য নিরাপদে হাঁটার জায়গা। আবার একই সড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, অটোরিকশা এবং অন্যান্য যানবাহন চলাচল করছে। অনেক ক্ষেত্রে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত, চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফলে শিশুদের স্বাভাবিক চলাচলও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সামছুল হক সমকালের প্রতিবেদনে সড়ক নির্মাণের ত্রুটি ও পরিকল্পনার দুর্বলতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় বাড়ির পাশ দিয়ে সড়ক নির্মাণের সময় শিশুদের চলাচল, দৃশ্যমানতা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয় না। বিশেষ করে আঁকাবাঁকা সড়কে বাঁকের আড়াল থেকে আসা যানবাহন শিশু কিংবা চালক—কারও পক্ষেই সময়মতো দেখা সম্ভব নাও হতে পারে। ফলে দুর্ঘটনা এড়ানোর সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়।
এখানে উন্নয়ন বলতে শুধু পাকা রাস্তা নির্মাণকে বোঝালে চলবে না। একটি সড়ক কতটা নিরাপদ, পথচারীদের জন্য কতটা উপযোগী এবং স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে তার নকশা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেসব বিষয়ও উন্নয়নের মাপকাঠি হওয়া উচিত। রাস্তা নির্মাণের পর সেখানে শিশুদের চলাচল নিরাপদ কি না, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে কি না, বিপজ্জনক বাঁকগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। প্রয়োজনে গতিরোধক, সতর্কতামূলক চিহ্ন, নিরাপদ পারাপারের জায়গা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং পথচারীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের নিয়ন্ত্রণহীন চলাচলও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব যানবাহন দেশের বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। স্বল্প আয়ের চালকদের জন্য এগুলো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে, আবার অনেক এলাকায় মানুষের যাতায়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু জীবিকার প্রয়োজনকে সামনে রেখে যানবাহনের নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের প্রশ্ন উপেক্ষা করা যায় না। একইভাবে, এসব যানবাহনকে দায়ী করেই পুরো সমস্যার ব্যাখ্যা শেষ করা যাবে না। সড়কের নকশা, চালকের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের কারিগরি মান, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং আইন প্রয়োগ—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন এসব যানবাহনের জন্য বৈধতা, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং নিবন্ধনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যানবাহনগুলোকে নির্দিষ্ট গতিসীমা ও নিয়মের আওতায় আনা গেলে নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারে। এ ধরনের প্রস্তাবের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা জড়িয়ে আছে: অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের ঝুঁকি কমাতে হলে চালকদের জীবিকা এবং জননিরাপত্তা—দুই বিষয়কেই গুরুত্ব দিতে হবে। তবে কোনো নির্দিষ্ট গতিসীমা নির্ধারণ করলেই দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নিরাপদ সড়কের জন্য একাধিক ব্যবস্থা একসঙ্গে কার্যকর করা প্রয়োজন।
ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে নিয়মের আওতায় আনতে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল ২০২১ সালে। ২০২৩ সালে একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। পরে ২০২৫ সালে নতুন করে খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সমকালের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৫ অনুযায়ী নির্দিষ্ট কারিগরি বৈশিষ্ট্য, নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ এবং চালকের লাইসেন্সের বিধান রয়েছে। মহাসড়কে এসব যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু নীতিমালা থাকা আর তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হওয়া এক বিষয় নয়। মাঠপর্যায়ে নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, অনিবন্ধিত যানবাহন কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এবং আইন ভঙ্গের ঘটনায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি।
সড়ক দুর্ঘটনার পর বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এলমা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয়ভাবে আপসের পর সাধারণ ডায়েরির ভিত্তিতে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়েছিল বলে সমকালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শিশুটির বাবা জসিম উদ্দিন বলেছেন, মামলা করে কী লাভ—মেয়ে তো আর ফিরে আসবে না। শোকাহত একজন বাবার এই বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে গভীর অসহায়ত্ব। প্রিয় সন্তানকে হারানোর পর আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার মানসিক শক্তি সবার থাকে না। কিন্তু এ ধরনের ঘটনার বিচার কেবল পরিবারের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি জননিরাপত্তা ও আইনের শাসনের সঙ্গেও যুক্ত।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনায় দায় নির্ধারণ ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। চালকের অবহেলা বা বেপরোয়া গতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্য কেবল কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়; ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য দায় নির্ধারণ, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং নিয়মের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করাও এর অংশ। স্থানীয়ভাবে আপস হলেই যদি সম্ভাব্য ফৌজদারি দায়ের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়, তবে সড়কে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার বার্তা দুর্বল হয়ে পড়ে।
এ জন্য দুর্ঘটনার পর পুলিশি তদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য সংগ্রহ, যানবাহনের তথ্য সংরক্ষণ এবং দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিহত শিশুর পরিবারকে আইনি সহায়তা দিতে হবে, যাতে শোক ও আর্থিক সংকটের মধ্যে থেকেও তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারে। দুর্ঘটনার প্রতিটি ঘটনায় ন্যায়সংগত ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা গেলে চালক, মালিক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে দায়িত্বশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
শিশুদের নিরাপত্তায় অভিভাবক ও বিদ্যালয়ের ভূমিকাও রয়েছে। ছোট শিশুদের রাস্তার কাছে একা খেলতে না দেওয়া, নিরাপদে রাস্তা পার হওয়ার নিয়ম শেখানো এবং মোটরসাইকেলে উপযুক্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। তবে শিশুদের সচেতনতা বাড়ানোকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। একটি শিশু ভুল করতে পারে, হঠাৎ দৌড়ে রাস্তায় উঠতে পারে কিংবা চলন্ত গাড়ির গতি বুঝতে ব্যর্থ হতে পারে। সড়ক পরিকল্পনা ও যানবাহন ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—মানুষের এমন ভুল হলেও যেন তা প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় পরিণত না হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রশীদ সমকালের প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, পাঠ্যপুস্তকে ট্রাফিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ চলছে এবং আগামী বছর থেকে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে ট্রাফিক নিয়মকানুন শিখতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে পাঠ্যবইয়ে নিয়ম শেখানোর পাশাপাশি বিদ্যালয়ের আশপাশে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা, গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। শিশুকে রাস্তার নিয়ম শেখানো হবে, অথচ সেই রাস্তা যদি তার জন্য অনিরাপদ থাকে, তাহলে শুধু শিক্ষা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের মূল বার্তা তাই আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সড়কে শিশুদের মৃত্যু প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ—নিরাপদ নকশা, কার্যকর আইন প্রয়োগ, প্রশিক্ষিত চালক, নিবন্ধিত ও মানসম্মত যানবাহন, গতিসীমার বাস্তব প্রয়োগ এবং দুর্ঘটনার পর জবাবদিহি। গ্রামীণ সড়ক থেকে শহরের ব্যস্ত পথ—সবখানেই শিশুদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের ব্যবস্থাও উন্নত করতে হবে, যাতে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা যায় এবং সেই অনুযায়ী নীতি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।
একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি সমাজেরও অপূরণীয় ক্ষতি। এলমা, ওমর ও ইভার মতো শিশুরা যে জীবন পেতে পারত, সেই সম্ভাবনা আর কখনো ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু তাদের মৃত্যুর কারণগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে অন্য অনেক শিশুকে বাঁচানো সম্ভব। সড়কে প্রাণহানিকে অনিবার্য দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি মৃত্যুর পর প্রশ্ন তুলতে হবে—কীভাবে ঘটনাটি ঘটল, কোন ব্যবস্থা ব্যর্থ হলো এবং ভবিষ্যতে তা ঠেকাতে কী করা হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন একটি শিশু বাড়ির সামনে খেলতে গিয়ে, স্কুলে যাওয়ার পথে কিংবা রাস্তা পার হওয়ার সময় নিজের জীবন নিয়ে ভয় পাবে না। পাকা সড়ক, দ্রুত যাতায়াত ও আধুনিক যানবাহনের পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তাও উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। শিশুদের সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি তাদের অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আজকের শিশুদের জীবন রক্ষা করতে না পারলে আগামী দিনের সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিও প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই সড়কে শিশুদের এই মৃত্যুমিছিল থামাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন—কারণ প্রতিটি শিশুর জীবনই অমূল্য, আর একটি প্রাণও অবহেলায় হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়।
আপনার মতামত জানানঃ