বাংলাদেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে প্লাস্টিক বর্জ্যও। ফলে এখন প্রশ্নটি আর শুধু প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সংস্কার প্রয়োজন কি না—সেটি নয়; বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করার মতো প্রস্তুতি বাংলাদেশের আছে কি না। দেশের নগর এলাকাগুলোতেই প্রতিদিন আনুমানিক ৩৮ হাজার টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ ১ লাখ ১৮ হাজার টন ছাড়িয়ে যেতে পারে। মোট বর্জ্যের প্রায় ১০ শতাংশ প্লাস্টিক হলেও এর পরিবেশগত ক্ষতি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। পচনশীল নয় এমন প্লাস্টিক শহরের ড্রেন বন্ধ করে জলাবদ্ধতা বাড়ায়, নদী-খাল দূষিত করে, বন্যার ঝুঁকি তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
এই বাস্তবতায় গত ১৩ আগস্ট ২০২৬ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ‘এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি’ বা বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা (EPR) নির্দেশিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ১৩ ধারার অধীনে এসআরও নম্বর ২৯৩-আইন/২০২৬ হিসেবে জারি হওয়া এই নির্দেশিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়েছে।
এটি শুধু আরেকটি পরিবেশবিষয়ক সরকারি নির্দেশনা প্রকাশের ঘটনা নয়। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এতদিন ব্যবহারের পর প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় অংশের দায়িত্ব ছিল মূলত সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংস্থা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ওপর। নতুন ব্যবস্থায় প্লাস্টিক উৎপাদনকারী, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকদেরও আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বের আওতায় আনা হয়েছে। তাদের নিবন্ধন, তথ্য প্রদান, বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের মতো বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে।
EPR-এর মূল ধারণাটি খুবই সরল। যে প্রতিষ্ঠান কোনো পণ্য বা প্যাকেজিং বাজারে ছাড়বে, ব্যবহারের পর সেটি কীভাবে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার করা হবে, তার দায়িত্ব এবং ব্যয়ের একটি অংশও সেই প্রতিষ্ঠানের বহন করা উচিত। অর্থাৎ প্লাস্টিক উৎপাদন ও বাজারজাত করে শুধু লাভ করলেই হবে না; ব্যবহারের পর সেই প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য কী পরিণতি তৈরি করছে, তার দায়ও উৎপাদককে নিতে হবে। এর মাধ্যমে ‘দূষণকারীই ব্যয় বহন করবে’—এই নীতিকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্লাস্টিক অর্থনীতি একটি খণ্ডিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে। প্লাস্টিক উৎপাদিত বা আমদানি হচ্ছে, মানুষ তা ব্যবহার করছে এবং ব্যবহারের পর তা ফেলে দিচ্ছে। কিন্তু সংগ্রহ, পরিবহন, বাছাই, পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশগত ক্ষতির বড় একটি অংশের ব্যয় এতদিন প্লাস্টিক বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের হিসাবের বাইরে থেকেছে। EPR সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তবে গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়েই কাজ শেষ হচ্ছে না। বরং এখান থেকেই শুরু হচ্ছে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আইনগত বাধ্যবাধকতাকে বাস্তবে এমন একটি কার্যকর বাজারে রূপান্তর করা যাবে কি না, যেখানে বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই, পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য নকশা—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, সেটিই এখন মূল বিষয়।
নতুন নির্দেশিকায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সংজ্ঞা, প্লাস্টিকের বিভিন্ন শ্রেণি, নিবন্ধন ও তথ্য প্রদানের ব্যবস্থা, সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা এবং EPR প্রকল্পের ফি নির্ধারণের কাঠামো রাখা হয়েছে। উৎপাদকদের দায়িত্ব বাস্তবায়নে Producer Responsibility Organisation বা PRO-এর ভূমিকার কথাও বলা হয়েছে।
প্রথম দুই বছরে প্লাস্টিক বর্জ্যের ১৫ শতাংশ সংগ্রহ এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তৃতীয় বছর থেকে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৩০ শতাংশ এবং পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্য ১৫ শতাংশে উন্নীত হবে। এসব লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে উৎপাদকদের দায়িত্ব পরিমাপের একটি কাঠামো তৈরি হয়। কিন্তু শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই যে বাস্তবে পুনর্ব্যবহার বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থায়ন, সংগ্রহ অবকাঠামো, দক্ষ নেটওয়ার্ক, নির্ভরযোগ্য তথ্য, পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বাজার এবং কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—উৎপাদকরা তাদের EPR দায়িত্ব পালনের জন্য বাস্তবে কত টাকা দেবেন। নির্দেশিকায় পুনর্ব্যবহারের হার, প্লাস্টিকের পরিমাণ এবং নির্ধারিত ব্যয়ের ভিত্তিতে EPR প্রকল্পের ফি দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু একটি সুস্পষ্ট ন্যূনতম ফি নির্ধারণ না থাকায় প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, সংগৃহীত অর্থ আদৌ যথেষ্ট হবে কি না।
কারণ কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে কম খরচে কিছু ব্যবস্থা করলেই EPR সফল হয়েছে বলা যাবে না। যদি সেই অর্থ দিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্লাস্টিক সংগ্রহ, বাছাই ও পরিবেশসম্মত পুনর্ব্যবহার সম্ভব না হয়, তাহলে পুরো ব্যবস্থা কাগজে-কলমে সফল হলেও বাস্তবে পরিবেশের কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে না। তাই শুধু EPR ফি আছে কি না—এই প্রশ্নের পরিবর্তে এখন দেখতে হবে, সেই ফি বাস্তব অর্থে যথেষ্ট কি না।
একটি কার্যকর ফি ব্যবস্থায় প্লাস্টিক সংগ্রহ, পরিবহন, বাছাই, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পরিবেশসম্মত পুনর্ব্যবহারের প্রকৃত ব্যয় বিবেচনায় নিতে হবে। সব ধরনের প্লাস্টিকের অর্থনৈতিক মূল্যও এক নয়। সহজে বিক্রি করা যায় এমন PET প্লাস্টিক এবং মাল্টিলেয়ার প্যাকেজিং, নমনীয় প্লাস্টিক বা Expanded Polystyrene বা EPS-এর সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের খরচ এক নয়। ফলে ভবিষ্যতে প্লাস্টিকের ধরন ও পরিবেশগত ঝুঁকি অনুযায়ী ফি নির্ধারণ করা জরুরি।
যে প্যাকেজিং পুনর্ব্যবহার করা কঠিন বা পরিবেশের জন্য বেশি ক্ষতিকর, তার জন্য বেশি ফি আরোপ করা যেতে পারে। এতে উৎপাদকরা কম ক্ষতিকর, সহজে পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ব্যবহারে উৎসাহিত হবেন। অর্থাৎ EPR-এর লক্ষ্য শুধু টাকা সংগ্রহ করা নয়; বরং পণ্যের নকশা পরিবর্তন, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক কমানো এবং একটি কার্যকর ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা চক্রাকার অর্থনীতি গড়ে তোলা।
একইভাবে সব ধরনের প্লাস্টিকের জন্য অভিন্ন সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করাও যথেষ্ট নয়। PET, HDPE, নমনীয় প্লাস্টিক, মাল্টিলেয়ার প্যাকেজিং ও EPS-এর পরিবেশগত প্রভাব এবং পুনর্ব্যবহারের সম্ভাবনা আলাদা। বাজারমূল্য বেশি এমন প্লাস্টিক হয়তো সহজেই সংগ্রহ হবে, কিন্তু কম মূল্যবান ও পুনর্ব্যবহার কঠিন প্লাস্টিক পরিবেশেই পড়ে থাকতে পারে। ফলে সংখ্যাগত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও সবচেয়ে ক্ষতিকর প্লাস্টিকগুলো ব্যবস্থার বাইরে থেকে যেতে পারে।
এ কারণে ভবিষ্যতে প্লাস্টিকের ধরন ও পণ্যের ভিত্তিতে আলাদা লক্ষ্যমাত্রা এবং ভিন্ন ফি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। যে উপাদান যত কঠিনে পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং পরিবেশের জন্য যত বেশি ক্ষতিকর, সেটিকে কমানো, পুনর্নকশা করা, পুনরুদ্ধার করা বা বিকল্প উপাদান ব্যবহারের জন্য তত বেশি প্রণোদনা তৈরি করতে হবে।
সরবরাহ ব্যবস্থায় কার ওপর EPR-এর মূল দায়িত্ব থাকবে, সেটিও স্পষ্ট করা জরুরি। একটি প্লাস্টিক পণ্যের সঙ্গে উৎপাদক, আমদানিকারক এবং ব্র্যান্ড মালিক—একাধিক পক্ষ যুক্ত থাকতে পারে। একাধিক প্রতিষ্ঠান একই পণ্যের জন্য দায়ী হলে দ্বৈত নিবন্ধন, দ্বৈত রিপোর্টিং কিংবা দায়িত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই Producer–Importer–Brand Owner-এর মধ্যে কার ওপর প্রাথমিক দায়িত্ব থাকবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কাঠামো দরকার।
অন্যদিকে, প্লাস্টিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাতকে উপেক্ষা করা যাবে না। বর্জ্য সংগ্রহকারী, ফেরিওয়ালা, ভ্রাম্যমাণ সংগ্রাহক, ভাঙারি দোকান, মধ্যস্বত্বভোগী এবং ছোট ছোট পুনর্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এমন প্লাস্টিক সংগ্রহ করে আসছে, যা অন্যথায় হয়তো শহরের বর্জ্য ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নদী-খাল বা পরিবেশে পড়ত।
নতুন EPR ব্যবস্থা যদি এই বিদ্যমান নেটওয়ার্ককে বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন সংগ্রহব্যবস্থা তৈরি করতে চায়, তাহলে তা হবে অকার্যকর ও ব্যয়বহুল। বরং PRO-গুলোর উচিত বিদ্যমান অনানুষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে সমন্বয় করা। তাদের নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, স্বচ্ছ পারিশ্রমিক এবং সংগ্রহ করা বর্জ্য একত্র করার কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে।
এটি শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নয়; কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। প্লাস্টিক সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন, পুনরুদ্ধার, পুনর্ব্যবহার এবং পুনর্ব্যবহৃত পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বর্জ্যকে পরিবেশের বোঝা থেকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করা সম্ভব।
রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রেও নীতিটি সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হবে। যে প্লাস্টিক পণ্য কখনো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবেশ করে না, তার ওপর অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা শিল্পের জন্য বাড়তি ব্যয় তৈরি করতে পারে। তবে শুধু কোনো প্রতিষ্ঠান রপ্তানিমুখী হলেই তাকে EPR-এর বাইরে রাখা উচিত নয়। বরং বাস্তবে কত প্লাস্টিক দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে এসেছে, তার ভিত্তিতে ছাড় নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কাস্টমস ও বাণিজ্যিক নথির সঙ্গে রপ্তানি তথ্য মিলিয়ে দেখা যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত EPR ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে আইন প্রয়োগ ও তথ্যের ওপর। একটি প্রতিষ্ঠান কত প্লাস্টিক বাজারে দিয়েছে, তার কতটা সংগ্রহ হয়েছে, কোথা থেকে সংগ্রহ হয়েছে, কারা সংগ্রহ করেছে, কতটা পুনর্ব্যবহার কেন্দ্রে গেছে এবং শেষ পর্যন্ত কতটা সত্যিকার অর্থে পুনর্ব্যবহার হয়েছে—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর থাকতে হবে।
এর জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ডিজিটাল তথ্য ও যাচাই ব্যবস্থা। কোনো প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্য ধরে নেওয়া যাবে না। সংগ্রহ করা প্লাস্টিক আর প্রকৃতপক্ষে পুনর্ব্যবহার করা প্লাস্টিক এক বিষয় নয়। কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে বর্জ্য হস্তান্তর করলেই সেটিকে চূড়ান্ত পুনর্ব্যবহার হিসেবে গণনা করা হলে পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে। সংগ্রহ, পুনরুদ্ধার এবং প্রকৃত পুনর্ব্যবহারের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখতে হবে।
ছোট, মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠানকে ধাপে ধাপে EPR ব্যবস্থায় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত প্রশাসনিকভাবে যুক্তিযুক্ত। তবে শুধু প্রতিষ্ঠানের আকারকে পরিবেশগত দায়বদ্ধতার একমাত্র মাপকাঠি বানানো ঠিক হবে না। ছোট কোনো প্রতিষ্ঠানও বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বাজারে দিতে পারে। আবার বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের প্লাস্টিকের ব্যবহার তুলনামূলক কম হতে পারে। তাই ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের আকারের পাশাপাশি বাজারে কত পরিমাণ এবং কী ধরনের প্লাস্টিক দেওয়া হচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
একই সঙ্গে ছোট ব্যবসাগুলোর জন্য সহজ নিবন্ধন, সরল তথ্য প্রদান, যৌথভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ এবং নির্ধারিত ফি কাঠামো রাখা প্রয়োজন। অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার অনানুষ্ঠানিক খাতে চলে যেতে উৎসাহিত করতে পারে।
পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বাজার তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার বাড়াতে হলে পুনর্ব্যবহৃত উপকরণের জন্য স্থায়ী ক্রেতা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার দেশের অন্যতম বড় পণ্য ও সেবার ক্রেতা। তাই প্রযুক্তিগত মান ও সরবরাহ সক্ষমতা যেখানে অনুমোদন করে, সেখানে ধীরে ধীরে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা চালু করা যেতে পারে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থাগুলো পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের আসবাব, নির্মাণসামগ্রী, প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন উপযোগী পণ্য কেনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে। অর্থাৎ EPR-এর কাজ শুধু প্লাস্টিকের বর্জ্য ফেলার জায়গায় শেষ হবে না; সংগ্রহ থেকে পুনর্ব্যবহার, পুনর্ব্যবহার থেকে উৎপাদন এবং উৎপাদন থেকে বাজার—পুরো চক্রকে একসঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
এ জন্য বাংলাদেশের একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় ভিত্তি-তথ্যও প্রয়োজন। দেশে বছরে কত প্লাস্টিক বাজারে আসে, কারা তা বাজারজাত করে, কোন খাতে কত ব্যবহার হয়, কতটা সংগ্রহ করা হয়, পুনর্ব্যবহারের সক্ষমতা কোথায় কতটুকু এবং বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনায় প্রকৃত ব্যয় কত—এসব তথ্য ছাড়া সঠিক লক্ষ্যমাত্রা ও ফি নির্ধারণ কঠিন।
EPR-এর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো এটি প্লাস্টিক বর্জ্যের অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে। বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্যের সুবিধা ভোগ করে উৎপাদক ও ভোক্তা, কিন্তু ব্যবহারের পর এর পরিবেশগত ও সামাজিক ব্যয়ের বড় অংশ বহন করে পৌরসভা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং পরিবেশ। EPR সেই ব্যর্থ বাজারব্যবস্থাকে কিছুটা সংশোধন করে উৎপাদককে দায়িত্বের আওতায় আনার চেষ্টা করছে।
সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে উৎপাদকরা অপ্রয়োজনীয় প্যাকেজিং কমাতে, সহজে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান ব্যবহার করতে, পুনর্ব্যবহৃত কাঁচামালের ব্যবহার বাড়াতে এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা পুনঃব্যবহারযোগ্য পণ্যের নকশা তৈরি করতে উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে প্লাস্টিক সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি এবং পুনর্ব্যবহৃত কাঁচামালের নতুন বাজারও তৈরি হতে পারে।
তবে এই নীতির সাফল্য শুধু কতজন উৎপাদক নিবন্ধন করলেন, কতটি ফরম জমা হলো কিংবা কত টাকা ফি আদায় হলো—এসব দিয়ে বিচার করা যাবে না। আসল সাফল্য দেখা যাবে তখনই, যখন নদী-খাল ও ড্রেনে প্লাস্টিকের প্রবাহ কমবে, প্রকৃত পুনর্ব্যবহার বাড়বে, পুনর্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্থায়ী বাজার পাবে, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ন্যায্য আয় পাবেন, উৎপাদকরা প্যাকেজিংয়ের ধরন পরিবর্তন করবেন এবং সাধারণ মানুষ প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অংশ নেওয়ার বাস্তব সুযোগ পাবেন।
বাংলাদেশ এখন আর EPR থাকবে কি না—সেই পর্যায়ে নেই। গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। এখন আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কী ধরনের EPR ব্যবস্থা তৈরি করতে চায়।
শুধু নিয়ম মানা, নিবন্ধন আর রিপোর্টের ওপর জোর দিলে EPR হয়তো আরেকটি প্রশাসনিক কাঠামোতে পরিণত হবে। কিন্তু যদি উৎপাদকের দায়বদ্ধতার সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রণোদনা, অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্তি, নির্ভরযোগ্য তথ্য, পুনর্ব্যবহারের বাজার, সরকারি ক্রয়নীতি এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য নকশাকে যুক্ত করা যায়, তাহলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের প্লাস্টিক অর্থনীতির কাঠামোই বদলে দিতে পারে।
গেজেট আইনগত ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন সেই ভিত্তির ওপর কার্যকর প্রতিষ্ঠান, বাজার ও প্রণোদনার কাঠামো গড়ে তোলাই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ। প্লাস্টিক বর্জ্যকে শুধু আবর্জনা হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করা এবং একই সঙ্গে পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখার সুযোগ এখন বাংলাদেশের সামনে। সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, তার উত্তর নির্ভর করবে নীতিটি কাগজে কতটা সুন্দরভাবে লেখা হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি—বাস্তবে কতটা স্বচ্ছ, অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর এবং জবাবদিহিমূলকভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে তার ওপর।
আপনার মতামত জানানঃ