
বাংলাদেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক চিত্র যেন একই ফ্রেমে ধরা দুটি বিপরীত দৃশ্য। একদিকে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসছে রেকর্ড পরিমাণে। ডলারের বাজারে চাপ কিছুটা কমছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে ভরসা দিচ্ছে প্রবাসীদের আয়। অন্যদিকে দেশের ভেতরে প্রবৃদ্ধির গতি দুর্বল, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি মানুষের সংসারের হিসাব এলোমেলো করে দিচ্ছে। রাষ্ট্রের বৈদেশিক লেনদেনের খাতায় স্বস্তির যে রেখা দেখা যাচ্ছে, রান্নাঘরের বাজার কিংবা মাসশেষের হিসাবখাতায় তার প্রতিফলন খুব সামান্য।
আগস্টের প্রথম ২৬ দিনেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ২৪৫ কোটি ডলার। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্সও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। টাকার অবমূল্যায়ন, বৈধ চ্যানেলে পাঠানো অর্থের তুলনামূলক ভালো দর, নগদ প্রণোদনা এবং হুন্ডির বিরুদ্ধে তদারকি—সব মিলিয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলার আসার প্রবণতা বেড়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কারণ আমদানি ব্যয় পরিশোধ, জ্বালানি ও খাদ্য কেনা, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি দেওয়া এবং মুদ্রাবাজারে আস্থা ধরে রাখার জন্য রেমিট্যান্স এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎসগুলোর একটি।
কিন্তু রেমিট্যান্স বৃদ্ধি আর সামগ্রিক অর্থনৈতিক সুস্থতা এক জিনিস নয়। রেমিট্যান্স মূলত দেশের বাইরে কর্মরত মানুষের শ্রমের আয়। এই অর্থ একটি পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতে পারে, সন্তানের লেখাপড়া চালাতে পারে, ঘর নির্মাণ কিংবা ছোটখাটো ব্যবসায় সহায়তা করতে পারে। কিন্তু এটি দেশের ভেতরে উৎপাদন, নতুন শিল্প, উচ্চমানের চাকরি বা শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিকল্প নয়। বরং অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে আরও মানুষকে জীবিকার জন্য দেশ ছাড়তে হয়, আর রাষ্ট্র সেই প্রবাসী আয়ের ওপর ক্রমে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন রেমিট্যান্সের রেকর্ড একই সঙ্গে অর্জন ও সতর্কবার্তা—দুটিই হয়ে ওঠে।
বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থাটি দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতের চাপ, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং টানা তিন বছর দারিদ্র্য বৃদ্ধির কথা বলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল তুলনামূলক বেশি, ৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের দুর্বলতাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। সংখ্যায় পার্থক্য থাকলেও দুটি পূর্বাভাসের সাধারণ বার্তা একই—বাংলাদেশের অর্থনীতি আগের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় নেই এবং পুনরুদ্ধার এখনো ভঙ্গুর।
পরিবারের অস্বস্তির সবচেয়ে দৃশ্যমান কারণ মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রকাশিত বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৮.৩২ শতাংশে নেমেছে, জুনে যা ছিল ৯.১৬ শতাংশ। হার কমা স্বস্তির ইঙ্গিত হলেও এর অর্থ বাজারদর কমে গেছে—এমন নয়। এর অর্থ হলো, দাম এখনো বাড়ছে; শুধু বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে। কয়েক বছর ধরে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, ওষুধ, বাড়িভাড়া, শিক্ষা ও পরিবহনের ব্যয় যে উচ্চতায় উঠেছে, একটি মাসের কম মূল্যস্ফীতি সেই জমে থাকা চাপ মুছে দেয় না।
এই জায়গাতেই সামষ্টিক অর্থনীতির সাফল্য এবং পারিবারিক অভিজ্ঞতার বিচ্ছেদ তৈরি হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে ডলার সরবরাহ বাড়তে পারে, চলতি হিসাবের ঘাটতি কমতে পারে কিংবা রিজার্ভ স্থিতিশীল হতে পারে। কিন্তু একজন নিম্ন বা মধ্যবিত্ত নাগরিক অর্থনীতিকে বিচার করেন তার বেতন দিয়ে কত কেজি চাল কেনা যায়, সন্তানের স্কুলের ফি দেওয়া যায় কি না, চিকিৎসার খরচ সামলে মাসশেষে কিছু টাকা অবশিষ্ট থাকে কি না—এসব দিয়ে। জাতীয় সূচকের উন্নতি যদি বাস্তব আয় না বাড়ায়, তবে মানুষের কাছে সেই উন্নতি পরিসংখ্যানেই আটকে থাকে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের মজুরি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল রাখতে পারেনি। অর্থাৎ নামমাত্র বেতন কিছুটা বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। একই প্রতিবেদনে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ২১.৪ শতাংশে ওঠার কথা বলা হয়েছে। এর মানে আরও প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যে যুক্ত হয়েছে। একটি পরিবার রেমিট্যান্স পেলেও যদি খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় তার চেয়ে দ্রুত বাড়ে, তাহলে ডলারের অঙ্ক বড় হলেও জীবনের স্বস্তি ছোট হয়ে যায়।
আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো, সব পরিবার রেমিট্যান্স পায় না। প্রবাসী সদস্য আছে এমন পরিবার সরাসরি উপকৃত হয়; অন্য পরিবারগুলো পরোক্ষভাবে কিছু সুফল পেতে পারে—যেমন বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি, আমদানির সক্ষমতা বা স্থানীয় ব্যয়ের মাধ্যমে ব্যবসার চাহিদা। কিন্তু এই সুফল অসমভাবে বণ্টিত হয়। শহরের বেতনভোগী, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, ক্ষুদ্র কৃষক কিংবা বেকার তরুণ সরাসরি ডলার পান না; অথচ বাজারের বাড়তি দাম তাদেরও দিতে হয়। ফলে রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতিকে ধরে রাখলেও সমাজের সবার জীবন একই মাত্রায় ধরে রাখে না।
রেমিট্যান্সের বড় অংশ দৈনন্দিন ভোগে ব্যয় হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। খাদ্য, ঋণ পরিশোধ, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের খরচই অধিকাংশ পরিবারের অগ্রাধিকার। কিন্তু দেশে নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত, ব্যাংক খাত নিয়ে আস্থার সংকট এবং ছোট ব্যবসার জন্য অর্থায়ন কঠিন হলে এই অর্থ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপ নেয় কম। জমি, ফ্ল্যাট বা সোনা কেনা একটি পরিবারের সম্পদ বাড়াতে পারে, কিন্তু সবসময় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করে না। ফলে রেমিট্যান্সের অর্থ অর্থনীতিতে প্রবেশ করলেও তার বহুগুণ প্রভাব সীমিত থেকে যায়।
দুর্বল প্রবৃদ্ধির আরেকটি মুখ হলো কাজের বাজার। প্রবৃদ্ধি তখনই মানুষের জীবনে অর্থবহ হয়, যখন তা পর্যাপ্ত ও মানসম্মত চাকরি তৈরি করে। বেসরকারি বিনিয়োগ মন্থর হলে নতুন কারখানা, সেবা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা কম গড়ে ওঠে। উচ্চ সুদ, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, ব্যাংকের দুর্বলতা, নীতিগত অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি উদ্যোক্তাদের অপেক্ষায় রাখে। তখন নতুন শ্রমশক্তির একটি অংশ বেকার বা কম আয়ের কাজে আটকে যায়; আরেকটি অংশ বিদেশে যাওয়ার জন্য ঋণ করে। এই চক্রে প্রবাসন ব্যক্তিগত মুক্তির পথ হলেও জাতীয় কর্মসংস্থান ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
এর সঙ্গে রয়েছে অভিবাসনের উচ্চ মূল্য। একজন কর্মী বিদেশ যেতে জমি বিক্রি করেন, ঋণ নেন কিংবা উচ্চ সুদে টাকা সংগ্রহ করেন। প্রথম কয়েক মাস বা বছর তার পাঠানো অর্থের বড় অংশ চলে যায় সেই ঋণ শোধে। পরিবারের হাতে ডলার এলেও সেটির সবটুকু নতুন আয় নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা আগের দায় মেটানোর অর্থ। বিদেশে কম মজুরি, অনিরাপদ কাজ এবং নিয়োগ ব্যয়ের শোষণ থাকলে রেমিট্যান্সের রেকর্ডের আড়ালে প্রবাসীর ব্যক্তিগত ত্যাগ ও ঝুঁকি অদৃশ্য থেকে যায়।
তাহলে রেমিট্যান্সের সুফল কীভাবে পরিবারের স্থায়ী স্বস্তিতে রূপ নিতে পারে? প্রথমত, মূল্যস্ফীতি শুধু সুদের হার দিয়ে নয়, খাদ্য সরবরাহ, বাজার প্রতিযোগিতা, আমদানি ব্যবস্থাপনা এবং চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক খাত সংস্কার করে সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে নেওয়ার পথ তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রবাসী ও তার পরিবারকে কম খরচে নিরাপদ সঞ্চয়, বীমা, পেনশন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগে বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে। চতুর্থত, দক্ষতা উন্নয়ন ও নিয়োগ ব্যয় কমিয়ে একই সংখ্যক কর্মীর মাধ্যমে বেশি আয় অর্জনের ব্যবস্থা করতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো দেশের ভেতরে চাকরি ও আয় বাড়ানো। রেমিট্যান্স অর্থনীতির সুরক্ষাকবচ হতে পারে, কিন্তু উন্নয়নের ইঞ্জিন হতে পারে না। শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, নীতির ধারাবাহিকতা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার অর্থায়ন, নারীর কর্মসংস্থান এবং শ্রমঘন খাতে বিনিয়োগ না বাড়লে পরিবারগুলো প্রবাসীর পাঠানো অর্থ দিয়ে কেবল বাড়তে থাকা ব্যয়ের পেছনে ছুটবে। রাষ্ট্র ডলার পাবে, কিন্তু সমাজ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পাবে না।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা তাই একটি সরল সত্য সামনে আনে: বৈদেশিক মুদ্রার মজুত এবং মানুষের স্বস্তি এক সূচকে মাপা যায় না। প্রবাসীদের ডলার অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা থেকে বাঁচাচ্ছে—এটি তাদের অসামান্য অবদান। কিন্তু সেই অর্থের ওপর ভর করে যদি বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ন্যায্য মজুরির সংস্কার পিছিয়ে দেওয়া হয়, তবে রেকর্ড রেমিট্যান্সও কেবল সংকট সামলানোর উপায় হয়ে থাকবে। পরিবার সত্যিকার স্বস্তি পাবে তখনই, যখন ডলার আসার পাশাপাশি দেশের ভেতরেও মানুষের আয় বাড়বে, কাজের নিশ্চয়তা তৈরি হবে এবং বাজারদরের ওপর তার ক্রয়ক্ষমতা ফিরে আসবে।
আপনার মতামত জানানঃ