
ভারতের সরকারি দপ্তর নিয়ে বহুল পরিচিত একটি অভিযোগ হলো—সেখানে নাগরিকের চেয়ে ফাইলের গুরুত্ব বেশি। একটি সনদ, ভাতা, জমির নথি কিংবা রাস্তার সমস্যার সমাধান চাইতে গিয়ে মানুষকে এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘুরতে হয়। কে সিদ্ধান্ত নেবেন, কর্মকর্তা কখন পাওয়া যাবেন এবং আবেদনটি কোন পর্যায়ে আছে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রায়ই থাকে না।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার এই পুরোনো অভিজ্ঞতা বদলাতে ‘জনতার দরবার’ চালুর নির্দেশ দিয়েছে। এখন থেকে প্রতি মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিজ দপ্তরে উপস্থিত থেকে সাধারণ মানুষের অভিযোগ শুনতে হবে। এ জন্য আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
জেলা শাসক, অতিরিক্ত জেলা শাসক, মহকুমা শাসক, ব্লক উন্নয়ন কর্মকর্তা, পৌর কমিশনার, পুলিশ, বন বিভাগ এবং বিভিন্ন লাইন ডিপার্টমেন্টের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এই ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে অন্য সভা, সফর কিংবা প্রশাসনিক কর্মসূচি যথাসম্ভব না রাখতেও বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সরকারি ফোন নম্বর ও ই-মেইল দপ্তরের দৃশ্যমান স্থানে এবং সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশের নির্দেশ রয়েছে। নাগরিক সরাসরি উপস্থিত হতে না পারলে ফোন বা ই-মেইলেও যোগাযোগ করতে পারবেন। The Indian Express, News on AIR
কাগজে-কলমে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সংস্কার। নাগরিককে কর্মকর্তার কাছে পৌঁছানোর অনুমতি দেওয়া নয়, কর্মকর্তাকে নাগরিকের জন্য নির্দিষ্ট সময় দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
কিন্তু সরকারি অফিসের দরজা খোলাই কি জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট?
‘দরবার’ ও ‘অধিকার’ এক বিষয় নয়
‘জনতার দরবার’ কথাটির মধ্যে একটি ঐতিহাসিক বৈপরীত্য রয়েছে। দরবারে শাসক বা কর্মকর্তা ওপরে বসেন, প্রজা সামনে এসে আবেদন জানায়। আবেদন শোনা ও প্রতিকার দেওয়া অনেকটাই ক্ষমতাবানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের সরকারি পরিষেবা পাওয়াকে অনুগ্রহ হিসেবে দেখার কথা নয়। এটি তার অধিকার। কর্মকর্তা নাগরিকের আবেদন শুনবেন—এটি দয়া নয়, তাঁর দায়িত্ব।
নতুন ব্যবস্থাটি যদি নাগরিককে শুধু কর্মকর্তার সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত পাওয়ার অধিকার না দেয়, তবে পুরোনো দরবারি সংস্কৃতিই নতুন নামে ফিরে আসতে পারে। মানুষ অভিযোগ জানাবে, কর্মকর্তা শুনবেন, আশ্বাস দেবেন—তারপর ফাইল আবার আগের স্তূপে ফিরে যাবে।
সুতরাং ‘জনতার দরবার’ কত মানুষকে কর্মকর্তার সামনে আনল, শুধু তা দিয়ে উদ্যোগটির সাফল্য বিচার করা যাবে না। জানতে হবে—কতটি অভিযোগ গ্রহণ করা হলো, কতটির সমাধান হলো, কত দিনের মধ্যে হলো এবং যেগুলোর সমাধান হয়নি, সেগুলো কেন হয়নি।
নতুন ব্যবস্থাটি কীভাবে কাজ করার কথা
‘জনতার দরবার’ একেবারে বিচ্ছিন্ন কোনো আয়োজন নয়। এটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘আপনার সরকার, আপনার পাশে’ জনঅভিযোগ ব্যবস্থার মাঠপর্যায়ের সম্প্রসারণ।
জুনে চালু হওয়া এই উদ্যোগে সরকারি পরিষেবা ও কল্যাণমূলক প্রকল্প নিয়ে অভিযোগ জানানোর জন্য একটি কেন্দ্রীয় হেল্পলাইন এবং ই-মেইল ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অনলাইনে অভিযোগ নথিভুক্ত হলে নাগরিককে একটি পরিচিতি নম্বর দেওয়ার কথা, যার সাহায্যে অভিযোগটি কোন বিভাগে গেছে এবং নিষ্পত্তির অবস্থা কী—তা দেখা যাবে। রাজ্যের কর্মী ও প্রশাসনিক সংস্কার বিভাগের ভাষায়, স্থানীয় বা বিভাগীয় স্তরে সমাধান না পাওয়া অভিযোগ উচ্চতর কর্তৃপক্ষ ও মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরের নজরে আনার জন্য এই ব্যবস্থা। পশ্চিমবঙ্গ কর্মী ও প্রশাসনিক সংস্কার বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর
নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, সরাসরি দরবারে আসা অভিযোগ ও কর্মকর্তার নেওয়া পদক্ষেপও একই ব্যবস্থায় নথিভুক্ত করার কথা। তাত্ত্বিকভাবে এতে মৌখিক আবেদন একটি অনুসরণযোগ্য প্রশাসনিক রেকর্ডে পরিণত হতে পারে।
এখানেই উদ্যোগটির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। কারণ সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে একবার দেখা করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—অভিযোগটি এমন একটি ব্যবস্থায় প্রবেশ করছে কি না, যেখান থেকে সেটি অদৃশ্য করে দেওয়া কঠিন।
ডিজিটাল ট্র্যাকিং কেন গুরুত্বপূর্ণ
একটি অভিযোগব্যবস্থায় সবচেয়ে দুর্বল জায়গা প্রায়ই অভিযোগ গ্রহণ নয়; তার পরের ধাপ।
নাগরিক আবেদন জমা দিলেন, কিন্তু কে দায়িত্ব পেলেন তা জানলেন না। কর্মকর্তা বললেন, বিষয়টি অন্য বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সেই বিভাগ আবার বলল, প্রয়োজনীয় নথি পাওয়া যায়নি। কয়েক মাস পর আবেদনকারীকে নতুন করে শুরু করতে হলো।
একটি কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রতিটি অভিযোগের সময়, দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগ, গৃহীত পদক্ষেপ এবং নিষ্পত্তির কারণ সংরক্ষণ করতে পারে। এতে কোন পর্যায়ে অভিযোগ আটকে আছে, তা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও দেখতে পারেন।
তবে ডিজিটাল পোর্টাল থাকলেই স্বচ্ছতা আসে না। অভিযোগকে ‘নিষ্পত্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং নাগরিকের সমস্যা বাস্তবে সমাধান হওয়া এক বিষয় নয়। কোনো কর্মকর্তা শুধু একটি উত্তর পাঠিয়েই ফাইল বন্ধ করতে পারেন। তাই পোর্টালের তথ্যের সঙ্গে অভিযোগকারীর প্রতিক্রিয়া ও স্বাধীন যাচাই যুক্ত না হলে নিষ্পত্তির হার বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
ভারতের অন্য কয়েকটি অভিযোগ ব্যবস্থায় সমাধানের পর নাগরিককে ফোন করে সন্তুষ্টি যাচাই, মাসিক পর্যালোচনা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কর্মদক্ষতার সঙ্গে ফলাফল যুক্ত করার নজির রয়েছে। এসব ব্যবস্থার সাফল্য শুধু প্রযুক্তির কারণে নয়; নিয়মিত নজরদারি ও ফল যাচাইয়ের কারণেও এসেছে।
কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারেন
অনলাইন পোর্টাল শিক্ষিত শহুরে মানুষের জন্য সহজ হতে পারে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বহু প্রবীণ নাগরিক, গ্রামের দরিদ্র পরিবার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিতে অনভ্যস্ত মানুষের জন্য সরকারি ওয়েবসাইটে অভিযোগ করা এখনো কঠিন।
সরাসরি কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার সুযোগ এই ডিজিটাল বিভাজন কমাতে পারে। রেশন, আবাসন, সামাজিক পেনশন, জমির নথি, পানীয় জল, রাস্তা, পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা বা স্থানীয় দপ্তরের হয়রানির মতো সমস্যা নাগরিক নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
কোনো নথি অসম্পূর্ণ থাকলে কর্মকর্তা সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দিতে পারেন। কয়েক সপ্তাহ চিঠি চালাচালির পরিবর্তে একটি বৈঠকেই ভুল বোঝাবুঝি দূর হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের আগের ‘দুয়ারে সরকার’ কর্মসূচিও সরকারি পরিষেবা মানুষের বসবাসের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল প্রবীণ, প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ পিছিয়ে থাকা নাগরিকদের কল্যাণমূলক প্রকল্পে প্রবেশ সহজ করা। National Informatics Centre—West Bengal
ছোট পরিসরের একটি গবেষণায় ‘দুয়ারে সরকার’-এর অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশ পরিষেবা নিয়ে সন্তুষ্টি জানিয়েছিলেন। তবে জমির নথির মতো জটিল বিষয়ে সমস্যাও রয়ে গিয়েছিল। দুয়ারে সরকার নিয়ে গবেষণা
এ অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রশাসনকে কাছে আনা সহজ সমস্যার দ্রুত সমাধান দিতে পারে; কিন্তু জমি, নিয়োগ, দুর্নীতি বা পুলিশি অভিযোগের মতো ক্ষমতা ও আইনের সঙ্গে যুক্ত বিরোধ শুধু একটি শুনানিতে মেটে না।
কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ হলে কী হবে
একজন নাগরিকের অভিযোগ যদি সেই কর্মকর্তা বা তাঁর অধীনস্থ দপ্তরের বিরুদ্ধেই হয়, তখন সমস্যাটি আরও জটিল।
ঘুষ চাওয়া, রাজনৈতিক পক্ষপাত, নথি আটকে রাখা কিংবা পুলিশি হয়রানির অভিযোগ একই দপ্তরে বসে শুনলে আবেদনকারী নিরাপদ বোধ করবেন কি? অভিযোগ করার কারণে পরে প্রতিশোধের আশঙ্কা থাকবে না তো?
কার্যকর ব্যবস্থায় তাই ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আপিল, পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ এবং গুরুতর অভিযোগ স্বাধীন সংস্থায় পাঠানোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। কর্মকর্তা নিজের দপ্তরের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনে নিজেই চূড়ান্ত বিচারক হলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হবে।
নতুন নির্দেশে অভিযোগ গ্রহণ ও ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও স্বাধীন আপিল, ক্ষতিপূরণ কিংবা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের কাঠামো কতটা শক্তিশালী হবে—সেটিই বড় পরীক্ষা।
প্রান্তিক মানুষের সামনে নতুন বাধা
দরবারে প্রবেশ সবার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হলেও বাস্তবে সবাই সমানভাবে কথা বলতে পারবেন না।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী কিংবা দলীয় কর্মীরা যদি লাইনের নিয়ন্ত্রণ নেন, তবে দরিদ্র ও অসংগঠিত নাগরিক আবার পিছিয়ে পড়বেন। লিখিত আবেদন তৈরি, নথি সংগ্রহ কিংবা কর্মকর্তার ভাষা বোঝার জন্য নতুন দালালশ্রেণিও তৈরি হতে পারে।
নারী, দলিত, আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, অভিবাসী শ্রমিক এবং প্রতিবন্ধী নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণে বৈষম্য হচ্ছে কি না—তার পৃথক তথ্য প্রয়োজন। শুধু মোট অভিযোগের সংখ্যা প্রকাশ করলে এই অসমতা দেখা যাবে না।
দপ্তর কত দূরে, যাতায়াতের খরচ কত, ভবনে হুইলচেয়ার প্রবেশ সম্ভব কি না এবং অভিযোগ গ্রহণে বাংলা ছাড়া অন্য স্থানীয় ভাষার ব্যবস্থা আছে কি না—এসবও জবাবদিহির অংশ।
সেবা দেওয়া ও জবাবদিহি কি একই?
কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে আটকে থাকা পেনশন চালু হলে সেটি অবশ্যই নাগরিকের জন্য বাস্তব সাফল্য। কিন্তু প্রশাসনিক জবাবদিহির পরিধি আরও বড়।
একই ধরনের পেনশন কেন শত মানুষের ক্ষেত্রে আটকে ছিল? কোন নিয়ম বা কর্মকর্তা বিলম্বের জন্য দায়ী? ভবিষ্যতে যাতে অন্য কারও একই সমস্যা না হয়, সে জন্য কী পরিবর্তন আনা হলো?
অভিযোগের ব্যবস্থা শুধু একজনের সমস্যা মেটালে তা প্রতিকার। একই অভিযোগের ধরন বিশ্লেষণ করে প্রশাসনিক নিয়ম বদলালে তা সংস্কার। আর যে ব্যর্থতার কারণে সমস্যা হয়েছিল, তার দায়িত্ব নির্ধারণ হলে সেটি জবাবদিহি।
‘জনতার দরবার’ সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে হলে এই তিন স্তরেই কাজ করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ প্রতিকারবিষয়ক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, কার্যকর অভিযোগব্যবস্থা ব্যক্তিগত অন্যায়ের প্রতিকার দেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের পদ্ধতিগত দুর্বলতা শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু অভিযোগের তথ্য শেখা ও নীতি সংশোধনের কাজে ব্যবহার না করলে সেই সম্ভাবনা পূরণ হয় না। World Bank
রাজনীতির জনসংযোগ হওয়ার ঝুঁকি
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের পর নতুন বিজেপি সরকার প্রশাসনের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ‘জনতার দরবার’ সেই রাজনৈতিক বার্তা দৃশ্যমান করার কার্যকর মাধ্যম।
কর্মকর্তার সামনে সাধারণ মানুষের সারি, হাতে অভিযোগপত্র এবং দ্রুত নির্দেশ দেওয়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শক্তিশালী প্রচারণার উপাদান। এতে সরকার দেখাতে পারে—পুরোনো শাসনের বন্ধ দরজার বিপরীতে নতুন প্রশাসন মানুষের কাছে উন্মুক্ত।
রাজনৈতিক যোগাযোগ নিজে অপরাধ নয়। নাগরিকের আস্থা তৈরি করাও সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু সমস্যা হবে যদি দৃশ্যমান শুনানির ছবিই প্রধান ফল হয়ে ওঠে এবং অভিযোগের পরিণতি অদৃশ্য থাকে।
কত মানুষ দরবারে এলেন, সেই সংখ্যা প্রকাশ করা সহজ। কতজনের সমস্যা তিন মাস পরও সমাধান হয়নি, তা প্রকাশ করা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর। সত্যিকারের স্বচ্ছতা তাই সরকারের সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার তথ্যও প্রকাশের সাহস দাবি করে।
কীভাবে উদ্যোগটির সাফল্য মাপা যাবে
‘জনতার দরবার’ জবাবদিহি আনছে কি না বোঝার জন্য কয়েকটি ফল প্রকাশ করা জরুরি।
প্রতিটি জেলা ও দপ্তরে কত অভিযোগ জমা পড়েছে, অভিযোগের ধরন কী, গড় নিষ্পত্তির সময় কত এবং কত অভিযোগ নির্ধারিত সময় অতিক্রম করেছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার।
কত আবেদন ‘নিষ্পত্তি’ দেখানো হয়েছে এবং তার মধ্যে কতজন অভিযোগকারী বাস্তবে সন্তুষ্ট, সেটিও পৃথকভাবে জানতে হবে। একই বিষয়ে বারবার অভিযোগ এলে সংশ্লিষ্ট নিয়ম বা দপ্তরে কী সংস্কার হয়েছে, তারও ব্যাখ্যা থাকা উচিত।
গুরুতর অভিযোগে কতজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হয়েছে এবং আপিলে কতটি সিদ্ধান্ত বদলেছে—এই তথ্য ছাড়া জবাবদিহির দাবি অসম্পূর্ণ থাকবে।
সবশেষে স্বাধীন নিরীক্ষা প্রয়োজন। সরকার নিজের কর্মসূচির সাফল্য নিজেই মাপলে স্বাভাবিকভাবেই অনুকূল সংখ্যা বেছে নেওয়ার ঝুঁকি থাকবে। নাগরিক সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা নিরপেক্ষ নিরীক্ষকের মাধ্যমে নমুনাভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থাটির বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পারে।
জনশুনানি কখন ক্ষমতায়ন করে
ভারতে জনশুনানি ও সামাজিক নিরীক্ষার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বহু ক্ষেত্রে গ্রামের মানুষ সরকারি হিসাব প্রকাশ্যে পড়ে শুনে ভুয়া নাম, অসম্পূর্ণ কাজ ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা শনাক্ত করেছেন।
এই অভিজ্ঞতার শিক্ষা হলো—কেবল নাগরিকের বক্তব্য শোনা যথেষ্ট নয়। তার হাতে তথ্য, কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে উত্তর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পথ থাকতে হয়।
ভারতের সামাজিক নিরীক্ষাব্যবস্থায় ‘জন শুনানি’ কার্যকর হয়েছে তখনই, যখন এটি শুধু ব্যক্তিগত আবেদন নয়, সরকারি নথি ও ব্যয়ের ওপর সম্মিলিত নাগরিক নজরদারিতে পরিণত হয়েছে। ভারতের সামাজিক ন্যায়বিচার মন্ত্রণালয়ও সামাজিক নিরীক্ষাকে তথ্যের পদ্ধতিগত দাবির মাধ্যমে সরকারি সংস্থার জনজবাবদিহি নিশ্চিত করার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করে। ভারত সরকারের সামাজিক নিরীক্ষা প্ল্যাটফর্ম
পশ্চিমবঙ্গের দরবার যদি একেক নাগরিকের বিচ্ছিন্ন অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সমস্যার পদ্ধতিগত চেহারা আড়ালে থেকে যাবে। একই গ্রামের শত মানুষ পানীয় জল পাচ্ছেন না—এটি শতটি পৃথক আবেদন নয়; এটি একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
দরজা খোলার পরের কাজ
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিদ্ধান্তের একটি তাৎপর্য অস্বীকার করা যাবে না। কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া সপ্তাহে নির্দিষ্ট সময়ে শীর্ষ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ প্রশাসনিক দূরত্ব কমাতে পারে। ফোন ও ই-মেইল প্রকাশ কর্মকর্তার নাগাল পাওয়াও সহজ করবে। অনলাইন ট্র্যাকিং মৌখিক আশ্বাসকে নথিভুক্ত প্রতিশ্রুতিতে রূপ দিতে পারে।
কিন্তু এগুলো জবাবদিহির অবকাঠামো—নিজে জবাবদিহি নয়।
সত্যিকারের পরিবর্তন তখনই হবে, যখন কর্মকর্তা শুধু নাগরিকের কথা শুনবেন না, সমাধান দিতে ব্যর্থ হলে তাঁকেও ব্যাখ্যা দিতে হবে। অভিযোগের ফল নাগরিক যাচাই করতে পারবেন। বন্ধ করা অভিযোগ পুনরায় খোলার পথ থাকবে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সবাই সমান সুযোগ পাবেন। আর অভিযোগের তথ্য ব্যবহার করে বারবার ঘটে চলা প্রশাসনিক সমস্যার মূল কারণ বদলানো হবে।
‘জনতার দরবার’ সফল হলে সরকারি দপ্তরে যাওয়ার জন্য নাগরিককে কোনো নেতা, দালাল বা পরিচিত কর্মকর্তার সাহায্য নিতে হবে না। ব্যর্থ হলে নতুন সময়সূচি, নতুন পোর্টাল ও নতুন প্রচারণার আড়ালে পুরোনো আমলাতন্ত্রই টিকে থাকবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কর্মকর্তা জনতার সামনে বসছেন কি না—সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, জনগণের প্রশ্নের সামনে প্রশাসনকে উত্তরদায়ী করা যাচ্ছে কি না।
দরজা খুলেছে। এখন দেখতে হবে, তার ভেতরে প্রবেশ করা অভিযোগগুলো সমাধানের পথে যায়, নাকি আরেকটি ফাইল হয়ে পুরোনো স্তূপে হারিয়ে যায়।
আপনার মতামত জানানঃ