রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, বুলিং, শিক্ষকদের আচরণ এবং কোচিং বাণিজ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির বসুন্ধরা শাখার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইবতিশাম রাফিফ ইসলাম আরিশার মৃত্যুর পর এসব অভিযোগ সামনে আনেন কয়েকজন অভিভাবক। তাদের দাবি, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু পাঠদান ও পরীক্ষার ফলাফলই গুরুত্বপূর্ণ নয়; শিক্ষার্থীদের মানসিক নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রতিষ্ঠানের অন্যতম দায়িত্ব। তাই আরিশার মৃত্যুর ঘটনাসহ উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
সোমবার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বেইলি রোড ক্যাম্পাসে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন কয়েকজন অভিভাবক। সেখানে তারা শিক্ষকদের আচরণ, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বুলিং, কোচিং বাণিজ্য এবং হেড গার্ল নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতে চেয়েছেন বলে জানান। পরে ক্যাম্পাসের বাইরে সাংবাদিকদের সামনে নিজেদের অভিযোগ ও দাবির কথা তুলে ধরেন তারা।
অভিভাবকদের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে শিক্ষার্থীদের মানসিক নিরাপত্তার বিষয়টি। তাদের মতে, সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর পর শ্রেণিকক্ষ কিংবা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে তার সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হচ্ছে, সেটি সবসময় অভিভাবকদের পক্ষে জানা সম্ভব হয় না। একজন শিক্ষার্থী কোনো শিক্ষক বা সহপাঠীর আচরণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলেও অনেক সময় সে বিষয়টি পরিবারকে জানায় না। ফলে বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষকদের আচরণ এবং শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
অভিভাবক এমএএম ইফতেখার মোমিন বলেন, সন্তানদের স্কুলে দিয়ে আসার পর প্রতিষ্ঠানের ভেতরে তাদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হচ্ছে, তা সবসময় জানা যায় না। শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বুলিংয়ের অভিযোগ সামনে আসছে, পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যেও বুলিংয়ের ঘটনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রশাসন কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা অধ্যক্ষের কাছে জানতে চেয়েছেন বলেও জানান তিনি।
বুলিং এখন শুধু একটি শিশুর সঙ্গে অন্য শিশুর ঝগড়া বা ঠাট্টার বিষয় নয়। দীর্ঘ সময় ধরে অপমান, উপহাস, ভয় দেখানো, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া কিংবা কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে অপমানজনক আচরণ একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ও মানসিক সুস্থতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কৈশোরে একজন শিক্ষার্থী নিজের পরিচয়, আত্মসম্মান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যায়। সেই সময়ে বিদ্যালয়ের পরিবেশ যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে তার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
এই জায়গাতেই আরিশার মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে অভিভাবকদের প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তারা জানতে চেয়েছেন, শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দায়বদ্ধতা কী ছিল এবং কোনো শিক্ষক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের ভূমিকা ছিল কি না, তা যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছে কি না। তবে কোনো ঘটনার সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ার আগে অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নির্ধারণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আরিশার মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো শোকবার্তা বা আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ করা হয়নি বলেও প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা। তাদের বক্তব্য, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী মারা গেলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে শোক প্রকাশ এবং সহপাঠীদের মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকা উচিত। একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, তার সহপাঠী, শিক্ষক ও পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও গভীর আঘাতের ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলা হবে, কীভাবে তাদের মানসিকভাবে সহায়তা করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ। অভিভাবকদের অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্কুলের শিক্ষকের কাছে কোচিং না করলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণের পরিবেশ তৈরি হয়। তারা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের কোচিং নির্ভরতার কারণে পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ পড়ে এবং একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক চাপও বাড়তে পারে।
ইফতেখার মোমিন কোচিং বাণিজ্য বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, সরকার কোচিং বাণিজ্য বন্ধের যে উদ্যোগের কথা বলেছে, তারা তার সঙ্গে একমত। তার অভিযোগ, কোচিং বাণিজ্য বন্ধ না হলে বুলিং ও হয়রানির মতো সমস্যাও পুরোপুরি বন্ধ হবে না। এমনকি একটি শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পেছনে কোচিং বাণিজ্যের ভূমিকা রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন। তবে এই দাবির সত্যতা নির্ধারণ করতে অবশ্যই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
অভিভাবকদের আরেকটি অভিযোগ ধানমন্ডি শাখার তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ঘিরে। ইফতেখার মোমিনের দাবি, ওই শিক্ষার্থী ৪৭ দিন ধরে ক্লাসে যেতে পারছে না এবং ঘটনাটির সঙ্গেও কোচিং বাণিজ্যের বিষয় এসেছে। তবে এই অভিযোগের বিস্তারিত কারণ ও সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে তার পেছনে কী কারণ রয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠান ও পরিবারের সমন্বিতভাবে খোঁজ নেওয়া জরুরি।
কোচিংয়ের আর্থিক চাপের বিষয়টিও অভিভাবকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকের জন্য স্কুলের বেতন, বই-খাতা, পোশাক ও অন্যান্য খরচের পাশাপাশি নিয়মিত কোচিংয়ের ব্যয় বহন করা কঠিন হতে পারে। যদি বিদ্যালয়ের পাঠদানের পরও একই শিক্ষকের কাছে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে পড়ার প্রয়োজন তৈরি হয়, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। অভিভাবকদের ভাষায়, স্কুলে পড়ার পরও যদি একই শিক্ষকের কাছে কোচিং করতে হয়, তাহলে বিদ্যালয়ের পাঠদানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক।
তবে কোচিং বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সব শিক্ষককে একইভাবে দায়ী করাও যুক্তিসংগত নয়। কোনো শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে অতিরিক্ত পাঠদান করতে পারেন, আবার কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর প্রয়োজনেও অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। মূল বিষয় হলো—কোনো শিক্ষার্থীকে কোচিংয়ে অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে কি না, কোচিং না করলে তাকে কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে কি না এবং বিদ্যালয়ের পাঠদানকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল করে ব্যক্তিগত কোচিংয়ের দিকে শিক্ষার্থীদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব।
হেড গার্ল নির্বাচন নিয়েও অভিভাবকদের অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, এই পদকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয় এবং বিভিন্ন পক্ষের তদবিরের বিষয়ও সামনে আসে। এমনকি বিভিন্ন সময়ে হেড গার্ল ও তার প্যানেলকে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে বলেও তারা জানান। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া নিঃসন্দেহে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সেই নেতৃত্ব নির্বাচন যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বাইরে চলে যায়, তাহলে তা শিক্ষার্থীদের মধ্যকার বিভাজন বা প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব নির্বাচন শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও সংগঠনিক দক্ষতা গড়ে তোলার একটি সুযোগ হতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগকে কেন্দ্র করে কোনো শিক্ষার্থী বা গোষ্ঠীর ওপর অযাচিত চাপ তৈরি হলে তা শিক্ষার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই নেতৃত্ব নির্বাচন ও শিক্ষার্থীদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট নিয়ম, সমান সুযোগ এবং প্রশাসনিক নজরদারি থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন অভিভাবকরা।
অধ্যক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়েও অভিভাবকদের বক্তব্য রয়েছে। তাদের দাবি, সাক্ষাৎ করতে গিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা হলে তিনি বিষয়গুলো দেখছেন এবং সঠিক বিচার করবেন বলে জানিয়েছেন। অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আরিশার মৃত্যুর বিষয়ে সঠিক তদন্ত এবং যে শিক্ষকের বিরুদ্ধে বুলিংয়ের অভিযোগ রয়েছে, তার বিরুদ্ধেও তদন্ত করা প্রয়োজন। তদন্ত নিরপেক্ষ না হলে ভবিষ্যতে তারা এ বিষয়ে আরও পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবেন বলেও জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম অভিভাবকদের সঙ্গে এসব বিষয়ে আলোচনার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, অভিভাবকরা স্বাভাবিকভাবে এসেছিলেন এবং তাদের সঙ্গে অভিভাবক হিসেবে কথা হয়েছে। অর্থাৎ অভিযোগকারীদের বক্তব্য এবং প্রতিষ্ঠানের প্রধানের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে এই অবস্থায় কোনো পক্ষের বক্তব্যকে একমাত্র সত্য ধরে নেওয়ার পরিবর্তে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করাই হবে দায়িত্বশীল পদ্ধতি।
বসুন্ধরা শাখার এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার বিষয়েও অধ্যক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হয়। তিনি বলেন, ওই শিক্ষার্থীর কোনো অভিযোগ ছিল না। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে তদন্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীটির বিষয়ে আরও কিছু করা উচিত বলে প্রতিষ্ঠান মনে করছে এবং এ বিষয়ে একাধিক তদন্ত হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—কোনো শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করলে বা অস্বাভাবিকভাবে মারা গেলে শুধু ঘটনাটির তাৎক্ষণিক কারণ খোঁজা যথেষ্ট নয়। তার মানসিক অবস্থা, পারিবারিক পরিস্থিতি, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, সহপাঠীদের আচরণ, শিক্ষকদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং কোনো ধরনের চাপ বা হয়রানির অভিযোগ ছিল কি না—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন যোগাযোগের কোনো ভূমিকা থাকলে সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
বিদ্যালয়ে শিশু ও কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু শিক্ষকদের নয়; অভিভাবক, শিক্ষার্থী, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ—সবার। একটি অভিযোগ উঠলেই শিক্ষককে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি অভিযোগকে গুরুত্ব না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়াও দায়িত্বশীল আচরণ নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
ভিকারুননিসার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সীমার মধ্যে আটকে নেই। দেশের স্কুল-কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের মানসিক নিরাপত্তা কতটা গুরুত্ব পায়, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক কতটা সুস্থ, বুলিংয়ের অভিযোগ কীভাবে তদন্ত হয় এবং কোচিং নির্ভরতা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়—এসব বৃহত্তর প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যায় শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়। সে সেখানে বন্ধুত্ব তৈরি করে, আত্মবিশ্বাস অর্জন করে, ভুল থেকে শেখে এবং ভবিষ্যতের নাগরিক হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করে। তাই বিদ্যালয়ের পরিবেশে ভয়, অপমান, বৈষম্য কিংবা অযাচিত চাপের জায়গা থাকা উচিত নয়।
বিশেষ করে কোনো শিক্ষার্থীর মৃত্যু বা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলে প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত স্বচ্ছ, সংবেদনশীল ও তথ্যভিত্তিক। একই সঙ্গে পরিবারের কষ্ট ও গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। তদন্তের নামে কোনো শিক্ষার্থীকে আবার মানসিকভাবে আঘাত করা যাবে না। অভিযোগকারী, অভিযুক্ত এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের বক্তব্য শোনা এবং প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাই প্রতিষ্ঠানটির ওপর অভিভাবক ও সমাজের প্রত্যাশাও বেশি। সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো যদি ভুল বা ভিত্তিহীন হয়, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা পরিষ্কার হওয়া উচিত। আর যদি কোনো অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
অভিভাবকদের মূল দাবি আসলে একটি নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন। যেখানে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষককে ভয় না পেয়ে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারবে, সহপাঠীর বুলিংয়ের শিকার হলে সাহায্য চাইতে পারবে এবং কোচিং বা অন্য কোনো সুবিধার সঙ্গে তার একাডেমিক মূল্যায়ন জড়িয়ে পড়বে না। একই সঙ্গে শিক্ষকও যেন প্রমাণ ছাড়া অভিযোগের শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের সমাধান কোনো পক্ষের জয়-পরাজয়ের মাধ্যমে হওয়া উচিত নয়। জয়ী হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা ও ন্যায়বিচার। আরিশার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, বুলিংয়ের অভিযোগ, কোচিং বাণিজ্য এবং অন্যান্য উত্থাপিত বিষয় নিয়ে যদি নিরপেক্ষ তদন্ত হয় এবং তার ফলাফল স্বচ্ছভাবে জানানো হয়, তাহলে অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন, ফলাফল বা সুনাম নয়—তার শিক্ষার্থীরা। তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারলেই একটি প্রতিষ্ঠান সত্যিকার অর্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। ভিকারুননিসাকে ঘিরে ওঠা সাম্প্রতিক প্রশ্নগুলোর উত্তর তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার মতামত জানানঃ