বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় বৈদেশিক ঋণ নতুন কোনো বিষয় নয়। অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, বড় বড় সেতু ও সড়ক প্রকল্প, রেলপথ, নগর উন্নয়ন কিংবা বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে বছরের পর বছর বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করেছে দেশ। তবে গত ১৪ বছরে নেওয়া বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ যখন প্রায় ৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই ঋণ দেশের অর্থনীতিতে কতটা সুফল এনেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর এর দায় কতটা চাপিয়ে দিয়েছে?
জাতীয় সংসদে সম্প্রতি দেওয়া অর্থমন্ত্রীর এক বক্তব্যে উঠে এসেছে বৈদেশিক ঋণের এই বড় অঙ্কের তথ্য। সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, ২০১০ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে বিদেশ থেকে ৮১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সময়ে সরকারের বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে আসল হিসেবে ১৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন এবং সুদ বাবদ ৬ দশমিক ০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে।
অঙ্কটি বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে এর বিশালত্ব আরও স্পষ্ট হয়। ডলারের বিনিময় হার সময়ভেদে পরিবর্তিত হওয়ায় সুনির্দিষ্ট টাকার অঙ্ক ভিন্ন হবে। তবে ৮১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার যে কয়েক লাখ কোটি টাকার সমান, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অর্থাৎ গত দেড় দশকে দেশের উন্নয়ন ও বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রমে বৈদেশিক উৎস থেকে যে অর্থ এসেছে, তার পরিমাণ বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শুধু ঋণের মোট অঙ্ক দেখেই অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব বিচার করা যায় না। একটি দেশের জন্য বৈদেশিক ঋণ নিজে থেকেই খারাপ কিছু নয়। বরং সঠিক পরিকল্পনা, কম সুদ, দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধের সুযোগ এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বৈদেশিক ঋণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। সমস্যাটি তৈরি হয় তখন, যখন ঋণ নিয়ে এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয় যেখান থেকে প্রত্যাশিত আয় বা অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যায় না, অথবা ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ দেশের রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ ব্যবহার হয়েছে অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এসব বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি নতুন সেতু বা মহাসড়ক শুধু নির্মাণকাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর মাধ্যমে পণ্য পরিবহন সহজ হয়, সময় ও খরচ কমে, নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠতে পারে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বাড়ে। একইভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলপথ, বন্দর কিংবা নগর অবকাঠামোয় বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
কিন্তু এসব প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল পরিমাপ করা জরুরি। একটি প্রকল্পে শত শত কোটি বা হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলো—কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সেটি প্রত্যাশিত আয় তৈরি করতে পারল না, কর্মসংস্থান হলো না কিংবা অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি আনতে ব্যর্থ হলো—তাহলে সেই ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়ে। কারণ রাষ্ট্রের ঋণ পরিশোধের অর্থ আসে মূলত জনগণের কর, সরকারি রাজস্ব এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বিভিন্ন উৎস থেকে।
গত ১৪ বছরে ৮১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার বিপরীতে ১৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার আসল এবং ৬ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার সুদ পরিশোধের তথ্যও তাই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ একই সময়ের মধ্যে ঋণের দায় পরিশোধে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার গেছে শুধু সুদ পরিশোধে। এই সুদের অর্থ কোনো নতুন অবকাঠামো তৈরি করে না, নতুন রাস্তা বানায় না, নতুন হাসপাতাল নির্মাণ করে না কিংবা সরাসরি কোনো উৎপাদনশীল সম্পদ সৃষ্টি করে না। এটি মূলত অতীতে নেওয়া অর্থ ব্যবহারের বিনিময়ে ঋণদাতাকে দেওয়া আর্থিক ব্যয়।
অবশ্য সুদকে একেবারে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হিসেবেও দেখা যায় না। ঋণদাতা দেশ বা প্রতিষ্ঠান অর্থ দেওয়ার বিনিময়ে সুদ নেয়—এটাই আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার স্বাভাবিক নিয়ম। বরং আসল প্রশ্ন হলো, সেই সুদের হার কত, ঋণের মেয়াদ কত দীর্ঘ, গ্রেস পিরিয়ড কত এবং ঋণটি কোন প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়েছে। কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিয়ে যদি এমন একটি প্রকল্প করা হয় যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আয় সৃষ্টি করে, তাহলে সেই ঋণ অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক হতে পারে। বিপরীতে স্বল্পমেয়াদি বা তুলনামূলক ব্যয়বহুল ঋণ নিয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করলে তা ভবিষ্যতে চাপ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে তা পরিশোধ করা হবে। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে শুধু বাংলাদেশের মোট আয় নয়, বৈদেশিক মুদ্রার জোগানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঋণ সাধারণত ডলার বা অন্য কোনো বৈদেশিক মুদ্রায় নেওয়া হয় এবং পরিশোধও করতে হয় সেই মুদ্রায়। ফলে দেশের রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয়, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও এর প্রভাব পড়ে।
একটি দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই ঋণ পরিশোধের সময়সূচি নিয়ে চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে একই সময়ে যদি নতুন ঋণ গ্রহণ এবং পুরনো ঋণ পরিশোধ—দুই প্রক্রিয়াই দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে অর্থনীতিতে নগদ বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজনীয়তা বাড়ে। ফলে ভবিষ্যৎ বাজেট পরিকল্পনায় ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়টি দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই সময়ে বাংলাদেশ দ্রুত অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ করেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছে, যোগাযোগব্যবস্থায় বড় বিনিয়োগ করেছে এবং বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এসব উদ্যোগের অনেকগুলোতেই বৈদেশিক অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে শুধু ঋণের পরিমাণ দেখে বলা যাবে না যে অর্থনীতির জন্য এসব ঋণ ক্ষতিকর ছিল। বরং প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয়, অর্থনৈতিক প্রত্যাবর্তন, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠান থেকে কত ঋণ নেওয়া হয়েছে, কী শর্তে নেওয়া হয়েছে, সুদের হার কত, কত বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে এবং কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হয়েছে—এসব তথ্য সাধারণ মানুষের সামনে স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ঋণ জনগণেরই দায়।
এখানে সংসদে প্রকাশিত ৮১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারের তথ্য নতুন করে সেই আলোচনাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। দেশের উন্নয়ন প্রয়োজন, আর উন্নয়নের জন্য অর্থও প্রয়োজন। সব অর্থ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহ করা সবসময় সম্ভব নয়। তাই বৈদেশিক ঋণ উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য স্বাভাবিক একটি অর্থায়ন পদ্ধতি। কিন্তু সেই ঋণ যেন ভবিষ্যতের বোঝা না হয়ে ভবিষ্যতের সম্পদে পরিণত হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সেতু নির্মাণের জন্য ঋণ নেওয়া হলো। সেতুটি যদি যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করে, পণ্য পরিবহনের সময় কমায়, নতুন শিল্প গড়ে তোলে এবং সরকারের রাজস্ব বাড়ায়, তাহলে ঋণের অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে বলা যায়। একইভাবে বিদ্যুৎ বা রেল অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বিনিয়োগ যদি উৎপাদন ও ব্যবসা সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে, তাহলে সেই ঋণ ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়াতে পারে। কিন্তু প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে, সময়মতো কাজ শেষ না হলে অথবা প্রকল্পের প্রত্যাশিত সুবিধা না মিললে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যায়।
তাই বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু কত ঋণ নেওয়া হয়েছে—এই প্রশ্ন নয়; বরং কত ঋণ কার্যকরভাবে বিনিয়োগ হয়েছে, কত ঋণ থেকে অর্থনৈতিক আয় তৈরি হয়েছে এবং আগামী বছরগুলোতে কত ঋণ পরিশোধ করতে হবে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
৮১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণকে তাই আতঙ্কের সংখ্যা হিসেবে দেখার চেয়ে সতর্কতার সংখ্যা হিসেবে দেখা বেশি জরুরি। কারণ ঋণ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারে, আবার ভুল ব্যবস্থাপনায় অর্থনীতির ওপর চাপও তৈরি করতে পারে। পার্থক্যটা তৈরি করে ঋণের ব্যবহার, শর্ত, প্রকল্পের দক্ষতা এবং পরিশোধ সক্ষমতা।
বাংলাদেশ এখন এমন একটি পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উন্নয়নের পাশাপাশি আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি। নতুন ঋণ নেওয়ার আগে প্রকল্পের অর্থনৈতিক ফলাফল কতটা হবে, ঋণের শর্ত কতটা সুবিধাজনক এবং ভবিষ্যতে পরিশোধের সক্ষমতা কেমন থাকবে—এসব বিষয়কে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে চলমান প্রকল্পগুলো থেকে প্রত্যাশিত আয় ও অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
কারণ আজকের নেওয়া ঋণ শুধু আজকের সরকারের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর কিস্তি, সুদ এবং আর্থিক দায় ভবিষ্যতের বাজেটেও জায়গা করে নেয়। তাই বৈদেশিক ঋণ যতটা উন্নয়নের হাতিয়ার, ততটাই এটি দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার পরীক্ষা।
গত ১৪ বছরে বিদেশ থেকে প্রায় ৮২ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার তথ্য সেই পরীক্ষার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই অর্থ যদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে পরিণত হয়, তাহলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে। আর যদি ঋণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে একদিন উন্নয়নের সেই অর্থই পরিণত হতে পারে বড় আর্থিক চাপে।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি শুধু ‘বাংলাদেশ কত ঋণ নিয়েছে?’—এখানেই থেমে থাকার নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, ‘এই ঋণ দিয়ে বাংলাদেশ কী অর্জন করেছে এবং ভবিষ্যতে এই ঋণের দায় কীভাবে সামলাবে?’ দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর কতটা নিশ্চিত করা যায় তার ওপর।
আপনার মতামত জানানঃ