
তুরস্কের পূর্বাঞ্চলের রুক্ষ পাহাড়ি ভূমিতে ওপর থেকে তাকালে গঠনটি চোখে পড়বেই। দুই প্রান্ত সরু, মাঝখান প্রশস্ত এবং চারদিকে উঁচু কিনারা—দূর থেকে দেখে মনে হয়, মাটির ভেতর কোনো বিশাল নৌকার কাঠামো আটকে আছে।
স্থানটির নাম দুরূপিনার ফরমেশন। তুরস্কের আড়ি প্রদেশের দোয়ুবায়াজিত জেলার কাছে, ইরান সীমান্ত থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। বৃহত্তর আরারাত পর্বতের চূড়া থেকেও এটি বেশ দূরে। তবু নৌকার মতো আকৃতি এবং ধর্মীয় কাহিনির সঙ্গে ভৌগোলিক সম্পর্কের কারণে কয়েক দশক ধরে একদল অনুসন্ধানকারী দাবি করছেন—এখানেই হয়তো নূহের নৌকার ধ্বংসাবশেষ চাপা পড়ে আছে।
২০২৬ সালে নতুন করে আলোচনায় এসেছে স্থানটি। সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক জেঙ্কার আতিলার নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক দল সেখানে আধুনিক জরিপ শুরু করেছে। গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার বা GPR, ইলেকট্রিক্যাল রেজিস্টিভিটি টোমোগ্রাফি বা ERT, লিডার, মাটির রাসায়নিক বিশ্লেষণ এবং কোর ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে গঠনটির ভেতরে কী আছে, তা বোঝার চেষ্টা চলছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের রাডার জরিপে মাটির নিচে কয়েকটি সরলরেখা, কোণাকৃতি প্রতিফলন এবং কক্ষের মতো বিন্যাস দেখা গেছে। ভেতরের মাটিতে বাইরের নমুনার তুলনায় বেশি জৈব উপাদান পাওয়ার দাবিও করা হয়েছে। এসব তথ্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু সংবাদমাধ্যমে আবার ছড়িয়ে পড়েছে—“নূহের নৌকা পাওয়া গেছে।”
কিন্তু বিজ্ঞান এখনো এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
২০২৬ সালের প্রকল্পটি সত্যিকার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান হলেও এর পূর্ণাঙ্গ ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। মাঠপর্যায়ের কাজের পর নমুনা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ এবং ফলাফল আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। গবেষণার নেতৃত্বে থাকা অধ্যাপক আতিলাও বলেছেন, গঠনটির উৎপত্তি সম্পর্কে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। Türkiye Today
যে ছবি থেকে শুরু হয়েছিল রহস্য
দুরূপিনার গঠনটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয় ১৯৫৯ সালে। তুরস্কের সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ইলহান দুরূপিনার ন্যাটোর জন্য পরিচালিত একটি আকাশপথ জরিপের ছবি পরীক্ষা করার সময় অস্বাভাবিক নৌকাসদৃশ আকৃতিটি শনাক্ত করেন। পরে তাঁর নামেই স্থানটির নামকরণ হয়।
১৯৬০ সালে অনুসন্ধানকারীদের একটি দল জায়গাটি পরীক্ষা করে। তারা খনন ও বিস্ফোরণের সাহায্যে ভেতরের অংশ দেখার চেষ্টা করলেও কোনো দৃশ্যমান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পায়নি। তাদের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ছিল, এটি মানুষের নির্মিত কোনো বস্তু নয়; সম্ভবত অস্বাভাবিক একটি প্রাকৃতিক গঠন।
কয়েক বছর স্থানটি প্রায় বিস্মৃত ছিল। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে মার্কিন অপেশাদার অনুসন্ধানকারী রন ওয়ায়াট আবার দাবি করেন, গঠনটি নূহের নৌকার জীবাশ্মীভূত অবশেষ। এরপর কথিত লোহার রিভেট, ধাতব বন্ধনী, নোঙর-পাথর এবং জীবাশ্মীভূত কাঠের বিভিন্ন দাবি সামনে আসে।
এই দাবিগুলো দুরূপিনারকে ধর্মীয় পর্যটন ও জনপ্রিয় রহস্যের কেন্দ্রে পরিণত করে। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক মহলে সেগুলোর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়নি।
ধর্মগ্রন্থে আসলে কোথায় নৌকার কথা বলা হয়েছে?
বাইবেলের জেনেসিসে নৌকাটি ‘আরারাতের পর্বতমালায়’ থেমেছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি নির্দিষ্টভাবে আজকের বৃহত্তর মাউন্ট আরারাতের চূড়াকে নির্দেশ করে—এমন কথা সেখানে নেই। প্রাচীন ব্যবহারে আরারাত একটি বিস্তৃত অঞ্চল বা রাজ্যকেও বোঝাত।
কোরআনের সুরা হুদের ৪৪ নম্বর আয়াতে নৌকাটি ‘জুদি’র ওপর স্থির হওয়ার কথা রয়েছে। জুদি কোথায়—তা নিয়েও ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বিতর্ক আছে। তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জুদি পর্বতকে অনেকে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে দেখেন; আবার অন্য ব্যাখ্যাও রয়েছে।
অর্থাৎ দুরূপিনারের সঙ্গে ধর্মগ্রন্থের সম্পর্ক সরাসরি নয়। প্রথমে একটি নৌকাসদৃশ ভূমিরূপ দেখা গেছে; এরপর তাকে ধর্মীয় বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে সম্ভাব্য পরিচয় দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞানকে তাই প্রথমেই প্রশ্ন করতে হয়—আমরা কি প্রমাণ থেকে সিদ্ধান্তে যাচ্ছি, নাকি আগে নেওয়া সিদ্ধান্তের সমর্থনে প্রমাণ খুঁজছি?
রাডার আসলে কী দেখে?
গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার মাটির নিচে ক্যামেরার মতো ছবি তোলে না। যন্ত্রটি ভূমিতে উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ পাঠায়। মাটির নিচে ভিন্ন বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যের দুটি স্তর বা বস্তুর সীমায় পৌঁছালে তরঙ্গের একটি অংশ প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে।
ফিরে আসা সংকেতের সময়, তীব্রতা ও বিন্যাস বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা মাটির নিচে কোথায় পরিবর্তন রয়েছে, তার একটি ধারণা পান। এভাবে দেয়াল, গর্ত, কবর, পাইপ, শিলাস্তরের সীমানা কিংবা ফাঁপা জায়গা শনাক্ত করা সম্ভব।
কিন্তু রাডার সরাসরি বলে না—“এটি কাঠ”, “এটি কক্ষ” কিংবা “এটি জাহাজের দেয়াল”। এটি শুধু দেখায়, একটি অংশের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য আশপাশের উপাদান থেকে আলাদা।
একই ধরনের প্রতিফলন সৃষ্টি করতে পারে শিলাস্তর, ফাটল, পানির উপস্থিতি, মাটির ঘনত্বের পরিবর্তন, খনিজের সঞ্চয় কিংবা প্রাকৃতিক গর্ত। আঁকাবাঁকা শিলার ত্রিমাত্রিক তথ্য নির্দিষ্ট গভীরতায় কেটে দেখালে কোনো কোনো অংশ সরলরেখা বা সমকোণের মতোও মনে হতে পারে।
GPR প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি সাধারণত সম্ভাব্য স্থান শনাক্ত করে; চূড়ান্ত পরিচয় নির্ধারণ করে না। রাডারে পাওয়া অসংগতিকে পরীক্ষামূলক খনন, ড্রিলিং, নমুনা বিশ্লেষণ এবং ভূতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট দিয়ে যাচাই করতে হয়। US National Park Service, গবেষণা পর্যালোচনা
‘কোণ’ পাওয়া মানেই মানুষের নির্মাণ নয়
নতুন প্রচারণায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় দাবি হচ্ছে, রাডারে মাটির নিচে সমকোণ ও কক্ষের মতো বিন্যাস পাওয়া গেছে। সাধারণ ধারণা হলো, প্রকৃতি এলোমেলো; সোজা রেখা ও সমকোণ কেবল মানুষই তৈরি করে।
বাস্তবে প্রকৃতি প্রায়ই জ্যামিতিক গঠন তৈরি করে।
শিলা চাপের কারণে ভেঙে সমতল ফাটল সৃষ্টি করতে পারে। দুটি ফাটল পরস্পরকে প্রায় সমকোণে ছেদ করতে পারে। পাললিক শিলার স্তর ভাঁজ হয়ে পরে ক্ষয়প্রাপ্ত হলে নিয়মিত রেখা তৈরি হয়। শিলা ঠান্ডা হওয়ার সময় কলামাকৃতি খণ্ড, খনিজের শিরা কিংবা বহুভুজও তৈরি হতে পারে।
রাডার তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সময় বিভিন্ন রেখা আলাদা করে দেখানো হলে এসব প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য আরও নির্মিত কাঠামোর মতো মনে হতে পারে। তাই ‘কোণাকৃতি অসংগতি’ একটি অনুসন্ধানযোগ্য সূত্র—মানুষের তৈরি কক্ষের প্রমাণ নয়।
পুরোনো ভূতত্ত্ব কী বলছে?
দুরূপিনারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালে Journal of Geoscience Education-এ। ভূতত্ত্ববিদ লরেন্স জি. কলিন্স ও অনুসন্ধানকারী ডেভিড ফাসোল্ড গঠনটি নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন দাবির নমুনা ও ভূতাত্ত্বিক বিন্যাস বিশ্লেষণ করেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ফাসোল্ড প্রথম দিকে স্থানটিকে নূহের নৌকা মনে করতেন। পরে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন।
গবেষকদের সিদ্ধান্ত ছিল, গঠনটি একটি প্রাকৃতিক ‘ডাবলি প্লাঞ্জিং সিনক্লাইন’—অর্থাৎ দুই দিকে ঢালু হয়ে যাওয়া ভাঁজযুক্ত পাললিক শিলার কাঠামো। পরবর্তী ক্ষয়, কাদা ও ভূমিধসের উপাদান এটিকে নৌকার মতো দৃশ্যমান আকৃতি দিয়েছে।
যেসব উপাদানকে লোহার রিভেট বা ধাতব বন্ধনী বলা হয়েছিল, গবেষণায় সেগুলোকে লিমোনাইট ও ম্যাগনেটাইটের প্রাকৃতিক ঘনীভবন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কথিত জীবাশ্মীভূত কাঠকে রূপান্তরিত আগ্নেয় শিলা এবং নোঙর হিসেবে প্রচারিত পাথরগুলোকে স্থানীয় অ্যান্ডেসাইট বলে চিহ্নিত করা হয়। মূল গবেষণার নথি, California State University Northridge
নতুন গবেষণা পুরোনো সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করতে পারে—বিজ্ঞানে কোনো সিদ্ধান্তই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু সে জন্য নতুন তথ্যকে অন্তত আগের ভূতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার চেয়ে শক্তিশালী হতে হবে।
বেশি জৈব পদার্থ কি কাঠের প্রমাণ?
প্রকল্পটির সমর্থকেরা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে গঠনের ভেতরের মাটির নমুনায় বাইরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি জৈব উপাদান পাওয়া গেছে। অন্য একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পার্থক্যটি প্রায় ৪০ শতাংশ বলা হয়েছে। এই সংখ্যাগত অসামঞ্জস্যই দেখায়, পূর্ণাঙ্গ গবেষণাপত্র ছাড়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্যকে কতটা সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। Noah’s Ark Scans, Arkeonews
জৈব উপাদান বলতে শুধু কাঠ বোঝায় না। উদ্ভিদের শিকড়, ঘাস, প্রাণীর অবশেষ, অণুজীব, পানি প্রবাহে জমে থাকা পদার্থ কিংবা মাটির স্থানীয় পরিবেশও জৈব কার্বনের মাত্রা বাড়াতে পারে।
প্রমাণটি মূল্যায়নের জন্য জানতে হবে—নমুনা কোন গভীরতা থেকে নেওয়া হয়েছে, কতটি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, বাইরের নিয়ন্ত্রণস্থল কতটা তুলনাযোগ্য ছিল, পরীক্ষার পদ্ধতি কী এবং পার্থক্যটি পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কি না।
যদি সত্যিই কাঠ পাওয়া যায়, তখনও পরীক্ষা শেষ হবে না। মাইক্রোস্কোপে তার কোষীয় গঠন শনাক্ত করতে হবে, বয়স নির্ধারণ করতে হবে, দূষণ বাদ দিতে হবে এবং কাঠটি কোনো নির্মাণের অংশ ছিল কি না তা প্রাসঙ্গিক অবস্থান থেকে দেখাতে হবে।
আকৃতির মিল কেন এত বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়?
দুরূপিনারের দৈর্ঘ্য সাধারণত প্রায় ১৫৭ থেকে ১৬৪ মিটার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। নূহের নৌকার বাইবেলীয় দৈর্ঘ্য ৩০০ কিউবিট। নির্দিষ্ট এক ধরনের প্রাচীন কিউবিট ব্যবহার করলে এই পরিমাপ প্রায় কাছাকাছি আসে।
কিন্তু কিউবিট কোনো সর্বজনীন নির্দিষ্ট একক ছিল না। অঞ্চল ও সময়ভেদে এর দৈর্ঘ্য পরিবর্তিত হয়েছে। সম্ভাব্য বিভিন্ন মান থেকে যে মাপটি ভূখণ্ডটির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মেলে, সেটি বেছে নিলে মিলটি বাস্তবের চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ মনে হতে পারে।
মানুষের মস্তিষ্ক পরিচিত আকৃতি খুঁজতে অত্যন্ত দক্ষ। মেঘে মুখ, মঙ্গলের পাথরে মানুষের অবয়ব কিংবা পাহাড়ে শুয়ে থাকা প্রাণী দেখা—এসবকে প্যারাইডোলিয়া বলা হয়। দুরূপিনার নিঃসন্দেহে নৌকাসদৃশ; কিন্তু কোনো বস্তু নৌকার মতো দেখানো এবং সেটি সত্যিই নৌকা হওয়া দুটি আলাদা দাবি।
কী পাওয়া গেলে দাবি শক্তিশালী হবে?
দুরূপিনারকে মানুষের নির্মিত প্রাচীন নৌযান হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হলে কয়েকটি স্বাধীন প্রমাণকে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।
ড্রিলিং বা নিয়ন্ত্রিত খননে কাঠ কিংবা নির্মাণসামগ্রী তার মূল ভূস্তরে পাওয়া প্রয়োজন। কাঠের কোষীয় গঠন, ব্যবহারের দাগ ও সংযোগপ্রণালি শনাক্ত করতে হবে। বিভিন্ন নমুনার বয়স একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ভূতাত্ত্বিক স্তর প্রমাণ করতে হবে যে উপাদানগুলো পরে পানি, ভূমিধস বা মানুষের মাধ্যমে সেখানে আসেনি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গবেষণাপদ্ধতি ও সম্পূর্ণ তথ্য পিয়ার-রিভিউড সাময়িকীতে প্রকাশ করতে হবে। প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কহীন ভূতত্ত্ববিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভূ-পদার্থবিদদের একই ফল পুনরাবৃত্তি করতে হবে।
এ পর্যায়ের প্রমাণ ছাড়া ‘নূহের নৌকা পাওয়া গেছে’ বলা বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি অনুমানের প্রচারণা।
বিশ্বাস ও বিজ্ঞানের সীমারেখা
নূহের মহাপ্লাবনের কাহিনি ইহুদি, খ্রিষ্টান ও ইসলামি ঐতিহ্যে গভীর ধর্মীয় তাৎপর্য বহন করে। মেসোপটেমিয়ার গিলগামেশ মহাকাব্যসহ আরও পুরোনো বন্যাকাহিনিতেও বৃহৎ প্লাবন, নৌকা এবং প্রাণরক্ষার অনুরূপ বিবরণ আছে।
এসব কাহিনি হয়তো প্রাচীন মানুষের স্মৃতিতে থাকা ভয়াবহ আঞ্চলিক বন্যার সাংস্কৃতিক প্রতিফলন। আবার বিশ্বাসীর কাছে এগুলো ঐশী সত্য। প্রত্নতত্ত্ব ধর্মীয় অর্থের বিচার করে না; তার কাজ বস্তুগত দাবি পরীক্ষা করা।
বিজ্ঞানের সতর্কতা বিশ্বাসের প্রতি অসম্মান নয়। বরং কোনো প্রিয় বিশ্বাসকে ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর দাঁড় করানো হলে নতুন পরীক্ষায় সেই দাবি ভেঙে পড়ার ঝুঁকিই বেশি থাকে।
অপেক্ষা এখন নমুনার ফলের
নতুন দুরূপিনার প্রকল্পের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, গবেষকেরা শুধু ওপরের আকৃতি দেখে সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরিবর্তে রাডার, বৈদ্যুতিক জরিপ, মাটি বিশ্লেষণ ও ড্রিলিং একসঙ্গে ব্যবহার করছেন। তাদের তথ্য উন্মুক্তভাবে প্রকাশিত হলে পুরোনো ভূতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আরও শক্তিশালী হতে পারে, সংশোধিত হতে পারে, কিংবা সম্পূর্ণ নতুন কিছু সামনে আসতে পারে।
কিন্তু সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সবচেয়ে সৎ সিদ্ধান্ত হলো—দুরূপিনারের নিচে কিছু ভূ-পদার্থগত অসংগতি পাওয়া গেছে; সেগুলো কী, তা এখনো প্রমাণিত হয়নি।
রাডার কোনো নৌকা শনাক্ত করেনি। কাঠের নিশ্চিত নমুনা পাওয়া যায়নি। কোনো নির্মাণপ্রণালি বা মানুষের তৈরি কাঠামোও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিপরীতে গঠনটির জন্য একটি বিস্তারিত প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আগে থেকেই রয়েছে।
অতএব, আরারাতের পাহাড়ি ভূমিতে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে যা পাওয়া গেছে, তা নূহের নৌকা নয়—একটি অসাধারণ নৌকাসদৃশ ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং তাকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাস, কৌতূহল ও প্রমাণ অনুসন্ধানের দীর্ঘ ইতিহাস।
নতুন গবেষণা সেই সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে। তবে বিজ্ঞানে চমকপ্রদ দাবির জন্য প্রয়োজন চমকপ্রদ শিরোনাম নয়—স্বচ্ছ পদ্ধতি, যাচাইযোগ্য নমুনা এবং স্বাধীনভাবে পুনরাবৃত্ত প্রমাণ।
আপনার মতামত জানানঃ