ইরানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান। চারপাশে আনন্দের আয়োজন, স্বজনদের ভিড়, নতুন জীবনের সূচনাকে ঘিরে উৎসব। অথচ মুহূর্তের মধ্যেই সেই আনন্দ পরিণত হয় শোক ও আতঙ্কে। দক্ষিণ ইরানের কুহেস্তাক শহরে বিয়ের অনুষ্ঠানে ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহত হন পাঁচজন, আহত হন অন্তত ৬৮ জন। ঘটনাটি প্রথমে একটি যুদ্ধকালীন দুর্ঘটনা কিংবা লক্ষ্যচ্যুত কোনো ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ হিসেবে দেখা হলেও, ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এখন বলছেন—বাড়িটিতে ব্যবহৃত অস্ত্রটি সম্ভবত সরাসরি মার্কিন সামরিক বাহিনীর ছোড়া। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের পর ছিটকে গিয়ে ওই বাড়িতে পড়েনি; বরং সরাসরি বাড়িটির ছাদে আঘাত করেই বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে মনে করছেন তারা।
ঘটনাটি ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে একের পর এক সামরিক অভিযান, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং পাল্টা হামলার মধ্যে বেসামরিক মানুষের জীবন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সামরিক বাহিনীর ভাষায় প্রতিটি হামলার পেছনে নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে—রাডার, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো কিংবা সামরিক স্থাপনা। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতায় সেই লক্ষ্যবস্তুর কয়েকশ মিটার দূরেই থাকতে পারে একটি বাড়ি, একটি স্কুল, একটি হাসপাতাল কিংবা একটি বিয়ের অনুষ্ঠান। কুহেস্তাকের ঘটনাটি সেই ভয়াবহ বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একাধিক হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম। তাদের দাবি, এসব অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপনা, রাডার ব্যবস্থা এবং যোগাযোগ অবকাঠামো। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের আগের হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এসব অভিযান চালানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ কুহেস্তাকের আকাশে যে বিস্ফোরণ, তার পেছনে ছিল বৃহত্তর এক সামরিক সংঘাতের ধারাবাহিকতা।
কিন্তু সামরিক লক্ষ্যবস্তু আর বেসামরিক জীবনের মধ্যকার দূরত্ব কখনো কখনো মাত্র কয়েকশ মিটার। কুহেস্তাকে যে টেলিযোগাযোগ টাওয়ারটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেটি ছিল বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল থেকে মাত্র ১৩৫ মিটার দূরে। স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে টাওয়ারটিতে হামলা হয় বলে ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য। এর কাছাকাছিই তখন একটি বাড়িতে চলছিল বিয়ের অনুষ্ঠান। কয়েক ডজন মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ বিস্ফোরণে বাড়িটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেউ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন, কেউ আহত হয়ে ছুটতে থাকেন, আর আনন্দের অনুষ্ঠান মুহূর্তেই পরিণত হয় মৃত্যুর দৃশ্যে।
রয়টার্স ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও চারজন সামরিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞের কাছে বিশ্লেষণের জন্য দেয়। তাদের মধ্যে তিনজনের মূল্যায়ন ছিল, বাড়িটির ছাদে সরাসরি কোনো অস্ত্র আঘাত করার স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির ধরনটি পাশের কোনো স্থাপনায় হামলার পর অস্ত্রের অংশ ছিটকে এসে বাড়িতে পড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও তারা মত দেন। অর্থাৎ বিস্ফোরণটি কেবল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল—এমন ব্যাখ্যার চেয়ে সরাসরি আঘাতের ব্যাখ্যাই তাদের কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়েছে।
সাবেক মার্কিন সেনা বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ প্রযুক্তিবিদ ও অস্ত্র বিশ্লেষক ট্রেভর বলের বিশ্লেষণ ঘটনাটিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কারণ তৈরি করেছে। তার মতে, ছাদে আঘাতের পর অথবা ছাদের ঠিক ওপরে বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। আঘাতের ধরন ও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন বিবেচনায় নিয়ে তিনি ধারণা করছেন, অস্ত্রটি সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা গ্যারেথ কোলেটও একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তার মতে, হাতে থাকা প্রমাণগুলো মার্কিন ৫০০ পাউন্ড ওজনের আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনাকে বেশি সমর্থন করে।
অন্যদিকে অসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান শুটও ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও পর্যালোচনা করেছেন। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাড়িটির ছাদে তৈরি গর্তটি পাশের টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলার পর কোনো অস্ত্রের অংশ ছিটকে এসে আঘাত করার ফলে তৈরি হয়নি। আঘাতের অবস্থান ও কোণও তিনি বিশ্লেষণ করেছেন। তার মতে, ক্ষতির ধরনটি ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্যচ্যুত ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভুল আঘাত নতুন কোনো ঘটনা নয়। তাই কুহেস্তাকের বিস্ফোরণের পর এমন একটি সম্ভাবনাও সামনে আসে যে, ইরানের কোনো বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ভুলপথে গিয়ে বাড়িটিতে আঘাত করেছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ সেই ব্যাখ্যাকে খুব শক্তিশালী বলে মনে করছে না। কোলেটের মতে, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওয়ারহেড বিস্ফোরণের পর সাধারণত যে ধরনের খণ্ডিত ধ্বংসাবশেষ থাকার কথা, ঘটনাস্থলে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আঘাতের কোণও সেই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করেন শুট।
এর মধ্যেই ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে কিছু অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ। ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে ট্রেভর বল সেগুলোর কয়েকটি অংশকে জয়েন্ট স্ট্যান্ড-অফ ওয়েপন বা জেএসওডব্লিউ হিসেবে শনাক্ত করেছেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত এক ধরনের গ্লাইড বোমা। তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাটি রয়েছে—রয়টার্স ওই ধ্বংসাবশেষ কুহেস্তাকের বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কিনা, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে অস্ত্রের পরিচয় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের অনুমান থাকলেও এটিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা এখনো সম্ভব নয়।
এদিকে দুই মার্কিন কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ১ সেপ্টেম্বর কুহেস্তাক এলাকায় মার্কিন বাহিনী সত্যিই হামলা চালিয়েছিল। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, লক্ষ্য ছিল শহরের একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ওই টাওয়ারটি বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল থেকে মাত্র ১৩৫ মিটার দূরে। এই দূরত্বই পুরো ঘটনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ সামরিক অভিযানে একটি নির্দিষ্ট স্থাপনা লক্ষ্য করলেও তার আশপাশের বেসামরিক স্থাপনা ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হয়েছিল, সেই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এখনো ঘটনাটির দায় সরাসরি স্বীকার করেনি। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিয়ের অনুষ্ঠানে হতাহতের ঘটনার সম্ভাব্য কারণগুলো যুক্তরাষ্ট্র খতিয়ে দেখছে। এর মধ্যে মার্কিন হামলার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ পরিবর্তন কিংবা কোনো ইন্টারসেপ্টর লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনাও। অর্থাৎ ঘটনাটির চূড়ান্ত কারণ নিয়ে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
তবু ঘটনাটি ঘিরে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে, তা হলো—সামরিক অভিযানে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব? একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার যদি সত্যিই সামরিক লক্ষ্য হয়ে থাকে, তবে তার মাত্র ১৩৫ মিটার দূরে একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলার তথ্য হামলার পরিকল্পনা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলবে। যুদ্ধের নিয়ম ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে বেসামরিক মানুষকে রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্যবস্তু সামরিক হলেও হামলার সম্ভাব্য পার্শ্বক্ষতি, বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি এবং হামলার আনুপাতিকতা বিবেচনা করার বিষয়টি সেখানে বিশেষ গুরুত্ব পায়।
কুহেস্তাকের মানুষের জন্য অবশ্য এসব সামরিক ও আইনি প্রশ্নের চেয়ে বাস্তবতা অনেক বেশি নির্মম। তাদের কাছে এটি কোনো কৌশলগত মানচিত্রের একটি বিন্দু নয়। এটি একটি বাড়ি, যেখানে মানুষ বিয়ের আনন্দে একত্রিত হয়েছিল। এটি এমন একটি রাত, যে রাতটি একটি পরিবারের জন্য নতুন জীবনের সূচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই রাতেই কেউ সন্তান হারিয়েছেন, কেউ স্বজন, কেউ বন্ধু। বিস্ফোরণের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের চেষ্টা চলেছে। আহতদের নিয়ে তৈরি হয়েছে আরেক দফা আতঙ্ক।
এই ঘটনার পর কুহেস্তাকে বেসামরিক হতাহতের বিষয়টি নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে। কারণ এটি কোনো বিচ্ছিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনা নয়। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বহু শিশু ও শিক্ষক নিহত হওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় একের পর এক বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ দেখিয়ে দেয়, আধুনিক অস্ত্রের নির্ভুলতা যতই বাড়ুক, যুদ্ধের মাটিতে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনো কঠিন।
কুহেস্তাকের বিস্ফোরণের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা মানবাধিকার সংগঠনগুলো দাবি করেছে, বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলতে প্রত্যক্ষদর্শীদের ওপর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ চাপ প্রয়োগ করেছে। রয়টার্স অবশ্য মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেছে। যুদ্ধের সময় তথ্য নিয়ন্ত্রণের এই প্রবণতা ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র সামনে আনার কাজকে আরও কঠিন করে তোলে। ফলে ছবি, ভিডিও, স্যাটেলাইট চিত্র এবং অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের স্বাধীন বিশ্লেষণই অনেক সময় ঘটনার পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে ওঠে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, যে টেলিযোগাযোগ টাওয়ারটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল, সেটি ছিল বেসামরিক স্থাপনা। সিরিকের বাসিন্দারা ওই টাওয়ারের মাধ্যমে মোবাইল, টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা পেতেন। এই তথ্য সত্য হলে হামলার লক্ষ্যবস্তুটির সামরিক চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে টাওয়ারটি সামরিক যোগাযোগে ব্যবহৃত হয়েছিল কিনা, কিংবা যুক্তরাষ্ট্র কী কারণে এটিকে লক্ষ্য করেছিল, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য থেকে পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম দিক সম্ভবত এখানেই—একটি স্থাপনার সামরিক গুরুত্ব কারও কাছে কৌশলগত, কিন্তু তার পাশে বসবাসকারী মানুষের কাছে সেটি দৈনন্দিন জীবনের অংশ। যোগাযোগের একটি টাওয়ার কারও কাছে সামরিক অবকাঠামো হতে পারে, আবার একই টাওয়ার কোনো পরিবারের কাছে প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলার একমাত্র মাধ্যম। আর সেই স্থাপনার কাছাকাছি যদি কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান চলে, তাহলে সামরিক সিদ্ধান্তের প্রতিটি ভুল হিসাব মানুষের জীবনে সরাসরি আঘাত হয়ে ফিরে আসে।
গত বৃহস্পতিবার কুহেস্তাকে নিহতদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে চার বছর বয়সী আমির মোহাম্মদ কারিমির কফিনে ফুল দিতে দেখা গেছে স্থানীয়দের। একটি শিশুর কফিন যুদ্ধের বড় রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে মুহূর্তের মধ্যে মানবিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত করে। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষায়, সিরিকের পরিস্থিতি অত্যন্ত শোকাবহ; মানুষ এখনো ঘটনাটির ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি।
কুহেস্তাকের বিয়ের অনুষ্ঠানের বিস্ফোরণ তাই শুধু পাঁচজন নিহত ও ৬৮ জন আহত হওয়ার একটি ঘটনা নয়। এটি যুদ্ধের একটি বড় প্রশ্নকে সামনে আনে—একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্তের মূল্য যদি পাশের একটি পরিবারের জীবন দিয়ে দিতে হয়, তাহলে সেই হামলাকে কতটা সফল বলা যায়? অস্ত্রটি সত্যিই মার্কিন বাহিনীর সরাসরি নিক্ষেপ করা ছিল কিনা, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া দরকার। একইভাবে ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা বা লক্ষ্যচ্যুত কোনো ইন্টারসেপ্টরের সম্ভাবনাও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ দায় নির্ধারণের আগে প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
তবে অস্ত্রের পরিচয় যাই হোক, এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি হলো—বেসামরিক মানুষ যুদ্ধের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ। তারা সিদ্ধান্ত নেয় না কোন স্থাপনায় হামলা হবে, কোন আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্র উড়বে কিংবা কোন সামরিক লক্ষ্য ধ্বংস করা হবে। অথচ শেষ পর্যন্ত তাদেরই ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়, তাদের সন্তান আহত হয়, তাদের স্বজনের কফিনে ফুল দিতে হয়। কুহেস্তাকের সেই বিয়ের অনুষ্ঠান তাই শুধু একটি পরিবারের হারানো আনন্দের গল্প নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যে বেসামরিক জীবনের অসহায়তার আরেকটি নির্মম প্রতিচ্ছবি।
যুদ্ধের মানচিত্রে কুহেস্তাক হয়তো একটি ছোট শহর। কিন্তু সেই শহরের একটি বাড়িতে সেদিন যারা একত্রিত হয়েছিলেন, তাদের কাছে সেটিই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সেখানে ছিল হাসি, স্বপ্ন, আত্মীয়তার বন্ধন এবং একটি নতুন জীবনের প্রত্যাশা। একটি বিস্ফোরণ সেই সবকিছুকে মুহূর্তে ধ্বংস করে দিয়েছে। এখন তদন্ত হয়তো বলবে কোন অস্ত্র সেখানে আঘাত করেছিল। বিশেষজ্ঞরা হয়তো তার ধরন শনাক্ত করবেন। সামরিক কর্মকর্তারা হয়তো নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করবেন। কিন্তু ধ্বংসস্তূপ থেকে যে প্রশ্নটি বারবার উঠে আসবে, সেটি আরও সহজ—যুদ্ধের লক্ষ্য যদি মানুষকে নিরাপদ রাখা না হয়, তাহলে সেই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য কে দিচ্ছে?
কুহেস্তাকের উত্তরটি খুব স্পষ্ট: সাধারণ মানুষ।
আপনার মতামত জানানঃ