বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য রেমিট্যান্স এখন সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক বৈদেশিক মুদ্রার উৎসগুলোর একটি। প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলার প্রবাহ বাড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালেই তৈরি হয়েছে আরেকটি অস্বস্তিকর হিসাব। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের বিপরীতে সরকার যে ২ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়ার নীতি করেছে, সেই অর্থ ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করলেও সরকারের কাছ থেকে তার পুরো অর্থ সময়মতো ফেরত পাচ্ছে না। ফলে ব্যাংকগুলোর পাওনা এখন ৮ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকার বেশি।
প্রশ্নটি তাই শুধু একটি সরকারি বিল বকেয়া থাকার নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর ভর করে সরকার রেমিট্যান্সের অর্থ দেশে আনছে, সেই ব্যাংকগুলোকেই যদি দীর্ঘ সময় নিজেদের তহবিল থেকে সরকারি প্রণোদনার খরচ বহন করতে হয়, তাহলে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির এই সাফল্যের প্রকৃত মূল্য কে দিচ্ছে? আর এই ব্যবস্থার চাপ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ভবিষ্যতে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স আনতে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং পুরো বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে এর কী প্রভাব পড়তে পারে?
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। এত বড় প্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু রেমিট্যান্স যত বেড়েছে, এর সঙ্গে সরকারের প্রণোদনা ব্যয়ের পরিমাণও বেড়েছে। প্রবাসীরা প্রতি ১০০ ডলার পাঠালে নির্ধারিত হারে ব্যাংকিং চ্যানেলে বাড়তি অর্থ পান। এই অর্থ ব্যাংকগুলো নিজেদের তহবিল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে দেয় এবং পরে সরকারের কাছ থেকে সেই টাকা ফেরত পাওয়ার কথা।
এখানেই তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সময়ের ব্যবধান।
জুনের শেষে ব্যাংকগুলোর সরকারের কাছে বকেয়া দাবি ছিল ৮ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। এরপর ২ আগস্ট সরকার ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। কিন্তু একই সময়ে জুলাই মাসের নতুন দাবি যোগ হয়েছে আরও ৮৭৯ কোটি টাকা। ফলে মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ কিছু অর্থ পরিশোধ করা হলেও নতুন দাবির তুলনায় সরকারি পরিশোধের গতি কম হওয়ায় বকেয়া কমার বদলে আবার বেড়েছে।
ব্যাংকারদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সমস্যা নতুন নয়। প্রায় দুই বছর ধরে তারা প্রণোদনার অর্থ নিজেদের তহবিল থেকে বহন করছেন। অতীতে সরকার ব্যাংকগুলোকে আগাম অর্থ দিত। ফলে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের প্রণোদনা দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় নিজেদের অর্থ আটকে রাখার পরিস্থিতিতে পড়ত না। এখন সেই ব্যবস্থায় ছন্দপতন ঘটেছে। সরকারি অর্থ ছাড়ে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ব্যাংকগুলো কার্যত একটি সরকারি ব্যয়ের অর্থায়ন করছে।
এখানে ‘সরকার ব্যাংকের কাছে ঋণী’ কথাটি বিশ্লেষণাত্মক অর্থে ব্যবহার করা যায়। এটি প্রচলিত অর্থে সরকারের নেওয়া কোনো ব্যাংকঋণ নয়; বরং ব্যাংকগুলো যে সরকারি প্রণোদনার অর্থ নিজেদের তহবিল থেকে আগাম পরিশোধ করেছে, সেই অর্থ সরকারের কাছে তাদের পাওনা হিসেবে জমা হচ্ছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের একটি ব্যয় তাৎক্ষণিকভাবে বহন করছে বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। আর যত দিন সেই অর্থ ফেরত না আসে, তত দিন ব্যাংকগুলোর মূলধন ও তারল্যের একটি অংশ কার্যত আটকে থাকে।
এই আটকে থাকা অর্থের একটি বড় আর্থিক মূল্য আছে। ব্যাংকগুলো সাধারণত আমানতকারীদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে আয় করে। ব্যাংকারদের হিসাবে, এই অর্থ ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করলে বছরে অন্তত ৯ শতাংশ পর্যন্ত আয় করা সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর আমানতের ওপর সুদ দেওয়ার খরচ রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকারের বক্তব্য অনুযায়ী, আমানত সংগ্রহের বার্ষিক খরচ প্রায় ৭ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
অর্থাৎ যে টাকা ব্যাংকের কাছে থাকার কথা ছিল আয় সৃষ্টিকারী সম্পদে, সেই টাকা যদি সরকারি প্রণোদনার বকেয়া হিসেবে আটকে থাকে, তাহলে ব্যাংক একদিকে সম্ভাব্য আয় হারাচ্ছে, অন্যদিকে সেই অর্থের বিপরীতে আমানতকারীদের দায় বহন করছে। এটিই ‘অপর্চুনিটি কস্ট’ বা সুযোগ ব্যয়ের মূল বিষয়।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ব্যাংকগুলো গ্রাহকের আমানত ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে। ফলে ব্যাংককে আমানতের সুদ দিতে হচ্ছে, কিন্তু একই অর্থ থেকে বিনিয়োগ করে আয় করার সুযোগ থাকছে না। সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মাশরুর আরেফিনও বিষয়টির তিনটি বড় প্রভাবের কথা বলেছেন—ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার মতো তারল্য কমে যাচ্ছে, আটকে থাকা অর্থ কোনো আয় করছে না, অথচ আমানতের সুদ পরিশোধের দায় অব্যাহত থাকছে এবং একই সঙ্গে আয় সৃষ্টি করতে পারে এমন সম্পদে বিনিয়োগের সুযোগ হারাচ্ছে ব্যাংক।
এই পরিস্থিতি শুধু ব্যাংকের হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যাংকের তারল্য কমে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে ঋণ বিতরণে। কোনো ব্যাংকের হাতে যদি বড় অঙ্কের অর্থ আটকে থাকে, তাহলে ব্যবসা ও শিল্প খাতে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কিছুটা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংক আগে থেকেই তারল্য সংকটে রয়েছে, তাদের ওপর চাপ তুলনামূলক বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আরেকটি বিষয় হলো ব্যাংকের লাভজনকতা। সরকারি পাওনা দীর্ঘদিন আটকে থাকলে ব্যাংক যে সুদ আয় করতে পারত, তা হারায়। একই সঙ্গে আমানতকারীদের সুদ দিতে হয়। ফলে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান সংকুচিত হতে থাকে। এটি যদি দীর্ঘ সময় চলতে থাকে, তাহলে ব্যাংকগুলোর মুনাফায় চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রেমিট্যান্স ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে।
বাংলাদেশের রেমিট্যান্স বাজারে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসীদের অর্থ বৈধ চ্যানেলে দেশে আনতে ব্যাংকগুলো বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউস, মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে। এসব সম্পর্ক পরিচালনায়ও ব্যয় রয়েছে। ব্যাংকারদের আশঙ্কা, যদি প্রণোদনার অর্থ নিয়মিত ও সময়মতো ফেরত না আসে, তাহলে ব্যাংকগুলোর ওপর রেমিট্যান্স সংগ্রহের আর্থিক চাপ বাড়বে।
একটি ব্যাংক কেন প্রবাসীদের অর্থ আনতে বাড়তি প্রচার করবে, বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে ব্যয় করবে কিংবা অতিরিক্ত জনবল ও অবকাঠামো ব্যবহার করবে—যদি সেই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সরকারি প্রণোদনার অর্থই দীর্ঘদিন আটকে থাকে? প্রশ্নটি এখানেই।
রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি যত বেশি হবে, এই সমস্যার আকারও তত বড় হতে পারে। কারণ ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা হার একই থাকলেও মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়লে সরকারের প্রণোদনা ব্যয়ও বাড়বে। অর্থাৎ রেমিট্যান্সের সাফল্য নিজেই যদি সরকারি অর্থ ছাড়ের সক্ষমতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলে, তাহলে বকেয়া আরও জমতে পারে।
টাকার অবমূল্যায়নও এই চাপ বাড়িয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টের আগে রেমিট্যান্সের বিনিময় হার ছিল প্রতি ডলারে প্রায় ১১৭ টাকা। তখন ব্যাংকগুলো প্রতি ডলারে প্রায় ২ টাকা ৯৫ পয়সা অতিরিক্ত প্রণোদনা দিত। এখন রেমিট্যান্সের বিনিময় হার প্রায় ১২৩ টাকা হওয়ায় প্রণোদনার হিসাব প্রতি ডলারে প্রায় ৩ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমে যাওয়ার ফলে একই শতাংশ প্রণোদনা দিতে হলেও টাকার হিসাবে সরকারের ব্যয় বেড়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবাহ। ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির জন্য বড় অর্জন হলেও এর অর্থ হলো প্রণোদনা বাবদ সরকারের ওপরও বড় অঙ্কের আর্থিক দায় তৈরি হচ্ছে। কিন্তু বাজেটে সেই বাড়তি প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণোদনার জন্য বরাদ্দ এবং অর্থ ছাড় না বাড়লে বকেয়া তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ব্যাংকাররা তাই আগের তিন মাসের অগ্রিম অর্থায়ন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি করছেন। পাশাপাশি প্রতি মাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংকের দাবি নিষ্পত্তি, রেমিট্যান্স প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজেট বরাদ্দ এবং নির্ধারিত সময়ের পর অর্থ পরিশোধে বিলম্ব হলে ব্যাংকের তহবিল ব্যয়ের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের কথাও বলা হচ্ছে।
এই দাবিগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে—ঝুঁকির সঠিক বণ্টন। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স আনা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলার সরবরাহ বাড়ে, চলতি হিসাব শক্তিশালী হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই এই জাতীয় নীতির ব্যয় যদি সরকার নির্ধারণ করে, তাহলে সেই ব্যয়ের অর্থায়নের দায়ও মূলত সরকারেরই থাকা উচিত। ব্যাংককে দীর্ঘ সময় ধরে সেই ব্যয়ের অর্থ বহন করতে বাধ্য করলে নীতির আর্থিক বোঝা বেসরকারি খাতে স্থানান্তরিত হয়।
আর এখানেই ‘প্রবাসীর টাকায় সরকার ব্যাংককে ঋণী করে ফেলছে’—এই প্রশ্নটির গুরুত্ব।
প্রবাসী তার কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন। ব্যাংক সেই অর্থ গ্রহণ করে, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেটিকে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করাচ্ছে এবং গ্রাহককে নির্ধারিত প্রণোদনা দিচ্ছে। কিন্তু সেই প্রণোদনার সরকারি অংশ যদি ব্যাংকের কাছে মাসের পর মাস বকেয়া থাকে, তাহলে পুরো ব্যবস্থায় একটি অদৃশ্য অর্থনৈতিক ঋণ তৈরি হয়। রাষ্ট্রের জন্য রেমিট্যান্স ইতিবাচক সম্পদ তৈরি করছে, কিন্তু সেই সম্পদ প্রবাহের একটি অংশ পরিচালনাকারী ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে সরকারি পাওনা হিসেবে জমা হচ্ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয়, দীর্ঘমেয়াদি বকেয়া শেষ পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক ‘হুন্ডি’ ব্যবস্থাকে পরোক্ষভাবে সুবিধা দিতে পারে। বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে যদি ব্যাংকিং চ্যানেল নানা কারণে কম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, তাহলে কিছু প্রবাসী বিকল্প অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠানোর দিকে ঝুঁকতে পারেন। হুন্ডির বিস্তার হলে শুধু ব্যাংকগুলোর ব্যবসাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না; দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কারণ হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো অর্থ দেশের আনুষ্ঠানিক বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে সরাসরি যুক্ত হয় না। ফলে রেমিট্যান্সের যে অর্থ এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, চলতি হিসাব এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সহায়তা করছে, তার একটি অংশ আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে চলে যেতে পারে।
অবশ্য বর্তমান বকেয়া পরিস্থিতিকে এমনভাবে দেখা ঠিক হবে না যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে বড় সংকটে পড়ে গেছে বা রেমিট্যান্স প্রবাহ এখনই ভেঙে পড়বে। ব্যাংকগুলো এখনো প্রণোদনা দিচ্ছে, রেমিট্যান্সও আসছে এবং সরকার আংশিক অর্থ পরিশোধ করছে। কিন্তু প্রায় দুই বছর ধরে বকেয়া জমতে থাকা এবং বর্তমানে তা ৮ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকার ওপরে পৌঁছানো একটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সমাধান তাই শুধু ‘বকেয়া পরিশোধ’ নয়। নিয়মিত অর্থ ছাড়ের একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। রেমিট্যান্সের সম্ভাব্য প্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে বাজেটে প্রণোদনার জন্য বাস্তবসম্মত বরাদ্দ রাখতে হবে। ব্যাংকের দাবি নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে এবং সেই সময়সীমা অতিক্রম করলে ক্ষতিপূরণের কাঠামো থাকতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রেমিট্যান্স বাড়লে প্রণোদনার ব্যয়ও বাড়বে—এই বাস্তবতাকে সরকারি আর্থিক পরিকল্পনার মধ্যে আগে থেকেই অন্তর্ভুক্ত করা।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি লাখ লাখ পরিবারের আয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস এবং অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থিতিশীলতা শক্তি। এই প্রবাহ বাড়াতে প্রবাসীরা যেমন ভূমিকা রাখছেন, তেমনি ব্যাংকিং ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে কাজ করছে। তাই রেমিট্যান্সের সাফল্যের বোঝা যেন সেই ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি না করে, সেটিই এখন নিশ্চিত করা দরকার।
রেকর্ড রেমিট্যান্স বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির খবর। কিন্তু সেই রেকর্ডের বিপরীতে যদি সরকারি প্রণোদনার হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংকের খাতায় বকেয়া হিসেবে জমতে থাকে, তাহলে সাফল্যের হিসাবটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ অর্থনীতি শুধু কত ডলার দেশে এলো, তা দিয়ে চলে না; সেই অর্থ আনতে গিয়ে কার কত খরচ হলো, কার তহবিল কতদিন আটকে থাকল এবং পুরো ব্যবস্থাটি কতটা টেকসই—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই সরল: প্রবাসীর পাঠানো অর্থ যদি দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে, তাহলে সেই অর্থ দেশে আনতে যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা কাজ করছে, তার ওপর সরকারি প্রণোদনার আর্থিক বোঝা কতদিন চাপিয়ে রাখা হবে? রেমিট্যান্সে রেকর্ডের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন প্রণোদনার বকেয়াও থাকবে না—এবং ব্যাংকগুলো রাষ্ট্রের হয়ে বছরের পর বছর বিনা পারিশ্রমিকে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে না।
আপনার মতামত জানানঃ