বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের কলেজছাত্র সিফাত আব্দুল্লাহকে গ্রেপ্তারের ঘটনা এরই মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একদিকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ তুলে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে অশালীন ভাষা ব্যবহারের অভিযোগে আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়েন। অন্যদিকে তার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে মাঠে নামে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১। তদন্ত শেষে সংস্থাটি জানায়, সিফাতের বাসার বিদ্যুৎ বিল প্রস্তুতের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা অতিরিক্ত বিল করার প্রমাণ তারা পায়নি। তবে ঘটনাটি যতটা সরলভাবে ‘বিল বেশি এসেছে’ বনাম ‘বিল বেশি আসেনি’—এভাবে দেখানোর সুযোগ নেই। কারণ, তদন্তের হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, জুলাই ও আগস্ট মাসে তিনটি মিটার মিলিয়ে ১০ হাজার ৬৮১ টাকা বিল এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সিফাতের অভিযোগের কোন অংশ সঠিক, কোন অংশ অতিরঞ্জিত, আর ঘটনাটির পেছনে আসল বিভ্রান্তি কোথায়?
গাজীপুর মহানগরীর ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের টিনের মসজিদ এলাকার বাসিন্দা সিফাত আব্দুল্লাহ। তিনি রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, মাত্র দুই মাসে তার বাসায় প্রায় ১০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে। এমন বিলকে তিনি অস্বাভাবিক ও পরিবারের জন্য চাপ হিসেবে তুলে ধরেন। পরে একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসেও তিনি বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে।
তবে ভিডিওতে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অভিযোগ করার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে সিফাতের বিরুদ্ধে। এরপর পুলিশ তাকে আটক করে। পরে তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। ফলে বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগটি দ্রুতই একটি রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।
এরপরই সামনে আসে পল্লী বিদ্যুতের তদন্ত। গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর বোর্ড বাজার জোনাল অফিসের কর্মকর্তারা সিফাতের বাসায় গিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি যাচাই করেন। তদন্তে তারা দেখতে পান, সিফাতদের দোতলা বাড়িতে একটি নয়, মোট তিনটি আবাসিক বিদ্যুৎ মিটার রয়েছে। এই তথ্যটি পুরো ঘটনাকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করে। কারণ, কোনো বাড়ির মোট বিদ্যুৎ ব্যয় বোঝার ক্ষেত্রে একটি মিটারের বিল আলাদাভাবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
পল্লী বিদ্যুতের তদন্ত প্রতিবেদনে তিনটি মিটারের চার মাসের হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম মিটারে মে মাসে ৪৫ ইউনিট ব্যবহারের বিপরীতে বিল এসেছে ৩১৭ টাকা। জুনে ৫০ ইউনিটে বিল ৩৪২ টাকা। জুলাইয়ে ১৫০ ইউনিট ব্যবহারে ১ হাজার ১৮২ টাকা এবং আগস্টে ৭৫ ইউনিটে ৫১৩ টাকা বিল এসেছে। অর্থাৎ চার মাসে এই মিটারে মোট ৩২০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে বিল হয়েছে ২ হাজার ৩৫৪ টাকা।
দ্বিতীয় মিটারের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। মে মাসে ২৫০ ইউনিটের জন্য বিল এসেছে ১ হাজার ৮১২ টাকা। জুনে ২০০ ইউনিটের বিল ১ হাজার ৫৮৪ টাকা। জুলাইয়ে ৪০০ ইউনিট ব্যবহারে ৩ হাজার ৫৯৪ টাকা এবং আগস্টে ২৮৫ ইউনিটে ২ হাজার ৩৯৭ টাকা বিল এসেছে। চার মাসে এই মিটারে মোট ১ হাজার ১৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে বিল হয়েছে ৯ হাজার ৩৮৭ টাকা।
তৃতীয় মিটারেও উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার দেখা গেছে। মে মাসে ১২৫ ইউনিটের জন্য বিল এসেছে ৮৪৭ টাকা, জুনে ১২০ ইউনিটের জন্য ৬৯০ টাকা, জুলাইয়ে ২০৫ ইউনিটের জন্য ১ হাজার ৬৩৩ টাকা এবং আগস্টে ১৭৫ ইউনিটের জন্য ১ হাজার ৩৬২ টাকা। চার মাসে এই মিটারে মোট ৬২৫ ইউনিট ব্যবহারের বিপরীতে বিল হয়েছে ৪ হাজার ৫৩২ টাকা।
তিনটি মিটারের হিসাব একত্র করলে মে থেকে আগস্ট—এই চার মাসে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার দাঁড়ায় ২ হাজার ৮০ ইউনিট। আর মোট বিল হয়েছে ১৬ হাজার ২৭৩ টাকা। এখানেই ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সামনে আসে। সিফাত যে দুই মাস—জুলাই ও আগস্ট—মিলে প্রায় ১০ হাজার টাকা বিল দেওয়ার কথা বলেছিলেন, পল্লী বিদ্যুতের হিসাবেও ওই দুই মাসে তিনটি মিটার মিলিয়ে মোট বিল হয়েছে ১০ হাজার ৬৮১ টাকা। অর্থাৎ শুধু মোট টাকার অঙ্কের দিক থেকে দেখলে তার দাবির সঙ্গে পল্লী বিদ্যুতের হিসাবের একটি বড় মিল রয়েছে।
তাহলে বিরোধটা কোথায়?
বিতর্কের মূল জায়গা সম্ভবত ‘একটি মিটার’ এবং ‘তিনটি মিটার’-এর হিসাবকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেখানে। পল্লী বিদ্যুৎ বলছে, বাড়িতে তিনটি আবাসিক মিটার রয়েছে এবং সবগুলো মিটারের ব্যবহার বিবেচনায় নিতে হবে। অন্যদিকে সিফাতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তার অভিযোগের প্রেক্ষাপট এবং বাসায় বসবাসকারী মানুষ বা ভাড়াটিয়াদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা দরকার। ফলে শুধু মোট বিলের অঙ্ক দেখলেই পুরো বিষয়টির সমাধান হচ্ছে না।
এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নির্বাহী কাউন্সিলের সদস্য অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান সিফাতের পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরে দাবি করেছেন, জুলাই ও আগস্টে তিনটি মিটারের বিল ১০ হাজার ৬৮১ টাকা—এই অঙ্কটি সঠিক। তার প্রশ্ন, যদি এই হিসাবই সঠিক হয়, তাহলে সিফাতের বক্তব্যকে পুরোপুরি ভুল হিসেবে দেখানোর কারণ কী? তিনি আরও দাবি করেছেন, বাড়িটিতে ভাড়াটিয়া থাকার বিষয়টিও সিফাতের বক্তব্যে এসেছে এবং মিটার তিনটির ব্যবহার কারা করছেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর বোর্ড বাজার জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. আহসান কবীরের বক্তব্য, তারা সরেজমিনে তদন্ত করেছেন এবং মিটারের রিডিং, অফিসে সংরক্ষিত তথ্য ও বিল প্রস্তুতের প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম পাননি। অর্থাৎ পল্লী বিদ্যুতের অবস্থান হলো—সিফাতের বাসার মিটার থেকে যে ইউনিট ব্যবহার হয়েছে, তার ভিত্তিতেই বিল তৈরি হয়েছে এবং সেখানে অতিরিক্ত বিল চাপিয়ে দেওয়ার প্রমাণ নেই।
তদন্তের সময় আরেকটি বিষয়ও সামনে এসেছে। পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা সিফাতের বাড়িতে গিয়ে বাসায় ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের প্রকৃত তালিকা সংগ্রহ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ির পক্ষ থেকে সেই তালিকা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয় এবং একপর্যায়ে গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে তদন্তকারীদের জন্য বাসাটিতে বিদ্যুতের প্রকৃত ব্যবহার কতটা এবং কোন ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার হচ্ছে, তা সরেজমিনে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—বিদ্যুৎ বিল বেশি হওয়া এবং বিদ্যুৎ বিলে অনিয়ম থাকা এক জিনিস নয়। একটি বাড়িতে বেশি সংখ্যক বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, একাধিক পরিবার বা ভাড়াটিয়া, একাধিক মিটার কিংবা বেশি ইউনিট ব্যবহারের কারণে মোট বিল বড় হতে পারে। আবার মিটার রিডিং ভুল, বিল প্রস্তুতে ত্রুটি বা অন্য কোনো কারিগরি সমস্যার কারণে অনিয়মও হতে পারে। তাই কোনো বিলের অঙ্ক বড় হলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘অতিরিক্ত বিল’ বলা যায় না। একইভাবে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ কোনো অনিয়ম খুঁজে না পেলেই গ্রাহকের অসন্তোষকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলা যায় না। দুই পক্ষের দাবির মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য মিটারভিত্তিক ব্যবহার, রিডিং, সংযোগের ধরন এবং কারা কোন মিটার ব্যবহার করছেন—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘটনাকে আরও জটিল করেছে সিফাতের গ্রেপ্তারের বিষয়টি। একজন নাগরিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অভিযোগ করলে সেই অভিযোগ যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থার কাছে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকা জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক নেতা বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আইন ও সামাজিক শালীনতার সীমা অতিক্রম করলে সেটিরও আইনি পরিণতি হতে পারে। ফলে সিফাতের বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের অভিযোগ—দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
ঘটনাটি আরও একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অভিযোগ ভাইরাল হওয়ার পর সেটির সত্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত ও স্বচ্ছ হওয়া উচিত? কারণ এখন একটি ভিডিও বা ফেসবুক পোস্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অভিযোগ সত্য হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগের তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সেটিও দ্রুত পরিষ্কার করা দরকার। তা না হলে একটি সাধারণ ভোক্তা অভিযোগও মুহূর্তের মধ্যে রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হতে পারে।
সিফাতের ঘটনায় পল্লী বিদ্যুতের তদন্তের পর অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—জুলাই ও আগস্ট মাসে তিনটি মিটার মিলিয়ে ১০ হাজার ৬৮১ টাকা বিল এসেছে। ফলে ‘দুই মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা বিল’—এই কথাটি পুরোপুরি অমূলক নয়। তবে সেই অর্থ তিনটি মিটারের মোট বিল, একটি মিটারের নয়। আবার এই বিলের প্রতিটি ইউনিট যথাযথভাবে মাপা হয়েছে কি না, বাড়ির কোন অংশে কোন মিটার ব্যবহার হয়েছে, সেখানে কতজন গ্রাহক বা ভাড়াটিয়া ছিলেন এবং তাদের ব্যবহারের হিসাব কী—এসব প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনাটির সব দিক নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যুৎ বিল নিয়ে কোনো গ্রাহকের অভিযোগ থাকলে সেটির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে। মিটার রিডিং, আগের মাসের ব্যবহার, বর্তমান মাসের ব্যবহার, মিটারের কার্যকারিতা এবং বিলের প্রতিটি উপাদান যাচাই করেই সিদ্ধান্তে আসা দরকার। প্রয়োজনে স্বাধীন কারিগরি পরীক্ষা বা পুনরায় মিটার যাচাইও করা যেতে পারে। এতে গ্রাহকের অভিযোগ সত্য হলে তার প্রতিকার হবে, আর অভিযোগে ভুল থাকলে সেটিও পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হবে।
সিফাতের ঘটনা তাই শুধু একজন কলেজছাত্রের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বিতর্ক নয়। এটি গ্রাহকের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্যের দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে তথ্য যাচাই—সবকিছুকে একসঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি বিলের অঙ্ক নিয়ে শুরু হওয়া বিতর্ক শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র, নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক আস্থার প্রশ্নে গিয়ে ঠেকেছে।
এখন সবচেয়ে প্রয়োজন আবেগ নয়, স্বচ্ছতা। সিফাতের অভিযোগের যে অংশ সত্য, সেটি সত্য হিসেবে স্বীকার করা যেমন জরুরি, তেমনি যে অংশে ভুল বা বিভ্রান্তি রয়েছে, সেটিও তথ্য-প্রমাণসহ পরিষ্কার করা দরকার। কারণ বিদ্যুৎ বিল নিয়ে একজন গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের তর্কে নয়, মিটার, রিডিং, ব্যবহার এবং নির্ভুল হিসাবের মধ্যেই পাওয়া সম্ভব।
আপনার মতামত জানানঃ