বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পার হলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতির দাবি করা হলেও পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান, মানবাধিকার সংগঠনের পর্যবেক্ষণ এবং সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সহিংস ঘটনার চিত্র বলছে—আইনশৃঙ্খলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। বিশেষ করে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পুলিশের ওপর হামলার মামলা আগের ছয় মাসের তুলনায় বেড়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়। সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসের অপরাধের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে একটি মিশ্র এবং কিছু ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক চিত্র সামনে আসে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে বিভিন্ন ধরনের অপরাধে মোট ৯৯ হাজার ৯৯২টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে—২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত—মামলার সংখ্যা ছিল ৮৯ হাজার ১২টি।
অর্থাৎ দুই সময়কাল তুলনা করলে মোট রেকর্ড হওয়া মামলার সংখ্যা বেড়েছে ১০ হাজার ৯৮০টি।
তবে মোট মামলার এই বৃদ্ধিকেই সরাসরি সব ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ বিভিন্ন অপরাধের প্রবণতা ছিল ভিন্ন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর একটি হত্যাকাণ্ড। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগের ছয় মাসে দেশে ১ হাজার ৭৮০টি হত্যা মামলা রেকর্ড করা হয়েছিল। নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৮৯টিতে।
অর্থাৎ ছয় মাসে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০টি হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে।
সংখ্যাগতভাবে আগের সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি খুব বেশি না হলেও প্রকাশ্য স্থানে গুলি, সংঘবদ্ধ হামলা এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বেশ কিছু ঘটনা মানুষের নিরাপত্তাবোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
আরও বড় বৃদ্ধি দেখা গেছে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায়।
২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১০ হাজার ৯০টি মামলা হয়েছিল। বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে একই ধরনের মামলা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টিতে।
অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি।
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও বেড়েছে। আগের ছয় মাসে পুলিশের ওপর হামলার ২৭৫টি মামলা বা ঘটনা রেকর্ড হয়েছিল। ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩১৭টি।
একই সময়ে দাঙ্গার ঘটনাও ১০টি থেকে বেড়ে ১৩টিতে পৌঁছেছে।
তবে আইনশৃঙ্খলার পুরো চিত্রই নেতিবাচক নয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি প্রচলিত অপরাধের মামলা বরং কমেছে।
আগের ছয় মাসে ডাকাতির মামলা ছিল ৩২৮টি, যা বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে কমে ২৫৬টিতে নেমেছে। দস্যুতার মামলা ৯৬০টি থেকে কমে ৯০৪টি, অপহরণের মামলা ৫৬৩টি থেকে ৫১২টি, সিঁধেল চুরি ১ হাজার ৬৫৯টি থেকে ১ হাজার ৫৯১টি এবং সাধারণ চুরির মামলা ৫ হাজার ১১৩টি থেকে কমে ৪ হাজার ৮০৮টিতে দাঁড়িয়েছে।
ফলে সরকারি পরিসংখ্যান থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে এক কথায় শুধু ‘ভালো’ অথবা ‘খারাপ’ বলার সুযোগ নেই। একদিকে চুরি, ডাকাতি ও অপহরণের মতো কিছু অপরাধ কমেছে; অন্যদিকে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পুলিশের ওপর হামলার মতো গুরুতর অপরাধের মামলা বেড়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যেও উদ্বেগের কারণ দেখা যাচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে জানিয়েছিল, ওই সময়ে দেশে অন্তত ৬০৫ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ২০৯ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ এবং পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলার ঘটনা তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ওই সময় হত্যা, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, লুটপাটসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ অব্যাহত থাকার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।
মব বা গণপিটুনির ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের এপ্রিল-জুন ২০২৬ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই তিন মাসে দেশে মব হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৪১ জন নিহত এবং ৯৭০ জন আহত হওয়ার তথ্যও সংস্থাটি নথিভুক্ত করেছে।
অধিকারের প্রতিবেদনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ৫৭টি ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়। এসব ঘটনায় চারজন নিহত এবং প্রায় ৪০০ জন আহত হয়েছেন বলে সংগঠনটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চাঁদাবাজি, এলাকার নিয়ন্ত্রণ, মাটি বিক্রি, স্থানীয় নির্বাচনের মনোনয়ন এবং দলীয় কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এসব সংঘাতের অভিযোগ উঠে এসেছে।
এর আগে বছরের প্রথম চার মাসে মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের হিসাবে ১৩২টি মব সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ৭১ জন নিহত হওয়ার তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে মার্চ ও এপ্রিলেই ৬৯টি ঘটনায় ৩৫ জন নিহত হন।
বিশেষজ্ঞদের কাছে উদ্বেগের আরেকটি জায়গা হচ্ছে অপরাধের ধরন।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, চাঁদাবাজি, অপহরণ, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। কয়েকটি ঘটনায় প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে।
পুলিশের কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুলিশের সক্ষমতা ও মনোবল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশের পুলিশ ব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছিল। থানা ও পুলিশের স্থাপনায় হামলা, অস্ত্র লুট এবং ব্যাপক বদলির পর বাহিনীকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, সেই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। পুলিশ বাহিনীতে পুনর্বিন্যাস, মনোবলের ঘাটতি, গোয়েন্দা নজরদারির দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব অপরাধ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলছে।
তবে সরকারের মূল্যায়ন ভিন্ন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গত আগস্টে বলেছেন, গত ছয় মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। পরিস্থিতিকে আরও শক্তিশালী ও জনগণের প্রত্যাশার পর্যায়ে নিয়ে যেতে কিছুটা সময় প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বলছেন, অনেক এলাকায় সামগ্রিক অপরাধের প্রবণতা কমেছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। হত্যা মামলার পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রেও সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণের কথা বলছেন তারা। কারণ কোনো কোনো হত্যা মামলা ঘটনার অনেক পরে নথিভুক্ত হয়।
অপরাধের আঞ্চলিক পরিসংখ্যানেও একই ধরনের মিশ্র চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে ঢাকা, খুলনা ও সিলেট মহানগর এলাকা এবং রেলওয়ে রেঞ্জে অপরাধ কমেছে। বিপরীতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও সিলেট রেঞ্জ এবং গাজীপুর, রংপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বরিশাল মহানগর এলাকায় অপরাধ বেড়েছে।
ফলে শুধু জাতীয় পর্যায়ের মোট সংখ্যা দিয়ে পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করাও কঠিন।
আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান মূলত থানায় রেকর্ড হওয়া মামলার হিসাব। দেশে সংঘটিত প্রতিটি অপরাধ শেষ পর্যন্ত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয় না। অনেক ভুক্তভোগী থানায় যান না, আবার কোনো কোনো অভিযোগ সাধারণ ডায়েরি বা লিখিত অভিযোগ হিসেবেই থেকে যায়।
তাই মামলার সংখ্যা কমা মানেই বাস্তবে সমান হারে অপরাধ কমেছে—এমন সিদ্ধান্তেও সরাসরি পৌঁছানো যায় না।
তবু সরকারের প্রথম ছয় মাসের তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত দিচ্ছে। বিশেষ করে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, পুলিশের ওপর হামলা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং মব সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধের উপস্থিতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে বিশেষ অভিযান, মাদক ও চাঁদাবাজবিরোধী ব্যবস্থা এবং অপরাধীদের তালিকা তৈরিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের সফলতা শেষ পর্যন্ত শুধু গ্রেপ্তার বা অভিযানের সংখ্যায় নির্ধারিত হবে না।
মূল প্রশ্ন হচ্ছে—সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ বোধ করছেন।
মানুষ যদি রাস্তায়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মস্থলে কিংবা নিজের বাড়িতে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে সরকারি পরিসংখ্যানে কিছু অপরাধ কমলেও সেটিকে পূর্ণাঙ্গ আইনশৃঙ্খলা উন্নতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
অন্যদিকে কিছু গুরুতর অপরাধ বেড়েছে বলেই যে প্রতিটি অপরাধের সূচক খারাপ হয়েছে, সরকারি তথ্য সেটিও সমর্থন করে না।
ছয় মাসের পরিসংখ্যান তাই বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি জটিল বাস্তবতা সামনে আনছে—চুরি, ডাকাতি ও অপহরণের মতো কিছু অপরাধের মামলা কমেছে, কিন্তু হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পুলিশের ওপর হামলা বেড়েছে; পাশাপাশি মব ও রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
ক্ষমতায় আসার সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং মানুষের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার যে অঙ্গীকার বিএনপি সরকার করেছিল, আগামী মাসগুলোতে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নই এখন বড় পরীক্ষা।
আপনার মতামত জানানঃ