একসময় তালেবানকে আফগানিস্তানের সবচেয়ে সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মতো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোটের বিরুদ্ধে টানা দুই দশক যুদ্ধ করেও এই সংগঠন ভেঙে পড়েনি। নেতৃত্বে মতভেদ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা কখনোই প্রকাশ্যে তালেবানের ভেতর ফাটল ধরাতে পারেনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ২০২১ সালে কাবুল দখলের পর অনেক বিশ্লেষকের ধারণা ছিল, তালেবান হয়তো কঠোর হবে, কিন্তু শাসনব্যবস্থা হবে স্থিতিশীল। তিন বছরের মাথায় এসে সেই ধারণা এখন প্রশ্নের মুখে। কারণ তালেবানের সবচেয়ে বড় সংকট আর কোনো বিদেশি শক্তি নয়, বরং তাদের নিজেদের ভেতরের দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস এবং ক্ষমতার লড়াই।
যুদ্ধকালীন তালেবান আর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা তালেবান—এই দুই বাস্তবতার পার্থক্যই বর্তমান সংকটের মূল উৎস। যুদ্ধের সময় তালেবান ছিল একটি আদর্শভিত্তিক আন্দোলন। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই—বিদেশি দখলদারির অবসান। সেই লড়াইয়ে নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য তৈরি হয়েছিল যৌথ শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাধ্যমে। তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল তুলনামূলক সহজ, কারণ প্রশ্ন ছিল অস্তিত্বের। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর তালেবানকে রূপ নিতে হয়েছে শাসকগোষ্ঠীতে। এখানে আদর্শের পাশাপাশি প্রশাসন, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং জনগণের নীরব সম্মতির বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। এই রূপান্তরের সঙ্গে তালেবানের শীর্ষ নেতৃত্ব মানসিক ও কাঠামোগতভাবে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি।
এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে আছেন তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা। তিনি মূলত একজন ধর্মীয় আলেম, যাঁর ক্ষমতার উৎস শরিয়াহ ব্যাখ্যার কর্তৃত্ব ও ধর্মীয় বৈধতা। যুদ্ধের সময় এই বৈশিষ্ট্য তালেবানের জন্য কার্যকর ছিল। এতে নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি এবং শৃঙ্খলা বজায় ছিল। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এই ধর্মীয় কেন্দ্রীকরণই সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। আখুন্দজাদা নিজেকে কেবল সৃষ্টিকর্তার কাছে দায়বদ্ধ মনে করেন। রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক চাপ তাঁর সিদ্ধান্তে খুব সীমিত প্রভাব ফেলে। তাঁর কাছে ইসলামি আমিরাত একটি আদর্শিক কাঠামো, যেখানে আপসের জায়গা নেই।
এর বিপরীতে তালেবানের ভেতরেই একটি গোষ্ঠী রয়েছে, যারা যুদ্ধের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। কাবুলভিত্তিক এই নেতারা জানেন, একটি আধুনিক রাষ্ট্র ইন্টারনেট ছাড়া চলে না, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়া অর্থনীতি দাঁড়ায় না এবং নারীদের পুরোপুরি বাদ দিয়ে সমাজ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাঁরা ধর্ম ত্যাগ করতে চান না, বরং ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যেই বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় চান। এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আখুন্দজাদার কঠোর, একমুখী শাসনচিন্তার সরাসরি সংঘর্ষ তৈরি হয়েছে। এই সংঘর্ষকে অনেক বিশ্লেষক ‘কান্দাহার বনাম কাবুল’ দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখছেন।
ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এই ভাঙনকে আরও গভীর করেছে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কান্দাহারকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। কান্দাহার তালেবান আন্দোলনের জন্মভূমি। নব্বইয়ের দশকে এখান থেকেই মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে তালেবানের উত্থান ঘটে। আখুন্দজাদা এই ঐতিহাসিক স্মৃতিকে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বৈধতার উৎস হিসেবে দেখেন। তাঁর কাছে কান্দাহার শুধু একটি ভৌগোলিক কেন্দ্র নয়, বরং তালেবানের ‘খাঁটি’ আদর্শের প্রতীক। ফলে রাজধানী কাবুলের পরিবর্তে কান্দাহার থেকে শাসন পরিচালনাই তাঁর কাছে নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে।
এই কান্দাহারকেন্দ্রিকতা তালেবান শাসনের কাঠামোগত ভারসাম্য নষ্ট করেছে। কাবুলে থাকা মন্ত্রিসভা অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে চলে গেছে। কান্দাহার থেকে ফরমান আসে, বাস্তবায়ন করতে হয়, প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে না। এর ফলে কাবুলভিত্তিক নেতৃত্বের মধ্যে অসন্তোষ জমতে থাকে। নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরাসরি কান্দাহারের নিয়ন্ত্রণ কাবুলের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করেছে।
এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের প্রভাব সাধারণ আফগান জনগণের জীবনেও স্পষ্ট। শহরাঞ্চলে বেকারত্ব বাড়ছে, ব্যবসা স্থবির, ব্যাংকে নগদ অর্থের সংকট লেগেই আছে। তরুণদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। গ্রামাঞ্চলে নীরব অসন্তোষ জমছে, যদিও তা প্রকাশ্যে আসে না। মানুষ হয়তো তালেবানের ভেতরের রাজনীতি বোঝে না, কিন্তু শাসনের অচলাবস্থা তারা প্রতিদিন অনুভব করছে। এই বাস্তবতায় তালেবানের ভেতরের দ্বন্দ্ব কেবল ক্ষমতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
এই সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন কান্দাহার থেকে পুরো আফগানিস্তানে ইন্টারনেট বন্ধের আদেশ দেওয়া হয়। নারীদের শিক্ষা বন্ধ করা বা পোশাকবিধি কঠোর করার মতো সিদ্ধান্তে অনেকেই ভেতরে ভেতরে আপত্তি করলেও প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ করা মানে ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার শিরায় আঘাত করা। প্রশাসন, বাণিজ্য, ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক লেনদেন এমনকি নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ইন্টারনেটনির্ভর। এই সিদ্ধান্ত কাবুলের তালেবান নেতাদের কাছে নিছক আদর্শিক ফরমান নয়, বরং সরাসরি শাসনক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর আঘাত হিসেবে ধরা দেয়।
ফলে কাবুল গোষ্ঠী প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ নেতার আদেশ অমান্য করার ঝুঁকি নেয়। তারা কার্যত ওই নির্দেশ বাতিল করে দেয়। প্রভাবশালী মন্ত্রীরা একত্র হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে ইন্টারনেট পুনরায় চালুর নির্দেশ দেন। অর্থাৎ কান্দাহার থেকে জারি হওয়া আমিরের ফরমান রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করে অকার্যকর করে দেওয়া হয়। তালেবান কাঠামোর ভেতরে এটি ছিল নজিরবিহীন ঘটনা। এটি নিছক মতপার্থক্য নয়, বরং শাসনক্ষমতার প্রশ্নে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে একটি কঠিন বাস্তবতা কাজ করেছে। তালেবানের শীর্ষ নেতারা জানেন, তাঁদের ক্ষমতা শুধু ধর্মীয় বৈধতায় নয়, বাস্তব শাসনক্ষমতায় টিকে আছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে রাষ্ট্র কার্যত অচল হয়ে পড়ত। এতে জনগণের অসন্তোষ বাড়ত, প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ত এবং আন্তর্জাতিক চাপ আরও তীব্র হতো। সেই ঝুঁকি নেওয়ার মতো অবস্থায় তালেবান এখন নেই।
এই ভাঙনের পেছনে ব্যক্তিগত নেতৃত্ব সংকটও স্পষ্ট। আখুন্দজাদা ক্রমেই আরও অন্তর্মুখী ও কঠোর হয়ে উঠছেন। পরামর্শের পরিসর সংকুচিত হচ্ছে, তাঁর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ কমছে। এতে শীর্ষ নেতৃত্বের ভেতরেই আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বারাদার, হাক্কানি বা ইয়াকুবের মতো নেতারা জনসমক্ষে বেশি দৃশ্যমান। তাঁরা আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও গণমাধ্যমের বাস্তবতা বোঝেন। তাঁদের কাছে শাসন মানে শুধু ফরমান নয়; কিছুটা সমঝোতা, যোগাযোগ ও বিশ্বাসও দরকার।
এই অভ্যন্তরীণ ভাঙন এখনো পূর্ণাঙ্গ বিদ্রোহে রূপ নেয়নি। কারণ তালেবান আন্দোলনের ভেতরে আনুগত্য এখনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে কাজ করে। নিরাপত্তা বাহিনীর বড় অংশ এখনো শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য দেখাচ্ছে। কিন্তু যে ফাটল তৈরি হয়েছে, তা গভীর ও কাঠামোগত। এটি আদর্শ বনাম বাস্তবতার সংঘাত, আলেমশাসন বনাম প্রশাসনিক রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব এবং একক নেতৃত্ব বনাম যৌথ শাসনের লড়াই।
এই ভাঙন যদি আরও গভীর হয়, তাহলে তালেবানের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি আসবে ভেতর থেকেই। আফগানিস্তান আবারও দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার দিকে এগোতে পারে। কারণ একটি রাষ্ট্র শুধু ভয়, ধর্মীয় ফরমান বা অস্ত্রের জোরে টিকে থাকে না। টিকে থাকতে হলে দরকার সমন্বয়, বাস্তবতা বোঝা এবং জনগণের নীরব অংশগ্রহণ। তালেবান আজ সেই মৌলিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় পড়েছে।
আপনার মতামত জানানঃ