চুম্বনকে আমরা সাধারণত মানুষের আবেগ, ভালোবাসা কিংবা রোমান্টিক সম্পর্কের একান্ত নিজস্ব প্রকাশ হিসেবেই ভাবি। ঠোঁটের স্পর্শ, মুখোমুখি ঘনিষ্ঠতা—সব মিলিয়ে এটি যেন মানবিক অনুভূতির এক বিশেষ ভাষা। কিন্তু সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই ধারণাকে আমূল বদলে দিচ্ছে। গবেষণা বলছে, চুম্বনের মতো আচরণ শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর শিকড় বিস্তৃত প্রাণিজগতের গভীরে এবং এর বয়স প্রায় দুই কোটি দশ লাখ বছর। অর্থাৎ মানুষের আবির্ভাবের বহু আগেই এই ঘনিষ্ঠ আচরণটি বিবর্তনের ধারায় জন্ম নিয়েছিল।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়–এর গবেষকদের করা এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে বিবর্তন ও আচরণবিজ্ঞানের খ্যাতনামা জার্নাল ‘ইভোলিউশন অ্যান্ড হিউম্যান বিহেভিয়র’-এ। গবেষণার মূল প্রশ্ন ছিল—চুম্বনের মতো মুখোমুখি ঘনিষ্ঠ আচরণ কবে এবং কীভাবে প্রাণিজগতে বিকশিত হলো। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা চুম্বনকে কেবল একটি রোমান্টিক বা সাংস্কৃতিক অভ্যাস হিসেবে না দেখে, একটি নির্দিষ্ট জৈবিক ও আচরণগত কাঠামোর মধ্যে বিশ্লেষণ করেছেন।
গবেষণার শুরুতেই বিজ্ঞানীরা চুম্বনের একটি স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করেন। তাদের মতে, চুম্বন হলো একটি ‘অ-আক্রমণাত্মক, নির্দেশিত মৌখিক-মৌখিক যোগাযোগ’, যেখানে মুখ বা ঠোঁটের পারস্পরিক স্পর্শ ও ঘষাঘষি থাকবে, কিন্তু খাদ্য আদান-প্রদান হবে না। এই সংজ্ঞা ব্যবহার করে তারা বিভিন্ন প্রাণীর আচরণ বিশ্লেষণ করেন এবং বিস্ময়করভাবে দেখতে পান, মানুষ ছাড়াও বহু প্রজাতির মধ্যে এই সংজ্ঞার সঙ্গে মিলে যায় এমন আচরণ বিদ্যমান।
গবেষণার প্রধান গবেষক, বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী ড. মাটিল্ডা ব্রিন্ডল ব্যাখ্যা করেন, মানুষ, শিম্পাঞ্জি এবং বোনোবো—এই তিন প্রজাতির মধ্যেই চুম্বনের মতো আচরণ দেখা যায়। যেহেতু এই প্রজাতিগুলোর একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ ছিল, তাই ধারণা করা হচ্ছে, সেই পূর্বপুরুষের মধ্যেই এই আচরণের সূচনা ঘটেছিল। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, গ্রেট এপসদের মধ্যে এই আচরণটি প্রায় ২ কোটি ১০ থেকে ২ কোটি ১৫ লাখ বছর আগে বিবর্তিত হয়।
এই গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, চুম্বনের ইতিহাস শুধু আধুনিক মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানীরা মানুষের নিকটতম প্রাচীন আত্মীয় নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেও চুম্বনের সম্ভাব্য প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন। নিয়ান্ডারথালরা প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও, তাদের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আধুনিক মানুষ ও নিয়ান্ডারথালদের মুখগহ্বরে একই ধরনের জীবাণু বিদ্যমান ছিল। এর অর্থ হলো, এই দুই প্রজাতির মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে লালা বিনিময় হয়েছিল, যা ঘনিষ্ঠ মুখোমুখি যোগাযোগ ছাড়া সম্ভব নয়। গবেষকদের মতে, এটি চুম্বনের মতো আচরণের একটি শক্ত প্রমাণ।
গবেষণার পরিধি এখানেই থেমে থাকেনি। বিবর্তনীয় ফ্যামিলি ট্রি তৈরি করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা আরও বহু প্রাণীর আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন। নেকড়ে, প্রেইরি ডগ, মেরু ভালুক এমনকি অ্যালবাট্রস পাখির মধ্যেও মুখোমুখি স্পর্শ, ঠোঁট বা মুখের ঘষাঘষির মতো আচরণ দেখা গেছে, যা চুম্বনের বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই আচরণগুলো কখনো সামাজিক বন্ধন জোরদার করতে, কখনো দলে নিজের অবস্থান বোঝাতে, আবার কখনো সঙ্গী নির্বাচনের সময় ব্যবহৃত হয়।
এই গবেষণা প্রমাণ করে, চুম্বন কোনো বিচ্ছিন্ন মানবিক উদ্ভাবন নয়। বরং এটি একটি গভীরভাবে প্রোথিত বিবর্তনগত আচরণ, যা সামাজিক প্রাণীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, ঘনিষ্ঠতা এবং বন্ধন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মানুষের ক্ষেত্রে এটি ভালোবাসা ও আবেগের প্রকাশ হলেও, প্রাণিজগতে এটি টিকে থাকার কৌশলের অংশ হিসেবেই বিকশিত হয়েছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
তবে একটি বড় প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি উত্তরহীন রয়ে গেছে—কেন এই আচরণটি বিবর্তিত হলো। বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে কয়েকটি সম্ভাব্য তত্ত্বের কথা বলছেন। একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, চুম্বনের উৎস হতে পারে প্রাচীন এপসদের ‘গ্রুমিং’ বা পরিচ্ছন্নতার আচরণ। গ্রুমিংয়ের সময় একে অপরের শরীর পরিষ্কার করার পাশাপাশি সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আচরণ মুখোমুখি ঘনিষ্ঠতায় রূপ নিতে পারে।
আরেকটি তত্ত্ব বলছে, চুম্বন হতে পারে সঙ্গীর স্বাস্থ্য ও জিনগত উপযুক্ততা যাচাইয়ের একটি উপায়। মুখোমুখি ঘনিষ্ঠতার সময় গন্ধ, স্বাদ এবং জীবাণুর মাধ্যমে সঙ্গীর শারীরিক অবস্থার নানা সংকেত পাওয়া সম্ভব। এই সংকেতগুলো প্রজননের জন্য উপযুক্ত সঙ্গী বাছাইয়ে সহায়ক হতে পারে।
ড. ব্রিন্ডল মনে করেন, এই গবেষণা মূলত একটি দরজা খুলে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন আরও গভীর গবেষণা, যাতে বোঝা যায়, চুম্বনের মতো আবেগময় আচরণ কীভাবে বিভিন্ন প্রজাতিতে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিয়েছে এবং কীভাবে এটি সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, চুম্বনকে শুধু মানুষের রোমান্টিক আচরণ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করা যাবে না।
এই গবেষণার সামাজিক তাৎপর্যও কম নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ প্রকৃতি থেকে আলাদা কোনো সত্তা নয়। আমাদের অনেক আবেগ, আচরণ এবং সামাজিক অভ্যাসের শিকড় রয়েছে প্রাণিজগতের গভীরে। চুম্বনের মতো একটি ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ আচরণের ইতিহাস যখন কোটি কোটি বছর পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়, তখন তা মানুষের আত্মপরিচয় ও বিবর্তন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
সবশেষে বলা যায়, চুম্বন আর শুধু প্রেমের কবিতা বা চলচ্চিত্রের দৃশ্য নয়। এটি বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস বহন করা এক আচরণ, যা মানুষসহ বহু প্রাণীর সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই উপলব্ধি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক সাধারণ অভ্যাসকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়—যেখানে একটি ছোট্ট চুম্বনের মধ্যেও লুকিয়ে আছে কোটি বছরের বিবর্তনের গল্প।
আপনার মতামত জানানঃ