বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন সব সময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, কিন্তু আসন্ন ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এই নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক ভিতও গভীর সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন জনগণের মতপ্রকাশের প্রকৃত মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে না পারায় যে রাজনৈতিক জড়তা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও সুশাসনের ওপর। ফলে সামনে যে সরকারই দায়িত্ব নিক না কেন, তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন বা ক্ষমতা গ্রহণ নয়; বরং একটি চাপগ্রস্ত, ভারসাম্যহীন এবং আস্থাহীন অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের দায়িত্বও এসে পড়বে।
গত এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক, বিরোধী দলের অংশগ্রহণের অভাব এবং ভোট কারচুপির অভিযোগ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রমেই দুর্বল করে তুলেছে। একটি বড় অংশের জনগণ নিয়মিত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এর ফলে রাজনীতির সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব বেড়েছে, জবাবদিহির কাঠামো ক্ষয়ে গেছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা কমেছে। যখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর জনগণের চাপ কমে যায়, তখন নীতিনির্ধারণে দায়িত্বশীলতার জায়গাটিও দুর্বল হয়ে পড়ে। এর প্রভাব সরাসরি অর্থনীতিতে গিয়ে পড়ে—এই বাস্তবতা বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক গতি স্পষ্টভাবেই কমে এসেছে। প্রবৃদ্ধির হার আগের মতো শক্ত অবস্থানে নেই, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমাত্রায় অবস্থান করছে এবং ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণের ভারে ন্যুব্জ। মানুষের প্রকৃত আয় কমছে, সঞ্চয় কমে যাচ্ছে এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির মতো মৌলিক খাতে খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির, বিদেশি বিনিয়োগ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে এবং সরকারি বিনিয়োগের বড় একটি অংশ দক্ষতা ও ফলপ্রসূতার প্রশ্নে সমালোচিত হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় আসন্ন নির্বাচনকে অনেকেই দেখছেন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে—যেখান থেকে রাজনৈতিক বৈধতা ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা একসঙ্গে পুনর্গঠনের পথ তৈরি হতে পারে। কিন্তু শুধু নির্বাচন সুষ্ঠু হলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন ভাবার সুযোগ নেই। কারণ, আগামী সরকার এমন একটি অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে, যেখানে বহু বছর ধরে নীতিগত উদাসীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি বর্তমানে সাধারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের মোট ব্যয়ের অর্ধেকের বেশি যায় খাদ্যে। ফলে খাদ্যের দাম সামান্য বাড়লেও তাদের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল না মেলায় মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। এর ফলে সঞ্চয় কমছে, ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে এবং সামাজিক বৈষম্য আরও গভীর হচ্ছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি শুধু ব্যক্তিগত জীবনে চাপ তৈরি করে না; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর। ব্যবসায় অনিশ্চয়তা বাড়ে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহ কমে, টাকার ওপর চাপ পড়ে এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এর প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির পেছনে বৈশ্বিক কারণ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে দেশের ভেতরের নীতিগত দুর্বলতাও। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জ্বালানির দাম এক লাফে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি সরকার ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেওয়ায় বাজারে অর্থের সরবরাহ বেড়েছে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিয়েছে।
এ অবস্থায় নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কৌশল গ্রহণ করা। খাদ্যবাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, সিন্ডিকেট ও মজুতদারি বন্ধ করা, সংরক্ষণ ও পরিবহন অবকাঠামো উন্নত করা এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া মূল্যস্ফীতি টেকসইভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম নির্ধারণে একটি স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক পদ্ধতি চালু করা জরুরি, যাতে হঠাৎ বড় ধাক্কা না আসে এবং ব্যবসা ও ভোক্তা—দুই পক্ষই আগাম পরিকল্পনা করতে পারে।
অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বল জায়গা হলো বিনিয়োগ। প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বেসরকারি বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের মান, সময় ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিদেশি বিনিয়োগও আশানুরূপ নয়। নীতিগত অনিশ্চয়তা, জটিল নিয়মকানুন, চুক্তি বাস্তবায়নের দুর্বলতা, অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করেছে।
ব্যাংক খাতের দুরবস্থা এই সমস্যাকে আরও গভীর করেছে। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল সুশাসন এবং বারবার ঋণ পুনঃ তফসিলের কারণে ঋণ ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যোগ্য উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না, অথচ প্রভাবশালীরা সহজেই বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা ফেরত দিচ্ছেন না। এর ফলে ব্যাংক খাত বিনিয়োগ সহায়ক ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যাংক খাতে সুশাসন জোরদার করা, খেলাপি ঋণ আদায় নিশ্চিত করা, ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সংস্কারের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে ব্যবসা করার পরিবেশ সহজ করতে হবে, সরকারি সেবা ডিজিটাল করতে হবে এবং করব্যবস্থা সরল ও ন্যায্য করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নে শুধু বড় প্রকল্প নয়, দক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিদ্যুৎ, বন্দর, কাস্টমস ও লজিস্টিকসে দুর্বলতা থাকলে ব্যবসার খরচ বাড়ে এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমে যায়।
এই সব চ্যালেঞ্জের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামাজিক চাপ তৈরি করছে কর্মসংস্থানের সংকট। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু সে অনুপাতে চাকরি তৈরি হচ্ছে না। যুব বেকারত্ব জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। অধিকাংশ নতুন চাকরি অনানুষ্ঠানিক, কম আয়ের এবং কম উৎপাদনশীল। শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে, যা শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার বড় ধরনের ব্যবধানকে সামনে নিয়ে আসছে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি নির্ভর করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মজুরি কমিয়ে দেয় এবং নিয়োগে বাধা সৃষ্টি করে। তাই স্থিতিশীল অর্থনীতি ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার বড় পরিসরে সম্প্রসারণ দরকার। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে এবং তাদের জন্য নিয়মকানুন সহজ করতে হবে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার প্রশ্ন নয়; এটি শাসনের ধরন, নীতির দিকনির্দেশনা এবং একটি প্রজন্মের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। গণতন্ত্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও জবাবদিহি একসূত্রে বাঁধা। নতুন সরকার যদি সাহসী ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে বাংলাদেশ স্থবিরতা ও অনিশ্চয়তার চক্র ভেঙে স্থিতিশীলতা, আস্থা ও সুযোগের নতুন পথে এগোতে পারে। আর যদি এই সুযোগ হাতছাড়া হয়, তবে তার মূল্য দিতে হবে আরও দীর্ঘ সময় ধরে—সাধারণ মানুষকেই।
আপনার মতামত জানানঃ