রাজনীতির ময়দানে জোট গঠন নতুন কিছু নয়, তবে জোটের ভেতরের টানাপোড়েন প্রায়ই বড় গল্প হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী দলগুলোর নির্বাচনী জোটে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেটি শুধু আসন বণ্টনের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পারস্পরিক আস্থা, রাজনৈতিক কৌশল এবং ভবিষ্যৎ অবস্থান—সবকিছুরই একটি জটিল প্রতিফলন। চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং আল্লামা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এই জোটে থাকবে কি না, সেই প্রশ্ন এখন রাজনীতির অন্দরমহলে আলোচনার কেন্দ্রে।
২০২৫ সালের ৫ নভেম্বরের সেই সংবাদ সম্মেলনের কথা এখনও অনেকের মনে তাজা। তখন আটটি দল একসঙ্গে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছিল, পরে সেটিই ধীরে ধীরে নির্বাচনী জোটে রূপ নেয়। সেই মঞ্চে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের পাশে বসেছিলেন মামুনুল হক ও চরমোনাই পীর। সে সময় দৃশ্যটা ছিল ঐক্যের প্রতীক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐক্যের ভিতরে ফাটল ধরতে শুরু করে, যার বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায় আসন সমঝোতা।
ইসলামী আন্দোলন শুরু থেকেই বড় পরিসরে নির্বাচন করতে চেয়েছিল। শতাধিক আসনে প্রার্থী দেওয়ার আগ্রহ তাদের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সাংগঠনিক শক্তির আত্মবিশ্বাস থেকেই এসেছে—এমনটাই দলটির নেতাদের বক্তব্য। আলোচনার টেবিলে বসে তারা ধাপে ধাপে সেই দাবি কমিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ৫০টির বেশি আসনে ছাড় চেয়েও যখন জামায়াতের পক্ষ থেকে ৪০টি আসনের প্রস্তাব আসে, তখনই অসন্তোষ প্রকাশ পায় জোরালোভাবে। ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতাই এটিকে নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
এই অসন্তোষ শুধু সংখ্যার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না। আলোচনা প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দলীয় সূত্র বলছে, জামায়াত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়েছে, বিশেষ করে নতুন কয়েকটি দলকে আসন সমঝোতার আলোচনায় আনার ক্ষেত্রে। জাতীয় নাগরিক পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং আমার বাংলাদেশ পার্টির সঙ্গে আলাদা করে বৈঠক করা হয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। এসব বৈঠকের আগে অন্য শরিকদের জানানো হয়নি বলে ইসলামী আন্দোলনের নেতারা মনে করছেন, এতে পারস্পরিক বিশ্বাসে চিড় ধরেছে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে দলের শীর্ষ নেতারা রামপুরার একটি মাদ্রাসায় যান। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও নেতাকর্মীরা সেখানে জড়ো হন। সন্ধ্যার পর শুরু হয় শুরা কাউন্সিলের রুদ্ধদ্বার বৈঠক। মাগরিব ও এশার নামাজের বিরতি দিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলে আলোচনা। ভবনের নিচে অবস্থান নেওয়া নেতাকর্মীদের জটলা, আসন সমঝোতা নিয়ে আলাপ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত ও অনিশ্চয়তায় ভরা।
বৈঠক শেষে রাত গভীর হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মজলিসে আমেলার ওপর। আজ জোহরের নামাজের পর সেই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। দলের ভেতরে অনেকেই বলছেন, শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করছে আমির চরমোনাই পীরের সিদ্ধান্তের ওপর। তিনি যদি জোটে থাকার পক্ষে মত দেন, তাহলে শুরা বা মজলিসে আমেলার সুপারিশও গৌণ হয়ে যাবে। আর তিনি যদি সমঝোতা থেকে সরে আসেন, তাহলে ইসলামী আন্দোলনের জোটে থাকা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের অবস্থানও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। দলটি ২৫ থেকে ৩০টি আসন চাইলেও জামায়াত সর্বোচ্চ ২০টি আসনে ছাড় দিতে রাজি। এই ব্যবধান ঘোচাতে না পারলে খেলাফত মজলিস কিছু আসনে প্রার্থী উন্মুক্ত রাখার চিন্তা করছে। মামুনুল হক প্রকাশ্যে বলছেন, আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে, তবে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা না হলে উন্মুক্ত আসনের পথ খোলা থাকবে। দলের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ আবার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইসলামী আন্দোলন যদি জোট থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে তাদের দলকেও জোটে থাকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
এই বক্তব্যগুলো স্পষ্ট করে দেয়, জোটের ভেতরের ভারসাম্য কতটা নড়বড়ে হয়ে গেছে। একদিকে জামায়াত আশাবাদী যে শেষ পর্যন্ত সব দলই থাকবে এবং আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হবে। অন্যদিকে শরিক দলগুলোর নেতারা নিজেদের অবস্থান নিয়ে দ্বিধায় ভুগছেন। বিশেষ করে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং জাতীয় সরকার গঠনের পক্ষে বক্তব্য ইসলামী আন্দোলনের ভেতরে দ্বিচারিতার অভিযোগকে আরও উসকে দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ইসলামী দলগুলোর দীর্ঘদিনের ঐক্যের জন্য বড় পরীক্ষা। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন ও গণভোট আলাদা করার দাবিতে যে আটটি দল একসঙ্গে আন্দোলন করেছিল, তাদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ছিল মূল শক্তি। এখন সেই শক্তি যদি আসন বণ্টনের হিসাবেই দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে নির্বাচনী রাজনীতিতে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আজ বিকেলে জামায়াতের পক্ষ থেকে ১১ দলের আসন সমঝোতা বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। সেই সংবাদ সম্মেলনে সব দলের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, তা সহজে কাটবে—এমন নিশ্চয়তা কেউই দিচ্ছেন না।
এই পুরো প্রক্রিয়া দেখিয়ে দিচ্ছে, জোট রাজনীতিতে শুধু আদর্শ বা অভিন্ন দাবি যথেষ্ট নয়; আসন, ক্ষমতা ও প্রভাবের হিসাব শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে ওঠে। চরমোনাই পীর ও মামুনুল হকের সিদ্ধান্ত শুধু তাঁদের দলের ভবিষ্যৎই নয়, বরং পুরো ইসলামী জোটের পথচলাকেও প্রভাবিত করবে। ঐক্য থাকবে, নাকি ভাঙনের দিকে যাবে—এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে খুব শিগগিরই। তবে আপাতত রাজনীতির আকাশে যে মেঘ জমে আছে, তা সহজে কাটার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে
আপনার মতামত জানানঃ