আর্কটিকের বরফঢাকা বিশাল দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড হঠাৎ করেই বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। দূরত্বে বিচ্ছিন্ন, জনসংখ্যায় কম, কিন্তু কৌশলগত গুরুত্বে অতুলনীয়—এই ভূখণ্ডকে ঘিরেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে অবস্থান নিয়েছেন, তা শুধু কূটনৈতিক উত্তেজনাই বাড়ায়নি, বরং ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিরোধিতা করা ইউরোপের আটটি মিত্র দেশের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি সেই সংঘাতকে আরও প্রকাশ্য ও তীব্র করেছে।
ট্রাম্পের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের পণ্যের ওপর প্রথমে ১০ শতাংশ, পরে তা বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। শর্ত একটাই—গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রির চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই শুল্ক বহাল থাকবে। অর্থাৎ বাণিজ্যিক চাপকে সরাসরি ভূখণ্ডগত দাবির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউরোপের নেতারা একে দেখছেন নজিরবিহীন ও বিপজ্জনক পদক্ষেপ হিসেবে।
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। আন্তর্জাতিক আইনে এর সার্বভৌমত্ব স্পষ্ট, কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে আর্কটিক অঞ্চলের গুরুত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলে নতুন নৌপথ উন্মুক্ত হচ্ছে, খনিজ ও বিরল ধাতুর সম্ভাবনা বাড়ছে, আর সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি হয়ে উঠছে আগাম সতর্কতা ও ক্ষেপণাস্ত্র নজরদারির এক অনন্য অবস্থান। এই প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্প বারবার বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’।
এই বক্তব্য ইউরোপে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সরাসরি বলেন, মিত্রদের ওপর শুল্ক আরোপ ন্যাটোর যৌথ নিরাপত্তা চেতনার পরিপন্থী এবং এটি ‘সম্পূর্ণ ভুল’ সিদ্ধান্ত। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ আরও কঠোর ভাষায় একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন এবং স্পষ্ট করেন যে ইউরোপ কোনো ধরনের ভীতি প্রদর্শনে মাথা নত করবে না। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উল্ফ ক্রিস্টারসন বলেন, ইউরোপ ব্ল্যাকমেইলের শিকার হবে না এবং একটি যৌথ প্রতিক্রিয়ার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নরওয়ে ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
ডেনমার্কের জন্য বিষয়টি কেবল কূটনৈতিক নয়, অস্তিত্বগতও। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকি রাসমুসেন ট্রাম্পের শুল্ক হুমকিকে ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে বর্ণনা করেছেন। কোপেনহেগেন আশঙ্কা করছে, এই চাপ যদি সামরিক হুমকিতে রূপ নেয়, তাহলে তা ন্যাটোর ইতিহাসে এক ভয়াবহ নজির স্থাপন করবে—যেখানে এক সদস্য রাষ্ট্র অন্য সদস্যের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের পথে হাঁটবে। ডেনমার্ক স্পষ্ট করে বলেছে, এমন পরিস্থিতি ন্যাটোর পতন ডেকে আনতে পারে।
এই উত্তেজনার প্রভাব শুধু কূটনৈতিক বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ নেই। গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ নেমে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভে। বরফঢাকা নগর নুক থেকে শুরু করে কোপেনহেগেন—সবখানেই একটাই বার্তা: গ্রিনল্যান্ড বিক্রির কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তুলনামূলকভাবে কম জনসংখ্যার হলেও গ্রিনল্যান্ডবাসীর মধ্যে নিজেদের ভূমি ও স্বায়ত্তশাসন নিয়ে প্রবল আবেগ কাজ করছে, আর সেই আবেগ এখন বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এই অবস্থান থেকে পিছু হটছে না। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউরোপের দেশগুলোর বিরুদ্ধে ‘বিপজ্জনক খেলা’ খেলার অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ডেনমার্ককে শুল্ক না নিয়ে কার্যত ভর্তুকি দিয়ে এসেছে, এখন সেটি ফেরত দেওয়ার সময়। আরও একধাপ এগিয়ে তিনি বলেছেন, বিশ্বশান্তি ঝুঁকির মুখে, কারণ চীন গ্রিনল্যান্ড চায় এবং ডেনমার্ক তা ঠেকাতে পারবে না—যা ইউরোপীয় নেতাদের চোখে স্পষ্টতই ভয় দেখানোর কৌশল।
এই বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার একাধিক স্তর জড়িয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত পিটুফিক ঘাঁটিতে শতাধিক সামরিক সদস্য মোতায়েন রেখেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র নজরদারি কেন্দ্র পরিচালনা করছে ওয়াশিংটন। বিদ্যমান চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র চাইলে আরও সৈন্য পাঠাতে পারে। তবু ট্রাম্পের যুক্তি, সম্ভাব্য রুশ বা চীনা হামলার বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে গ্রিনল্যান্ডের ‘মালিক’ হওয়া জরুরি।
ইউরোপ এই যুক্তিকে মানতে নারাজ। তাদের মতে, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ন্যাটোর যৌথ দায়িত্ব, কোনো একক দেশের একচেটিয়া দাবি নয়। সেই যুক্তির ভিত্তিতেই ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য তথাকথিত নজরদারি মিশনের অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ডে সীমিত সংখ্যক সেনা পাঠিয়েছে। ম্যাক্রঁ ঘোষণা দিয়েছেন, প্রয়োজনে স্থল, আকাশ ও সমুদ্র—সব ধরনের সম্পদ পাঠানো হবে, যা কার্যত যুক্তরাষ্ট্রকে একটি কূটনৈতিক বার্তা।
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাণিজ্য। গত বছর ব্রাসেলস ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যে ইইউ-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, ট্রাম্পের নতুন শুল্ক হুমকি সেটিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রভাবশালী ইপিপি গ্রুপের নেতা ম্যানফ্রেড ওয়েবার বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এই হুমকির আবহে চুক্তি অনুমোদন সম্ভব নয়। অর্থাৎ গ্রিনল্যান্ড ইস্যু এখন শুধু নিরাপত্তা নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই পুরো সংঘাত আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করছে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কস্তা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন দৃঢ় থাকবে। এই অবস্থান মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের প্রতিরক্ষা—যেখানে শক্তির জোরে ভূখণ্ড দখলকে অগ্রহণযোগ্য বলে ধরা হয়।
গ্রিনল্যান্ডের মতো একটি ভূখণ্ড, যার আয়তন জার্মানির ছয় গুণ হলেও জনসংখ্যা খুবই কম, আজ সেই নীতিগত লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক হিসাব, অন্যদিকে ইউরোপের সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন। এই দ্বন্দ্বের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে গ্রিনল্যান্ডবাসী—যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চায়, কোনো পরাশক্তির দরকষাকষির বস্তু হতে নয়।
শেষ পর্যন্ত এই সংঘাত কোন পথে যাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। আলোচনার টেবিলে সমাধান আসতে পারে, কিংবা শুল্ক ও কূটনৈতিক চাপের রাজনীতি আরও তীব্র হতে পারে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—গ্রিনল্যান্ড আর নিছক এক দূরবর্তী বরফের দ্বীপ নয়। এটি এখন বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, ন্যাটোর ঐক্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বড় পরীক্ষার নাম।
আপনার মতামত জানানঃ