মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার যে আবহ তৈরি হচ্ছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক দিনে ইরানের জলসীমার কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতাধীন এলাকায় ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের উপস্থিতি সেই উত্তেজনাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বিমানবাহী রণতরীটির সঙ্গে বেশ কয়েকটি গাইডেড-ক্ষেপণাস্ত্র ডেস্ট্রয়ার মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে প্রবেশ করেছে—এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই কূটনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে আশঙ্কা জোরালো হয়েছে যে পরিস্থিতি একটি বড় ধরনের সংঘাতের দিকে গড়াতে পারে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতার ইতিহাস থাকলেও, এবারের প্রেক্ষাপট অনেক দিক থেকেই ভিন্ন এবং সম্ভাব্যভাবে আরও বিপজ্জনক।
এই উত্তেজনার পটভূমিতে রয়েছে ইরানের ভেতরে চলমান গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটিতে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, তা শুধু সরকারের কোনো নির্দিষ্ট নীতির বিরুদ্ধে নয়; বরং পুরো শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধেই একটি ক্রমবর্ধমান আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে ও জানুয়ারির শুরুতে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষ নজিরবিহীন মাত্রায় সহিংসতা প্রয়োগ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থা এবং দেশটির ভেতরের চিকিৎসাকর্মীদের তথ্যমতে, কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, আহত বা আটক হয়েছে আরও অনেকে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইরানি কর্তৃপক্ষের ভেতরের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে যে এই বিক্ষোভে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় পাঁচশ’ নিরাপত্তাকর্মীও রয়েছেন।
দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রকৃত চিত্র যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারিভাবে এসব মৃত্যুর দায় স্বীকার করা হয়নি; বরং ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ এই সহিংসতার জন্য দায়ী এবং এর পেছনে ইসরায়েলের মদদ রয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও এই বক্তব্য এসেছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি পর্যন্ত বলেছেন, এই বিক্ষোভগুলোকে গত গ্রীষ্মের ১২ দিনের যুদ্ধের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা উচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সরকার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কঠোর দমন অভিযান চালিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ইরানের জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে। অতীতে ইরান সাধারণত দেরিতে ও সীমিত পরিসরে প্রতিশোধ নেওয়ার কৌশল অনুসরণ করেছে। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর, ইরান কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। সেই হামলার আগে ইরান সতর্কবার্তা দিয়েছিল বলে তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়। হতাহতের খবর না থাকায় বিশ্লেষকেরা এটিকে এমন একটি হিসেবি প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখেন, যেখানে ইরান শক্ত অবস্থান দেখালেও বড় যুদ্ধ এড়াতে চেয়েছিল।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানিকে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করার পরও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। পাঁচ দিন পর ইরান ইরাকের আইন আল-আসাদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। সেবারও আগাম সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল এবং কোনো মার্কিন সেনা নিহত হননি, যদিও পরে অনেক সেনা মাথায় আঘাতজনিত সমস্যার কথা জানান। এই ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দেয়, অতীতে ইরান উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে, যতটা না তা বাড়ানোর দিকে।
কিন্তু এবারের পরিস্থিতি সেই পুরনো ছকের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। ১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইরান এখন সম্ভবত সবচেয়ে গুরুতর অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিক্ষোভের মাত্রা সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমে এলেও তা পুরোপুরি থামেনি। মানুষের ক্ষোভের মূল কারণগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে, ফলে সমাজের বড় একটি অংশের সঙ্গে শাসনব্যবস্থার দূরত্ব বা বিভাজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জানুয়ারির শুরুতে কয়েকটি বড় শহরে নিরাপত্তা বাহিনী সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল বলেও খবর আসে। পরে ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এই সাময়িক নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা কর্তৃপক্ষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে বলে মনে করা হয়।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ ইরানের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। সীমিত আকারের মার্কিন হামলা ওয়াশিংটনকে সামরিক সাফল্যের দাবি করার সুযোগ দিতে পারে এবং তাৎক্ষণিক আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি ইরানি কর্তৃপক্ষকে দেশের ভেতরে আরও কঠোর দমন-পীড়ন চালানোর অজুহাতও দিতে পারে। নতুন করে ধরপাকড়, গণগ্রেফতার, এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
অন্যদিকে, যদি যুক্তরাষ্ট্র বড় পরিসরে এমন কোনো পদক্ষেপ নেয় যা ইরানি রাষ্ট্রকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয় বা অচল করে তোলে, তাহলে ৯ কোটির বেশি জনসংখ্যার এই দেশটি বিশৃঙ্খলার কিনারায় পৌঁছে যেতে পারে। হঠাৎ করে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়লে শান্তিপূর্ণ বা দ্রুত পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুব কম। বরং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সহিংসতা এবং গোটা অঞ্চলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাই বেশি। এই ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে।
এই ঝুঁকিগুলোই ব্যাখ্যা করে কেন সাম্প্রতিক সময়ে তেহরান আরও কঠোর ভাষায় কথা বলছে। ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর, সাধারণ সশস্ত্রবাহিনী এবং শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা একযোগে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলা, ছোট বা বড় যাই হোক না কেন, যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এতে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে যেসব উপসাগরীয় দেশে মার্কিন সেনা রয়েছে, তারা গভীর উদ্বেগে পড়েছে। ইরানের দ্রুত প্রতিক্রিয়া সেসব দেশকে তাৎক্ষণিক ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে এবং সংঘাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সীমা ছাড়িয়ে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করবে।
ওয়াশিংটনের অবস্থানও সহজ নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একাধিকবার ইরানি কর্তৃপক্ষকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা না চালানোর সতর্কতা দিয়েছেন। অস্থিরতার চরম পর্যায়ে তিনি ইরানিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “সাহায্য আসছে।” এই বক্তব্য ইরানের ভেতরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করে। তবে এই ধরনের ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা ইরানি নেতৃত্বের কাছে সরাসরি হুমকি হিসেবেও ধরা পড়েছে।
দুই পক্ষই একটি বড় কৌশলগত বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন। ট্রাম্প জানেন, গত গ্রীষ্মের ১২ দিনের যুদ্ধের আগের তুলনায় ইরান এখন সামরিকভাবে দুর্বল। অন্যদিকে তেহরানও বোঝে, ট্রাম্প পূর্ণমাত্রার ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ শুরু করতে আগ্রহী নন। এই পারস্পরিক বোঝাপড়া কিছুটা আশ্বস্ত করার মতো হলেও, এতে ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকিও রয়েছে। দুই পক্ষই নিজেদের প্রভাব ও ক্ষমতা বেশি ধরে নিতে পারে, অথবা প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে—যার পরিণতি হতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত।
ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা। তিনি এমন একটি ফল চান, যাকে রাজনৈতিকভাবে ‘বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে। আবার একই সঙ্গে এটাও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ইরান আরও দমন-পীড়নের চক্রে না পড়ে বা পুরোপুরি বিশৃঙ্খলায় ডুবে না যায়। ইরানি নেতাদের জন্য ঝুঁকির জায়গা হলো সময় ও দৃষ্টিভঙ্গি। দেশ যখন ভেতরে ভেতরে নড়বড়ে, তখন আগের মতো বিলম্বিত ও প্রতীকী প্রতিশোধ হয়তো আর যথেষ্ট মনে নাও হতে পারে। নেতারা যদি মনে করেন, বাইরে শক্ত অবস্থান দেখানো ও ভেতরে নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জরুরি, তাহলে তারা আরও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
কিন্তু দ্রুত প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় বিপদ। ভুল সিদ্ধান্ত গোটা অঞ্চলকে এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে, যা টেনে নেওয়ার সামর্থ্য খুব কম দেশেরই আছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষই যখন তীব্র চাপে রয়েছে এবং সামনে এগোনোর পথ সীমিত, তখন দীর্ঘদিনের শক্তি প্রদর্শনের এই খেলাটি সম্ভবত সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখানে সামান্য ভারসাম্যহীনতার মূল্য দিতে হতে পারে শুধু সরকারগুলোকে নয়; লাখো সাধারণ ইরানি মানুষ এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্যকেই।
আপনার মতামত জানানঃ