বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর অবস্থান সব সময়ই সংবেদনশীল, বিতর্কপ্রবণ এবং বহুমাত্রিক। সেই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর পক্ষ থেকে দেওয়া কিছু বক্তব্য ও নেওয়া কয়েকটি পদক্ষেপ নতুন করে আলোচনা উসকে দিয়েছে—এটি কি আদর্শিক রূপান্তরের ইঙ্গিত, নাকি আসন্ন নির্বাচনের বাস্তবতায় কৌশলগত ভাষা ও আচরণ? বিশেষ করে দলটির আমির শফিকুর রহমান–এর নামে প্রচারিত বক্তব্য—রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করা হবে না—দলটির ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে আছে বলে অনেকেই মনে করছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, এটি নতুন কিছু নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলমান এক ধীর পরিবর্তনের প্রকাশমাত্র।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী সব সময়ই আদর্শিকভাবে একটি স্পষ্ট অবস্থান ধরে রেখেছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণাকে যে তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়েছিলেন, তা কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার প্রস্তাব ছিল। সেই উত্তরাধিকার বহন করেই জামায়াত দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছে। পাকিস্তান আমলে ইসলামি সংবিধানের দাবি, পরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রশ্নে অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে দলটি কখনোই নিজেকে কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক দল হিসেবে উপস্থাপন করেনি। ফলে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন না করার মতো বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই বিস্ময়ের জন্ম দেয়।
কিন্তু এই বিস্ময় যতটা আদর্শিক, ততটাই বাস্তব রাজনৈতিক। কারণ ২০১০–এর দশক থেকে জামায়াতে ইসলামীর ওপর যে রাজনৈতিক ও আইনি চাপ তৈরি হয়েছে, তা দলটিকে আগের অবস্থানে স্থির থাকতে দেয়নি। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, শীর্ষ নেতাদের শাস্তি, দলীয় নিবন্ধন বাতিল—এই সবকিছু মিলিয়ে জামায়াত এক গভীর অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। সেই সংকট থেকে বেরোতে গিয়ে দলটি গঠনতন্ত্র সংশোধন করেছে, ভাষা বদলেছে, গণতন্ত্র ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের কথা জোর দিয়ে বলেছে। ‘ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা’-র পরিবর্তে ‘গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ’-এর কথা বলা নিছক শব্দের বদল ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে টিকে থাকার এক প্রকার সমঝোতা।
এই প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে জামায়াতের বৈঠক এবং তাদের আশ্বস্ত করার ভাষা অনেকের কাছে ধারাবাহিক বলেই মনে হচ্ছে। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি মার্থা দাসের বক্তব্যে যে আশ্বাস উঠে এসেছে, তা দলটির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আচরণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। একইভাবে প্রথমবারের মতো হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া—এই সিদ্ধান্তও কেবল নির্বাচনী অঙ্কের ফল নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে দলটির বিরুদ্ধে থাকা ‘অসাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী’ ভাবমূর্তি ভাঙার প্রচেষ্টা।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই পরিবর্তন কতটা গভীর? জামায়াতের নেতারা বলছেন, দল পরিচালিত হবে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, আর রাষ্ট্র পরিচালিত হবে সংবিধান ও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী। এই দ্বৈততার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মূল টানাপোড়েন। কারণ রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত যদি রাষ্ট্রক্ষমতায় যায়, তখন দল ও রাষ্ট্রের এই আলাদা অবস্থান বাস্তবে কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে সন্দেহ থাকাই স্বাভাবিক। সমালোচকেরা বলেন, আদর্শিক দলগুলো ক্ষমতায় গেলে দলীয় দর্শনই রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপ নেয়—বাংলাদেশে হোক বা অন্য কোথাও।
এখানেই নির্বাচনী কৌশলের প্রশ্নটি সামনে আসে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচন মানেই প্রতিশ্রুতি, নরম ভাষা এবং সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা। জামায়াতও এর বাইরে নয়। বিশ্লেষকেরা যেমন বলছেন, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে বৈঠক, শরিয়াহ আইন নিয়ে স্পষ্ট আশ্বাস—এসবই ভোটারদের ভয় কাটানোর কৌশল হতে পারে। বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত ও সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো এখন দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু সব বিশ্লেষক বিষয়টিকে কেবল কৌশল হিসেবেই দেখছেন না। কেউ কেউ মনে করেন, জামায়াতে ইসলামীর ভেতরেই একটি প্রজন্মগত ও চিন্তাগত পরিবর্তন চলছে। দীর্ঘদিন রাজনীতির বাইরে থাকা, দমন–পীড়নের অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া দলটিকে আগের চেয়ে বাস্তববাদী করেছে। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ হলেও রাষ্ট্রীয় জীবনে কঠোর ধর্মীয় আইন চায় না—এই বাস্তবতা জামায়াত হয়তো এখন আগের চেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারছে।
তবে এই বাস্তববোধের সীমাও আছে। নারীদের বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান, নারী প্রার্থী না দেওয়া, কর্মঘণ্টা কমানোর মতো প্রস্তাব—এসব দেখিয়ে সমালোচকেরা বলেন, দলটির উদারতার দাবি আংশিক ও বাছাই করা। সংখ্যালঘুদের আশ্বাস দেওয়া হলেও নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে অনীহা থাকলে সেই উদারতার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ফলে জামায়াতের পরিবর্তনকে অনেকেই ‘নির্বাচনী প্রয়োজন অনুযায়ী সামঞ্জস্য’ হিসেবেই ব্যাখ্যা করছেন।
সব মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামী আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে তার আদর্শিক ইতিহাস ও সমর্থকগোষ্ঠীর প্রত্যাশা, অন্যদিকে বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো ও বহুত্ববাদী সমাজের বাস্তবতা। শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন না করার বক্তব্য এই দ্বন্দ্বেরই প্রতিফলন। এটি একদিকে দলটির অতীত থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়, আবার অন্যদিকে ভবিষ্যতের ক্ষমতার রাজনীতিতে টিকে থাকার চেষ্টা হিসেবে ধরা পড়ে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হয়তো এভাবে নয় যে জামায়াত আদর্শ বদলেছে কি না, বরং প্রশ্নটি হলো—বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শিক দলগুলো কতটা বদলাতে বাধ্য। ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে বাস্তবতা যেমন কথা বলে, তেমনি ক্ষমতায় গেলে সেই বাস্তবতাকে কতটা সম্মান করা হয়, সেটাই আসল পরীক্ষা। জামায়াতে ইসলামী যদি সত্যিই সংবিধান ও বিদ্যমান আইনি কাঠামোর ভেতরেই রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকারে অটল থাকে, তবে তা হবে দলটির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়। আর যদি এটি কেবল নির্বাচনী ভাষা হয়ে থাকে, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি নতুন কোনো গল্প নয়। সময়ই বলে দেবে—এই অবস্থান বদল কৌশল, না কি আদর্শের নতুন ব্যাখ্যা।
আপনার মতামত জানানঃ