Trial Run

রুশ-মার্কিন বিবাদ: খুনিই পারে আর এক খুনিকে চিনে নিতে— বাইডেনকে পুতিন

ছবি: সংবাদ প্রতিদিন

বৃহস্পতিবার (১৮ মার্চ) রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন উপহাসের সুরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মন্তব্যের জবাব দেন। এই দুই বিশ্ব নেতার মধ্যকার উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চিন্তার ভাঁজ ফেলছে বিশ্ব রাজনীতিতে। যদিও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভালই রসায়ন ছিল পুতিনের। কিন্তু হোয়াইট হাউসে পালাবদলের পরে মস্কো-ওয়াশিংটন সম্পর্ক যে এত তাড়াতাড়ি তলানিতে ঠেকবে তা হয়তো ভাবতে পারেননি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

এক টিভি সাক্ষাৎকারে আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন পুতিনকে ‘খুনি’ বলার একদিন পর পুতিনের পাল্টা মন্তব্য, ‘‘খুনিই পারে আর এক খুনিকে চিনে নিতে!’’

এর আগে বুধবার এবিসি নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বাইডেন আলোচিত মন্তব্যটি করেন। যখন তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, রুশ সরকারের বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনিকে বিষ প্রয়োগের ঘটনায় তিনি রুশ প্রেসিডেন্টকে দোষী মনে করেন কিনা। তার উত্তরে বাইডেন দ্বিধাহীনভাবে জানান, হ্যাঁ, তিনি পুতিনকে দোষী মনে করেন।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের মার্চে রাশিয়ার সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সের্গেই স্ক্রিপাল এবং তার মেয়ে সালিমবুরিকে নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগ করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এছাড়া রুশ সরকারের বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনিকেও সম্প্রতি বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এসব ঘটনা পুতিনের নির্দেশে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠলেও বার বারই তা অস্বীকার করে আসছে মস্কো।

পুতিনের পাল্টা জবাব

বাইডেন বলেন পুতিনের মনুষ্যত্ববোধ নেই। পাশাপাশি তিনি বলেন, বিগত ২০২০ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়া হস্তক্ষেপের জন্য মস্কোকে চরম মূল্য দিতে হবে।

এর জের ধরে বৃহস্পতিবার পুতিন বলেন, আমার মনে পড়ে, শৈশবে মাঠে খেলতে গিয়ে আমাদের মধ্যে ঝগড়া বাঁধলে আমরা যে বলতাম, একজন যেমন অন্যজনকে ঠিক তেমন মনে করে, এই কথাটা আসলে কেবল শিশুতোষ কোন কথা বা ঝগড়া নয়, এটা অত্যন্ত গভীর এক সত্য।  

আমরা সবসময় অন্যের মাঝে নিজের গুণাবলী খুঁজতে চেষ্টা করি এবং চিন্তা করি ওই ব্যক্তিটিও আমার মতো। এর ফলে আমরা সেভাবেই অন্যের কাজের মূল্যায়ন করি। 

বাইডেনের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আমরা একে অন্যকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি। আমি কী উত্তর দেব তার কথার? আমি বলবো, আমি আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করি। এটা রসিকতা করে বলছি না। আমি সত্যিই তার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি। 

মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন

সম্প্রতি মার্কিন এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। 

গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালকের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ১৫ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তপেক্ষপের অভিযোগ তোলা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জো বাইডেনের সম্পর্কে বিভ্রান্তিমূলক বা অসমর্থিত অভিযোগ ছড়িয়েছিল মস্কো।

রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি ট্রাম্প প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে এবং প্রচারমাধ্যমগুলোতে বাইডেনবিরোধী প্রচারণার জন্য কাজ করেছিলেন। এছাড়া রাশিয়া তখন ট্রাম্পের জয়ের সম্ভাবনা বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।

ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব কিছু পুতিন জানতেন এবং তিনি নিজেই হয়তো এই বিষয়টি পরিচালনা করেছেন। এর আগেও ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও রাশিয়া হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়বেন রুশ রাষ্ট্রদূত

এদিকে, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের হুঁশিয়ারির পর বুধবার ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূতকে লডেকে পাঠায় মস্কো। মস্কোর সঙ্গে জরুরি পরামর্শ করতে ওয়াশিংটনে রুশ রাষ্ট্রদূত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ছাড়বেন। এতে দু’দেশের সম্পর্কের মধ্যে আরও অবনতি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বৃহস্পতিবার রুশ দূতাবাস জানায়, আগামী ২০ মার্চ, যুক্তরাষ্ট্রে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আনাতলি অন্তোনভ মস্কোর উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটন ছাড়বেন। সংকটে থাকা রুশ-মার্কিন সম্পর্ক সংশোধনে আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে আনাতলির।

রুশ দূতাবাস জানায়, মার্কিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হঠকারী মন্তব্যে দুই দেশের মধ্যকার অতিমাত্রায় সাংঘর্ষিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ার হুমকিতে রয়েছে।

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রসঙ্গে পরামর্শ করতে ওয়াশিংটনে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আনাতলিকে মস্কোতে ডেকে পাঠানো হয়েছে।

রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রেবকভ বলেছেন, রুশ-মার্কিন সম্পর্কের অবনতির সম্পূর্ণ দায় যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে।

 মন্তব্যের কড়া জবাব দিতে চায় রুশ পার্লামেন্ট

বৃহস্পতিবার পুতিনের বক্তব্যের অল্প কিছু পরে ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেস্কভ বলেন, বাইডেনের মন্তব্যে বোঝা যায় মস্কোর সাথে চলমান সমস্যা সমাধানে তাদের কোন আগ্রহ নেই।   

এটা সত্যিই মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্য ছিল অসংলগ্ন।  সে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, আমাদের দেশের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন করতে তারা চায় না। তো আমরা এখন এটা মাথায় রেখেই এগোবো। 

 কনস্টান্টিন কোস্যাশভ, রুশ পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষের উপ-চেয়ারম্যান বলেন, বাইডেনের মন্তব্য ইতিমধ্যেই সম্পর্ক অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি মস্কো ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সমস্যা সমাধানের সমস্ত সম্ভাবনাই শেষ করে দিয়েছে।

কনস্টান্টিন কোস্যাশভ জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে সরিয়ে নেওয়া মস্কোর যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা ছিল।

তিনি তার ফেসবুক পোস্টে বলেন, ধারণা করছি যদি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোন ব্যাখ্যা দেয়া বা ক্ষমা চাওয়া না হয়, তবে এমন মন্তব্য আরও করা হতে পারে।

রুশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের একজন সদস্য আর্টার ক্লিংগ্যারোভ রাশিয়ার ইকো মস্কোভি রেডিও স্টেশনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্যের কড়া জবাব দেবে রাশিয়া।  

রাশিয়ার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

পশ্চিমের সাথে মস্কোর সম্পর্ক ২০১৪ সালের স্নায়ু যুদ্ধ থেকেই অনেকটা ম্লান। এবার রাশিয়ার কারাগারে থাকা অ্যালেক্সেই নাভালনির মৃত্যুতে তা শেষ হবার দোরগোড়ায় গিয়ে পৌঁছালো।  

পশ্চিমা শক্তি যুক্তরাষ্ট্র নাভালনির মুক্তি দাবি করে আসছিল। রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবিকে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ আখ্যা দিয়ে এক প্রকার উড়িয়ে দিয়েছিল।      

গত বুধবার, নাভালনিকে বিষপ্রয়োগে হত্যার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ রাশিয়ার কিছু রপ্তানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।  

মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ থেকে জানানো হয়, ২০১৮ সালের মার্চে রাশিয়ার সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সের্গেই স্ক্রিপাল এবং তার মেয়ে সালিমবুরিকে নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগ করে হত্যার চেষ্টার কারণে এই নিষেধাজ্ঞায় আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হবে।

অভিযোগ বারবার অস্বীকার করে আসছে মস্কো

২০২০ নির্বাচনে হস্তক্ষেপের কারণে রাশিয়ার উপর আরও বিধিনিষেধ আরোপের কথা চিন্তা করছে যুক্তরাষ্ট্র।  

রাশিয়া কী ধরণের ফলাফলের মুখোমুখি হবে জানতে চাইলে বাইডেন এবিসি-কে বলেন, আপনারা শীঘ্রই দেখতে পাবেন।    

এদিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বাইডেনের মন্তব্যের জন্য মস্কো ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করছে।  

চীনের দিকে ঝুঁকছে যুক্তরাষ্ট্র?

রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক যখন সংঘাতপূর্ণ ঠিক সেসময়ই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

আগামী ২২ এপ্রিল দুই নেতার মধ্যে প্রথম ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। কারণ ওই সময়ে ধরিত্রি দিবস উপলক্ষে ওয়াশিংটনে ‘বিশ্ব নেতৃবৃন্দের জলবায়ু বিষয়ক শীর্ষ বৈঠক সম্মেলন’ আয়োজন করছেন বাইডেন।

এই অনুষ্ঠানের লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্বনেতাদের একত্রিত করে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে আলোচনা করা। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে বাইডেন এরই মধ্যে তার পররাষ্ট্র নীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান  হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আমাদের যেখানে স্বার্থ রয়েছে সেখানে আমরা চীনের সঙ্গে সহযোগিতা করবো।

যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনা কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে বৃহস্পতিবার আলাস্কার অ্যাংকরেজে। সেখানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন এবং হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সালিভানের সঙ্গে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং দেশটির শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক ইয়াং জিয়েচির বৈঠকের কথা রয়েছে।

এসডব্লিউ/এসএস/১৩৩৭ 

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 15
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    15
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ