Trial Run

দেশে দ. আফ্রিকাসহ করোনার ১২টি স্ট্রেইন শনাক্ত: টিকার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ

আবারও করোনার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশে৷ হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। আইসিইউ শয্যার সংকট দেখা দিচ্ছে৷ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন চিকিৎসকরাও৷

সম্প্রতি দেশে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের নতুন স্ট্রেইন পাওয়া গেছে। এ তথ্য জানিয়েছে গ্লোবাল জিনোম সিকোয়েন্সিং ডেটাবেস জিআইএসএআইডি। এর আগে জানুয়ারিতে কয়েকজনের দেহে যুক্তরাজ্যের নতুন স্ট্রেইন পাওয়া যায়। 

“বাংলাদেশে করোনার ১২টি স্ট্রেইন রয়েছে, যা একাধিক দেশেও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের স্ট্রেইনগুলো সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয়।”

ডেটাবেসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকার স্ট্রেইনে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় গত ২৪ জানুয়ারি। ‘বি ডট১ ডট ৩৫১’ বা ‘৫০১ ডট ভি২’ নামে পরিচিত এই স্ট্রেইনটি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রেও পাওয়া গেছে। ব্রাজিলে প্রথম শনাক্ত হওয়া স্ট্রেইনের সাংকেতিক নাম ‘বি ডট১ ডট১ ডট১০৭’।

জিআইএসএআইডি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকার স্ট্রেইনটি ছাড়াও দেশে আরও ১১ ধরনের করোনাভাইরাস স্ট্রেইন রয়েছে।

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের সর্বোচ্চ হার ছিল গত জুলাই মাসে৷ এ পর্যন্ত মাস হিসেবে মোট সংক্রমণের ২২ দশমিক ৪৬ ভাগ হয়েছে ওই মাসে৷ 

গত ২১ ফেব্রুয়ারি করোনা শনাক্তের হার ২ দশমিক ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছিল। যা গতকাল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে। গত ৮ মার্চ নতুন শনাক্ত হয়েছিল ৮৪৫ জন। গতকাল সোমবার এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে এক হাজার ৭৭৩ এ দাঁড়িয়েছে।

সংক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মৃত্যুর হারও। গত রোববার করোনায় আক্রান্ত ১৮ জনের মৃত্যু হলেও গতকাল হয়েছে ২৬ জনের।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) গত সপ্তাহে ৯৩টি নতুন জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের ডেটা পাঠিয়েছে জিআইএসএআইডি ডেটাবেসে।

জানতে চাইলে বিসিএসআইআরের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিস্ট ড. সেলিম খান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সূত্র মতে, এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে জিআইএসএআইডি ডেটাবেসে ৯০৩টি জিনোম সিকোয়েন্সিং ডেটা দেওয়া হয়েছে।

জিআইএসএআইডি ডেটাবেসের তথ্য ব্যাখ্যা করে ঢাকার আশিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চীফ মলিকুলার বায়োলজিস্ট মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘জিআইএসএআইডি ডেটাবেসে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে করোনার ১২টি স্ট্রেইন রয়েছে, যা একাধিক দেশেও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের স্ট্রেইনগুলো সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয়।’

যুক্তরাজ্যের নতুন স্ট্রেইন শনাক্ত

যুক্তরাজ্যের নতুন স্ট্রেইন দুই মাসের বেশি সময় আগে শনাক্ত হয়েছে। এর কারণে দেশে সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া এক তথ্য অনুযায়ী, ৮৩টি দেশে যুক্তরাজ্যের নতুন স্ট্রেইন ধরা পড়েছে। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই মত দিয়েছেন, নতুন স্ট্রেইনটি শতকরা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত মারাত্মক হতে পারে।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম জানান, ‘যুক্তরাজ্যের স্ট্রেইন বাংলাদেশে জানুয়ারিতে শনাক্ত হয়েছে।’

বর্তমান সময়ে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনেকে সন্দেহ করছে যুক্তরাজ্যের স্ট্রেইনের কারণে বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওই স্ট্রেইন সারাদেশে ছড়িয়ে গেছে আগের স্ট্রেইনকে রিপ্লেস করে- এটা এত তাড়াতাড়ি সম্ভব নয়। সুতরাং এই একটা জিনিস দিয়ে এটাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। আরও অন্য ফ্যাক্টর থাকতে পারে।’

ভাইরাসটি দ্রুত ছড়ায় উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কিন্তু ছড়ানোর জন্য তো একটা সুবিধা থাকতে হবে। একজন আরেকজনের সঙ্গে মিলেমিশে, তারপরই তো ছড়াবে। জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, এটা অস্বাভাবিক মনে হয়। তবে সম্ভাবনা আছে।’

দক্ষিণ আফ্রিকার স্ট্রেইন শনাক্ত

দক্ষিণ আফ্রিকার এই স্ট্রেইনটি অধিকসংখ্যক মানুষকে সংক্রমিত করে মারাত্মক অসুস্থ করে ফেলে— এমনটা নিশ্চিত নয়। তবে এ ধরনের ভাইরাস দ্রুত ছড়ায় এবং করোনার টিকা এই স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে ভালো কাজ করে না। 

দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন স্ট্রেইনের স্পাইক প্রোটিনে কিছু পরিবর্তন থাকে। এ কারণে এটি খুব সহজে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। 

সে কারণ বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকার স্ট্রেইনটি যদি দেশে এসে থাকে তাহলে তা উদ্বেগজনক। কারণ এই স্ট্রেইনটি অন্যান্য স্ট্রেইনের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত ছড়ায়।

বাংলাদেশ কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের (বিসিএসআইআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. আবুল খায়ের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান জানান, গত ২১ জানুয়ারি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার থেকে জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের জন্য পাঠানো নমুনায় দক্ষিণ আফ্রিকার স্ট্রেইন শনাক্ত হয়েছে।

উল্লেখ্য, দক্ষিণ আফ্রিকায় পাওয়া করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেইনটি জাপান, ফিলিপাইন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ৬১টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতে চারটি, সিঙ্গাপুরে তিনটি, থাইল্যান্ডে ছয়টি ও চীনে একটি দক্ষিণ আফ্রিকার করোনার নতুন স্ট্রেইনের অস্তিত্ব মিলেছে।

ব্রাজিলের স্ট্রেইন শনাক্ত

ব্রাজিলে যে করোনার স্ট্রেইন আছে, সেটি ব্রাজিল থেকে ফেরা এক নাগরিকের শরীরে পাওয়া গেছে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। আক্রান্ত ও তার যাবতীয় কন্ট্যাক্টদের কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছে। 

ব্রাজিলের ভাইরাস স্ট্রেইনটাকে ইতিমধ্যেই কালচার করা হয়েছে। সেটির ওপর করোনা টিকা কার্যকর কি না, পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।

আইসিএমআরের তরফ থেকে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বে ব্রাজিলের স্ট্রেইনটি ইতিমধ্যে ১৫টি দেশে ছড়িয়েছে।

প্রশ্নের সম্মুখীন টিকার কার্যকারিতা  

যুক্তরাজ্যের নতুন ধরনটির বিরুদ্ধে বর্তমানে প্রাপ্ত সব টিকাই কার্যকর। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে নিয়মিত মানুষ আসা-যাওয়া করে বলে এটি আমাদের জন্য একটি স্বস্তির বিষয়। 

কিন্তু এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিপজ্জনক হল দক্ষিণ আফ্রিকা বা ব্রাজিলের ধরনটি। দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনটির ‘ই৪৮৪কে’ নামের একটি জায়গায় মিউটেশন হয়, যার ফলে নতুন ধরনটির মাঝে ‘প্রতিরোধ ক্ষমতা এড়ানোর কৌশল’ রয়েছে। এর ফলে আমাদের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসটিকে সহজে শনাক্ত করতে পারে না এবং নিষ্ক্রিয়ও করতে পারে না।

একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল থেকে জানা গেছে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের বিপক্ষে কার্যকর নয়। এ কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার তাদের জনগণকে অক্সফোর্ডের টিকা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

সম্প্রতি নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনের একটি গবেষণার ফলাফল থেকে জানা গেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের বিপক্ষে অ্যান্টিবডি তৈরির পরিমাণ ফাইজারের টিকার ক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ কমে যায়।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিএসআইআর জিনোমিক রিসার্চ ল্যাবরেটরির এক বিজ্ঞানী বলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার এই স্ট্রেইনটি ‘এন ৫০১ ওয়াই’ নামের একটি মিউটেশন বহন করে, যা এটিকে আরও সংক্রমণ বা ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে। এই ভাইরাসের আরেকটি মিউটেশন ‘ই৪৮৪কে’ আরও ভয়াবহ। এটি মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে ধোঁকা দিয়ে টিকার কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে।’

আজকের করোনা পরিস্থিতি 

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ৮ হাজার ৫৯৭ জনের। নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৭১৯ জন। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬০ হাজার ৮৮৭ জনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঢাকা সিটিসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ও বাড়িতে উপসর্গ বিহীন রোগীসহ গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৩৫২ জন। এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ৫ লাখ ১৪ হাজার ৪৭৯ জন। 

সারাদেশে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ২১৯টি ল্যাবে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা হয়েছে। এর মধ্যে আরটি-পিসিআর ল্যাব ১১৮টি, জিন-এক্সপার্ট ২৯টি, র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন ৭২টি। 

এসব ল্যাবে ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ২০ হাজার ৯৩৬টি। মোট নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ২০ হাজার ৭৪৮টি। এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৪৩ লাখ তিন হাজার ৯৯৪টি।

এতে আরও জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৯১ দশমিক ৭৩ এবং শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

টিকা প্রদান কার্যক্রম 

নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ মোকাবিলায় দেশে জাতীয়ভাবে টিকা প্রয়োগের ৩১তম দিনে ৮৭ হাজার ৮৬০ জন টিকা নিয়েছেন। এর মধ্যে রাজধানীতে টিকা নিয়েছেন ১৫ হাজার ৯৮৪ জন।

এ নিয়ে দেশে এখন পর্যন্ত ৩১ দিনে মোট টিকা নিলেন ৪৪ লাখ ৮৫ হাজার ৯৫৪ জন। এর মধ্যে কেবল রাজধানী ঢাকায় টিকা নিয়েছেন ৭ লাখ ২৩ হাজার ৪৯৫ জন। আর টিকা নিতে আগ্রহীদের নিবন্ধন সংখ্যা পেরিয়ে গেছে ৫৭ লাখ।

সোমবার (১৫ মার্চ) স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমানের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সোমবার বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত টিকা গ্রহণের জন্য সারাদেশে নিবন্ধিত ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭ লাখ ৭০ হাজার ১৯৮ জনে।

চাপ বাড়ছে হাসপাতালগুলোতে

মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানেই করোনা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন চিকিৎসকরা৷ আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় হাসপাতালগুলোতে চাপ বাড়ছে৷ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের আইসিইউগুলোতে আসন সংকট দেখা দিচ্ছে৷

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ’র প্রধান ও অ্যানেস্থেসিওলজি অধ্যাপক ডা. শাহজাদ হোসাইন মাসুম মনে করছেন করোনার নতুন কোন ধরনের বিস্তার ঘটছে৷ সেটি হতে পারে বাইরে থেকে এসেছে অথবা বিদ্যমান ভাইরাসই নিজেকে বদলে আরো শক্তিশালী হয়েছে৷

তিনি বলেন, পরিস্থিতি আবার খারাপের দিকে যাচ্ছে৷ আমরা নিজেরাই নতুন পরিস্থিতিতে হতভম্ব৷ এটা যে টিকা আসার পর মানুষ গা ছাড়া দিয়েছে শুধু সেই কারণেই হচ্ছে তা আমার মনে হয় না৷ তাহলে তো আগেই হত৷  

তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আমাদের সামাজিব দূরত্ব অবশ্যই বজায় রাখতে হবে৷ টিকার কারণে গা ছাড়া দিলে হবে না৷ আর মাস্ক অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে৷ জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে৷

তিনি জানান, করোনা টিকার দ্বিতীয় ডোজ নেয়ার দুই সপ্তাহ পর তা কার্যকর হয়৷ প্রথম ডোজ নিয়েই শরীরে কোভিড প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই৷ কাজেই টিকা নিয়েই নিশ্চিত হওয়া বা স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করা ভয়ংকর বলে উল্লেখ করেন এই চিকিৎসক৷

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নীতিমালা অনুযায়ী, টানা দুই সপ্তাহ পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে থাকলে করোনা নিয়ন্ত্রণে ধরা যায়। বাংলাদেশে সংক্রমণের হার টানা আট সপ্তাহের বেশি সময় যাবৎ ৫ শতাংশের নিচে ছিল।

তবে গত কয়েকদিন ধরে দেশে আবারও করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েছে। প্রতিদিন গড়ে মৃত্যু এবং আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এদিকে ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে জ্বর, সর্দি, কাশিসহ ঠান্ডাজনিত রোগের প্রার্দুভাব। ফলে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে।

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ বি এম আবদুল্লাহ গণমাধ্যমকে জানান, ‘কিছু দিন হল করোনা শনাক্তের হার বাড়ছে। এটা করোনার দ্বিতীয় ঢেউ কি না, এ বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাবে না। আরও অপেক্ষা করতে হবে। আগামী দুই সপ্তাহ যদি এই হার বাড়তে থাকে তাহলে বুঝতে হবে দেশে করোনা দ্বিতীয় ঢেউ এসেছে।’

স্বাস্থ্যবিধি না মানলে সামনে বড় বিপদ জানিয়ে এই চিকিৎসক জানান, ‘প্রায় দুই মাস দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে ছিল, যে কারণে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে উদাসীনতা দেখা দিয়েছে। টিকা নেওয়ার পর অনেকে স্বাস্থ্যবিধি ও মাস্ক পরা ছেড়ে দিয়েছেন। রাজনৈতিক সমাবেশ, সামাজিক অনুষ্ঠানেও মানা হচ্ছে না শারীরিক দূরত্ব।

‘গত দুই সপ্তাহে বিদেশ থেকে প্রচুর মানুষ দেশে আসছে। তাদেরও সেভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে স্বাস্থ্যবিধি মানায় জোর দেয়া।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, নতুন ধরনের করোনায় আক্রান্ত ছয়জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিষয়টিকে ‘অনেকটা আপেক্ষিক’ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, অন্যান্য দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসেছে। কারণ, তারা শুরুতেই কঠোর লকডাউনে ছিল। যখন লকডাউন খুলে দেয়া হলো, তখন সংক্রমণের হার বাড়তে শুরু করছে। ওখানে ভাইরাস পরিবর্তনের কারণে এটা হতে পারে। আরও অনেক কারণ থাকতে পারে।

সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, ‘প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় ঢেউ পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর। আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলায় সংক্রমণের হার বেড়েছে।’

ফের লকডাউন নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা!

মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম জানান, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং মৃত্যুহার ক্রমাগত বেড়ে চললেও দেশে লকডাউন দেয়ার চিন্তা নেই। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কঠোর লকডাউনের বিষয়ে আমাদের কোনও নির্দেশনা দেয়া হয়নি। তবে আগের যে স্বাস্থ্যবিধি ছিল, সেগুলো বেশি বেশি করে মানা, সেগুলো প্রচার করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

‘আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে— রেস্তোরাঁ, পরিবহনে ভিড় এড়ানো, সবাইকে মাস্ক পরানো, পর্যটন কেন্দ্রগুলোয় যেন লোকজন ভিড় না করে।’

তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করণীয় বিষয়ে বৈঠকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাব 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে নজীর আহমেদ বলেন, করোনা আমদের একবার কমে গেল। সেখান থেকে আবার একবার যে বৃদ্ধি পেলো, এটি একটি উদ্বেগের বিষয়। এই অবস্থা যে কতদূর যাবে, তাই বোঝা দরকার। জানা উচিত কেন এরকম হচ্ছে। সেটা সরকারেরই উচিত ভালো করে বিশ্লেষণের ব্যবস্থা করা। 

এটি করার জন্য গবেষণা দরকার, সার্ভে দরকার, জিনোম সিকয়েন্সিং করা দরকার। তবে মুশকিল হচ্ছে সরকারের এমন কোনও উদ্যোগ দেখা যায় না। বরং তারা শুধু মানুষ নিয়ম কানুন মানছে না, এই কারণেই সংক্রমণ বাড়ছে বলে দায় সারছে।

তিনি আরও বলেন, জানুয়ারিতে করোনার নতুন স্ট্রেইন শনাক্ত হলো, কিন্তু সেটা প্রকাশ করা হলো মার্চে। তখন সবাইকে জানিয়ে এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন করা যেত। কিংবা নির্বাচন কমিশন যে পৌরসভা নির্বাচন করেছে, এটার কারণে মানুষের মনে ভুল একটা মেসেজ গেছে, যে নির্বাচন যদি করা যায়, তাহলে হয়তো সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা ও ভ্রমণে যাওয়া যাবে। 

এগুলোকে বলা হয় ফলস সেন্স অব সিকিউরিটি। এই জায়গাগুলোতে যথাযথ ভূমিকা যদি না থাকে, তাহলে আমাদের এই সমস্যা মিটবে না।

তিনি বলেন, ইউকে থেকে আসা যাত্রীদের ঠিকমতো কোয়ারেন্টিন দরকার ছিল। সব দেশ যেখানে ফ্লাইট বন্ধ করে দিল, সেখানে আমাদের মানুষ আসছে। তাদের ঠিকমতো কোয়ারেন্টিন হচ্ছে না, তারা বের হচ্ছে, অনুষ্ঠানে যাচ্ছে। 

এ অবস্থা চলতে থাকলে ও সরকার সিরিয়াসলি বিষয়টা দেখভাল না করলে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাবে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। 

এসডব্লিউ/এমএন/এসএস/২০১৭ 


State watch সকল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত সংবাদ মাধ্যম, যেটি পাঠকদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। যে কোন পরিমাণের সহযোগীতা, সেটি ছোট বা বড় হোক, আপনাদের প্রতিটি সহযোগীতা আমাদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় অবদান রাখতে পারে। তাই State watch-কে সহযোগীতার অনুরোধ জানাচ্ছি।

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 160
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    160
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ