Trial Run

পৃথিবীর প্রাচীন ৭টি ভাষা, যা এখনো চলমান

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বে বর্তমানে ৭ হাজারের বেশি ভাষা প্রচলিত আছে। ২০১৭ সালের হিসাব মতে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষ কথা বলে ইংরেজিতে (১,১৩২ মিলিয়ন)। দ্বিতীয় স্থানে আছে চীনের ম্যান্ডারিন (১,১১৭ মিলিয়ন), তৃতীয় স্থানে হিন্দি (৬১৫ মিলিয়ন)। আর বাংলা আছে চতুর্থ স্থানে (২৬৫ মিলিয়ন)।  তবে উইকিপিডিয়া তথ্যানুসারে মাতৃভাষীর সংখ্যায় বাংলা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের পঞ্চমমোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুসারে বাংলা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা। ম্যান্ডারিন ভাষায় অক্ষর আছে ৫০ হাজার! তবে এ ভাষায় প্রকাশিত খবরের কাগজ পড়তে আপনাকে ২ হাজারের মতো অক্ষর জানলেই হবে।

এক গবেষণায় জানা গেছে, বিশ্বে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি ভাষা বা ভাষা রীতি বিলুপ্ত হচ্ছে। বর্তমানে ২৩১টি ভাষা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, আর ২ হাজার ৪০০টি ভাষা আছে হুমকির মুখে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বর্ণমালা আছে কম্বোডিয়ার ভাষা খেমারে। এ ভাষায় বর্ণমালার সংখ্যা ৭৪টি। আর সবচেয়ে কম বর্ণমালা আছে নিউগিনির রোটোকাটস ভাষায়, তাতে বর্ণমালার সংখ্যা ১২টি। সবচেয়ে বেশি শব্দ আছে ইংরেজি ভাষায়। এ ভাষার মোট শব্দ সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি! বিশ্বে সবচেয়ে বেশি অফিসিয়াল ভাষা (১১টি) আছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় শব্দ অবশ্য ‘টিনিন’ নামের সবচেয়ে বড় প্রোটিনের রাসায়নিক নাম। তাতে আছে ১,৮৯,৮১৯টি বর্ণ!

প্রথম ভাষা কী ছিল তা নিয়ে তর্কের কোন শেষ নেই। তবুও ভাষাবিদরা বহু ভাষার উপরে গবেষণা করার পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, একটি ভাষা কত পুরনো তা নির্ধারণ করার উপায় রয়েছে। সেই ভাষাটি প্রথম কোন পাঠ্যে পাওয়া গেছে এবং তার সমসাময়িক ব্যবহার দেখলেই তার উৎপত্তির সময় বোঝা সম্ভব হয়। চলুন জেনে আসা যাক, প্রাচীন পৃথিবীর সে ভাষাগুলো কী ছিল। এ লেখায় তুলে ধরা হলো সেই সাতটি ভাষার কথা।

তামিল: ৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ
৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এর ইতিহাসের হদিস পাওয়া গেলেও বিশ্বাস করা হয় এর উৎপত্তি ২৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষ তামিল ভাষায় কথা বলেন। তামিল ভাষা মূলত দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলঙ্কায় প্রচলিত দ্রাবিড় ভাষা। তামিল ভাষার সাহিত্য ২ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো এবং এর লিখিত ভাষাটির খুব সামান্যই পরিবর্তন হয়েছে। তামিল ভাষার আয়ুষ্কাল ৫০০০ বছর। এর সাহিত্যভাণ্ডার সুবিশাল,  বৈচিত্র্যময় এবং সংগৃহীত।

তামিলকে পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘজীবি ভাষার মধ্যে একটির খেতাব দেয়া হয়েছে। ১৮ বছর আগের এক গবেষণায় দেখা যায় তামিল ভাষায় এ যাবত ১,৮৬৩ টি সংবাদ পত্র প্রকাশিত হয়েছে। ভাষাভিত্তিক গবেষণায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব দেখা যায় কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম তামিল। যুগ যুগ ধরে এই ভাষার তথ্য সম্ভার সংরক্ষিত হয়েছে। এই সমসাময়িক ব্যবহারের জন্যেই তামিল বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ভাষা হিসেবে বিবেচিত।

গ্রিক: ১৫০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ
একটা সময় ছিল যখন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক এবং শিক্ষাবীদরা গ্রিক ভাষাতেই ভাবতেন, কথা বলতেন এবং লিখতেন। বর্তমানে গ্রিস এবং সাইপ্রাস নিবাসী প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ এই ভাষাতেই কথা বলেন, লেখেন। এটি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্যতম সরকারি ভাষাও বটে।

সংস্কৃত: ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ
ভারতের এই প্রাচীনতম ভাষার উৎপত্তি প্রায় ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। সংখ্যায় যদিও কম, তবু এখনও বেশ কিছু মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন। সংস্কৃতের প্রভাব বহু ভাষার উপরে রয়েছে। কম্পিউটারের প্রাথমিক ভাষা সংস্কৃতের উপর ভিত্তি করেই তৈরি করা হয়েছে। গবেষকদের ধারণা, ইন্দো ইউরোপিয়ান ভাষা বংশের ভাষা সংস্কৃত সৃষ্টি হয়েছিল তামিল ভাষা থেকে। এটি ভারতের সর্বোচ্চ শ্রেণীর ভাষা। বেশিরভাগ হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থ এই ভাষায় রচিত হয়েছিল। এটি এখনও ভারতের প্রশাসনিক ভাষার একটি। যদিও মাতৃভাষা হিসেবে সংস্কৃতের ব্যবহার নেই বললেই চলে।

চীনা ভাষা: ১২৫০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ
বিশ্বের সব চেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষের শেখা প্রথম ভাষাই হল চীনা। পৃথিবীর প্রায় ১২০ কোটি মানুষ চীনা ভাষাকেই তাদের প্রধান ভাষা হিসেবে বিবেচনা করেন। শাং সাম্রাজ্যের শেষের দিকে প্রায় ১২৫০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে এই ভাষার উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। সমসাময়িক ব্যবহারের নিরিখে তামিলের পাশাপাশি চীনা ভাষাকে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ভাষা হিসেবে ধরা হয়।

হিব্রু: ১০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ
হিব্রু ভাষা ইসরায়েলের দেশীয় ভাষা। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে মাত্র ৯০ লাখ মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন। সারা বিশ্বে ৯০ লাখ ভাষাভাষীদের মধ্যে ৫০ লাখ ভাষাভাষীরা ইসরায়েলে। হিব্রু আফ্রো-এশীয় ভাষা-পরিবারের সেমিটীয় শাখার একটি সদস্য ভাষা। তথ্য প্রমাণ অনুযায়ী ১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দেই এর উপস্থিতির নিদর্শন পাওয়া যায়। হিব্রু ভাষার ইতিহাস বৈচিত্র্যময়। ২০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মুখের ভাষা হিসেবে এটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৯শ শতকের শেষে ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কথ্য ভাষা হিসেবে এটির পুনর্জন্ম হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে (প্রধানত রাশিয়া থেকে) বর্তমান ইসরায়েলে (তৎকালীন ব্রিটিশ প্যালেস্টাইনে) ইহুদিরা তাদের নিজস্ব বিভিন্ন মাতৃভাষা যেমন আরবি, ইডিশ, রুশ, ইত্যাদির পরিবর্তে আধুনিক হিব্রু ভাষায় কথা বলা শুরু করেন। ১৯২২ সালে হিব্রু ব্রিটিশ প্যালেস্টাইনের সরকারি ভাষার মর্যাদা পায়।

লাতিন: ৭৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ
পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আজও এই ঐতিহ্যবাহী ভাষাটি তার অস্তিত্ব বজার রেখেছে। সংস্কৃতের তোই লাতিন ভাষাও অন্যান্য ভাষার উপর প্রভাব বিস্তার করেছে। রোমান সাম্রাজ্যে এর উপস্থিতির কথা জানা যায়। এখনও পোল্যান্ড এবং ভ্যাটিকান সিটিতে সরকারি ভাষা লাতিন এবং বিশ্বের কয়েক লাখ মানুষ এই ভাষা শেখেন।

 আরবি ভাষা :  ৫১২ খ্রিস্টাব্দ
বর্তমানে সারা বিশ্বের প্রায় ২৯ কোটি মানুষ আরবি ভাষায় কথা বলেন। আরবি ভাষা বহু প্রাচীন বলে ধারণা করা হয়, তবে এই ধারণার কোন ভিত্তি নাই। এই ভাষার প্রথম নিদর্শন পাওয়া যায় ৫১২ খ্রিস্টাব্দে।  ইসলামের আবির্ভাবের ঠিক আগের যুগে আরব উপদ্বীপে আরবি ভাষার উৎপত্তি ঘটে। প্রাক-ইসলামী আরব কবিরা যে আরবি ভাষা ব্যবহার করতেন, তা ছিল অতি উৎকৃষ্ট মানের। তাদের লেখা কবিতা মূলত মুখে মুখেই প্রচারিত ও সংরক্ষিত হত। আরবি ভাষাতে সহজেই বিজ্ঞান ও শিল্পের প্রয়োজনে নতুন নতুন শব্দ ও পরিভাষা তৈরি করা যেত এবং আজও তা করা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ যেমন ইউএই, সৌদি আরব, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইরান, ইসরায়েল, মিসর, জর্ডান, কুয়েত এবং ওমানের সরকারি ভাষা আরবি।

এসডব্লিউ/এমএন/ এফএ/২১১৫

ছড়িয়ে দিনঃ
  • 260
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    260
    Shares

আপনার মতামত জানানঃ